অনন্ত অত্যয়

নীলাঞ্জনা নীলা ২৭ নভেম্বর ২০১৬, রবিবার, ০৩:১০:১০পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি, গল্প ৩২ মন্তব্য
আড়ালের অন্তরালে...
আড়ালের অন্তরালে…

মানুষটি এসে জানতে চাইলেন আর কিছু কি চাই? আমি ধন্যবাদ জানিয়ে না বলতেই, আবারও এসে বললেন, সত্যি কিছুই কি চাওয়ার নেই? আমি মাথা খাটিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম, কি বলতে চাইছে ওই মানুষটা? কিন্তু এই মাথা থেকে কিছুই বের হলোনা। আমি আবারও বললাম, নাহ যথেষ্ট করেছেন। আর কিছুই করতে হবেনা। আর এই উপকারের ঋণ শোধ যে করবো, সেও তো জানিনা। একটা হাসি দিয়ে আমায় শুভকামনা জানিয়ে চলে গেলেন। এবারে আমার একলা সময়ের সময়। হাজারও মানুষ, কেউ ছুটছে, কেউ গল্পে মত্ত আর কেউবা চিন্তায় অস্থির। আর আমার কিছুই করার নেই। শুধুই অপেক্ষা। কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক চাওয়ার পর দেখি নিঃশব্দে খবরের চ্যানেল চলছে। শব্দহীন খবর শোনার মতো মেধা আমার নেই। খবরে পুলিশ আর সন্ত্রাসীদেরই আধিপত্য এতো বেশী যে, বিনোদন বিভাগেও নাটক-সিনেমা সব কিছুতেই ওই পুলিশ আর সন্ত্রাসীরাই জায়গা করে নিয়েছে। এসব ভাবতে ভাবতেই আমার নাম ধরে কেউ একজন ডাকতেই চাইলাম সেইদিকে, “তিন নম্বর রুমে যান।” হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম, যাক মনে হচ্ছে তাড়াতাড়ি-ই হয়ে যাবে। তিন নম্বর রুমে বসে থাকতে থাকতে এমনই বিরক্তি এলো, কিচ্ছু করার নেই। সেলফোন অসহ্য! ইস কেন যে বইটা নিয়ে আসেনি! মানুষটা বারবার জানতে চেয়েছিলো আর কিছু কি চাই? বললেই পারতাম, একটা খবরের কাগজ, নয়তো কোনো ম্যাগাজিন, অন্তত সেলফোনের হাত থেকে তো মুক্তি পাওয়া যেতো! ওসব ভেবে কি আর হবে? “ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না”—-প্রবাদটি জানি আমরা সকলেই, কিন্তু সময়মতো প্রয়োগ করিনা। একা একা নিজের সাথে কতোক্ষণ থাকা যায়? ইস কেউ যদি আসতো! এমন কেউ অন্ততপক্ষে গল্প করতে পারতাম। নিজেই আবার নিজেকে বললাম কে আর আসবে? অতো আন্তরিকতা যার মধ্যে আছে, সে তো এ শহরেই নেই। এ শহর হিসেবের শহর, বদলে যাওয়া মানুষদের শহর। কিন্তু আমার ভাবনার ঘুম ভাঙ্গিয়ে প্রমাণ করে দিলো এ শহর দায়িত্ত্বপূর্ণ ভালোবাসার শহরও বটে! দায়িত্ত্বপূর্ণ ভালোবাসা আর আন্তরিক ভালোবাসার মধ্যে রাত-দিনের পার্থক্য।

—-আমি ঈয়নী। আপনি?
—-আমি হার্দিক। ঠিক চিনতে পারলাম না আপনাকে! আপনি…!!!
—-চেনার কথা নয়। বলুন কেমন আছেন?
—-পরিচয় ছাড়া কথা বলাটা আসলে ঠিক বুঝতে পারছি না।
—-পরিচয় বলতে কি বোঝায়? নাম তো বললামই! এতো ভাববেন না, কথা বলতে মন না চাইলে ঠিক আছে আমি চলে যাচ্ছি।
—-আরে না, না! ভালো আছি। তবে বুঝে উঠতে পারছি না, কেন আমাকে ডাকলো? আর এভাবে বসে থাকতে আমি পারিনা। বড়ো বিরক্ত লাগে। আচ্ছা ঈয়নী যদি কিছু মনে না করেন আমায় বলবেন, আপনাকেও কি ওরা এখানে ডেকেছে?
—-না! আমায় এখানে রোজই আসতে হয়। আমার দায়িত্ত্ব আপনাদের সাথে কমিউনিকেট করার।
—-ওহ আচ্ছা! আগে বলবেন তো! ভেবেই যাচ্ছিলাম আপনাকে তো আমি কখনো দেখিনি!

ঈয়নীকে বললাম চেয়ারে বসতে। কিন্তু বসা তার জন্য বারণ। জানতে চাইলাম কতোদিন হলো চাকরী হয়েছে? বললো এক মাস। ‘কেন জানতে চাইলেন মিঃ হার্দিক?’ হাসলাম, আর মনে মনে বললাম সামনের বছর ঠিক এসেই বসে যাবে চেয়ারে, বলতেই হবে না। নতূন অবস্থায় সকলেই মাত্রাতিরিক্ত দায়িত্ত্বশীল হয়ে থাকে। বেশ মজা করতে পারে মেয়েটি। অনেক হাসালো, আমিও কতোদিন পর মন খুলে এভাবে হাসলাম, মনে করে পাইনি। বেশ কিছুক্ষণ পর ঈয়নী জানতে চাইলো আমার কিছু লাগবে কিনা! এবারে আর ভুল করলাম না, বললাম কোনো খবরের কাগজ বা ম্যাগাজিন পাওয়া যাবে? মাথা নাড়িয়ে বললো, ‘অবশ্যই! আপনি বসুন আমি এক্ষুণি নিয়ে আসছি। তবে আমি আসার আগেই আপনার কাজ শেষ হয়ে যায় কিনা!’ ঈয়নীকে দেখে মনে হলো দেশ অনেক উন্নত হয়েছে। তারপর আবার নিজেই নিজেকে বললাম, দেশ উন্নত হয়েছে, কিন্তু আসল হলো যাদের টাকা কথা বলে, তাদের কাছেই উন্নতির মাত্রা আকাশ-ছোঁয়া। যদিও আমার টাকা নেই, তবে মামা-চাচা আছে। উফ, কোথায় গেলো মেয়েটি? চোখ দুটো এদিক-ওদিক অস্থির।

ঈয়নীর সাথে সেদিন দেখা হয়নি। ওখানে বেশ কয়েকবার যাবার পর খোঁজ করেছি, কিন্তু কেউই কিছু বলেনা। শেষ যেদিন গেলাম আরেকজন এসে জানতে চাইলো আমার কিছু চাই কিনা! বললাম ঈয়নীর কথা, সেও জানেনা। হুম ঈয়নীর সাথে একদিন দেখা হয়েছিলো, আমায় সে চিনতে পারেনি। চেনার কথাও না। কেমোথেরাপিতে বদলে যাওয়া হার্দিক নামের মানুষটার চেহারা এক ঘন্টার দায়িত্ত্বপূর্ণ ভালোবাসা প্রদায়িনী ঈয়নী কিভাবে মনে রাখবে?

হ্যামিল্টন, কানাডা
২৬ নভেম্বর, ২০১৬ ইং।

 

২৪৯জন ২৪৯জন
1 Shares

৩২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য