টেবিল বিজনেস

ইকরাম মাহমুদ ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৬, শনিবার, ০২:২৬:২৭পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি, গল্প, বিবিধ ১০ মন্তব্য

উদ্ভিদ যেমন নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করে তেমনি জীবনের এক পর্যায়ে এসে নিজের খরচ নিজে চালাতে এক প্রকার বিজনেস শুরু করে ছাত্রসমাজ।তা হলোটেবিল বিজনেস।
টেবিল বিজনেস জন ও এলাকাভেদে নামের ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। কেউ বলে প্রজেক্ট,কেউ বলে প্রকল্প,কামলা দেওয়া। আবার কেউ আদর করে ক্ষ্যাপ বলে থাকে। এটা কী কোনো বিজনেস?
কোনো প্রকার মূলধন ছাড়াই ইনকাম। ছাত্রাবস্থায় এই বিজনেস করেনি এমন একজন খুঁজে পাওয়া যাবে না। অন্যের হাতে টাকা রেখে পুরো একমাসের স্বপ্ন সাজায় নির্বোধ, অবলা এই বিজনেসম্যানরা। আমিও একজন টেবিল বিজনেসম্যান । টেবিল বিজনেস করতে গিয়ে কতশত অভিজ্ঞতা যে হয়েছে তা আমার মতো যারা আছেন তারাও বলতে পারবেন।
তেমন কিছু ঘটনা শেয়ার করতেই এতো কথা বলছি..
ঘটনা-১
জীবনের প্রথম প্রজেক্টে এক বাসায় দুটো মেয়ে পড়াতাম। কোটিপতির বাসা নামে পরিচিত এলাকায়। কোটি পতি আর পত্নী দুজনই মূর্খ। মূৃর্খের একটা রকমফের থাকে, এদের তাও নেই।মেয়ে দুটোর একটা পঞ্চম শ্রেণির। লেটার পড়াতে গিয়ে দেখি বই কিনেনি এখনো। ওর মাকে বললাম, বই কিনতে। বইয়ের নামও লিখে দিয়ে এলাম।পরদিন বইটি না পেয়ে ছাত্রীর মা নিজেই এসে বলতেছে, মাস্টৈইর,কি লেটার পড়ান। বই তো সারা মার্কেটে খুইজ্জা পাইলাম না। গেরামার বই তো কিন্নাই দিছি। হেডাত থন পড়ান। আমি আর কি বলব? চুপ করে বসে রইলাম।
ভাগ্যিস বাজারে লাভ লেটার নামক বই পাওয়া যায়নি। তাহলে তো খবর ছিল। এই বাসায় আরো অনেক ঘটনা
ঘটছে তা নাই বললাম। ১ম মাসেই বিজনেসেরর
লালবাত্তির সুইচ নিজেই অন করলাম।

ঘটনা ২
কলেজের এক প্রফেসরের বাসায় পড়াতে গেলাম উনার
অনুরোধেই। ছোট মেয়েকে পড়াতে হবে। কারো কথা শোনেনা,মানেনা। যাই হোক পড়াচ্ছি ভালোই। মাস চারেক পর একদিন মেয়েটা তার মাকে বলল, আমার কাছে পড়বে না। পরদিন ম্যাডাম তো হাসতে হাসতে বলল, ইকরাম
তোমার কোনো কালো বন্ধু আছে? কেনো তা জানতে চাইলে বললেন তোমার ছাত্রী বলেছে, তুমি নাকি ফর্সা। তোমাকে দেখে ভয় পায়না। তারপর, তারপর আমি কালো বন্ধু খুঁজতে থাকলাম।

ঘটনা ৩
৬ষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীকে পড়াতাম। আর সেই সুবাদে ছাত্রীর ছোট বোনটা আমার কোলে এসে বসে থাকত। এক বছর পর নার্সারিতে ভর্তি করে দিয়েছে তাকে। একদিন হঠাৎ করে বলতেছে স্যার, আমাদের ম্যাডাম মূর্ধণ্য-ষ কে পেট কাটা বলছে। তার প্রশ্ন হলো, পেট কাটলো কিভাবে? আমি ওকে বুঝিয়ে বললাম এটা মনে রাখার জন্য বলেছেন। উত্তরটা পেয়ে খুশি হলোনা মনে হয়। চলে গেলো। একটু পর আবার এসে বলল, স্যার, ম্যাডাম পেট কাটা বলল কেন? এতো ভারি বিপদ। নাছোড়বান্দা মেয়ে। ওকে শান্ত করতে বললাম
অপারেশন করছিল। এটা শুনেই বলতেছে ও বুঝছি,
সিজার করছে। আমি হাসবো নাকি কাঁদব ওর কথা শুনে।
একটু পর, স্যার সিজার করে কী হইছে? এটাকে তো থামানো যাচ্ছে না দেখছি। একটার পর একটা প্রশ্ন করছে। অগত্যা আমি বললাম। সিজার করে ‘স’ হইছে। এটা শুনে বলল, ও তাইতো বলি, ষ এর পর স কেন? এবার নিজেই বুঝতে পারলো মনে হয়। দৌড়ে গেল ওর মাকে বলতে।

ঘটনা ৪
প্রথম শ্রেণিতে উঠার পর দায়িত্ব পড়ল এই মেয়েটাকে পড়ানোর। সরকারি স্কুলে ভর্তির পরিক্ষা দিবে। এ ছাত্রি পড়াতে গিয়ে কত প্রশ্নে জর্জড়িত হতে হয়েছে আমাকে বুঝতেপারছেন?
একদিন বলতেছে, স্যার আপনার কোনো ইউনিফর্ম নাই? আমি বললাম কিসের ইউনিফর্ম? সে বলল, এই আমাদের পড়াতে আসেন। আমাদের তো স্কুলের ইউনিফর্ম আছে। আপনারটা কই? কি বলব আমি? চুপ…..ধমক দিয়ে বসিয়ে রাখলাম।
★৫টি লোনা পানির ও ৫টি স্বাদু পানির মাছের নাম শেখাতে গিয়ে… ওর জানার সুবিধার্থে বললাম,ইলিশ মূলত লোনা পানির মাছ। তবে ডিম পাড়ার জন্য নদীতে আসে।
ভালোই বুঝল মনে হলো।শেখা শেষ। এবার লিখতে দিলাম,খাতায় সে ইলিশকে স্বাদু পানির মাছ লিখেছে। আমি রাগত স্বরে বললাম, এটা কি! ইলিশ এখানে লিখছ কেনো?
সে উত্তর করল,স্যার, এখন ডিম পাড়তে আসছে।
কিছু কী বলার থাকে তারপর?

ঘটনা ৫
৬ষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্র পড়াতাম। প্রতিদিনই কিছু না কিছু
খেতে দিত। বিশেষ করে টোস্ট বিস্কুট। এটা কি খাওয়া যায়? টোস্টে কামড় বসানোর শব্দ কোন পর্যন্ত যেত তা অনুমান করতে পারি না। এটা তো গেল কামড় তারপর তো চিবিয়ে খেতে হবে। ছাত্রকে বললাম, তোমার আম্মুকে বলো,আমাকে
নাশতা দেওয়ার দরকার নেই। পরদিন ছাত্রের মা
নিজেই নিয়ে এল পুরো এক বাটি কলা পিঠা। যা আমার
খুবই অপছন্দের।খেতে তো হবে। ছাত্রকে
অংক করতে দিয়ে খেতে লাগলাম,এক প্রকার
নিঃশ্বাস বন্ধ করে। নিঃশ্বাস বন্ধ করে খাওয়ার সুবিধা
হলো, এতে খাবারের কোনো স্বাদ বুঝা যায় না। গলার নিচে দিলেই তো হলো, তাই যতো তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করা যায়। ২ মিনিটেই খেয়ে উঠলাম। খাওয়া শেষ করে নিঃশ্বাস ছাড়তে না ছাড়তেই ছাত্রটি বললো, স্যার, কলা পিঠা আপনার খুব ফেভারিট…..?
কী বলার থাকে?

টেবিল বিজনেস করে এতো আজব আজব হাসির
ঘটনার সাক্ষী হবার পাশাপাশি বড় পাওয়াটা হলো,এই বিজনেসম্যানরা টাকার অপর পৃষ্ঠায় স্বপ্ন আঁকা শিখে যায়।
তবে আরেকটা শিক্ষা হয়েছে আমার।
বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান পরশ। তাকে আমি ৫ম থেকে ৭ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়িয়েছি। ছেলেটার বাবা শিক্ষা কর্মকর্তা আর মা বীমা কোম্পানির টাংগাইল জেলার ম্যানাজার। তাদের ব্যস্ততা অন্য এক পর্যায়ের। সন্তানকে সময় দেওয়া বলতে বাবা আসে ১ সপ্তাহ পর আর মা আসে রাতে। এ নিয়ে ছাত্রটা সবসময় মন খারাপ করে থাকত। ও একদিন বলতেছে স্যার, আজ আমার বন্ধুর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। বন্ধুর মা বাবা কত আদর করে খাওয়ালো আমাকে। জানেন, সকালে আম্মু খাইয়ে রেখে যায়, আর দুপুরে একাই খেতে হয়। রাতে এসে আম্মু ল্যাপটপ নিয়ে বসে। তার সাথে কথা বলার সময় থাকে না।কিছু বললেই শুধু ধমক দেয়। আব্বুকে তো দেখি শুক্রবারে। সারাদিন যা একটু কাছে পাই। সন্ধ্যার পর নাই। ছেলেটা ভীষণ অসহায় ভাবে কথাগুলো বলছিল আমাকে। মাঝে মাঝেই বলতো, টিফিনের সময় অন্যান্য বন্ধুর মায়েরা এসে খাইয়ে দিয়ে যায় আর আমার…. এটা বলেই সে কেঁদে দিত। ওন কথা শুনে আমারর ভীতরটা কেঁদে উঠতো।তবু ওকে সান্তনা দিতাম এটা সেটা বলে। আবার একদিন বলতেছে, স্যার জানেন? আম্মু আমাকে কত আদর করে? আমি বললাম কত? সে বলল, ৩০০ টাকার। আর আব্বু ৫০০ টাকার। মা ওকে খুশি রাখতে মাঝে মাঝে ৩০০/৪০০ টাকা দিত আর বাবা ৫০০ দেয় প্রতি সপ্তাহেই। কথাটা বলেই কান্না জুড়ে দিল। কী সান্তনা দিব ওকে? এর কী সান্তনা হয়। বাবা মায়ের আদর যে সন্তানদের জন্য কতটা অপরিহার্য তা শিক্ষা কর্মকর্তা বাবা আর বীমা কর্মকর্তা মা জানন না হয়তো। হয়তো জানেন, ক্যারিয়ারের ভাবনাই তাদের কাছে বড়। সন্তান নয়। এই সন্তান বড় হয়ে কি হবে? বাবা মায়ের আদর, শাসনহীন সন্তানরা কেমন হয়? কেমন থাকে তাদের মানসিক অবস্থা। কিশোর অপরাধ থেকে শুরু করে বড় বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে এমন অভাবী সন্তানরাই।
যে বাবা-মায়ের ভাবনা শুধু ক্যারিয়ারের, শিশুর ক্যারিয়ার যে কী হবে তা খুঁজে দেখেনা। জানিনা এই শিশুটির ভাগ্য কী হবে? তবে এমন অভাবী শিশুরাই একসময় দেশের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
শিক্ষা দিতে গিয়ে জীবনের সবথেকে বড় শিক্ষাটাই হল টেবিল বিজনেস করতে গিয়ে।

২৬৯জন ২৬৯জন
0 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য