“আমি তোমার জন্য এসেছ (পর্ব-আটাশ)”

ব্যবসার পাশিপাশি একটা চাকরি নেয়, ওখানেই জীবনটাকে নতুন ভাবে শুরু করেছে। ব্যবসা, চাকরি, কাজ এর বাইরে আরেকটা জীবন আছে আরাফ সেটা ভুলে গেছে।

জীবনে কি চেয়েছিলো আর আজ কি পেল তাতে আরাফের আজ কোন আক্ষেপ নেই। কারন ভাগ্য বিধাতা চায়নি প্রিয়া আরাফের মিলন হোক তাই আরাফ তার জীবনের সর্বত্র দিয়ে চেষ্টা করেছে। নিজেকে যতটা বেহায়া,যতটা নির্লজ হিসাবে কারো কাছে উপস্থাপন করা যায় সেভাবেই করেছে তবু প্রিয়ার অবুঝ মনে ভালোবাসার ফুল ফুটাতে পারে নাই। এটাকে সে ব্যর্থতা মনে করে না বরং সফলতা মনে করে সে তার মনের কথা সারা পৃথিবীতে চিৎকার করে প্রকাশ করতে পেরেছিলো।

কিন্তু ভাগ্যে ছিলো না বলে পায়নি বিধাতার লেখা মেনে নিয়েছে তবু বুকের বাম পাশটা আজো হা হা হা কার করে এত প্রাচুর্য তবু যেন কি নেই।

ভাবতে ভাবতে চোখের কোণ থেকে কয়েক ফোটা গরম লোনা জল গড়িয়ে পড়ল আরাফ চোখ বন্ধ করে আকাশের দিকে তাকাল।

আকরামের ফোন সময় পেলে একবার দেশে এসো বাবা আমি তোমাকে সুখি অবস্থায় একবার দেখে যেতে চাই। আচ্ছা বাবা সুযোগ বুঝে একবার দেশে আসবো, মনোয়ারা ফোন হাতে নেয় আরাফের কন্ঠ শোনে কেঁদে ফেলেন। কত বছর ছেলের মুখটা দেখেন না ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে এখন চোখেও কম দেখেন।

দাদুমনির সাথে প্রিয়া আগের মতো গল্প করার সময় পায় না কলেজে পড়ে পড়াশোনার অনেক চাপ, তবে শুক্রবার কলেজ বন্ধ থাকে বাবার অফিস নেই ওই একটা দিন সে পরিবারের কাছে বেশি সময় কাটায়।

বয়সের কারনে দাদুমির চোখে ভালো দেখেন না প্রিয়ার মুখটা তার কাছে এখন ঝাপসা লাগে তবু চেনা মুখ গুলো চিনতে তার ভুল হয়না।

অচেনা কেউ আসলে শুধু নামটা বলতে হয় তখন আর সমস্যা হয় না চিনতে পারেন।

প্রিয়া শহারের নামকরা কলেজে পড়ে বন্ধু,বান্ধবী অনেক হয়েছে তাদের সাথে কলেজ শেষে বাইরে রেস্টুরেন্টে খেতে যায় আনন্দ করে। আজ প্রিয়া কলেজের পড়া শেষ করে বালিশের নিচে হাত দেয়, মনে মনে লজ্জা পাচ্ছিল কি লেখা আছে! ওই ডাইরিতে যা ৩ বছর আছে আরাফ প্রিয়ার উদ্দেশ্যে লিখে গিয়েছিলো। তখন অভিমানে আর ডাইরিটা খোলা হয়নি, প্রয়োজনও বোধ করে নাই প্রিয়া।

কারন সে আরাফকে একটা পাগল ভাবত এর বাইরে ওরা ভালো বন্ধু তবে বন্ধুত্বের মানেটা ওই বয়সে বুঝত না। আরাফ যাতে না কাঁদে তাই বন্ধু হয়েছিলো তবে গুন্ডা ছেলেটা অনেক সুন্দর ছিলো প্রিয়ার মনের ফ্রেমে সেই ছবিটা স্পষ্ট ভেসে উঠে।

প্রিয়া ডাইরিটা খুলবে না কি খুলবে না ভাবতে ভাবতে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেল সে ডাইরিটা বুকের উপর রেখে শুয়ে আছে।

প্রিয়া ডাক দিয়ে মিরা রুমে ঢুকলো ঘড়িতে রাত ১২ টা বাজে, প্রিয়া এখনো তুমি ঘুমাও নাই..?

নাহ্ মম আস, ঘুম আসছে না।

মিরা মেয়ের মাথায় হাত রাখে শরীর ঠিক আছে মা শরীরটা একটু ক্লান্ত জার্নি করে নানা বাড়ি থেকে বাসে আসছি। তারপর এই তিনদিন মামাত ভাই- বোনদেন নিয়ে বেড়াতে গিয়েছি, ঘুরেছি, প্রচুর আনন্দ করছি মম বলেই মাথা থেকে মিরার হাতটা সরিয়ে নিজের দু’হাতে জড়িয়ে ধরল।

মম আরাফ ভাইয়ার কথা তোমার মনে আছে..?

মিরা উচ্ছাসিত হাসি মুখ নিয়ে বলে মনে থাকবে না কেন! খুব মনে আছে কি মিষ্টি চেহাড়ার ছেলে। অমায়িক ব্যবহার শেষ বার যখন আসছিলো স্থির হয়ে ৫ মিনিট বসে নাই! সারাক্ষন দাদুমনি,মিরা আন্টি প্রিয়া কখনো স্কুল থেকে কখন আসবে.? ওর সাথে আমার খুব দরকার একটু কথা বলতাম।

কিন্তু তোমার স্কুল ছুটি হতে দেরি দেখে খুব মন খারাপ করলো তারপর সে ঢাকা ফিরে গেল। তবে যাবার আগে তোমার ডাইরিতে কি জানি লিখে গিয়েছিলো তুমি পড় নাই..? আমি তো দিয়েছিলাম মিরা প্রশ্ন ছুড়ে দিল প্রিয়ার দিকে।

-নাহ্ মম।

-না মানে কি.?

-সেদিন ডাইরিটা আমি পড়ি নাই।

-অবাক হয়ে মিরা জানতে চায় কেন.?

-রাগ হয়েছিলো,অভিমান হয়েছিলো।

-কার উপর.?

-গুন্ডা ছেলেটার উপর।

-কেন.?

-আমার সাথে দেখা না করে চলে গিয়েছিলো বলে।

-মিরা হাসতে হাসতে প্রিয়াকে আলতু করে গালে হাত লাগায় আমার মেয়েটা কত অবুঝ।

-নাহ্, মম তোমার প্রিয়া এখন অবুঝ না, সে বুঝতে শিখেছে বলে হাসলো।

-মিরা প্রিয়ার দিকে তাকায় সত্যি দেখতে দেখতে আমার মেয়েটা অনেক বড় হয়ে গেছে সে এ বছর এইচ.এস.সি ফাইনাল দিবে।

-রাত অনেক হয়েছে মা ঘুমিয়ে পড় সকালে তো কোচিং আছে বলেই মিরা বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

-জ্বী মম বলেই প্রিয়া ঘুমের ভান করে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকল।

-মিরা রুমের টিউব লাইট বন্ধ করে চলে গেল।

প্রিয়া লজ্জা জড়ানো চোখে ডাইরির পাতা খোলল যেমন নতুন প্রেমিকা তার প্রেমিকে চিঠি খোলে সেই রকম।

স্নেহের প্রিয়া।

কেমন আছো পিচ্চি.? গুন্ডা ছেলেটা ভালো নেই। জানতো সারাক্ষন তোমাকে মিস করি। আজ আমি ময়মনসিংহে তোমাদের বাসায় আসছি ড্রইংরুমে বসে এই চিঠিটা লিখছি।

পিচ্চি “আমি তোমার জন্য এসেছি” জানো এই ৬ বছরে এই গুন্ডা ছেলেটার জীবনে অনেক মেয়ে এসেছে সে কাউকে ভালোবাসে নাই আজো তোমাকে পাগলের মতো ভালোবাসি,বিয়ে করতে চাই।

আমি সামনে মাসেই জাপান চলে যাব ওখানে আমার ব্যবসা আছে কিন্তু যাবার আগে তোমার সাথে একবার দেখা করতে আসছিলাম কিন্তু শেষ দেখাটা হলো না।

জানা হলো না এই পিচ্চি প্রিয়ার মনে গুন্ডা ছেলেটার জন্য কোন জায়গা তৈরি হলো কিনা, পিচ্চিটা আমাকে ভালোবাসে কি না অনেক গুলো প্রশ্ন মনে নিয়েই চলে যাচ্ছি।

নিচে আমার মোবাইল নাম্বার -01711*****5.

যদি তুমি আমার ভালোবাসা বুঝতে পার তাহলে কল দিও বিদেশ যাব না তোমাকে বিয়ে করে সুখের স্বর্গ রচনা করবো।

বিশ্বাস করো খুব ভালোবাসি পিচ্চি তোমাকে সেই প্রথম দেখার দিন থেকে….

আজ এখানেই শেষ করলাম।

ভালো থেকো পিচ্চি প্রিয়া

তোমার বন্ধু গুন্ডা ছেলে (আরিয়ান চৌধুরী আরাফ)

চিঠিটা আজ থেকে প্রায় ৩ বছর আগের আরাফের হাতের লেখা। চিঠিটা পড়তে পড়তে প্রিয়ার চোখের পানিতে জামার বুকের অংশটা ভিজে গেল। সে আর বসে থাকতে পারল না ডাইরিটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে দিল, বালিশটা বুকে জড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো। রাতের অন্ধকারে প্রিয়ার কান্নার আওয়াজ চার দেওয়ালের বাইরে যায়নি।

কারন প্রিয়ার আর্তনাত তো বুকের ভিতর এটা বাইরের পৃথিবী জানবে কি করে..!

অনেক্ষন কান্নার পর ঘুমিয়ে পড়ল কখন সে নিজেই জানে না।

সবাই নিজ নিজ কর্মে ব্যস্ততা বাড়ল যোগাযোগ কমতে থাকলো, বয়স্ক আকরাম সাহেব বাড়ির বাইরে তেমন বের হন না। প্রয়োজন ছাড়া আকরাম সাহেবকে এখন আর কেউ ফোন দেয় না, দেখতে আসে না। হঠাৎ আকরাম সাহেবের অসুস্থতা বেড়ে যায় চারদিকে পরিচিত সবাইকে জানানো হয় শেষ বারের মতো একবার দেখার জন্য।

বাইকিং এ খবরটা শোনার পর থেকে শহরের অলিতে -গলিতে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে মানুষের ঢল নামে রাস্তায় কর্মজীবনে অনেকের উপকার করেছেন খুব ভালো মানুষ ছিলেন আকরাম সাহবে।

সবার মুখে মুখে একই আলোচনা আত্নীয় স্বজনে পুরা বাড়ি মুখরিত বাবার শেষ ইচ্ছা ছিলো আরাফের বিয়েতে খুব ধুমদাম করে সবাইকে খাওয়াবে কিন্তু তা আর হলো না বলেই আরমান কাঁদতে কাঁদতে তানিয়ার বাবার কাঁধে মাথা রাখলেন।

মনোয়ারা ৫০ বছরের সংসারে জীবনের ইতি ঢেনে নির্বাক হয়ে সবার দিকে চেয়ে আছে! মুখে কোন কথা নেই, আম্মু আরাফ আর আরিফা আপু, দুলাভাই ঢাকা আন্তজাতিক বিমানবন্ধরে নামছে সায়মন ভাইয়া ওদের রিসিভ করতে গিয়েছে।

বড় ভাবি জ্ঞানহীন ভাবে পুরা বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছেন হাতে চায়ের কাপ,বাবা আপনি কোথায়?চা যে ঠান্ডা হয়ে গেল আপনি খাবেন না।আমি সেই কখন থেকে চা হাতে দাঁড়িয়ে থেকে আপনাকে খোঁজতেছি বলেই দোতলা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলেন।

রিতা (আরমানের বউ) এই বাড়িতে যখন বউ হয়ে আসে তখন বয়স আর কত হবে।মাত্র এস.সি.সি পাশ করলো বিয়ের পর বাবা তাকে নিজের মেয়ের মতো দেখতেন পড়াশোনার করে মাস্টার্স পাশ করিয়েছেন বড় বউ হিসাবে সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন।

রিতার হাতের চা বাবা খুব পছন্দ করতেই বলেই আরমান কান্নার আওয়াজ বাড়িয়ে দিলেন রিতার পাগলামী উপস্থিত সকলের চোখে পানি চলে আসল…!

…..চলবে।

১৫১জন ৪৮জন
0 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য