প্রাপ্তবয়স্ক জন্মদিন

মুহম্মদ মাসুদ ১৪ এপ্রিল ২০২০, মঙ্গলবার, ১২:৫৪:০০অপরাহ্ন ছোটগল্প ১০ মন্তব্য

 

ট্রেন চলছে।

ট্রেনের বুকের মধ্যে বহুগামী মানুষের ভিড়ভাট্টা। কেউ কেউ ট্রেনের জানালা দিয়ে আকাশের চাঁদ জোছনা দেখছে। আবার কেউ কেউ চাঁদ জলরাশির প্রেম দেখে মুগ্ধ হচ্ছে। কেউ কেউ ট্রেন ভ্রমণের উপাখ্যান ডায়েরির বৃদ্ধ পাতায় তুলে রাখছে। আবার কেউ কেউ ট্রেন, রাত্রি, আকাশের ক্যানভাস এবং ভিড়ভাট্টার মানুষদের নিয়ে কবিতা লিখতে ব্যস্ত। আবার কেউ কেউ ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে হাঁকিয়ে সিগারেট টানছে আর মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে থাকা প্রিয়জনের ছবিতে তাকিয়ে রয়েছে। আবার কেউ স্বপ্ন বুনছে, এইবার হয়তো চাকরিটা পেয়েও যাবো। চাকরিটা পেয়ে গেলে মাধবীলতাও অন্য কারো হবে না। আবার কেউ তখনও জীবিকার জন্য হরদম যুদ্ধ করছে।
এমন স্বপ্নের সিঁড়িগুলার ভিড়ে হঠাৎই হোঁচট খেলো সবাই। জীবিকার জন্য যুদ্ধ করা মানুষটি পড়ে গেলো। আকাশের চাঁদ জোছনা দেখা মানুষটির ট্রেনের জানালার সাথে গুতা খেল। ডায়েরিতে অনুভূতি তুলে রাখা পৃষ্ঠাটি ছিড়ে গেলো। কবিতা লেখার প্রিয় সামগ্রী কলমটি দূরে কোথাও ছিটকে পড়ে গেলো। মোবাইল স্ক্রিনে প্রিয়জনের ছবি ভেসে থাকা মোবাইলটি ঝোপঝাড়ে গেলো। মাধবীলতার স্বপ্নে ডুবে বিভোর মানুষটির ঘুম ভেঙে গেলো। বৃদ্ধ দাদুর চশমাটি ট্রেনের মেঝেতে পরে ভেঙে গেলো।
সবাই চমকে উঠলো। অজানা একটি ভয় প্রত্যেকটি মানুষের বুকে কাঁটা বিঁধাল। কেউ কেউ বলে উঠলো হঠাৎ ট্রেনটি থেমে গেলো কেন? এখানে কোন তো স্টেশন নেই। তবে কি ডাকাতদের… ?
আবার কেউ কেউ বলে উঠলো, হয়তো ট্রেনের যন্ত্রাংশে সমস্যা। নইলে এই ঘন জঙ্গলে ট্রেন থামবে কেন?
না, সংশয় যেন কাটছে না। রহস্যের গন্ধ প্রত্যেকের চোখে মুখে ঠোঁটে। কারো কারো বুক ধড়ফড় করছে। কারো কারো শরীর আচমকাই ঘেমে যাচ্ছে। ততক্ষণে সবাই ট্রেনের দরজা জানালা বন্ধ করে দিয়েছে।
ট্রেনের ট্রেনের এ্যাটেনডেন্ট, টিটি এবং ট্রেনে থাকা পুলিশ সবাইকে ভয় পাবেন না ভয় পাবেন না বলে সামনের বগিতে যেতে লাগলো। তখন অবশ্য সবার মুখে কিছুটা স্বস্তির আভাসে নিশ্বাসের পথ সুগম হয়েছে।
ট্রেন তখনও ছাড়ছে না। স্বকীয় অনুভবে দাড়িয়ে আছে। তখন অবশ্য সবাই বলাবলি শুরু করলো, ‘যদি সমস্যা না হয়ে থাকে তবে কেন ট্রেন…?’
বিলাসবহুল এসি ক্যাবিনের দরজায় নক পড়লো। বাইরে এ্যাটেনডেন্ট, টিটিই ও পুলিশ দাঁড়িয়ে। ভিতর থেকে এক বয়স্ক ব্যক্তি দরজা খুলে দিয়েই বলতে শুরু করলো,’ ও! আপনারা এসেছেন।’
কথাটি শুনেই সবাই চমকে উঠলেন। এবং দেখলেন ভিতরে বেশ লাল নীল, বিভিন্ন রঙের আলোকসজ্জা। একটি বড়সড় কেকও রয়েছে।
বয়স্ক ব্যক্তিটি বললেন, ‘আসুন, সবাই কেক নিন। আজকে আমার নাতির জন্মদিন। ১২ বছর পূর্ণ হলো। ওকে নিয়েই বৈশাখ উদযাপন করতে ঢাকায় যাচ্ছি।’
বালক মাসুদ বললো, ‘দাদু প্রত্যেকবার আমাকে এভাবেই চমকে দেয়। সত্যি! আমিও ভাবিনি ট্রেনে আমার জন্মদিন পালন হবে। গতবছরও মায়ের মৃত্যুর সংবাদে চমকে গিয়েছিলাম।’
বয়স্ক দাদু টিটিইর উদ্দেশ্য বললেন, আমি আরেকটি টিকিট কাটতে চাই।
কেন? টিকিট কাটবেন কেন? আপনারা তো…।
দাদু মুচকি হাসলো আর বললো এখনও বুঝতে পারেননি।
না, সত্যিই বুঝতে পারিনি।
দাদু বললো, এটাই আমার নাতির জীবনে সবচেয়ে বড় চমক।
সবাই তখন দাদুর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কিছু একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছে। কেউ একজন বলে উঠলো, আপনি কি সেই বিখ্যাত গোয়েন্দা অতনু ইসলাম?
দাদু মুচকি হেসে বললো, ‘আমি বিখ্যাত নই। ছোট্ট একজন…। তবে আসল কথা কি জানেন তো। আজকে আমার নাতির জন্মদিনের সাথে সাথে সে প্রাপ্তবয়স্কও হলো। আর প্রাপ্তবয়স্ক হলে অবশ্যই টিকিটও প্রাপ্তবয়স্কেরই কাটতে হবে।’
উপস্থিত সকলেই হেঁসে উঠলো। আর বলে উঠলো, আপনার বুদ্ধি যে আকাশ চুম্বি তার প্রমাণ পেলাম।
দাদু আবার বলে উঠলেন, ‘আমার নাতি বারবার প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠবে না। আর এজন্য এই দিনটি তার কাছে চমক হয়ে থাকবে।’
ট্রেন ছাড়ল।
ট্রেনের মাইকে আওয়াজ আসলো। বললো, কেউ ঘাবড়াবেন না। কোন দূর্ঘটনা হয়নি। আসলে আজকে আমাদের ট্রেনে বিখ্যাত গোয়েন্দা অতনু ইসলাম তাঁর নাতির জন্মদিন পালন করেছেন। এবং সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো তাঁর নাতি আজকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়াতে তিনি নতুন করে টিকিট কাটালেন।
সবাই আবার বলাবলি শুরু করলো, ইস্! একটিবার যদি কথা বলতে পারতাম। যদি একটি সেলফি উঠতে পারতাম। আরও কতকিছু…।
তবে, এদের মধ্যে একজন ফেসবুকে স্টাটাস দিলেন, ‘আজকের ট্রেনে আমাদের সাথে আছেন বিখ্যাত গোয়েন্দা অতনু ইসলাম।’

৯৫০জন ৮৬৬জন
7 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য