মূল লেখায় যান

শিরোনামশুন্য

শুন্য শুন্যালয়একান্ত অনুভূতি৩৮টি মন্তব্য

প্রায় ৯/১০ বছর আগে আমার বোনের বাসায় একজন রান্নার বুয়া রাখা হয়েছিল, বয়স আনুমানিক ৫৫ বছর হবে, তবে বেশ কর্মঠ। সবাই বুয়া বললেও আমি তাকে নানী বলে ডাকতাম। আমার সাথে বেশ একটু খাতিরও জমেছিল। একদিন তাকে বললাম, নানী তুমি অন্য কাজ করো, আজকে আমি রান্না করি। এক চুলায় গরুর মাংশ, আরেক চুলায় সবজী চড়িয়ে অপেক্ষা করছি। নানী দেখি আমার পাশ থেকে নড়েই না। আমার রান্না দেখছে। বললাম, কই নানী যাও অন্য কাজ করো, কি দেখো? হঠাৎ সে আমার হাত থেকে খুন্তীটা নিয়েই ধুতে শুরু করলো। কিছুই বুঝলাম না, কি হইছে নানী জিজ্ঞাসা করলাম। সে বললো, আমি গরুর মাংশ খাইনা। এতক্ষনে তার চিন্তা আর ঠায় দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণের কারণটা আমার কাছে স্পষ্ট হলো। যেহেতু সে গরুর মাংশ খায়না, আমি যদি আবার একই খুন্তী সবজি তে ব্যবহার করি সে সবজীও খেতে পারবেনা। এই হচ্ছে তার চিন্তার কারন। পরে তার সাথে গল্পের এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করলাম, গরুর মাংশ খাওনা কেনো? এলার্জি? যেটা বললো, সেটা শুনে মনটা খুবই খারাপ হলো।
নানী একজন হিন্দু পরিবারের মেয়ে ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স যখন ১৬/১৭ বছর তখন তাকে বিয়ে দেয় তার পরিবার। ছোটবেলায় মুক্তিযুদ্ধের কোন এক সিনেমাতে দেখেছিলাম অনেক নৌকায় করে বিয়ের বর-বউ যাচ্ছে। মাথায় প্রশ্ন এসেছিল, যুদ্ধের এতো আতংকের মধ্যেও এতো বিয়েসাদি হতো!! উত্তর টা নিজেই বুঝতে পেরেছিলাম এক সময়। অই সময় অনেক পরিবারই অবিবাহিত মেয়েদের সম্ভ্রমের চিন্তায় তড়িঘড়ি করে বিয়ে দিয়ে দিতেন। যা হবার বিয়ের পরে হোক, অন্তত কন্যা দায়গ্রস্ত পিতা-মাতা তো আর হতে হবেনা।

অবিবাহিত মেয়ের বোঝা সরে গেলো এক পরিবার থেকে, আর বিয়ের পর তার শ্বশুরবাড়ির পুরো পরিবার জীবনের ভয়ে নিজ ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান ধর্ম গ্রহন করলেন। ১৬/১৭ টা বছর একটা রীতিনীতির মধ্যে বড় হওয়া মানুষকে আচমকা বলা হলো, এতোদিন যা জেনেছ সব ভুল ছিল, ধুপ ধুনো, ঢোলের মাতন সব আজ থেকে তোমার জন্য হারাম। চার কালিমা আধ ভেঙ্গে হলেও পারো তো!! মানে নাই বা জানলে!! মূর্তির সামনে পাঠা বলি নয়, এখন থেকে গরু, যাকে “মা” বলে পূজো করে এসেছ এতদিন তাকেই বধ করে খুশি করতে হবে তোমার বিধাতা কে।

কতো শত এমনি নানীদের বছরের পর বছরের মানসিক চাপের ভারে নুহ্য এদেশের মাটি, অভিশাপও কি নেই?? পূজোর দিনগুলো এলে আমার মনটাই কেমন আনন্দে ভরে যায়, কত স্মৃতি আছে পূজো ঘিরে, তাহলে নানীর মনটা কেমন করে ওঠেনা??

মোট পড়েছেনঃ ৬১৪জনআজ পড়েছেনঃ ০জন
ঘরে বসেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন

৩৮টি মন্তব্য

  1. তাহলে নানীর মনটা কেমন করে ওঠেনা?? কথাগুলো একেবারে অন্তরে অন্তস্থলে আঘাত পেলো।সমাজ এমনিই মানুষের মন বুঝতে চায় না তার নিষ্ঠুরতার কাছে।সকাল সকাল সুন্দর একটি লেখা পড়লাম শুণ্য আপুর এবং মনও চাঙ্গা হলো দেখি বাকী সময়টা কেমন যায়।

  2. বেঁচে থাকার জন্য আমরা কত কিছু করি।এ শুধু শরীরের বেঁচে থাকা।আত্মা তো মরে যায় জোর করে বা জীবন বাঁচানোর জন্য ভয়ে ধর্মান্তরের দিন থেকে।
    পরিবর্তনটা আসলে বাইরের,ভিতরে ঠিকই থেকে যায় আসল আমি।

  3. আমার এক ডাক্তার বন্ধু আমাকে ইদানিং একটা ছবক দিচ্ছে – “Peaceful Coexistence”। আপনার নানীটার কথা জেনে নিজেকে অনেকটা ঐ নানীর মতো মনে হচ্ছে। তবে আমার চেয়ে উনি অনেক উন্নত। উনার তরিকা উনি ঠিক পালন করেন, আমরা অনেকে গুলিয়ে গালিয়ে ধরে নেই তরিকা আমার ঠিকই আছে। আসলে তা নেই মোটেই। অভিনয় করে যাচ্ছি কিন্তু মানতে রাজি নই আমরা।

  4. পড়ে নানীর জন্য মনটাই খারাপ হয়ে গেল – আমরা নিজেদেরকে বাঁচানোর জন্য কত কিছুই না করি –কিন্তু মন হতে মানতে পারি কি !!
    যখন পড়ছিলাম শেষে এসে মনে হচ্ছিল লেখাটা আরো একটু বড় হলে আরো ভাল হতো, কারণ মন চলে গিয়েছিল আপনি আর নানীর মাঝে —– অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখাটা —

    1. ঠিকই বলেছেন আপু, আরেকটু বড় করলে হয়তো ভালো হতো। তবু তো বেঁচে ছিলেন তারা, অনেকে ধর্মান্তরিত হয়েও শেষ রক্ষা পাননি। পাকিস্তানের এক সৈন্য একটা জায়গায় লিখেছিলেন, তাদেরকে অর্ডার দেয়া হয়েছিল একটা গ্রামের নাম মেনশন করে, এ গ্রামের সবাই হিন্দু, একটাকেও যেন প্রানে বাঁচানো না হয়। তারা যখন সে গ্রামে পৌঁছালেন, অই গ্রামের সবাই মুসলমান হয়ে গেছে অলরেডি, কেউ কেউ কোরআন পড়ছিলেন। তবুও অর্ডার ছিল, তাই প্রত্যেককে তারা হত্যা করে।

    1. এই ক্রুড বাস্তবতাকেই মেনে নিতে হয়েছে, হচ্ছে। ঘটনাটা আমাদের জন্য ছোটই, কিন্তু তাদের কাছে?
      আমি মাঝে মাঝে ভাবি, যদি আজ আমাকে কেউ এমনি জোর করে ধর্মান্তরিত করে?

  5. ১৯৭১ এ যদিও বেশ ছোট ছিলাম তারপরেও দেখেছি অনেক হিন্দু পরিবার কেবলমাত্র বেঁচে থাকার জন্য ধর্মান্তরিত হয়েছেন।স্বাধীনতার পরে আবার পূর্বের ধর্মে ফিরে গিয়েছেন।

    জোর করে কোনকিছুই ১০০ ভাগ পরিবর্তিত হয়না।
    অভিশাপ তো আছেই,না হলে দেশের এই অবস্থা কেন হবে?
    ভালো লিখেছেন।

  6. এই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে নিষ্ঠুরতার ছাপ–যত জানছি ততই ঘৃনা বাড়ছে…
    আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুটাও হিন্দু ধর্মের–তাদের পুজোকে ঘিরে আমাদেরও কতোই না আয়োজন থাকে..অথচো___________…তোমার মতো আমারও খুব জানতে ইচ্ছে করছে আপু, পুজোর সময় নানীর মনটা সত্যি কেমন করতো?….

    1. কতোটা যন্ত্রণা তারা বয়ে বেড়ায় ভাবো একবার। আল্লাহ্‌র কোন বিচারে এই পাপিষ্ঠ মুসলমানরা বেহেশতে যাবে জানিনা।
      এই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে নিষ্ঠুরতার ছাপ ঠিক বলেছ। ঘৃণা যত বাড়বে এ দেশের জন্য টান ততই বাড়বে। বহু আত্মত্যাগের ফসল এই দেশ। তার হেফাজত আমরা করতে পারছিনা, এটাই আফসোস।

      1. মুসলমান হলেই যে বেহেশতে যাবে এমন কোন কথা নেই আপু…
        আফসোস লাগে ভালো মানুষগুলোকে যন্ত্রনায় ছটপট করতে দেখলে,
        আর পাপিষ্ঠগুলোকে ভালো থাকতে দেখলে মনের মাঝে পাহাড় সমান ঘৃনা জন্ম নেয়…

  7. ছোট একটি লেখায় কত বিশাল একটি বক্তব্য দিলেন আপু।জোর করে কোন কিছুকেই পাল্টানো যায়না।আমরা বাহির থেকে কতটুকুই বা জানি একজন মানুষ সম্পর্কে?অনিচ্ছায় আমরা অনেক কিছু কেবল মেনে যাই,ভিতরে দহন ঠিকই থাকে।

  8. ছবির বাহিরে এই প্রথম শুনছি আপু এরকম কিছু।

    এমন টা যদি আমাদের সাথে হতো আমরা কি করতাম??? ভাবতেই তো কষ্ট হচ্ছে। উনি সহ্য করছেন কি ভাবে???

মন্তব্য করতে লগিন করুন অথবা নিবন্ধন করুন।

অনলাইনে ডাক্তার দেখাতে চান?