মানুষ ফিরুক জীবনে

রিমি রুম্মান ১১ আগস্ট ২০২০, মঙ্গলবার, ১২:৩৫:২৫অপরাহ্ন সমসাময়িক ৯ মন্তব্য

করোনাভাইরাস মহামারীকালে আমরা আমাদের দ্বিতীয় ঈদটি পালন করেছি। এবারো ঈদের দিন কেউ আমাদের বাড়ি বেড়াতে আসেনি। আমরাও যাইনি কারো বাড়িতে। আমরা মেহেদিতে হাত রাঙিয়েছি একাকি চার দেয়ালের মাঝে। ঈদের কেনাকাটা হয়নি। রান্না হয়েছে স্বল্প পরিসরে। ঘরে থাকা পাঞ্জাবি, পোশাক পরে সপরিবারে গিয়েছি উম্মুক্ত সবুজ প্রান্তরে। সেখানে বন্ধুরাও এসেছে একে একে। খোলা আকাশের নিচে সবুজ মখমলের মতো নরম ঘাসে শীতল পাটি বিছিয়ে নিজেদের সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া খাবার ভাগাভাগি করে খেয়েছি শেষ বিকেলের মোলায়েম আলোয় মাখামাখি হয়ে। মাস্ক পরে দৈহিক দূরত্ব মেনে একসঙ্গে সময় কাটিয়েছি। গল্প করেছি। ঈদ-উল-আযহার দিন কয়েক আগে বাড়ি থেকে ৯০ মাইল দূরে কানেক্টিকাটের এক খামারে গিয়ে গরু পছন্দ করে মুল্য পরিশোধ করে আসা হয়েছিল। গরু জবাইয়ের জন্যে এপয়েনমেন্ট দেয়া হয়েছিল ঈদের পরদিন মধ্যাহ্নে। বন্ধুরা সকলে মিলে সপরিবারে সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। উদ্দেশ্য আমাদের সন্তানদের কুরবানি সম্পর্কে ধারণা দেয়া। কিন্তু করোনামহামারী সংক্রমণ প্রতিরোধে খামার কর্তৃপক্ষ কিছু নিয়ম বেঁধে দিয়েছে। বিধায় আমাদের আর সপরিবারে যাওয়া হয়নি। পরিবারের কর্তারা গিয়েছেন শুধু। সন্ধ্যার কিছু পরে মাংস নিয়ে ফিরেছেন তারা। সেই মাংস ভাগ বাটোয়ারা করে মধ্যরাত অব্দি স্বজন, বন্ধুদের বাড়ির সামনে গিয়ে দিয়ে এসেছি।

আট মাস আগে চীনের উহান প্রদেশে শুরু হওয়া করোনাভাইরাসে সারা বিশ্বে মৃত্যুসংখ্যা ৭ লক্ষ ছাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যু ঘটেছে ১ লক্ষ ৫৫ হাজারের বেশি মানুষের। এত অধিক সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর ভয়াবহতার উপর দাঁড়িয়েও থেমে নেই কারো জীবন। জীবন ফিরতে চাইছে জীবনের নিয়মে। শিশুরা ফিরতে চাইছে স্কুলে। সংবাদপত্রের এক প্রতিবেদনে জানলাম, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের একটি শহরে একদল শিক্ষার্থী পাহাড়ের উপরে উন্মুক্ত স্থানে ক্লাস করছে। সেখানেই খোলা আকাশের নিচে নিজেদের শ্রেণীকক্ষ বানিয়ে নিয়েছে তারা। মাস্ক পরা, দৈহিক দূরত্ব মেনে চলা সহ কোভিড-১৯ সংক্রমণ প্রতিরোধে সকল নির্দেশনা মেনে শিক্ষা গ্রহণ করছে তারা। বিষয়টি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মন্দ নয়। কোভিড-১৯ সংক্রমণ থেকে রেহাই পেতে অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের জন্যে এটি ভালো ফল বয়ে আনবে হয়তো। ঘরের ভেতরে মাসের পর মাস বন্দি থেকে বিরক্ত শিশুদের হতাশা থেকে বেরিয়ে আনার চমৎকার উদ্যোগ।

এদিকে নিউইয়র্ক সিটির স্কুলগুলো আসছে সেপ্টেম্বরে খোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। স্কুল চ্যান্সেলর ই-মেইলের মাধ্যমে এ বিষয়ে অভিভাবকদের মতামত জানতে চেয়েছেন। ৭ই আগস্টের মধ্যে জানাতে অনুরোধ করেছেন, যেন তারা সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে। চাইলে নিউইয়র্ক সিটির শিক্ষার্থীরা বাড়িতে বসেই সপ্তাহে পাঁচদিন রিমোট লার্নিং এর মাধ্যমে ক্লাস করতে পারবে। আবার চাইলে স্কুলে গিয়েও ক্লাস করতে পারবে। স্কুলে গিয়ে ক্লাস করতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ছাত্রদের কিছু অংশ সপ্তাহে ২/৩ দিন স্কুলে গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করবে। সপ্তাহের বাকি দিনগুলো রিমোট লার্নিং এর সাহায্য নিতে হবে। ই-মেইলে জানানো হয় যে, স্কুলগুলো যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা করেই শিশুদের পাঠদান করবে। বিষয়টিকে অনেক অভিভাবকই স্বাগত জানিয়েছে। নিউইয়র্কের অন্যতম বিশেষায়িত হাই স্কুল ‘ স্টাইভেসেন্ট’ এ টুয়েলভ গ্রেড পড়ুয়া আমার বড়ছেলে ‘ অল-রিমোট লার্নিং’ অপশন বেছে নিয়েছে। এ বিষয়ে তার যুক্তি, নিরাপদে ঘরে বসে রিমোট লার্নিং এর মাধ্যমে সে পড়াশোনায় আরো বেশি সময় দিতে পারবে বলে তার ধারণা। কেননা বিগত তিন মাস রিমোট লার্নিং এর মাধ্যমে অংশগ্রহণ করা পরীক্ষাগুলোয় সে অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো ফলাফল করেছে। অন্যদিকে বাড়ির কাছের এলিমেন্টারি স্কুলে ফিফথ গ্রেড পড়ুয়া ছোটছেলের জন্যে বেছে নিয়েছি ‘ মিশ্রিত শিক্ষা’ অপশনটি। স্কুল ভবনে গিয়ে সপ্তাহে ২/৩ দিন ক্লাস করাটা যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে। কেননা ‘ রিমোট লার্নিং’ পদ্ধতি তার জন্যে সেই অর্থে স্বাচ্ছন্দ্যের নয়। অনেক কিছুই বুঝতে অসুবিধা বোধ করছে সে।

‘ আমরা খুব ধিরে স্বাভাবিক জীবনের পথে হাঁটছি একপা, দুইপা করে ’, এমনটিই মনে হয়েছিল। কিন্তু গত ৪ঠা আগস্ট দীর্ঘ চারমাস পর গাড়ি ড্রাইভ করতে গিয়ে সত্যিই সবকিছু কেমন যেন অস্বাভাবিক ঠেকেছে। তুমুল বর্ষণ আর ঝড়ো বাতাসে বড় বড় সড়কে গাছের ডাল কিংবা আস্ত গাছই উপড়ে পড়ে থাকতে দেখি। বিধায় পথে পথে বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছিল চলন্ত গাড়িগুলো। অথচ এমন ঝোড়ো বাতাস কত দেখেছি আমার দেশে! কিন্তু এমন করে প্রতিটি ষ্ট্রীট, এভিনিউতে শেকড়সহ গাছ উপড়ে যেতে দেখিনি। আমার প্রায়শই মনে হয় এই বিদেশ বিভূঁইয়ের প্রকাণ্ডসব বৃক্ষের শেকড় আমার দেশের মতো মাটির খুব গভিরে প্রোথিত নয়। পথে যেতে যেতে এতদিনের চেনা প্রশস্ত সড়কগুলোকে সংকুচিত মনে হয়েছে। সড়কের দুই পাশে শামিয়ানা টাঙিয়েছে রেস্তোরাঁ মালিকরা। এখনো পানশালা কিংবা রেস্তোরাঁর ভেতরে বসে সদলবলে পান করা, খাওয়া, আড্ডা দেয়ার অনুমতি নেই। বিধায় বাইরের মুক্ত বাতাসে দূরত্ব বজায় রেখে শামিয়ানার নিচে চেয়ার-টেবিল সাজিয়ে ক্রেতাদের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। অন্যদিকে ২৪ ঘণ্টার আলো ঝলমলে, লোকে লোকারণ্য ম্যানহাটন এখনও ছন্দে ফিরেনি। ফিরবেই বা কেমন করে! চাকুরি, ভ্রমণ কিংবা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে অন্য স্টেটের মানুষ, যাদের অহরহ আসা-যাওয়া ছিল, তাদের জন্যে এই সময়ে নিউইয়র্ক আসাটা কঠিন হয়ে উঠেছে। কেননা ৩৬টি স্টেটে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সেখান থেকে কেউ নিউইয়র্ক এলে ১৪ দিনের কয়ারেন্টিনে থাকতে হবে বাধ্যতামূলকভাবে। নতুবা ২০০০ ডলার জরিমানা গুণতে হবে। এতো ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে কে-ই বা চাইবে। অফিস-আদালত, ব্যবসাবাণিজ্য, পানশালা, রেস্তোরাঁ আর এয়ারপোর্টের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ট্যাক্সিচালনা পেশা। শহরের অন্যতম সৌন্দর্য হলুদ ক্যাব এখন এই শহরে প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। আগে রাত বিরাতে ঘুরে বেড়াতাম। ফেরার পথে ২৪ ঘণ্টা খোলা কোনো চেইন স্টোরের পার্কিং লটে গাড়ি পার্ক করতাম। একজন নেমে গিয়ে প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতাম, অন্যজন গাড়িতে বসে আয়েশ করে দেশে কথা বলতাম। কিন্তু পরিবর্তিত সময়ে এটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কোনোভাবেই একাকি নির্জন পার্কিং লটে বসে থাকা নিরাপদ নয়। চারিদিকে ক্রাইম বেড়েছে। ফ্লয়েড হত্যা, ‘ ব্ল্যাক লাইভস মেটার ’ আন্দোলনের পর পুলিশি তৎপরতা কমেছে। রাত বাড়লে নিস্তব্ধ শহরটাকে এখন ভীতিকর মনে হয়।

তবুও সব আঁধার একসময় ফুরায়। গহীন অরন্যের শেষপ্রান্তে এক চিলতে আলো দেখবার প্রত্যাশা থাকে পথ খুঁজে বেড়ানো মানুষের। অবসাদ, মানসিক চাপ কাটিয়ে পৃথিবীর মানুষ ফিরুক জীবনে। শহর ফিরুক তার নিজস্ব ছন্দে। প্রকৃতি ফিরুক নিজের নিয়মে। আমরা সেই সুদিনের প্রত্যাশায় পথ চেয়ে রই।

১৬০জন ৭০জন
0 Shares

৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য