সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

“আমি তোমার জন্য এসেছি-(পর্ব আঠারো)

আচ্চা আমাদের বিয়ের পরও কি প্রিয়া আমার সাথে এমন খুনসুটি করবে! পুতুল নিয়ে খেলা করবে! আমারা ঝগড়া করবো। আরো অনেক কিছু ভাবতে ভাবতে আরাফ হেসে পেলল দারুন! মজার গল্প দাদুমনি তুমি আম চুরি করছিলে।

মা এই গল্পটা মনে হয় আমি আগেও শুনছিলাম মাঝে মাঝে বাবা মজা করে আপনাকে বলতেন। আম চোর কিন্তু সম্পূর্ণ ঘটনাটা জানতাম না তাই বুঝতাম না, আপনি তখন রাগি ভাব নিয়ে অভিমান করে বসে থাকতেন! আর বাবা রাগ ভাঙ্গাত সত্যি মা! আপনাদের দুজনের প্রতি দুজনার ভালোবাসা, শ্রদ্ধা,সহমর্মিতা সবকিছুই মুগ্ধ করার মতো বললেন মিরা।

 

দাদুমনি দারুন মজার গল্প আমার তো হাসতে হাসতে পেট ব্যাথা করছে, তুমি দাদার আম চুরি করছিলে! বলেই হাসল প্রিয়া তারপর কি হলো বল জানতে ইচ্ছে করছে।

দাদুমনি আবার গল্প বলতে  শুরু করলেন শ্বশুড় বাবা গ্রামের মেম্বার তিনিও আমাদের খোঁজতে বাপের বাড়ি আসলেন।

 

তিনি সব শোনার পর হা হা হা হা করে হাসলেন, তারপর দুপুরের খাবার খেয়ে শ্বশুড় বাড়ীতে ফিরলাম। তারপর কেটে গেছে ৫ বছর আস্তে আস্তে বুঝতে শিখলাম, জ্ঞান বৃদ্ধি পেল, সংসারের দায়ীত্ব কাঁধে আসলো। আমাদের মনে শান্তি ফিরে এলো আজাদের জন্ম হল, আজাদ পড়াশোনা করে চাকরি জীবন শুরু করলো। তারপর আজাদের বিয়ে দিয়ে লাল টুকটুকে বউমা আনলাম, কয়েক বছর পর তাদের ঘর আলোকিত করে ছোট্র একটা পরীর জন্ম হলো। এখন সেই পরীরকে নিয়েই আমাদের সুখের সংসার বলেই প্রিয়াকে জড়িয়ে ধরে আদর করলেন দাদুমনি।অন্যহাতে আরাফকেও জড়িয়ে ধরে আদর করলেন।

 

দাদুমনির এমন গল্প শোনে সবাই মুগ্ধ হলো! মিরা রাতের রান্নার কাজে কিচেনে উদ্দশ্যে রওনা হলো। সন্ধ্যা মাগরিবের আজান হয়েছে সবাই নামাজ পড়তে গেল।

প্রিয়া পড়ার টেবিলে মন দিল আজাদ আঙ্কেল বাজার থেকে ফিরে রিমোট নিয়ে টিভির চ্যানেল পরিবর্তনে ব্যস্ত।

মিরা রান্না সামলাচ্ছে, দাদুমনি আর আরাফ রুমে বসে আছে। এটাই কথা বলার উপযুক্ত সময় কিভাবে শুরুটা করবে বুঝতেই পারছে না আরাফ।

 

অনেক ভেবে বলেই ফেলল দাদুমনি তোমার কাছে একটা জিনিস চাইবে, না করতে পারবে না, প্রমিস করো দিবে..?

আরাফের এমন আবদারে দাদুমনি কিছুটা বিচলিত হলেন কি চাইবে আরাফ! এত ধনী পরিবারের ছেলে আরাফ সে নিজেও একজন ব্যবসায়ী, কলেজের শিক্ষক তাকে দিবার মতো কি আছে আমার কাছে.? তবুও ভাবনা থেকে মনকে সরিয়ে আনলেন আচ্চা আমার সার্ধে থাকলে দিতে চেষ্টা করবো।

আচ্ছা বলো দাদাভাই তুমি কি চাও..?

 

আরাফের কথায় দাদুমনি যে সট খেলেন এমন কিছু হবে তিনি আগেই ভাবছিলেন, কিন্তু ঘটনা যে এতদূ্র এগিয়ে গেছে তিনি তা বুঝতে পারেন নাই।

দাদুমনি আমি সেই প্রথম দেখা থেকেই প্রিয়াকে পছন্দ করেছি। গোপনে ভালোবেসে ফেলছি,আমি প্রিয়াকে ছাড়া বাঁচবো না দাদুমনি।

দাদুমনি চুপ করে আরাফের কথা শোনছিলোন।

আমি গত চার বছরে বাংলাদেশের অনেক জায়গা ঘুরে বেড়িয়েছি, দেশের বাইরে গিয়েছি অনেক সুন্দরী,উচ্চ শিক্ষিত,ধনীর ঘরের মেয়ে দেখেছি কখনো কাউকে ভালো লাগে নাই। ভালোবাসতে পারি নাই, আমার সবটা হৃদয় জুড়ে শুধুই প্রিয়ার বসবাস, আমি প্রিয়াকে বিয়ে করতে চাই।

 

দাদুমনি, বড় ভাইয়া তার কলিগের মেয়েকে আমার জন্য পছন্দ করেছেন। কিন্তু আমি প্রিয়াকে ছাড়া কিছুই ভাবতে পারি না! আমি প্রিয়াকে বিয়ে করতে চাই প্লীজ আপনি সব ম্যানেস করে দিন।

 

দাদুমনির পা জড়িয়ে ধরে করুন সুরে কথা গুলো বলছিলো আরাফ।

দাদুমনি সব বুঝতে পারলেন আরাফ প্রিয়াকে খুব ভালোবাসে কিন্তু প্রিয়া কি আরাফকে ভালোবাসে.? নাহ্ দাদুমনি তখন প্রিয়াকে কথাটা বলতে পারি নাই, কিন্তু এখন তো প্রিয়া বড় হয়েছে। ক্লাস অষ্টমে পড়ে এখন বলার জন্যই আসছি আপনার সাহায্য লাগবে।

 

কিছুক্ষন ভেবে দাদুমনি বললেন সামনে প্রিয়ার স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষা, এই মুহূর্তে এসব বলা ঠিক হবে না তুমি পরে এসো। আমি প্রিয়াকে বুঝিয়ে বলবো কিন্তু আরাফ মানতে রাজি না আজকেই বলতে হবে। আরাফের অসহায়ত্ব একসময় দাদুমনিকে বাধ্য করলো, প্রিয়ার কাছে যেতে আচ্ছা তুমি থাক। আমি বিষয়টা নিয়ে প্রিয়ার সাথে কথা বলে ফিরে আসছি বলেই দাদুমনি প্রিয়ার রুমে গেলেন।

 

প্রিয়া মনযোগ দিয়ে পড়াশোনা করছিলো দাদুমনি পিচনে দাঁড়িয়ে বললেন প্রিয়ামনি পড়াশোনা কেমন চলছে.? আরে দাদুমনি! তুমি আসলে কেন আমাকে ডাকলেই আমি রুমে যেতাম বলেই দাদুমনিকে ধরে বিছানায় বসিয়ে দিলেন।

দাদুমনি কিছু বলবে.?

হ্যাঁ যা বলি শান্ত ভাবে শোন তারপর জবাব দিবে.? বাসায় বাবা,মম আছেন, পাশের রুমে মেহমান আছেন..

ওকে দাদুমনি ছোট্র জবাব প্রিয়ার।

 

আরাফ তোমাকে পছন্দ করে, বিয়ে করতে চায়! তোমার মতামত কি.!

প্রিয়া সহজ ভাবে বললো, আরাফ ভাইয়া আমাকে ভালোবাসে! কিন্তু ভালোবাসার মানে কি দাদুমনি.?

বিয়ের মানে কি.?

আমি তো কিছুই জানি না..

হুম আরাফ ভাইয়া দেখতে অনেক সুন্দর, ভালো লাগে বলেই ছোট্র প্রিয়া হেসে ফেলল।

তুমি ভাইয়াকে বলে দিও আমি বিয়ে করবো না হি হি হি হি, আমি অনেক পড়াশোনা করবো আব্বুর মতো বড় চাকরি করবো।

 

দাদুমনি প্রিয়ার মুখের দিকে চেয়ে আছেন, প্রিয়া কত অবুঝ মাথায় হাত রেখে বললেন। আচ্ছা তুমি পড়তে বসো আমি গেলাম বলে দাদুমনি নিজের রুমে আসলেন।

 

দাদুমনিকে আসতে দেখে আরাফ এক লাফে বিছানা ছেড়ে নিচে নেমে আসল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। দাদুমনি চেয়ে দেখল আরাফ তৃষার্ত কাকের মতো চেয়ে আছে প্রিয়া কি বললো জানার জন্য।

 

প্রিয়া তোমাকে ভালোবাসে.. আরাফ চিৎকার করে বলে আমি জানতাম প্রিয়া আমাকে ভালোবাসে। কথা শেষ করার আগেই দাদুমনির বলে উঠে আরাফ প্রিয়া তোমাকে বড় ভাইয়ার মতো ভালোবাসে, শ্রদ্ধা, সম্মান করে, কারন তার কোন ভাই-বোন নেই।

 

দাদুমনির কথাটা শোনার জন্য আরাফ কখনো প্রস্তুত ছিলো না, মুহূর্তেই সে হাসি কার্পূরের মত উদাও হয়ে গেল। তার মনটা হু হু হু করে কেঁদে উঠে পৃথিবীর সবকিছু এলোমেলো লাগছিলো। এত বছরের স্বপ্ন গুলো এভাবে ভেঙ্গে যেতে পারে না 😭

মাথায় দাদুমনি হাত বুলাতে বুলাতে বলে পাগল ছেলে কাঁদছো কেন..! তুমি প্রিয়ার চেয়েও আরো ভালো,শিক্ষিত  সুন্দরী,রাজ্যসহ রাজকন্যা বিয়ে করতে পারবে। এসব ছেলেমানুষি ভুলে যাও! আরাফের কান্না কিছুক্ষনের জন্য দাদুমনির মনকে নাড়া দিল। চোখ মুছে আজাদের রুমের দিকে চলে গেলেন তিনি আরাফকে কিছুই বুঝতে দেননি।

রাতের খাবার টেবিলে..সবাই চুপচাপ দাদুমনি, প্রিয়া কারো মুখে কোন কথা নেই! সবাই নিরবতা পালন করছিলো। মিরা সবার প্লেটে খাবার দিল, আরাফ কিছুই খেল না মাথা নিচু করে কিছুক্ষন বসে রইল। আজাদ বার বার প্রশ্ন করলো আরাফ কি হয়েছে! খাচ্ছো না কেন.?

আরাফ চুপ।

মাথায় আলতো করে কেউ ছুঁয়ে দিল! বাবা রান্না ভালো হয়নি..? আরাফ মিরাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলো। সবার নজর আরাফ মিরার দিকে কিছুই হয়নি আন্টি শরীরটা ভালো লাগছে না, আরাফ বলতেই আজাদ চেয়ার ছেড়ে এসে আরাফের কপালে হাত দিল জ্বর নেই। তো কি হয়েছে বাবা তোমার.? মিরা তখনো স্নেহের আঁচলে আরাফকে জড়িয়ে রেখেছে।

দাদুমনি চেয়ার ছেড়ে উঠে আসলেন, আরাফকে জড়িয়ে ধরলেন কিন্তু কাউকে বলতে পারছেন না। আরাফের মন খারাপের কারন আর কিছুই নয় শুধু প্রিয়া দাদুমনি চেয়ে দেখলেন প্রিয়া টেবিলে নেই খেয়ে চলে গেছে আগেই! কারন সে আরাফের মুখামুখি বেশিক্ষন থাকতে পারে নাই।

আরাফ শরীর খাবার বলে প্লেট রেখে বেসিনে হাত ধুয়ে নিজের রুমেই গিয়ে শুয়ে পড়ল। রাতে ঘুম আসলো না, দাদুমনিও অনেক রাত জেগে ছিলেন।

দাদুমনি ঢাকা থেকে জরুরি কল আসছে কলেজে দরকার এখনি ফিরতে হবে…

…চলবে।

সুরাইয়া নার্গিস।

২৯০জন ১৮০জন
0 Shares

১৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য