সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

প্রদীপ দূর্গো পূজোর ছুটিতে বাড়িতে গেল কিছুদিনের জন্য।তার বাপি ছিলেন তাদের গ্রামের সবার পরিচিত হোমিওপ্যাথি ডাক্তার।লোকমুখে “ডাক্তার বাবু,ডাক্তার বাবু” ডাকেই তিনি সুপরিচিত।প্রদীপ রাতে খাবার টেবিলে খেতে বসে তার বাবুকে নানান বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে লাগল কৌতূহলবশত।জিজ্ঞাসাতে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছিল নিম্নোক্ত প্রশ্নাবলী- উনি যখন টগবগে যুবক ছিলেন,তখন যৌবনে জীবনকে কিভাবে দেখেছেন?রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস তিনি কিভাবে কাটিয়েছিলেন?একটি ক্ষুধা,দারিদ্র্য মুক্ত,শোষণহীন,সাম্যাবস্থার উপর সমাজ বিনির্মানে উনার বক্তব্য কি?বুর্জোয়া নাকি সমাজতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে তিনি?

 

প্রদীপের অকস্মাৎ এহেন প্রশ্ন সমগ্রে উনি যেন আকাশ থেকে পড়লেন!অবাক হওয়ার কারনটাও অনেকটাই দিবালোকের মত পরিষ্কার।প্রদীপ আগে কখনোই ইতিহাস,রাজনীতি নিয়ে এতটা নাড়াচাড়া করেনি।তার বাপি উৎসাহি হয়ে কোন কিছু জানাতে গেলে সে শুনার জন্য শুনত।এতটুকুই ব্যাস!নিজে থেকে আগ বাড়িয়ে জানার ইচ্ছে বা প্রয়াস ছিল না তার মধ্যে।গতানুগতিক বইপড়াতে ডুবে থাকাই যেন ছিল তার অদম্য নেশা।তবে আজ কেন এত বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হল তার মাঝে?সব্যসাচী অর্জুনের জিজ্ঞাসু মনের সীমাহীন জিজ্ঞাসার মতো নিজ পুত্রের মনে আজ এত জিজ্ঞাসা কেন?সেটাই ভাবতে ভাবতে উত্তর দিচ্ছিলেন।কিছুটা আশংকিত হয়ে পড়লেন তাকে নিয়ে।

 

উনি উনার ভাবনায় আশংকার কথা আর মুখ ফুটে বলেননি প্রদীপকে।ছেলে বড় হতে থাকলে হয়তো একটা দূরত্বের অনির্দিষ্ট রেখা অংকিত হয় জীবনেও।আগে প্রতি বছরই পূজোর প্রতিটি দিনেই সাতসকালে অঞ্জলি নিত প্রদীপ নির্ভুলভাবে।ঘরে আর কেউ উপবাস করুক আর নাই করুক,তার উপবাস করতেই হবে।এটা ছিল তার অলিখিত আইন।কিন্ত সেবার দেখা মিলল প্রদীপে ভিন্নতা!অঞ্জলি নিচ্ছে না,পূজোতে বেড়াতে বের হচ্ছে না পাড়ার বন্ধুদের নিয়ে,পূজো শেষে মায়ের বিসর্জনে যাচ্ছে না,মঙ্গলার্থে দেয়া শান্তিজল বা হাতে বাধানো শান্তিও নিচ্ছে না।

 

পূজো শেষ হলে পরদিন তার বাপি তাকে কোলে টেনে নিলেন পরম মমতায়।ছেলের এই পরিবর্তন যেন উনি মেনে নিতে পারছিলেন না।উনি উনার শান্ত,সুবোধ প্রদীপকেই ফিরে পেতে ব্যাকুল।কিন্ত অকস্মাৎ প্রদীপের মুঠোফোন বেজে উঠতেই বাপির জড়ানো মায়ার বাধন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে খুব একটা সময় নিল না।এই আবেগমাখা ভালবাসা যেন আজ বিরূপতায় ভরা।

 

ঘটনার পেছনের ঘটনায় হাতড়াতেই দেখা মিলল কিছু নজিরের।পরিমলের সাথে প্রদীপ বাড়ির ছাদে উঠে কথা বলছিল তাদের পঠিত সর্বশেষ কয়েকটি রেফারেন্স বই নিয়ে।তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল প্রবীর ঘোষের লেখা “অলৌকিক নয় লৌকিক” বই শীর্ষক খন্ডিত আলোচনা।তারা তাদের অর্জিত জ্ঞান বিনিময় করছিল পরষ্পরের মাঝে।ঈশ্বরে অগাধ বিশ্বাসে তাদের ধারনায় ফাটল তৈরি করে দিল ওই বইটি।কিছু ভন্ড সাধু,সন্যাসীর কীর্তিকলাপের সচিত্র বর্ননা তাদের বিশ্বাসের জগত থেকে যেন অনেকটাই দূরে ঠেলে দিল।প্রদীপের বাপি আড়াল থেকে শুনতে পেলেন ছেলের ওই কথোপকথন।উনি ভীষণভাবে ব্যাথিত হয়ে পড়লেন।

 

সুনীল তার বাসার ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার থেকে পত্রিকা মুড়িয়ে তাদেরকে দিয়েছিল পড়ার জন্য।প্রদীপ,পরিমল পালাক্রমে বইটির আদ্যোপান্ত পড়ে শেষ করে ফেলল সীমাহীন কৌতূহল নিয়ে।জনশ্রুতি আছে যে নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের থাকে দূর্বার আকর্ষণ।আর ওই বইটি সুনীলের পত্রিকায় মুড়িয়ে দেয়ার কারনেই সমাজের নিষিদ্ধতা মনে করিয়ে দিল প্রদীপ আর পরিমলকে ভীষণভাবে।

 

হঠাৎ করেই প্রদীপের বাপি বেশ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।বিছানা থেকেই যেন উঠতে পারছিলেন না।বিশেষজ্ঞ কোন ডাক্তার গ্রামে না থাকায় প্রদীপ ও তার এক কাকাতো ভাই শুভ পাশের বড় গ্রামে ছুটে গেল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এক ডাক্তারের কাছে।ডাক্তারের বিরামহীন ব্যস্ততার কারনে লাগাতার অনুরোধ করেও ডাক্তারকে সাথে নিয়ে বাড়িতে ফিরতে ব্যার্থ হল।অতঃপর নিকট এক ফার্মেসিতে গিয়ে বাপির জন্য জরুরি কিছু ঔষধপত্র কিনে নিয়ে আসল বাড়িতে।

 

বাপির ছলছল চোখের চাহনি তাকে কিছুক্ষণ স্থির করে রাখল থেমে থাকা ঘড়ির মতো করে।তিনি প্রদীপের হাত মুঠোয় ভরে আরো কিছুদিন গ্রামে থেকে যেতে বললেন।ছেলের নৈকট্যতেই তিনি দিব্যি সুস্থ হয়ে উঠবেন বলে আশ্বাস দিলেন।প্রদীপ মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক সম্মতি দিল কেবলি বাপিকে খুশি করতে।

৩৮৪জন ২৪০জন
20 Shares

১৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ