করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে ভীতি নয়

তৌহিদুল ইসলাম ২ ফেব্রুয়ারী ২০২১, মঙ্গলবার, ০১:১৭:০৬অপরাহ্ন সমসাময়িক ১৬ মন্তব্য

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে আসা করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে যারা– ভারতের তৈরী/ ভারত থেকে আমদানিকৃত/ অনেকেই অসুস্থ হচ্ছেন এই ভ্যাকসিন নিয়ে, মরে গেলেও নেবোনা, আগে সরকার দলীয়রা এই টীকা নিক, ভারত তিস্তার পানি দেয় না বদলে করোনা ভ্যাকসিন উপহার কেন! ভ্যাকসিন নিয়ে অহেতুক ভয়ভীতি প্রচার এবং হিন্দুয়ানি রাষ্ট্র ভারত বিদ্বেষী (আহা যদি তুরস্কের টীকা হত!) এমন বিরুপ মন্তব্য করছেন কেউকেউ। এই হীন মানসিকতা পোষণকারীদের জন্য জনমনে করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে কিছুটা ভীতির সঞ্চার হচ্ছে। তাই চলুন ভ্যাকসিন নিয়ে সত্য জানি, জনস্বার্থে এসব তথ্য শেয়ার করি।

সম্প্রতি ভারত দুটো ভ্যাকসিন অনুমোদন দিয়েছে-

১. কভিশিল্ড (Covishield)
২. কোভ্যাক্সিন (Covaxin)

ভারত বাংলাদেশকে যে ভ্যাকসিনটি পাঠিয়েছে সেটি হচ্ছে ‘কভিশিল্ড’, যার মূল প্রস্তুতকারক ভারত (Bharat Biotech) নয়, বরং এই ভ্যাকসিনের মূল প্রস্তুতকারক যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত AstraZeneca কোম্পানী। কভিশিল্ড ভ্যাকসিনের পরীক্ষামূলক ট্রায়াল শুরু হয়েছিল গত বছর (২০২০ এর) ২৩ এপ্রিল থেকে, এবং ডিসেম্বরের শুরু থেকেই এই ভ্যাকসিনের সফল কার্যকারিতার তথ্য বিভিন্ন পিয়ার রিভিউড জার্নালে (ল্যানসেট) প্রকাশিত হতে শুরু করে।

ভারত আমাদের যে ২০ লক্ষ ভ্যাকসিন উপহার দিয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকার যে ৩ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন আমদানি করছে তা Oxford AstraZeneca এর ভ্যাকসিন Covishield যার পেটেন্ট ভারতের সেরাম ইনস্টিউট নিয়ে এস্ট্রাজেনকার নিজস্ব তত্ত্বাবধানে তৈরী করেছে। এই কোভিশিল্ড ভ্যাকসিনই আমরা পেয়েছি যা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ অনুমোদন দিয়েছে।

ভারতের যে ভ্যাকসিন নিয়ে আলোচনা সমালোচনা এবং কিছু মানুষের সাময়িক অসুস্থতা সেটি ভারতের নিজেদের আবিষ্কৃত বায়োটেকের তৈরী Covacxin যা Indian counsel of medical research অনুমোদিত। ‘কোভ্যাকসিন’ নামক ভ্যাকসিনটি আপাদমস্তক প্রস্তুত করা হয়েছে ভারতের ‘ভারত বায়োটেক (Bharat Biotech)’ কোম্পানীতে। এই ভ্যাকসিন আমাদের দেশে আসেওনি আর আসার সম্ভাবনাও নেই।

তাহলে কভিশিল্ড কেন ভারত হয়েই বাংলাদেশে এসেছে?

কভিশিল্ডের মূল প্রস্তুতকারক কোম্পানী AstraZeneca পৃথিবীর যত মধ্য আয়ের উন্নয়নশীল দেশে ভ্যাকসিনের সংরক্ষণ প্রক্রিয়া বিবেচনা করে স্বল্প খরচে ভ্যাকসিন পৌছানোর একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত করতে তারা ৩ টি প্রাইভেট ভ্যাকসিন কোম্পানীর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। প্রথমটি CEPI, দ্বিতীয়টি GAVI এবং তৃতীয়টি Serum Institute of India।

আপনারা হয়ত জানেন, Serum Institute of India ভারতের একটি প্রাইভেট ভ্যাকসিন কোম্পানী যা এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভ্যাকসিন কোম্পানী। (গুগলে চেক করুন)।

অক্সফোর্ডের AstraZeneca কোম্পানীর সাথে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর চুক্তি বা লাইসেন্স এগ্রিমেন্ট ছিল এইরকম, তারা সম্পূর্ণভাবে অক্সফোর্ডের কার্যপ্রণালী অনুসরণ করে যার যার ল্যাবে ভ্যাকসিন প্রস্তুত করে স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে ভ্যাকসিন পৌছে দেবে। এতে পরিবহণ ও সংরক্ষণ খরচসহ বেশ খানিকটা আনুষঙ্গিক খরচ কমে যাবে। এছাড়া কভিশিল্ড ভ্যাকসিনটি মাত্র ৪ ডলারের সাশ্রয়ী ভ্যাকসিন যা আমাদের বাসা-বাড়ীর সাধারণ ফ্রিজেই সংরক্ষণ করা যাবে।

ভারত কেন তাদের উৎপাদিত কোভ্যাকসিন বাংলাদেশে পাঠালো না?

বিবিসির তথ্য অনুযায়ী কোভ্যাকসিন নামক ভ্যাকসিনটি সম্পূর্ণভাবে কার্যকর কি না, তা এখন পর্যন্ত পরীক্ষাধীন রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশ নিশ্চিত না হয়ে সেই ভ্যাকসিন গ্রহণ করেনি। তবে আগামী ফেব্রুয়ারীর পরে কোভ্যাকসিনের ট্রায়াল রিপোর্ট প্রকাশিত হলে বাংলাদেশ যাচাই-বাছাই করে তার সিদ্ধান্ত জানাবে, যে আমরা কোভ্যাকসিন নেব কি না।

ভারত বাংলাদেশকে যে যা দেয়, তা-ই কি নিয়ে নেয়?

অবশ্যই না। ২০২০ এর অক্টোবরে চীনের একটি প্রাইভেট কোম্পানীর ভ্যাকসিন পর্যাপ্ত যাচাই বাছাইয়ের অভাবে রিজেক্ট করে দিয়েছিল বাংলাদেশ। দ্বিতীয়ত ভারত যখন তাদের নিজস্ব কোভ্যাকসিন বাংলাদেশে ট্রায়াল দিতে চেয়েছিল, তখন ভারতকেও রিজেক্ট করেছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে যে যা দিচ্ছে তাই নিয়ে নিচ্ছে না, বরং ভ্যাকসিন গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি সিস্টেমেটিক পদ্ধতিতে যাচাই-বাছাই করেই এগুচ্ছি আমরা।

রয়টার্স নিয়ে এত মিথ্যাচার কেন?

কিছু মানুষ গুজব ছড়াচ্ছেন, রয়টার্স নাকি বলেছে, বাংলাদেশে ট্রায়াল দেওয়ার জন্য ভারত ভ্যাকসিন পাঠিয়েছে। ঘেটে দেখুন, রয়টার্স এটি বলেনি, বরং রয়টার্সের ২১ জানুয়ারীর প্রতিবেদনের টাইটেলটি ছিল, “বাংলাদেশে ট্রায়াল দেওয়ার জন্য ভারত তাদের নিজস্ব কোভ্যাকসিন পাঠাতে চায়।”

মূল নিউজটি হল, হ্যাঁ ভারত তা চেয়েছিল, তবে বাংলাদেশ তা রিজেক্ট করে দিয়েছে। ভারত সম্প্রতি যে ভ্যাকসিন (কভিশিল্ড) বাংলাদেশে পাঠিয়েছে তা ভারতের নিজস্ব নয়, এবং তার ট্রায়াল হয়ে গেছে কয়েক মাস আগেই। ইংরেজিতে কাঁচা হলেই এ ধরণের গুজব ছড়ানো সম্ভব।

এই ভ্যাকসিন কি শূকরের চর্বি রয়েছে?

সম্প্রতি AstraZeneca নিজেরা জানিয়েছে তাদের ভ্যাকসিনে কোন ধরণের শূকরের প্রডাক্ট প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে যুক্ত করা হয়নি। অর্থাৎ কভিশিল্ড সম্পূর্ণ শুকরের চর্বিমুক্ত।

ইসলামিক ফতোয়া-

এক্ষেত্রে একটা বিষয় জানিয়ে রাখি, এ ব্যপারে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফতোয়া কাউন্সিল থেকে একটি ফতোয়া প্রকাশিত হয়েছে, আপনার মেডিসিন বা পথ্যে যদি শুকরের কোন অংশ অন্তর্ভূক্ত থাকেও, তা গ্রহণ করা আপনার জন্য বৈধ, কেননা আপনি তা খাদ্য হিসেবে নয়, বরং সুস্থ হওয়ার উদ্দেশ্যে মেডিসিন হিসেবে গ্রহণ করছেন।

দশ কথার এক কথা, ভারত সম্প্রতি যে ভ্যাকসিনটি বাংলাদেশে পাঠিয়েছে, তা ভারতের নিজস্ব নয়, এটি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাকসিন। এটির ট্রায়াল অনেক আগেই হয়ে গেছে এবং কার্যকারীতাও প্রমাণিত। এতে কোন শূকরের চর্বি বা গোমূত্র নেই। আপনি নিশ্চিন্তে সে ভ্যাকসিন ইনজেক্ট করতে পারেন।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যতজন কভিশিল্ড ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছেন তাদের সকলেই সুস্থ আছেন। কাজেই ভ্যাকসিন নিয়ে গুজব ছড়ানো এবং তা বিশ্বাস করা থেকে বিরত থাকুন।

করোনা ভ্যাকসিন নিবন্ধন প্রক্রিয়া জানতে এখানে ক্লিক করুন

———-

তথ্যসূত্র –

* কভিশিল্ড সম্পর্কে পিয়ার রিভিউড জার্নাল –

* রয়টার্সের যে প্রতিবেদনটি নিয়ে চরম মিথ্যাচার করা হচ্ছে –

* বাংলাদেশ চীনের ভ্যাক্সিন রিজেক্ট করেছিল –

* এস্ট্রাজেনেকার কোন ভ্যাক্সিনে শূকরের চর্বি নেই, এ বিষয়ে স্বীকারোক্তি (রয়টার্স) –

* শূকরের প্রডাক্ট নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফতোয়া –

কৃতজ্ঞতা- জনস্বার্থে শ্রদ্ধেয় Enayet Chowdhury- (শিক্ষক, বুয়েট) স্যারের লেখা থেকে কিছু অংশ সংকলিত।

ছবি- ফেসবুক এবং গুগোল

৩৯১জন ২১৬জন
17 Shares

১৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য