মূল লেখায় যান

পুলিশ হবো

নাসির সারওয়ারএকান্ত অনুভূতি৪৩টি মন্তব্য
  • আপনি বিজ্ঞান নিয়ে পড়েছেন, তাইতো?

# জী।

  • বিজ্ঞান বিভাগের কোন পদের জন্য নাম না দিয়ে পুলিশ পদের নাম সবার উপরে!

# আমি পুলিশ হবো।

  • পরিবারের কেউ পুলিশে কাজ করে?

# না।

  • তাহলে উৎসাহটা আসলো কি করে?

# নিজের উৎসাহে।

  • এই উৎসাহের কোন উৎস আছে?

# জী, আছে।

  • তা আমাদের যদি সেই উৎসাহের কথাটা বলতেন, তাহলে আপনার পুলিশ হবার পথে আমরা আপনাকে সহযোগীতা করতে পারতাম। বলার মত নাকি বলতে চাচ্ছেন না?

# আমি বৈজ্ঞানিক উপায়ে মানুষ পিটাবো।

কাগজ নাড়াচাড়ার মৃদু খচখচ শব্দটুকুও তখন থেমে গেলো। বিশেষ মৌখিক পরিক্ষার বোর্ডের পাঁচ জোড়া চোখ আমার চোখের দৃষ্টি হননে ব্যস্ত হয়ে পরেছে। আমি নির্বাক ভাবে প্রশ্নকর্তার চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে আছি। অপেক্ষা বেশ যন্ত্রণার যা আবারও আমাকে মনে করিয়ে দিলো। এক মিনিটেরও বেশী সেই সময়টা যেনো ঘড়ির সাথে চলেনি। অন্য আরেকজন প্রশ্নকর্তা সেই হরতাল ভেঙ্গে দিলেন।

  • এই অভিনব আইডিয়াটা কী এবং পেলেন কেমন করে?

# পাঁচ মিনিট সময় দিলে বলা যাবে।

  • আরো বেশী সময় লাগলেও আপনাকে দেয়া হবে।

সেদিন যা বলেছিলাম, তার সারসংক্ষেপ – খেলা পাগল আমি সবেমাত্র কলেজে উঠেছি। খেলা বলতে শুধু ফুটবলই বোঝাতো তখন। ৭০ রের শেষ আর ৮০ দশকের সাক্ষীরা জানেন কেমন করে মোহামেডান আর আবাহনী শুধু দেশকে নয়, একটা পরিবারকেও দুভাগ করে ফেলতো তাদের খেলার দিন। সেই দুই দলের ফিরতি খেলা যা প্রথমবারে পন্ড হয়েছিলো তুমুল মারধোরের কারনে। তিন দিন পরে কোরবানীর ঈদ। অতএব, খেলা শেষ করেতই হবে তার আগে। এখানে যেনে রাখা ভালো যে সেই দুই দলের সমর্থকদের আলাদা গ্যালারী ছিলো যার মাঝে বেশ ফাকা জায়গা থাকতো। গ্যালারীতে তিল ধরার জায়গা থাকতো না, তবুও ঐ খালি জায়গায় কাউকে বসতে দেয়া হতনা। কারন একটাই, মারামারি কম হোক। তারপরও তো ইস্টক ছিলোই।

যথারীতি খেলা শুরু হবার আগেই একপশলা ইষ্টক বৃষ্টিপাত হয়ে গেলো। শুরুর পরে রেফারী বেচারা বেশ চাপে থাকতেন। কোন পক্ষই তার পক্ষে থাকেনি কোনদিন। খেলা চলছে খেলা থামছে মাঠে আর গ্যালারীর উত্তেজনার মাঝে। শেষ হলোনা ফিরতি ম্যাচও। রেফারী সাহেব রাত ১১ টায় দিলেন শেষ বাঁশি বাজিয়ে। পুরো স্টেডিয়াম এলাকাটা যেন নরকের রূপ নিলো। দোকান পাট খুব কমই খোলা ছিলো। যা ছিলো, তা আর আস্ত থাকলো না। সাথে রাস্তার লাইট সহ যা ভাঙ্গা যায়, মোটামুটি অন্ধকার হচ্ছে একটু একটু।

গ্যালারী থেকে বের হবার আগেই টের পেলাম আমরা ১৮ জনের দল ছোট হয়ে ২ জনের হয়েছি। অন্যরা কে কোথায় তা জানার কোন উপায় সেযুগে ছিলোনা। চাঁচা আপন প্রাণ বাঁচা অবস্থা। রাস্তায় নেমেই দৌড়ের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করলাম। সাথে পানীয় ফ্রি যা বড় একটা ভাঙ্গা পানীয় সরবরাহ ট্রাক থেকে যে যার মত নিতে পারে। গুলিস্তান এসে দেখলাম ৬ নম্বর বাস ভাইয়েরা হরতাল শুরু করেছেন। স্টেডিয়াম পাড়া মাড়িয়ে আজ কোন বাস আর যাবেনা। রাত একটার দিকে এক রিক্সা ওয়ালাকে হাতে পায়ে ধরে উঠে পরলাম। স্টেডিয়াম এড়িয়ে আসলাম ঠিকই কিন্তু সচিবালয় এলাকা এড়ানোর কোন পথ ছিলোনা। কাছাকাছি যেতেই মোটামুটি নয়, ভালো ভাবেই টনক নড়ে উঠলো। রাস্তা ভর্তি শুধু পুলিশ আর পুলিশ এবং ৪০/৫০ টা রিক্সার লাইন। দুচার জনকে দেখছি পেটানোও হচ্ছে। সব রিক্সাই চেক করা হচ্ছে যা কিছুটা অন্ধকারেও দেখা যাচ্ছে। আমার বন্ধুটি বললো কেটে পরতে। আমার আবার ওর চাইতে বুদ্ধি বেশী। আরে না, আমাদেরতো চোর ছ্যাঁচোর মনে করার কোন কারন নাই। সেকালে জিন্স একেবারে সহজ প্রাপ্তির জিনিষ না যা আমরা পরে আছি। আর সাথে চুলের বাহারি মেলাতো আছেই। আরো বেশি বুদ্ধি দেখালাম, হাতের অবশিষ্ট পানীয়টি রিক্সার সিটের নীচে রেখে দিলাম পুলিশ দেখার আগেই।

“স্যার, ছাত্র পাইছি দুইটা”। আমাদের রিক্সার কাছে এসেই এক পুলিশের চীৎকার। শুধু শুনলাম, “নামা শালাদের”। এর পর শুধু লাঠি আর রাইফেলের বারি। কজন মিলে বা কতক্ষন পিটেয়েছিলো তা কখনো মনে করতে পারিনি। শুধু একটা ফটাস জাতীয় আওয়াজ আজও কানে বাজছে। মোটা একটা বেত (সম্ভবত রাজেন্দ্রপুর থেকে আনা) আমার বা কাধে পরে ভেঙ্গেই গেলো। মনে হয়েছিলো হাতটা আলাদা হয়ে গেছে শরীর থেকে (যা পরে সার্জারি করে ঠিক করতে হয়েছিলো)। দুজন পুলিশ আমাদের দুজনকে টেনে নিচ্ছে স্টেডিয়ামের দিকে। রাস্তায় তাদের বন্ধুরা তাদের হাত জ্বালাই করে নিচ্ছে আমাদের উপরে। আমাদের সহ আরো অনেককেই জড়ো করা হোল ভি, আই, পি গেটের কাছে। একসময় (সম্ভবত ভোর ৪টার দিকে) আমাদের সবাইকে পুলিশের বড় একটা ট্রাকে তোলা হলো। ট্রাকে তুলবার সময় ওরা একটা বিশেষ প্রক্রিয়ায় আসামী সংখ্যা দেয় যা এখানে লিখতে পারছিনা।

একসময় বেশ কয়েকটা ট্রাক ছাড়ল। কোথায় যাচ্ছি, কোন পথে যাচ্ছি, এযেন আমি নতুন এই শহরে। কিছুই মাথায় আসছেনা। কেমন যে বমি বমি লাগছিলো। সাথের বন্দুটিকে শুধু বলেছিলাম, আমার বা হাতে একটা চিমটি দে। চিমটি কী দিয়েছিলো!

আজ আর মনে করতে পারছি না,

মোট পড়েছেনঃ ১৩০৭জনআজ পড়েছেনঃ ০জন

৪৩টি মন্তব্য

  1. বাব্বা এত কিছু রেখে হঠাৎ পুলিশ হবার সখ হলো কেনোরে ভাই।এমনিতেই আমরা পুলিশ আতংকে তার যদি নিজেদের এমন ইচ্ছে থাকে তবেতো দেশত্যাগ হতে হবে।এ কেবল নামের মন্তব্য লেখার মন্তব্যে পড়ে আসছি -{@

  2. আবাহনী মোহামেডান এর খেলা, কি একটা উন্মাদনা গিয়েছে সে সময়,
    ঢাকা স্টেডিয়ামে ২ বার দেখেছি আবাহনী মোহামেডান এর খেলা,
    সতর্কতা হিসেবে মাইর শুরু হলে যেন খুব দ্রুত গেট থেকে বেড় হতে পারি, এমন আসন নিতাম 🙂

    যাই হোক এই মাইর থেকে রক্ষা পাওয়া বা মাইর দেয়ার জন্য পুলিশ হতেই হবে,
    এ ব্যতীত রক্ষা নাই।

    কি লিখলেন পইড়্যা হাসি নাই,
    অট্টহাসি দিছি :D)

    1. আজিবতো! আমাকে পিটিয়ে তক্তা বানালো আর আর আপনি হাসছেন!

      তখনকার দিনে খেলা আর সিনেমা ছাড়া আর কি ই বা ছিলো আমাদের! তবে খেলার মাঠের সেই আনন্দ এখনো মনে জড়িয়ে আছে। আহা।
      আমি কিন্তু এখনো পুলিশদের সাথে সাচ্ছন্দে কথা বলতে পারিনা।

  3. আপনি তো মিয়া লোক বালা না, আমার আগ্রহের সবটুকুই জমিয়ে রাখলেন। আমি আরো চাই এবং তাড়াতারি চাই, নয়ত আবহানী মহামেডান মাইর শুরু হবে কিন্তু ব্লগে, পুলিশ টুলিশ দিয়ে কিছু হবেনা কিন্তু তখন।

    1. পাবারই কথা।
      পুলিশতো আর মানুষ না। এই যেমন খবরের কাগজে লেখে, একজন পুলিশ এবং তিন জন মানুষ মারা গেছে।

      আবাহনী-মোহামেডান আমাদের যা দিয়েছে তা আর কেউ দিতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে। আমাদের দেশের ক্লাব খেলার সেই আমেজ আর নাই এখন।

  4. হা হা হা বৈজ্ঞানিক উপায়ে মানুষ পেটানো? 😀
    মামাদের মুখে অনেক গল্প শুনেছি। তারা নাকি জুতা গলায় ঝুলিয়ে খেলা দেখতে যেতো। বলতো আমাদের বাস রিক্সা ভাড়া বেঁচে যেতো। গুলিস্থান টু মিরপুর কোন ব্যাপারই না, দৌঁড়াইয়া বাসায় চলে আসতাম। রাইতে দৌড় শুরু করে কোন কোন দিন বাসায় ফিরে দেখতাম ভোর হয়ে গেছে। 🙂
    বদলা নিতে চান? নাকি মানুষ পেটানোর মজা? 🙂

    1. এখন সেল ফোন সহ কত কিছু এসেছে, কিন্তু পিটানোর কায়দার কোনই আপগ্রেট নেই। বিজ্ঞান এখানে কিছু না কিছু দিতেই পারে। আমার মত একজন পুলিশ না পেয়ে আজকে আমাদের এই অবস্থা। কত প্লান ছিলো আধুনিক কায়দায় মানুষ পেটাবো, তা আর হোল কই।
      খেলা প্রেমিদের জন্য অতটুকু দৌড় কোন ব্যাপার নাকি।

  5. এত্তদিনে বুঝতে পারলাম, ভিটামিনের কী গুন!!
    সেই আদ্দিকালের এ্যাকশনে এখনও এমন গুছিয়ে লিখতে পারছেন!!
    তা এখন আর খেলে-খুলা দ্যাহেন্না!!

    আপনি এত্ত ঘনঘন ল্যাখেন কী-ভাবে কে জানে!!

    1. সেকি যেইতেই ভাইটামিন, একেবারে ক টু ক্ষ! আর তার গুনেইতো ………।
      ক্রিকেট দেখি সময় সময়। কিন্তু ক্লাব খেলার মজাতো পাওয়া যায় না আর। সবাই দেশের পক্ষে। বিরোধী দল না হলে কি জমে!!

      আমি আইনের মানুষ। কোন ক্রমেই যে ২৪ ঘণ্টায় একটার বেশী লেখা না যায় তা নিয়ে অনেক ব্যাস্ত থাকতে হয়।

    1. পুরানো স্টাইলে আর কত! নতুন কিছু আনতে হবে যাতে এই পেটানো শিল্পের উন্নতি আসে।
      লেখকের জান নিয়ে টানাটানি আর আপনি পেলেন মজা!!

      পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

  6. এই পোষ্ট ঢাকা থাকতেই পড়ছিলাম। কিন্তু সময়ের কারনে মন্তব্য দিতে পারিনি। পুলিশ হইবেন পিটানোর লাইগ্গা ;?
    তাও বৈজ্ঞানিক উপায়ে! ভাবতে হইবে। তবে এটা ঠিক রাস্তায় নামলে পুলিশের আচরন দেখে লজ্জাই লাগে। উনি তো আমাকেই থামিয়ে রাখে। মাথায় আমার রাগ উঠেই থাকে কখন যে কি বলে বসি এই ভয়ে। বিশেষ করে নিচু শ্রেনীর গুলোকে দেখি রাস্তায় দেদারসে বিড়ি ফুকছে দেখে গা জলে আমার। ট্রাফিক পুলিশের কথা আর নাই বললাম। কিছু সার্জেন্টের বউদের দেখি ৭০ লাখ টাকা দামের গাড়িতে চড়ে। কি তাদের ফুটানি :@
    ইচ্ছে পূরণ হোক।

  7. দেরী করার জন্য দুক্ষিত। আশা করি এই লেখাটা ব্যক্তিগত ভাবে নিচ্ছেন না।

    আমার মনে অনেক শাখার কর্মচারীদের মতোই পুলিশেরও কর্ম দক্ষতা বা সঠিক প্রশিক্ষন নেই। নেই কোন জবাবদিহীতা। অতএব, যাহা ইচ্ছেই করছে তারা।

    ভালো থাকুন।

  8. ভাইয়া আপনি বেঁচে আছেন কিনা তা প্রমাণের জন্যে একটা চিমটি দিতে চাই। অনলাইনে তো দেখি আপনাকে প্রায়ই, সে আপনি নাকি আপনার ভূত, নাকি পুলিশ ভূত তাও প্রমাণ লাগবে।
    আপনিই একমাত্র সোনেলার কবি, সে যদি কবিতা না লেখে তাইলে ক্যাম্নে চলে!
    লেখালেখি নিয়ে ফিরে আসুন প্লিজ। আজই, এখনই।

    1. বাহ, এতো পুরানো লেখা পড়েছেন! অনেক অনেক ধন্যবাদ।

      একটা রাতই ছিলাম। দু’চারজনকে রেখে সবাইওকে ছেড়ে দিয়াছিলো।
      তবে ঈদের নামাজ পরা হয়নি সেবার। হাসপাতালে ছিলাম বেশ কদিন।

    2. পুলিশের ঠেঙ্গানি খাওয়ার দুর্লভ অভিজ্ঞতা এখনো হয়নি আমার, মাঝ মাঝে আফসোস হয় 😀

      আচ্ছা পিচ্ছি ব্লগার লেখার রসদ নিয়া আইল তবু আর লেখা হইল না ক্যান আপনার?

      আপনার পুরোনো লেখার লিঙ্ক দিয়াছিলেন শ্রদ্ধা ভাজন হেলাল ভাই।

মন্তব্য করতে লগিন করুন অথবা নিবন্ধন করুন।