সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

“আমি তোমার জন্য এসেছি-(পর্ব-একুশ)

একটা প্রস্তাব নিয়ে আমাদের কাছে আসছে।

কি প্রস্তাব দাদুমনি..?

শোন আরাফ তোমাকে পছন্দ করে, বিয়ে করতে চায় আকরাম,মনোয়ারা ওদের ছেলের পছন্দ মেনে নিয়েছে তারাও তোমাকে আরাফের জন্য বউ হিসাবে পছন্দ করেছে।

আমাদের ব্যাপারটা জানিয়েছে তোমার বাবা,মা আমিও চাই আরাফের সাথে তোমার বিয়ে দিতে এখন তোমার মতামত কি..?

প্রিয়া কিছুক্ষন চুপ করে থাকে সে এতটুকু বুঝতে পারে বিয়ে মানে বাবা মা ছেড়ে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে,পড়াশোনা করতে পারবে না। দাদুমনির কাছে শোনা গল্প থেকে তার মনে এমন ধারনার জন্ম হয়েছে এর বাইরে সে কিছু জানে না। তার ভিতর থেকে কান্না আসছিলো সে এখনি বিয়ে করতে চায় না।

প্রিয়া! দাদুমনি কিছু কথা বলছে তুমি তোমার সিদ্ধান্ত জানাও কোন সমস্যা নেই,আমরা জোর করবো না। আমরা সবাই অপেক্ষা করছি তোমার সিদ্ধান্তের জন্য আজাদের এমন কথায় প্রিয়া খুশি হলো।

মা-মনি তুমি আরাফকে চিন আশা করি আমার ছেলেটাকে বিয়ে করলে তুমি অসুখি হবে না! এতটুকু নিশ্চয়তা আমি আমার ছেলের ব্যাপারে দিতেই পারি বলেই আকরাম সাহেব প্রিয়ার মাথায় ভরসার হাত রাখলেন।

প্রিয়া খুশি হয়ে জবাব দিল আব্বু,আম্মু আমি বিয়ে করবো না আমি পড়াশোনাটা শেষ করে আব্বুর মতো বড় অফিসার হতে চাই।

ছোট প্রিয়ার কথা শুনে রুমের সবাই হাসতে শুরু করলো প্রিয়া কিছুটা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে রাখল। মনোয়ারা হেসে বললো পাগলি মেয়ে বিয়ের পরও তুমি পড়াশোনাটা চালিয়ে যাবে কোন সমস্যা নেই আরাফ তোমার পড়াশোনার সুযোগ দিবে। প্রয়োজনে তুমি দেশের বাইরে যাবে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে ভালো চাকরি করবে।

নাহ্,!

আন্টি আমি বিয়ে করতে চাই না প্লীজ জোর করবেন না বলেই বিছানা  থেকে নেমে আসল প্রিয়া।মিরা চেয়ারে বসা ছিলো মাকে জড়িয়ে ধরে প্রিয়ার সে কি কান্না মিরা মেয়েকে কান্না থামানোর চেষ্টা করছে।

আরাফ বুঝতে পারল না প্রিয়া কেন কাঁদছে তার চোখে তো আরাফ ভালোবাসা দেখেছে, মায়া দেখেছে, আরাফের চলে যাওয়া প্রিয়াকে কষ্ট দিত, ফিরে আসা আনন্দ দিত। প্রিয়ার চোখে ভাষা তো তার অনেক বছরের চেনা প্রিয়া! আরাফের এমন ডাকে সবার দৃষ্টি আরাফের দিকে প্রিয়া ফিরে তাকায়। আরাফের চোখে চোখ রাখে আরাফ শান্ত ভাবে অসহায়ের মতো প্রিয়ার দিকে চেয়ে আছে ভালোবাসা পাবার আকুতি নিয়ে চোখে পানি মনে বোবা কান্না চেহাড়ায় মলিনতা।

প্রিয়া যেন আরাফের দিকে তাকাতে পারছে না আম্মু আরাফ ভাইয়া কাঁদছে কেন.? মিরা কোন জবাব দিবার ভাষা খোঁজে পায় না মনোয়ারা জবার দেয় মা-মনি আরাফ ভাইয়া তোমাকে ভালোবাসে তোমার জন্য তার কষ্ট হয় তাই মন খারাপ তুমি তাকে বিয়ে করলে সে আর কাঁদবে না।

আন্টি আমি তো আরাফ ভাইয়াকে ভালোবাসি না, বিয়ে করতে চাই না। আমি পড়াশোনা করতে চাই। আরাফের পৃথিবীটাতে ঘৃর্ণিঝড় শুরু হলো দু-চোখে অন্ধকার দেখছিলো চোখ বন্ধ করে মনোয়ারাকে জড়িয়ে ধরে বললো। মা! আমি প্রিয়াকে খুব ভালোবাসি তুমি ওকে বুঝিয়ে বলো না প্লীজ।

এবার আজাদ,আকরাম কেউ যেন চোখের পানি আটকাতে পারে না। সবাই যার যার মতো করে প্রিয়াকে বুঝায়, আরাফকে বিয়ে করতে। কিন্তু ছোট্র প্রিয়া আরাফের ভালোবাসার মর্ম বুঝতে অক্ষম তাকে বলে আর কি  লাভ একসময় সবাই ব্যর্থ হয়।

আরাফের প্রশ্ন প্রিয়া তুমি আমাকে কোনদিন ভালোবাস নাই..?

-আরাফ ভাইয়া আমার বড় কোন ভাই বোন নেই তাই আপনিও আমার বড় ভাইয়া সেই হিসাবে ভালোবাসি।

ওহ্,! আমি তোমার আপন ভাইয়া না। রক্তের সম্পর্কের কেউ না। তুমি আমাকে বিয়ে করতে পারবে কোন সমস্যা নেই।

প্রিয়ার জবাব একটাই সে আরাফকে ভালোবাসে না, বিয়ে করবে না।

আলোচনা আরো দ্বীর্ঘায়িত হলো কিন্তু কেউ প্রিয়ার সিদ্ধান্ত থেকে এক চুল সরাতে পারল না। প্রিয়া তার রুমে চলে গেল, আকরাম ছেলেকে শান্তনা দিবার ভাষা খোঁজে পেলেন না। আজাদ স্যারের সামনে চোরের মতো বসে ছিলেন, মনোয়ারা তখনো আরাফকে জড়িয়ে ধরে বসে আছেন। মিরা চেয়ে দেখল আরাফ নির্বাক দৃষ্টিতে মিরাকে চেয়ে দেখছে হয়ত এটাই বুঝাতে চাচ্ছে একজন সন্তানের কষ্ট সবার আগে মা বুঝতে পারে। মিরার বুঝা উচিত আরাফের মনে কষ্টটা মিরা আঁচলে মুখ ঢাকল।

দাদুমনি মনে মনে প্রিয়াকে ধিক্কার দিল! আজ আরাফের ভালোবাসা বুঝলে না রে পাগলি। হয়ত একদিন ঠিকই বুঝবি কিন্তু সেদিন আফসোস করা ছাড়া কিছুই করার থাকবে না। আজ তুই কাকে হারালে যে তোর জন্য তার জীবন দিতে প্রস্তুত ভেবে দাদুমনির চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা পাড়ি গড়িয়ে পড়ল।

দূরের মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান শোনা যাচ্ছিল বউমা আমাকে একটু রুমে দিয়ে আসবে! আজান হচ্ছে নামাজে যাব। আজাদ যেন এখান থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাইছিলো, মায়ের ডাকে কে সাড়া দিল। বিছানা থেকে নেমে আসলো মা চল তোমাকে রুমে নিয়ে যাই।

হ্যাঁ বাবা চল! মাথাটা খুব ব্যাথা করছে সকালে প্রেশার এর ঔষধটা খেতে ভুলে গিয়েছিলাম। আকরাম বিছানা ছেড়ে আসে মা বলেন কি! এটা আপনি ঠিক করেন নাই। প্রেশারের ঔষধ না খেলে তো আপনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন! বলেই জায়গা ত্যাগ করলো।

আজাদের সাথে প্রিয়ার দাদুমনিকে রুমে নিয়ে গেলেন কারন আরাফের মুখটা দ্বিতীয়বার দেখার শাহস হয়নি।

ভাবি! ভাবি কোন জবাব নেই।

মিরা জোরে জোরে ধাক্কা দেয় মনোয়ারর শরীরে। 

-কে?

-ভাবি মাগরিবের আজান হয়েছে নামাজ পড়বেন না?

-মনোয়ারা যেন স্ব-জ্ঞানে নেই ছেলের কষ্টে তার ভিতরটা ধুমড়ে-মুড়ছে যাচ্ছে। শুধু দেখাতে পারছে না কাউকে কতটা ক্ষতের সৃষ্টি করেছে প্রিয়া।

-হ্যাঁ, মিরা আজান হয়ে গেছে.?

-হ্যাঁ ভাবি উঠেন অজু করে নামাজ পড়তে যাবেন।

মিরা আরাফের দিকে তাকাতে পারছিলো না প্রিয়াকেই বা কি দোষ দিবে ছোট মানুষ ভালোবাসা, বিয়ে এসব বুঝার বয়স তার হয়নি।

ছোটবেলা থেকেই বাবা,মা,দাদুমনি আর পড়াশোনা এর বাইরের জগৎটা সম্পর্কে প্রিয়া তেমন পরিচিত না। থাকলে হয়ত আজ আরাফের ভালোবাসা বুঝত বিয়েতে রাজী হতো।

আরাফের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন বাবা আমরা চাই প্রিয়াকে তোমার সাথে বিয়ে দিতে  তুমি একদম চিন্তা করো না। বাবা আমি নিজে প্রিয়াকে আরো বুঝাব দেখো সবঠিক হয়ে যাবে। আরাফ মাথা উঠিয়ে চোখ খোলে মিরার দিকে তাকাল আন্টি সত্যি আপনি প্রিয়াকে বিয়েতে রাজী করাবেন..!

পাগল ছেলে মা’ রা  কখনো মিথ্যে বলে না, আরাফ হাসি দিল ওকে আন্টি আমি প্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করবো ধন্যবাদ আন্টি বলে আরাফ বিছানা থেকে মনোয়ারাকে নিয়ে নামল।

আরাফ অজু করে বাবা,আঙ্কেলের সাথে নামাজে যাও আল্লাহ্ কাছে পার্থনা করো দেখবে তিনি তোমার মনের সব কষ্ট দূর করে দিবেন, আরাফ বেরিয়ে গেল মনোয়ারা, মিরা নামাজ পড়তে বসল।

আকরামের ফোন ভেজে উঠল রিসিভ করতেই রহিমা খালাম্মা আপনারা আসবেন কখন রাত তো অনেক হয়েছে, আমি আঙ্কেল বলছি।

ওহ্ রহিমা বলা শুরু করলো আরাফাত ভাইয়া বাসায় আসছে কি রান্না করবো.? আকরাম মনোয়ারার হাতে মোবাইলটা এগিয়ে দেয় মনোয়ারা রহিমাকে বুঝিয়ে বলে কি কি রান্না করবে। কারন ছেলের পছন্দ মা জানেন। আমরা সকালের ট্রেনে ময়মনসিংহ ত্যাগ করবো ঢাকা আসতে দুপুর হয়ে যাবে তুই চিন্তা করিস না বলেই ফোন রাখল।

মিরার আজ রান্না বসাতে দেরি হয়ে গেল এমনি মনটা ভালো নেই মেয়েটা যা কান্ড করলো এরপর আকরাম সাহেব, মনোয়ারা ভাবি, আরাফের সামনে যেতে মিরার লজ্জা হচ্ছিল ওরা আজ কতটা কষ্ট পেয়েছে সেটা একমাত্র ওরাই জানে ভাবতে ভাবতে রান্নাতে মন দিল।

সবাই টিভি দেখছে রিমুট কারো হাতে নেই বিছানার এক পাশে পড়ে আছে, সেদিকে কারো খেয়াল নেই। কারন সবাই চিন্তায় ব্যস্ত টিভিতে কারো মনযোগ নেই। সবাই নিরব আজ যা ঝড় বয়ে গেল তা সামলাতে কিছুটা সময় লাগবে।

….চলবে।

সুরাইয়া নার্গিস।

৩০৬জন ২০৪জন
38 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য