সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

অন্যান্য গ্রামের চেয়ে আনন্দপুরে সন্ধ্যা হয় খুব একটা দেরিতে। আকাশ গোধূলিতে পরিপূর্ণ।
মুখে কালো দাঁড়ি,চোখে কালো রঙের চশমা আর মাথায় লালরঙের টুপি। দেখে মনে হচ্ছে লোকটি পুলিশে চাকরি করে। বয়স প্রায় পঁচিশ ত্রিশ এর কাছাকাছি। কাকতালীয়া ভাবসাব দেখে বিনু মনেমনে ভাবছে লোকটির ভেতর রহস্য আছে।
লোকটিকে জমিদার হরিবাবুর বাগানবাড়িতে থাকার জায়গা দেওয়া হয়েছে। চারদিনের জন্য এসেছে।
কেন, কিসের জন্য এসেছে এসব আর কেউ তাকে প্রশ্ন করে নি। বিনু প্রশ্ন করতে চাইলেও রাঘব তাকে প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়নি। অবশেষে সন্ধ্যা নেমেছে। সবাই একে একে যারযার বাড়িতে ফিরছে।
আজ হরিবাবুকে পথ্য দিতে আসেন ডাক্তার নীলুদা শঙ্কর। লোকে তাঁকে ব্যঙ্গ করে কখনো ফেলুদা ডাক্তার বলে ডাকে। তাঁর বয়স অনেক। ডাক্তার হিসেবে খুবি ভালো। হরিবাবুর বাল্যবন্ধু নবীনবাবু উত্তরবঙ্গ হতে পাঠিয়েছেন ডাক্তার নীলুদাকে। পরনে নীল রঙের পাঞ্জাবী ও সাদাধূতি। হাতের বেগের মধ্যে পথ্যাধি ও ডানহাতে জারুলডালের বাঁকা লাঠি। লাঠির রঙ কালো। লাঠির উপরিভাগে সাপের কারুকাজ।
বৃদ্ধ লোক হলেও কথাবার্তা বেশ ফুটফুটে। কিন্তু মেজাজ বড্ড কটকটে।
বাড়িতে এসেই সোজাসুজি পৌঁছে গেলেন হরিবাবুর ঘরে। পথ্য দিবার পূর্বে তামাক ভরে নিলেন।
তামাক দেখে হরিবাবুর মনে বেশ আফসোস হচ্ছে যদি হুক্কায় দু এক টান দেওয়া যায়। হরিবাবুর এমন ভাবসাব দেখে নীলুদা ডাক্তার বলছেন না বাপু তামাক খাওয়ার জন্য এমন ভাবসাব করলে চলবে না।
আমি এখনো পরীক্ষা টরীক্ষা কিছুই করিনি তোমায়।
এতদূর থেকে এসেছি একটু আরাম আয়েশে হুক্কায় দু এক টান দিয়ে দেই। হরিবাবুর লোভ কিছুতে সামলাতে পারছেন না বৃদ্ধ নীলুদা ডাক্তারের খাওয়া দেখে। মনেপ্রাণে হুক্কায় টান দিচ্ছেন
আর ধূয়া উড়িয়ে জমিদারবাবুর ঘর অন্ধকার করে তুলছেন। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে তামাকের গন্ধ। কিছুই বলতে পারছেন না হরিবাবু।
নীলুদা শঙ্কর উত্তরবঙ্গের নামকরা ডাক্তার এছাড়া  একজন মহাপণ্ডিত। বড়ই কট্টরপন্থী লোক। সর্বক্ষণ নিরামিষভোজী। হুকাটা হাত থেকে রেখে জমিদার হরিবাবুকে পরীক্ষা করে বেশকিছু পথ্য লিখে দিলেন। এছাড়া বেগের ভেতর থেকে কিছু নিমতার বড়ি দিলেন রোজ সকালে নিয়ম করে খালি পেটে খাওয়ার জন্য।
লালমোহনকে আর পথ্য দেওয়ার উপযোগী মনে করলেন না হোমিও ডাক্তার নীলুদা। তবুও লালমোহনের স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির জন্য এনাকার্ডিয়াম ২০০ দিয়েছেন।
মাঝেমধ্যে লালমোহন ও বিনুর মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যায় লুডু খেলা নিয়ে। লালমোহন লুডু খেলায় সবাইকে ঠকায় যা তার পুরনো অভ্যাস।
পঁচিশ ত্রিশ বছরে যুবক বাগানবাড়িতে একা বসে গুণ গুণ করে বলছে,
“আমি রাজা রাজার রাজা
সবার রাজা
জমিদারবাড়ির ভূতের রাজা”
এমন অদ্ভুত কথা রাঘবের কানে আসলে সে অবাক হয়ে পড়ে। সত্যিই এ বাগানবাড়িতে বিরাট কিছু একটা রহস্য আছে! আর রহস্যকে ভেদ করতে চায় রাঘব।
লোকটি কিছুক্ষণ পর পর ঘরের ভেতর তন্ত্রমন্ত্র উচ্চারণ করে মোমবাতি জ্বালিয়ে ভূতপ্রেতের আবাহন করছে।
রাঘব আড়ষ্ট গলায় বলছে ঐ দেখো বিনু’
লোকটি কি জানি বলছে। বিনু ভূতপ্রেতকে পাত্তা দেয়না কিন্তু নাম শুনলে ভয়ে হাত পা সবসময় কাপে।
ঘরের ভেতর লোকটা শিস দিচ্ছে আর তন্ত্রমন্ত্রের সাথে গান গাইছে। রাঘব অনেকক্ষণ ধরে লোকটির এমন কাণ্ড দেখে বলছে,এই যে ভাই শুনছেন আপনার ঘরের ভেতর কিসের শব্দ শুনছি?
লোকটি আচমকা থমকে উঠে বলছে আ, আ ‘ ও কিছুনা ভাই। অচেনা জায়গা তো তাই গুণগুণ করে গান গাইছিলাম। বিনু এ কথা শুনে বলছে এই যে শুনেন মিথ্যা কথা বলতে যাবেন না।
এই ঘরে ভূত আছে।
আপনি কোন তান্ত্রিক টান্ত্রিক হন কি না?
যদি এমন কিছু হয়ে থাকেন তাহলে জমিদার হরিবাবুকে কিছু ফুঁ ফা দিয়ে আসেন। জমিদারবাবু বেশ কদিন ধরে শয্যাশায়ী। আর আপনি জানেন এ ঘরের ভেতর বড় আকারে বেশ কয়েকটি ভূতপ্রেত আছে।
এসবের সর্দার হলেন হরিবাবু। লোকটি মনেমনে ভাবছে হরিবাবু কী সত্যিকারের ভূতের সর্দার? না আমার মতো লোকঠকানো ভূতের সর্দার।
বাগানবাড়িতে আসা লোকটি বিনু ও লালমোহনের কাছ হতে জমিদারবাড়ি তথ্য জেনে নিয়েছে। বাগানবাড়ির যে ঘরের বিছানা লোকটি ঘুমাতো সে বিছানার কাঠটি ছিলো বটগাছের। এ কথা শুনে লোকটি বেশ চিন্তায় পড়ে গিয়ে ভাবছে সেখান থেকে পালাতে হবে।
কিন্তু জমিদার হরিবাবুকে না ঠকিয়ে যাবেনা বলে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিনু,রাঘব ও লালমোহন তিনজনি অবিবাহিতা।
আর তাদের মধ্যে লালমোহনের বয়স প্রায় চল্লিশ এর উপর। ঘরের কোন অরক্ষণীয়া কন্যা সহজে তাকে পাত্র করে নিবে বলে মনে হয় না। বলা যায়না প্রজাপতির ভাগ্যরেখা পরিবর্তন হতে পারে। কেননা লালমোহনের জামাইবাবু একজন জমিদার। জায়গা সম্পত্তির অভাব নেই। হরিবাবুর ছেলেমেয়ে সবাই বিলেতে চাকরি করে বিধায় এতসব সম্পত্তির মালিক একদিন লালমোহন হবে। জমিদার হরিবাবুর বাগানবাড়ির প্রতিটি ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে ভূতড়েকাণ্ড। এমন কাণ্ডকারখানা দেখে শ্যালক লালমোহনকে কী কেউ আর পাত্রী দিবে?
তা সন্দেহের বিষয়।
যদিও কয়েকদিন পূর্বে লালমোহন স্বাস্থ্যসেবায় চাকরি করে আসছে। সে শল্যবিভাগে পরিষেবারত একজন স্বাস্থ্যকর্মী।

২৭০জন ১৯৩জন
0 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য