মূল লেখায় যান

পূজোর স্মৃতি রোমন্থন

সুপর্ণা ফাল্গুনীস্মৃতিকথা২৯টি মন্তব্য

বাবার চাকরি সূত্রে শিশুকাল থেকেই শহরেই থাকা। বছরে হয়তো এক দুবার বাড়িতে যেতে হতো । তবে এখানেও যৌথপরিবারেই থেকেছি। বাবার বাড়ির লোকজন , মামা বাড়ির লোকজন ও এখানেই থাকতো । সবাই মিলে যখন লঞ্চে বাড়িতে যেতাম তখন এমনিতেই উৎসব উৎসব ভাব হয়ে যেত। এখানে বলে রাখা ভালো তখন লঞ্চ ছাড়া আমাদের বাড়িতে যাবার অন্য কোন উপায় ছিলো না। তখনকার সময়ে খুলনা বিভাগের পিরোজপুরে আমাদের বাড়ি ছিল এখন সেটা বরিশাল বিভাগে পড়েছে। তখন বড় কোনো অনুষ্ঠান হলে খুলনায় যেতে হতো বাজার করতে। তাও সেই লঞ্চে। একদিন লেগে যেতো পৌঁছাতে। আর ঢাকা আসতেও একদিন লেগে যেতো। আমরা যেহেতু ঢাকায় থাকি তাই দু’বাড়ির সব কেনাকাটা তো ছিলোই , সেই সাথে আত্নীয়-স্বজনদের সহ গ্রামের অন্যদের জন্য ও কিছু না কিছু কিনতে হতো। তো যখনি বাড়িতে যেতাম খুব বেশি লাগেজ হতো । একেক জনের হাতে কমপক্ষে দুই/তিনটা ভারী লাগেজ থাকতো। কোনো অনুষ্ঠান ছাড়াই এমন অবস্থা হতো যে সেই খরচ দিয়ে ঢাকায় দু’মাসের খরচ চলে যেতো। তাই পূজা-পার্বনে খুব কম যাওয়া হতো । সবার কাপড়-চোপড় দিয়ে দেয়া হতো কিন্তু বাড়িতে গেলে দু ‘বাড়ির বাজারের খরচটাও আমার বাবাকে দিতে হতো।

ঢাকায় থাকতাম বলে সবার চাহিদা থাকতো আকাশচুম্বী কিন্তু বাবার ছিলো সীমিত আয়ের চাকরি। ইঞ্জিনিয়ার হওয়া সত্ত্বেও আমাদের চলতে হতো খুব হিসাব করে। ঢাকার খরচ, দু ‘ বাড়ির খরচ মিলিয়ে খুব হিমশিম খেতে হতো আমার বাবা-মাকে। তখন তো কেনাকাটা হতো পূজো আর পহেলা বৈশাখে। আমার বাবা খুব সরল বলে আর কাউকে কিছু বলতে পারতোনা বলে সারাজীবন কলুর বলদ হয়েই খেটে গেছে। সবার আবদার পূরণ করতে গিয়ে আমাদের দুবোনের শখ আহ্লাদ তেমন মেটাতে পারেনি। অথচ বাবা-মা চাইলেই আমরা রাজকীয় হালে থাকতে পারতাম। ঢাকাতে পূজোর আনন্দ তেমন না হলেও চেষ্টা করতাম পাঁচদিনের প্রতিটা দিন পূজো মন্ডপে যাবার জন্য। দূর্গাপূজো, বৈশাখ, বইমেলা উপলক্ষে যে মেলা হতো সেগুলোই ছিল তখনকার সময়ে আমাদের তথা পুরো ঢাকার উৎসবের আমেজ। ঈদমেলা হলেও এই তিন মেলাতেই বেশী জমজমাট হতো। সেই মেলাগুলোকে আজো খুব মিস করি। মেলা থেকে মাটির তৈজসপত্র, খেলনা এগুলোই বেশী কেনা হতো। তখন ঢাকায় এতো শপিং মল ছিলোনা , সৌখিন জিনিস গুলো এসব মেলা থেকেই বেশী কেনা হতো। আর তখন প্লাস্টিকের পলিব্যাগ ছাড়া প্লাস্টিকের তেমন কিছুই ছিলোনা‌ । পূজোতে মেলা থেকে গজা, বাতাসা, মন্ডা আর হাওয়াই মিঠাই এগুলো ছাড়া পূজোর মজা যেন অসম্পূর্ণই থেকে যেতো। এইছিলো ঢাকায় পূজোর স্মৃতি।

আর এবার আসি বাড়ির পূজোর স্মৃতির মেলায়। বাড়ির দু’ একটা পূজোর কথা খুব বেশী মনে পড়ে যেহেতু তেমন যাওয়া হতো না। তখন গ্রামের পূজোতে যাত্রাপালা, সার্কাস থাকতোই। যেহেতু আমাদের বাড়ির কাছেই স্কুল ছিলো , বাড়ির কাছে বলতে আমাদের জমির সাথেই তাই যাত্রা বা সার্কাস এর লোকজন দেখতে আমরা সবাই আগেই গিয়ে দেখে আসতাম। যাত্রার শিল্পীদের তখন আকাশের তারা মনে হতো। সার্কাসে আসা সিংহ, হাতি, বাঘ ও দেখতাম আগে ভাগেই। তবে সাপ দেখতে পারতাম না আমি। ছোটবেলা থেকেই সাপ, কেঁচো, বিছার ছবি দেখলেও ভয় পেতাম খুব এমনকি টিভিতে দেখানোর সময় ও চোখ বন্ধ করে রাখি- এখনও। উফ্ তখন তো এসব ই ছিলো বিশাল ব্যাপার। গ্রামের লোকজনের উৎসাহ উদ্দীপনা সব এসবকে ঘিরেই ছিলো।

তো একদিন দুপুরে খাওয়া দাওয়া করেই এসব তারাদের দেখতে গেলাম বাড়ির মেয়েরা, কাজিনদের সাথে নিয়ে। সেদিন আমি পড়েছিলাম লাল রঙের একটি ড্রেস। তো সার্কাসের প্যান্ডেল থেকে আমাদের বাড়িতে আসতে পাঁচ থেকে সর্বোচ্চ দশ মিনিট লাগতো। তো সম্ভবত সার্কাস দলের সাথে আসা একটি কুকুর আমাদের পিছন নিলো। রাস্তার পাশেই একটি ছোট্ট ডোবার মতো ছিলো। কুকুরটি ডোবার ওপাশে চলে গেলো তাই ভাবলাম ও আর আমাদের ধরতে পারবে না। আমরা ছোটরা দৌড়াতে ছিলাম বলে এগিয়ে ছিলাম আর বড়রা গল্পে মশগুল হয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে ছিলো। তবুও তারা ঐটুকু পথ সাবধানে নিয়েই আসতে ছিলো কারন আমরা দুবোন ঢাকার, আরো কয়েকজন ছিলো মফস্বলের তাই গ্রামের মেঠোপথের সাথে আমরা অভ্যস্ত নই। তার আগে কিছুটা বৃষ্টি ও হয়েছিল তাই রাস্তা অনেকটা পিচ্ছিল ছিলো। তো ভাবলাম কুকুর টা সেই কর্দমাক্ত রাস্তা পেরিয়ে আমাদের ধরতে পারবে না। কিন্তু কুকুর টা অবাক করে দিয়ে ঠিক আমার হাঁটুতেই এসে কামড় লাগালো । তবে বড়রা পিছনে ছিলো বলেই তাদের তাড়া খেয়ে কুকুর টা ভয়ে বেশী জোরে কামড় দিতে পারেনি। শুধু দাঁতের দাগ পড়েছিল। উফ্ সেইদিনের কথা মনে পড়লে আজো গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। তখন আমার বয়স ছিলো আট/দশ তবুও এখনো স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে সে-ই দিনটা। এই ছিল আমার ভয়ের , মজার, আনন্দের পূজোর স্মৃতি রোমন্থন। আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে।

মোট পড়েছেনঃ ৯৩৮জনআজ পড়েছেনঃ ০জন

২৯টি মন্তব্য

  1. এত সুন্দর করে স্মৃতি-রেখা টানা সহজ কথা/কাজ নয়।
    পিরোজপুর কবে আসবেন! বলে আসবেন।
    তা ক’টি সুঁই নিতে হয়েছিল তা কিন্তু বলেন নি।
    শত ঝক্কির মাঝে সে সময়ের আনন্দ, আনন্দই, যার বিকল্প নেই।

    1. ভাইয়া দেখি কবে যেতে পারি। এখন আর যাওয়াই হয়না। গেলেও বাসে যাই । টুঙ্গিপাড়া থেকে আমাদের বাড়ি যেতে আধা ঘন্টার মতো লাগে। পানি ভয় পাই আর সময় বাঁচাতে ঐ পথেই যাতায়াত করি। সেলাই লাগেনি শুধু হালকা দাগ বসে ছিলো । ভয় পাওয়ার কারনে ঝাড়ফুক দিয়েছিলো। তবে রাতেই কিন্তু যাত্রা দেখতে গিয়েছিলাম। হা হা হা।

  2. কুকুরের কামড় খাওয়ার অভিজ্ঞতা আমারও হয়েছে, নাভীতে ১৪ টা ইঞ্জেকশনও নাকি দিতে হয়েছিল। কিন্তু অনেক ছোটবেলায়, মনে নেই আমার। যাইহোক, আপনার স্মৃতিচারণ দারুণ লাগলো। ছোটবেলা এত মধুর, কেউ কখনও ভুলতে পারে না। এই বড়বেলায় এসে সেসময়ের হালকা বেদনার স্মৃতিগুলোও কত মধুর মনে হয়!

  3. চমৎকার শব্দের গাঁথুনিতে সাবলীলভাবে আমাদের স্মৃতিচারণা লিখে শোনালেন দেখে আনন্দিত হলাম দিদিভাই। তবে কুকুর কামড় দেয়ার অংশটুকু পড়ে কিন্তু সত্যি ভয় পেয়েছি।

    ভালো থাকুন সবসময়।

    1. অসংখ্য ধন্যবাদ ভাইয়া। খুব ভালো লাগলো ভালো লেগেছে জেনে। কুকুর কামড়ানো অংশটুকু সত্যিই ভয়ংকর ছিল। ভালো থাকবেন। শুভ কামনা রইলো সবসময়ের জন্য

  4. ওরে বাবা ‍উৎসবের স্মৃতিতো দেখি কুকুরময় হয়ে গেল। এটা কি আনন্দের স্মৃতি বলব না বেদনার । কনফিউসড। তবে পুজোর ছুটিগুলো যে বৃথা যায় নি এটা বুঝা গেছে। ধন্যবাদ

  5. রাজধানী ঢাকা শহরের জীবন যাপন এম্নিতেই বেশ ব্যায়বহুল। আর যাদের আয় সীমিত তারা অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের প্রয়োজনীয় চাহিদা গুলোও ঠিক মতন পুরণ করতে পারেন না। সব জানা-শোনা সত্তেও ঢাকায় বসবাসরত স্বজনদের প্রতি আত্মীয়দের চাহিদা কেন জানি বেশি থাকে। ছুটি-ছাটা বা উৎসব-পার্বণের সময় এই চাহিদা এতটাই বেড়ে যায় যে, ঢাকার মানুষেরা খুব চাইলেও বছরে দুয়েক বারের বেশি আপনজনদের সান্নিধ্যে যেতে পারেন না। আমাদের মতো মধ্যবিত্ত/ নিম্ন মধ্যবিত্তদের বেলায় এসব সর্বদা ঘটে।
    ছোটবেলায় আপনার পূজোর স্মৃতিময় লেখাটি পড়ে ভালো লাগলো। কুকুরের কামড়ের কথা পড়ে মন কিছুটা খারাপ হলো। তবে এটাও ঠিক যে,স্মৃতিটা না থাকলে হয়তো সেইদিনটা এত স্মরণীয় হয়ে থাকতো না।

    আপনার স্মৃতিচারন লেখাটি বেশ ভালো হয়েছে। আশা করি আগামীতেও এমন আরও অনেক স্মৃতি সোনেলায় জমা করবেন।

    ভালো থাকুন,
    শুভ কামনা অবিরত 🌹🌹

  6. তোমার বাবা ইঞ্জিনিয়ার, আর তোমরা হিসেব করে কস্ট করে চলতে। আজকাল এসব ভাবা যায় না।
    একটি সময়ে লঞ্চ ছাড়া তো চলাচলই করা যেত না আমাদের দক্ষিনাঞ্চলে।
    পুজোর মেলার কথা খুব মনে পড়ে ছোটদি। কতকিছুই না কিনতাম মেলা থেকে!
    পুজোর সময় আমাদের কাছাকাছি এক জমিদার বাড়ীতে যাত্রা, সার্কাস হতো। আমরা ধর্মীয় পরিচয় ভুলেই সে সব পুজোয় আনন্দ করতে যেতাম।
    যাক কুকুড়ের কামড় তেমন মারাত্মক ছিল না, নইলে নাভীর চারপাশে ইঞ্জেকশন দেয়া লাগত।
    ভাবছি আমিও আমার পুজোর স্মৃতি লিখব।

    স্মৃতিকথা ভালো হয়েছে ছোটদি।
    শুভ কামনা।

    1. অফুরন্ত কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ দাদা ভাই। আমার লেখায় আপনাদের নিয়মিত অনুপ্রেরণা আমাকে আবেগ আপ্লুত করে ফেলে। সত্যিই আমি কৃতজ্ঞ আপনি, হেলাল ভাই, সুপায়ন দাদা, তৌহিদ ভাই, মহী ভাই, সুরাইয়া আপু, প্রদীপ দাদা, হালিম ভাই , সাবিনা আপু আমার প্রতিটি লেখায় উৎসাহ দিয়ে যান। ইঞ্জা ভাইও যথাসাধ্য চেষ্টা করেন আমার লেখা পড়ার‌ । জানিনা আমি এতো টা যোগ্য কিনা তবুও আপনারা পাশে থাকেন বলে সাহস পাই লেখার। আমার তো মনে হয় আমি খালি লিখেই যাই, কি যে হয় কে জানে? আপনাদের জন্য ই নতুন করে লেখায় ফিরে আসলাম। নিরন্তর শুভকামনা রইলো সবার জন্য

মন্তব্য করতে লগিন করুন অথবা নিবন্ধন করুন।