পরির দেশের সূর্য

হালিম নজরুল ২৫ জুন ২০২১, শুক্রবার, ০১:২১:০৩পূর্বাহ্ন ছোটগল্প ৪ মন্তব্য

গোধূলির হলুদ আভায় প্রকৃতি আজ অন্যরকম সাজে সেজেছে। ঝিরঝিরে হাওয়ায় দুলে উঠছে সবুজের ক্ষেত। ঝিলের জলে যেন আজ প্রাণের স্পন্দন। এই হিমেল হাওয়ায় ঘাসের ডগায় দোল খাচ্ছে একটি মায়াবী ফড়িং। কি সুন্দর তার গায়ের রং! হলুদাভ মাথার দু’পাশে লালচে দুটি ফোটা। কি সুন্দর মায়াবী চোখ! নীল-সবুজের চমৎকার কারুকাজে গড়া তার পাখনা। আর লেজটাও অসাধারণ বেগুনী-কমলা রঙের বাহারি সাজে সজ্জিত। ঝিলের ছলাৎ ছলাৎ গানের তালে তালে দুলছে সে। এতক্ষণ বসে বসে মুগ্ধ হয়ে দেখছিল টুম্পা। হঠাৎ ফড়িংটি উড়ে এসে বসল টুম্পার গায়ে। তারপর আবার উড়ে আশেপাশে ঘুরতে ঘুরতে বসল অন্য একটি ঘাসের উপর। সে যেন টুম্পাকে ছেড়ে কোথাও যেতে চাইছে না। টুম্পারও খুব ভাল লাগছে তার সঙ্গ।

 

এতক্ষণ ঘাসের উপর বসে ছিল টুম্পা। এবার একটু উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে ফড়িংটির কাছাকা‌ছি গেল। আস্তে আস্তে হাত বাড়িয়ে ধরতে চাইল তাকে। কিন্তু পারল না। সে উড়ে গিয়ে আবার বসল অন্য একটি ফুলে। টুম্পা আবার ধরতে গেল। এমন সময় পিছন থেকে কে যেন ডাকল টুম্পাকে। কি মিষ্টি কণ্ঠ! সে বলল “ওদেরকে ধরতে নেই, স্বাধীনভাবে উড়তে দাও। ঘাস, ফুল, পাখি, প্রজাপতি, নদী, পাহাড় এই সবকিছুই প্রকৃতির চমৎকার দান। ওদের ক্ষতি করতে নেই। ওরাই তো পৃথিবীর সৌন্দর্যকে আরও বেশি মনোমুগ্ধকর করে তোলে”।

 

টুম্পা পিছন ফিরে তাকাল। আহ কি অপরূপ সুন্দর পরি! সে এক মুহূর্তও চোখ ফেরাতে পারছে না। সে তাকে জিজ্ঞেস করল—

—কে তুমি? কোথা থেকে এসেছ? তুমি এত সুন্দর হয়েছ কিভাবে?

উত্তরে সে বলল—-

—আমি পরির দেশের মেয়ে, তোমার বন্ধু হতে এসেছি। সবাই আমাকে প্রিয়তি নামে ডাকে।

—আহ কি সুন্দর নাম!

—তোমার নামটিও খুব সুন্দর টুম্পা। তাছাড়া তুমিও দেখতে সুন্দর। তবে মানুষের আসল সৌন্দর্য কিন্তু তার গুণে।

—বাহ কি সুন্দর করে কথা বল তুমি! আচ্ছা তুমি সত্যি সত্যি আমার বন্ধু হবে?

—কেন নয়! অবশ্যই বন্ধু হব। যারা ভাল মানুষ, দুনিয়াতে সবাই তাদের বন্ধু হতে চায়।

—তুমি তো আমার চেয়ে ভাল। আচ্ছা বল তো ভাল মানুষ হতে গেলে কি করতে হয়।

—-ভাল মানুষ হতে হলে প্রথমে আলোকিত জীবন গড়তে হয়।

—-জীবনকে আলোকিত করতে হয় কিভাবে?

—জীবনকে আলোকিত করতে হলে জীবন থেকে অন্ধকার তাড়িয়ে আলো আনতে হয়। তার জন্য প্রয়োজন লেখাপড়া বা জ্ঞানের আলো। তারপর মানুষের কল্যাণের জন্য ভাল কাজ করা। সবার আগে বোঝা প্রয়োজন কোনটা ভাল, আর কোনটা মন্দ। আলো আর অন্ধকারের পার্থক্য না বুঝলে জীবনকে আলোকিত করার আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয় না।

—আচ্ছা বন্ধু, তুমি আমায় অন্ধকার ও আলোর পার্থক্য শিখিয়ে দেবে?

—অবশ্যই শেখাব। চল তাহলে সামনে এগোয়।

 

প্রিয়তির সম্মোহনী নিমন্ত্রণে আপ্লুত টুম্পা। হাঁটতে হাঁটতে তারা সামনে এগিয়ে চলেছে। সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার আস্তে আস্তে গাঢ় হচ্ছে। একটু পরই টুম্পা টের পেল তারা একটা সিঁড়ি বেয়ে আকাশে উঠে যাচ্ছে। যতোই উপরে উঠছে ততোই মনোরম পরিবেশ অনুভব করছে। কানে ভেসে আসছে অসাধারণ মূর্ছনা। ঝর্ণার কলকল ধ্বনি আর পাখিদের অসাধারণ গান শোনা যাচ্ছে। নাকে ভেসে আসছে নানান ফুলের অপরূপ সুগন্ধি। কিন্তু গভীর অন্ধকারে গা ছমছম করছে। এখন কিছুটা ভয় লাগছে তার। কেমন যেন বেশ ক্লান্তিও লাগছে টুম্পার। প্রিয়তি বলল—–

—এখন কেমন লাগছে তোমার?

—খুব ঘুম পাচ্ছে। কিছুটা ভয়ও লাগছে। এমন অন্ধকারে কার ভাল লাগে বল!

—আচ্ছা বুঝেছি, তাহলে এখন তুমি কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে নাও। আমি তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি।

বলেই প্রিয়তি টুম্পার মাথা কপাল ও চোখে হাত বুলাতে লাগল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল টুম্পা। সে এক পরম শান্তির ঘুম। এমন শান্তির ঘুম সে আর কখনোই ঘুমায়নি।

 

গভীর ঘুমে নিমগ্ন টুম্পা। পাশে বসে চোখে মুখে হাত বুলাচ্ছে প্রিয়তি। একটি পরিপূর্ণ ঘুমের পর টুম্পার কানে ভেসে আসছে সুমধুর কণ্ঠ। মনোমুগ্ধকর সুরের মূর্ছনা। নাকে ভেসে আসছে রাতের সেই নানান ফুলের সৌরভ। সে যেন এক স্বর্গীয় সুগন্ধি। পাখিদের কলকাকলিতে ঘুম ভেঙে গেল টুম্পার। চোখ মেলে দেখল চতুর্দিকে হাজার রঙের ঝলমলে আলো। হাওয়ায় হাওয়ায় দুলছে ফসলের ক্ষেত। নানান বর্ণে ও গন্ধে ফুটে আছে শত সহস্র ফুল। টলমলে ঝর্ণার স্বচ্ছ ধারায় কি অপরূপ দৃশ্য! পূর্ব আকাশে ডগমগে এক উদীয়মান সূর্য। পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার দূর করে নিয়ে এলো আলোর ঝিলিক। আলোকিত পৃথিবী যেন ঝলমল করে উঠল। আনন্দে আত্মহারা টুম্পা চিৎকার করে বলে উঠল “জেগে ওঠো সবাই। জীবনকে আলোকিত কর। সুর্যের মতো জ্বলে ওঠো। অন্ধকার সরিয়ে আলো ছড়িয়ে দাও চতুর্দিক”।

***(টুম্পা বুঝল পৃথিবীর প্রতিটি শিশুর উচিৎ ভোরের সূর্য ওঠা দেখা। সূর্য ওঠা প্রত্যক্ষ করলে অন্ধকার তাড়িয়ে জীবনকে আলোকিত করবার উপলব্ধি তৈরী হওয়া স্বাভাবিক।)***

১২৭জন ৩৫জন
0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য