সময়ের সাথে আসলে বদলে গেছে অনেক কিছুই। বদলেছে আমাদের জীবন, বদলেছে চারপাশের পরিবেশ আর বদলেছে বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকের দৃশ্যপট। কোন একটা সময় বাংলাদেশের সংগীত প্রেমী একটা ব্যান্ড এর জনপ্রিয় কোন গানকে মনে রাখতো সেই ব্যান্ড এর লিড ভোকালিস্ট এর মাধ্যমে। যেমন এক সময় মাইলস এর ‘ফিরিয়ে দাও’  ছিলো শাফিন আহমেদ এর গান,  সোলস এর  ‘মন শুধু মন ছুয়েছে’ গানটি ছিলো তপন চৌধুরির গান । কিন্তু দৃশ্যপট কিন্তু অনেকটা চেঞ্জ হয়েছে আজ। সময় কে হাতে ধরে , বা সময়ের দাবী মেটাতেই একের পর এক বাংলা ব্যান্ড উঠে এসেছে আমাদের মাঝে। এগিয়ে নিয়ে গেছে আমাদের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি কে। ঠিক তেমনি এগিয়েছে আমাদের শ্রোতাদের ও দৃষ্টিভঙ্গি।

বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকের নাম শুরু করলে সবার আগেই আসে একজন প্রবাদ পুরুষের নাম। মহান মুক্তিযোদ্ধা ” মাহবুবুল হক আজম”  যাকে আমরা পপ সম্রাট ” আজম খান” নামে চিনি। স্বাধীনতা পরবর্তি বাংলাদেশী ব্যান্ড মিউজিক সিন শুরুই হয়েছিলো তার গঠিত ব্যান্ড ” উচ্চারণ” এর হাত ধরে।

এরপর বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকে যোগ হলো নতুন জনরা  পপ রক। সত্তরের মাঝামাঝি সময়ে শুরু করেছিলো  মাইলস , সোলস , ফিডব্যাক,ফিলিংস ( নগর বাউল*), রেনেসা “ ।  এই পাঁচ টা ব্যান্ড এর কথা বলতেই হবে । শুধু পরিবর্তন নয়, বাংলা মিউজিক সিনারিও তে সেই সময় এনেছিলো যুগান্তকারি পরিবর্তন।  তাদের গান গুলোর স্পেশালিটি ছিলো নিজেদের ব্যাসিক কম্পোজিশন ধরে রেখে সুর এবং ভোকালের উপর বেশী জোড় দেয়া।  রাস্তার মোরে মোরে প্রথম ব্যান্ড মিউজিক পৌছে দিয়েছিলো কিন্তু এই ব্যান্ডগুলো ই।  এর পর আসলো ওয়েভস নামে একদল তরুন , ভুবন ভুলানো হেভি মেটাল যা শুনে বাঙালি তাদেরগান কে অপসংস্কৃতি বলে আখ্যায়িত করলো। এই তরুন ব্যান্ড যা কিছু করেছিলো জার্মানিতে বসেই। সেসময়ের সংগীত প্রেমী রা সেইভাবে নেয় এই ধারার সংগীত কে। ফলে এই প্রতিভাবান ব্যান্ড টি হারিয়ে গেলো জেগে ঊঠার আগেই। 🙁

কেউ চলে যায় কাউকে যায়গা দিতেই।  চলে আসলো বাংলা ব্যান্ড মিউজিক সিনারিও কে বদলে দেওয়া চারটা ব্যান্ড ।  বাংলাদেশের চার স্বপ্নের ব্যান্ড    ” রকস্ট্রাটা, ইনঢাকা , এসেস, ওয়ারফেজ” । হার্ড রক/ হেভী মেটাল দিয়ে পুরো জাতিকে নতুন ভাবে ভাবতে বাধ্য করেছিলো সর্বপ্রথম কিন্তু এই ব্যান্ড গুলোই। এদের মাঝে ছিলো মিউজিকাল একচেঞ্জ। এরা নামে চারটা ব্যান্ড হলেও সবাই ই ছিলো একে অপরের অনেক কাছাকাছি। ছিলো বিশাল একটা শক্তি। ওয়েভসের দেখানো পথ ধরে বাংলাতেও যে হেভী মেটাল করা যায় তা সেইটা শক্ত ভাবে প্রতিষ্টা করে গেছে ব্যান্ড গুলো।  এর পর আসলো “ ডিফরেন টাচ, উইনিং ,নোভা , এল আর বি, আর্ক, পেন্টাগন, পেপার রাইম, লিজেন্ড, সুইট ভেনম, অবসকিউর ”  এর মত ব্যান্ড যাদের সব কিছুই ইতিহাস কে এগিয়ে নিয়ে গেছিলো অনেক অনেক দূরে। এই ব্যান্ড গুলো নিজেরাই  একেকটা ইতিহাস যা আমরা সবাই ই জানি।

আইয়রন মেইডেন এর গান শুনতে  শুনতে হঠাৎ করেই  চার জন বন্ধু প্ল্যান করলো ব্যান্ড করবে এবং তারা গড়ে ফেললো আজকের ” ক্রিপটিক ফেইট” । এদিকে বাপ্পা মজুমদার এবং সঞ্জীবদা মিলে অন্য ধরনের ব্যান্ড “দলছুট” সৃষ্টি করলো । ফিডব্যাক ছেড়ে মাকসুদ উল হক  তৈরি করলেন তার ব্যান্ড ” মাকসুদ ও ঢাকা “ । এর পর আসলো বুয়েটের আঙ্গিনায় বেড়ে উঠা একদল প্রবাদ পুরুষ, যাদের গান শুনে রেকর্ড লেভেল প্রথমে ফিরিয়েই দিয়েছিলো ,। তারা আর কেউ নাই আজকের  ব্যান্ড ” শিরোনামহীন”  । গড়ে উঠলো “ভাইকিংস, দ্যা ট্র্যাপ”  এর মত ব্যান্ড ।

ওয়ারফেজ বেজিস্ট বেজবাবা সুমন ওয়ারফেজ ছেড়ে তৈরী করলেন এ যুগের অন্যতম সফল ব্যান্ড ‘অর্থহীন ‘ । সেদিন যদি বেজবাবা এভাবে না ভাবতেন , ওয়ারফেজ এর সাথে যদি এখনো থেকে যেতেন , তাহলে কি  আমরা পেতাম ‘অর্থহীন ‘ ???

এই ছিলো বাংলার সোনালী নব্বই । গর্বের নব্বই। নব্বই যেমন দিয়েছে আমাদের কে অসাধরন সব গান তেমনি দিয়েছিলো কিছু ব্যান্ড যারা শাসন করেছে ২০০০ পরবর্তী সময়।

১৯৯৯ । বাংলা ব্যান্ড পেলো একসাথে কিছু অমর রত্নের সন্ধান। আর সেই ব্যান্ড গুলোর গান  কে এক করে ইশা খান দূরে  রিলিজ করলেন মিক্সড এলব্যাম ” ছাড়পত্র“। এই ছাড়পত্র এবং পরের বছর রিলিজ পাওয়া ” অনুশীলন” এলব্যাম কে অনেক সংগীত বোদ্ধারা যুগান্তকারী এলব্যাম হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

সেই ছাড়পত্র এলব্যাম দিয়ে আগমন ঘটালো অনেক আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড  যার মধ্যে  “আর্টসেল , ব্ল্যাক , মেটাল মেজ, coprophilia , এবং নেমেসিস” অন্যতম।  আর্টসেল, ব্ল্যাক, নেমেসিসের পরের খবর তো সবার ই জানা।

এর পর স্টেনটোরিয়ান, আর্বোভাইরাস , ক্রাল ,  দ্যা ওয়াটসন ব্রাদার্স , রিবর্ন  , এর মত ব্যান্ড গুলোও এগিয়ে যেতে লাগলো । শহরতলী নামে সম্পূর্ণ অন্যধারার গান শুরু করলো একদল অন্য জগতের মানুষ । এর পর আসলো আরো একটি মেজর টার্ন । “ দ্যা রক স্টার ” এই শো এর মাধ্যমে ” পাওয়ারসার্জ , রেডিও এক্টিভের, মেকনিক্স , দৃক ” এর  মত ব্যান্ড চলে আসলো ইন্ডাস্ট্রিতে।

ভাইব । আফসোস এর যদি কোন সমার্থক শব্দ থাকে তাহলে সেটাকে একবারে বলা যাবে ভাইব। এক এলব্যাম দিয়েই স্বর্ণ শিখরে পৌছে গিয়েছিলো ভাইব। কিন্তু তারপর থেকেই হারিয়ে গেলো।

 মিনেরভা, শুন্য, চিরকুট, পরাহো, বে অফ বেংগাল, অশ্রুত,  এক্লিপ্স, রিকল, ক্রিমিটিক্স এক্স, ডি ইলুমিন্যাশন, গ্রুভ ট্রাপ , ক্রিমেটিক এক্স, স্কেয়ার ক্রো , পয়জন গ্রীন, ই এফ, ওয়ারসাইট, লালন, মেঘদল , মহাকাল , সহজিয়া , এভোয়েড রাফা, ইন্ডালো, নাগরিক, নোনতা বিস্কুট,ওল্ড স্কুল , পেন্টাগন , দ্যা ট্রী এর মত ব্যান্ড  নিজ নিজ অবস্থানে থেকে আজ মাতাচ্ছে পুরো বাংলাদেশ ।

আমাদের আছে কিছু ট্যালেন্টেড আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড। ” Orator, Burial Dust, Satanic, Nafarman, Grimorium Verum, Enmachined, Abominable Carnivore, Thrash,  Zerg, Naive , Homicide” তাদের মধ্যে অন্যতম।  যাদের হাতে বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তার রুপরেখা বর্তমানে বসেই অংকন করা যায় ।

বাংলা ব্যান্ড একদিনে গড়ে উঠেনি । সেই গুরু আজম খান থেকে আজ পর্যন্ত শত শত মানুষ নিজেকে উজার করে দিয়ে ব্যান্ড মিউজিককে নিয়ে এসেছে আজকের এই অবস্থানে। এখন আমাদের গৌরবউজ্জ্বল এই ইতিহাস কে নিয়ে গর্ব করার পালা আর এই ইন্ডাস্ট্রি রক্ষার দায়িত্ব আমাদের।

আসুন সবাই গান ডাউনলোড না করে গান কিনি । এগিয়ে নিয়ে যাই আমাদের মিউজক কে আরো বহুদুর ।

সোনেলা তে প্রায় তিন বছর পোস্ট করলাম। ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন।

৪০৭জন ৪০৬জন
19 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য