কি লিখি তোমায়

খসড়া ২৪ জানুয়ারী ২০১৫, শনিবার, ০১:১৭:২৭অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি, বিবিধ ৫৬ মন্তব্য

তখন কচিং সেন্টার এভাবে বিস্তার লাভ করেনি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই/বোনদের কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যপারে সাজেশন নেয়া এই ছিল কাজ। তখন পাখা গজিয়েছে। বাবা/মা বলেন— ভাল করে বই পড় না হলে কোথাও চাঞ্চ পাবেনা। কিসের পড়াশুনা? পড়াশুনার নাম করে এই হল ঐ হল দল বেঁধে ঘুড়ে বেড়ান। কোন কোন ভাইয়া/আপা তাদের আদর্শের কথা বলে আমাদের বিমোহিত করে দিত। আমারা তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতাম এইখানে ভর্তি হলে এই ভাইয়া/আপা হবেন আমাদের আদর্শ। তবে এটা ঠিক কোন ভাবেই কেন যেন আমাদের মনে স্থান করে নিতে পারেনি জামাতের ভাইয়া/আপারা।

ঠিক কবে থেকে যে ই এম ই বিল্ডিং এর সামনে বসে আড্ডা দিতে শুরু করেছিলাম মনে নেই। সেই সময় প্রায়ই দেখতাম ভীষন শান্ত ভঙ্গিতে একটি ছেলে ই এম ই বিল্ডিং থেকে বের হয়ে রশিদ হলের দিকে যেত একা। ছেলেটি হাঁটতো সোজা হয়ে কিন্তু দাঁড়াত এক পায়ের উপর ভর করে বাঁকা হয়ে। কখনই তাকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে দেখিনি। ছেলেটি ই এম ই বিল্ডিং থেকে বের হওয়া মাত্র আমরা নিজেদের মধ্যে ডাকতাম ‘দ’ । ছেলেটি নির্বিকার। কোনদিন ফিরেও দেখেনি। তাতে আমাদের আনন্দের এতটুকুও ভাঁটা পরেনি। উপরন্তু তার নাম হয়ে গেল ভোঁতা ‘দ’বা কালা ‘দ’।

কি কারনে জানি না নির্যাতন করার একটি মানুষ আমরা পেয়ে গেলাম। একদিন বাদাম নিয়ে বিক্রেতা ছোকরাকে পাঠালাম তার কাছে টাকা নেবার জন্য। ছেলেটি একবার মাত্র আমাদের দিকে তাকিয়ে টাকাটা দিয়ে দিল। প্রচন্ড আশাহত হলাম। এর তিন চারদিন পর আবার বাদামওয়ালাকে পাঠালাম তার কাছে। এবার সে এসে বলল—- “ কি চান আপনারা?”

—“আমরা তো কিছু চাই না।“

—“গেটের কাছে চাইলেই পারতেন দুই টাকা, বেচারা বাদামওয়ালাটাকে ভিক্ষা করা শেখাচ্ছেন কেন?” বলে বাদামওয়ালাকে দুই টাকা দিল, আর আমাদের দিকে দশ টাকার একটা নোট বাড়িয়ে ধরে বলল —আপনাদের পাঁচ দিনের বাদামের দাম অগ্রীম দিলাম ধরেন। আমরা কেউ হাত বাড়ালাম না দেখে টাকাটা বাদামওয়ালাকে দিয়ে বলল –“ওদের পাঁচ দিন বাদাম খাওয়াস।“ ততক্ষণে আমাদের হা হা হিহি সব শেষ। জীবদের সব আনন্দ ধূলিসাৎ। অপমানে জর্জরিত আমরা ছয়জন পরবর্তী কর্মসূচী স্থগিত রেখে বাড়ি অভিমুখে রওয়ানা হলাম।

পরবর্তী কর্মসূচী ছিল তৌকির আহম্মেদকে টন্ট করা এবং সেখান থেকে বেরিয়ে ইডেন কলেজের সামনে এসে বুইড়া ডেন্টিস্ট অরূপ রতন চৌধুরীর হাসি মুখের দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে তা তা দেয়া।

এর পর দিন গেছে দিনের নিয়মে। আমাদের কাজ আমরা করে গেছি। তাই বলে ভদ্রলোক হয়েছিলাম ভাবার কোন কারন নেই। আমাদের ছয় জন এর মধ্য আমি ও রুমা ছিলাম একই খুরে মাথা কামানো। হেন অপরাধ নাই যা আমরা ছয়জন ছাড়া করি নাই তবে রুমা ও আমি ছিলাম একই গ্রুপে। আমাদের অপরাধের তালিকায় ছিল— ছিনতাই, সিগারেট খাওয়া, গাঁজা টানা, ভিক্ষা করা, চুরি করা, টেলিফোনে বিরক্ত করা , পত্রমিতালীর ঠিকানা দেখে চিঠি লেখা, সবচেয়ে উল্লেখ্যযোগ্য পাত্রচাই বিজ্ঞাপণ দেখে সেখানে ইনিয়ে বিনিয়ে চিঠিলেখা। একবার এক পাত্র পক্ষতো বিদ্যুতদের বাড়িতে এসে হাজির। বিদ্যুতরা তিন ভাই কোন বোন নাই। বিদুত্যের বাবা/মা তো আমাদের দেখলেই হাসে। এরপর বাবা অবশ্য বলে দিয়েছিল –ঠিকানা দিলে আমার চেম্বারের ঠিকানা দিস। যাই করিনা কেন আমাদের অপরাধের শাস্তি শুধু মৃদু ভৎসনার উপর দিয়ে যেতো, কিন্তু ছেলেগুলির উপর দিয়ে মহা ঝড় বইতো। অপরাধের নাকি এই শুরু।

রুমা ছিল শ্যামলা, ওর ছিল পটল চেরা চোখ আর মেঘ কালো চুল। অপরূপ ঐ চোখের দিকে তাকিয়ে আমি মুগ্ধ হয়ে যেতাম। সবাই বলতো ওর চোখ নাকি কথা বলে। এখনও সাদিক ভাই ওর চোখ নিয়ে অখাদ্য কবিতা লেখে আর সুদূর কানাডা থেকে মধ্যরাতে ফোন করে ঘুম থেকে ডেকে তুলে সেই কবিতা শুনিয়ে বলে —কেমন হয়েছে, বল। আমি হাই তুলতে তুলতে বলি —–সাদিক ভাই কবিতাটা মেইল করেন । আমি আমার নামে ব্লগে ছাপিয়ে দেব। রুমা কোন দিনও কবিতা শোনে না, কবিতা বলতে শুরু করলেই রুমা খুব নিরুত্তাপ গলায় বলে —আমাকে বললেই হয় অন্য ঘরে যাও, কষ্ট করে কবিতা লেখার দরকার কি? হায় রুমা তুই প্রতিভার মূল্য দিলি না। আর আমার জানু গান লেখে সেই গানে তার প্রেমিকা সব সময়ই মৃত। অর্থাৎ তার গান বিরহের। সে যে কাকে নিয়ে লেখে? আমাকে নিয়ে? আমি তো এখনও বেঁচে আছি। আমি মরার আগেই যদি তার দুঃখানুভূতি শেষ হয় তবে তো বিপদ।

একদিন আমরা মানুষ হলাম অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একখানা সার্টিফিকেট পেলাম। বাবা/মা তাদের কর্তব্য সম্পাদন করবার উদ্দ্যেশে আমার জন্য পাত্র খুঁজতে শুরু করল। পাত্র দেখতে গেলাম ইভাদির বাসায়। লম্বাটে মুখে গোল গোল বড় ফ্রেমের চশমা পরিহিত শুকনা পাত্র দেখে পছন্দ হবার কোন কারনই নেই। তা সেই পাত্রের পাত্রীর বাবা/মা কে অভিভূত করবার মত যতই কাগজপত্র থাক না কেন? প্রথমেই ছেলেটাকে কেমন যেন পরিচিত পরিচিত মনে হল। খুঁজে পেলাম টেংরা মাছের সাথে তার চেহারার বড়ই মিল। বাসায় ফিরেই বাবাকে বললাম ——কে বলেছে ছেলে কম কথা বলে? কথা শুনতে শুনতে আমি যা বলব বলে ভেবে রেখেছিলাম তাই তো ভুলে গেছি।!

বাহ্‌ , কি দারুন! আমি ছাড়াই আমার বিয়ের কথাবার্তা চলছে । বাবাকে যেয়ে বললাম ——-বিয়ে তো আমি করব আমার ছেলে পছন্দ হয়েছে কিনা জিজ্ঞাসাও করছ না যে? তুমি কি ভেবেছ তোমার পছন্দের ছেলেকে আমি বিয়ে করব?
বাবা বলল —-তুই তো বাসায় ঢুকতে ঢুকতেই জোরে জোরে সবাইকে শুনিয়ে বললি যে তোর ছেলে পছন্দ হয়েছে। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম —মিথ্যুক, কখন বললাম!!??
—-ঐ যে বললি না যে, কে বলেছে ছেলে কম কথা বলে? কথা শুনতে শুনতে আমি যা বলব বলে ভেবে রেখেছিলাম তাই তো ভুলে গেছি।! ওতেই তো মা আমি বুঝে গেছি ছেলে তোর পছন্দ হয়েছে।
লে হালুয়া। বললাম –বাবা, একটু ভাবতে দাও! বাবা বললেন,—- কাল ওরা আসুক এর পর ভাবিস। পরদিন পাত্রপক্ষ বাসায় এসে যত অঘটন ঘটায় তাতে আমি আর ভাববার সময়ই পেলাম না। একফাঁকে পাত্র আমাকে জিজ্ঞাসা করল —আচ্ছা তোমার সেই গরু গরু চোখের বান্ধবীটা কই? পাত্রের প্রশ্ন শুনে আমার মাথা গরম । রুমার এত্ত সুন্দর চোখকে বলে কিনা গরুর চোখ? জীবনানন্দ দাস এই চোখকে বলেছে পাখির নীড়ের মত? আশ্চর্য! এই ছেলের সাথে সারাজীবন থাকা যাবে না। শূন্য মাথায় ভাবনা ঘুরতে শুরু করল রুমাকে এই টেংরা মাছ চেনে কিভাবে? মরার উপর খাড়ার ঘা এর মত জয় এসে খবর দিল এই তো আমাদের সেই ‘দ’!
সব শেষে আবার ভাবনায় ডুবে গেলাম যখন রুমা বাবাকে বলল—- চাচা সারাজীবন সব কাজ এক সাথে করেছি, ওর যে বিয়ে হচ্ছে এখন আমার কী হবে? বাবা এক গাল হেসে বললেন –তোর ও হবে মা।
সেটা ছিল ——থাক তারিখটা উহ্যই থাক।

উঠ ছূড়ি তোর বিয়ে টাইপের বিয়ে হয়েছে আমার। যা আমার চেনা কিংবা কল্পনার জগতের সাথে মিলে না। তাই বর যখন আমাকে বলেছিল –শুনেছি তুমি খুব ভাল কবিতা আবৃত্তি করতে পার একটা কবিতা শোনাবে? আমি তখন তাকে শুনিয়েছিলাম –যত বার আলো জ্বালতে চাই/নিভে যায় বারে বারে/——/উৎসবে তার আসে নাই কেহ/বাজে নাই বাসি সাজে নাই গেহ/—-

২৫ এপ্রিল আমার বাবার মৃত্যুবার্ষিকী। (রব্বি হাম হুমা কামা রব্বাইনা সাগীরা)। বাবাকে কখনই কষ্ট স্পর্শ করতো না। বাবা আমার সব আনন্দের সাথে মিশে আছে। আমি বাবাকে সবসময়ই আনন্দের সাথে স্মরণ করি। ভাল থাক বাবা।

২৫ এপ্রিল, শুভ জন্মদিন তোমাকে আর বলা হয়না মন। তুমি আমার জীবনের আনন্দের কাব্য। সেই রাতে যে আলো জ্বেলেছি তা আলোকিত করে রেখেছে তোমার আমার ভুবন। তুমি আমার বাবার দেয়া শ্রেষ্ঠ উপহার।

১৬১৯জন ১৬১৯জন
0 Shares

৫৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ