মূল লেখায় যান

মৃত্যুর কাছাকাছি

নাসির সারওয়ারএকান্ত অনুভূতি৩৫টি মন্তব্য

 

প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতেই আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু তার যে একটা কদর্য রূপও আছে, তা আমরা দেখতে চাই না। দেখাতো দূরের কথা আমরা তা নিয়ে কথা বলতে বা শুনতেও চাইনা। তারপরও দেখতে হয়, শুনতে হয়। এটাই প্রকৃতির নিয়ম যা আমরা ইচ্ছে করলেও এড়িয়ে যেতে পারিনা। বৃষ্টির দিকে থাকিয়ে আনন্দে দেহ মন ভেজাবো। তবে ঝড় এলেই পাখিদের মত ডানা ঝাঁপটিয়ে কোথাও নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নেবো। সমুদ্রের জলে খেলা-আনন্দে নিজেকে ডুবিয়ে দেবো। কিন্তু বন্যার পানি থেকে শত হাত দুরে থাকবো। আরও কত না সৌন্দর্য-ভয়ঙ্কর রূপে প্রকৃতি আমাদের নিয়ে খেলা করে। সময়ে অসময়ে আমাদের তার হরেক রূপের ধরণ মনে করিয়ে দেয়। আনন্দের সাথে একটু কষ্টের ভাগও নাও।

বাড়ির পাশে বড় রাস্তা। তার ওপারেই আমাদের একটা আড্ডাখানা আছে। ছোটবেলার স্কুলের সাথীদের নিয়ে দুয়েক মাসে একটা আড্ডা। প্রধান বিষয় বস্তু, ছোটবেলার মজার গল্পে হাসির রোল আর সাথে খানাপিনা দিয়েই সামাজিক দায় দায়িত্ব শেষ করা। এক রোজার দিনে ইফতারির আয়োজন। আড্ডাবাজিই যে প্রধান উদ্দেশ্য তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। যার যার যা মন চায়, নিয়ে হাজির। একজন নিজের গাছের দুটো ঢাউস আকারের কাঁঠাল এনে গলা ফাটিয়ে ফেলার অবস্থা করে ফেলছে। “এতো বড় কাঁঠাল অন্য কোন গাছে জন্মাতেই পারেনা”। আহা, কি আড্ডাবাজি সাথে সেই সব শৈশবের মধু মাখা গল্প। কে উঠতে চায়, তবুও উঠতে হয়। কোন মতে ইফতারি শেষ করেই বিশেষ তাগিতে উঠতেই হলো।

বড় রাস্তাটা পার হতেই পরলাম এক মহা বিপদের মুখে। হঠাৎ প্রকৃতি তার ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে হাজির হলো মুহূর্তের মধ্যে। কথা নাই বার্তা নেই প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাস। এতোটুকু বয়সে এরকম তড়িৎ বেগে প্রকৃতির চোখ উলটানো কী কখনো দেখেছি! চারিদিকে কত কী যে উড়ে বেড়াচ্ছে, তা দেখার সময় কোথায় আমার! আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিনা আবার হাঁটতেও পারছি না। মনে হচ্ছে এবার আমার আকাশে উড়ার শখ মিটে যাবে। আট দশ হাত দুরে একটা পুলিশ বক্স। নাহ, অতটুকুও যাওয়া হচ্ছে না। ডান পাশে একটা দেয়াল, কোনমতে নিজেকে টেনেটুনে নিয়ে পাশে দাঁড়ালাম আর তিন চারজনের সাথে। অপেক্ষা শুরু,এ তাণ্ডব কখন শেষ হবে।

চোখ থাকিতে অন্ধ কথাটার ভালোই প্রয়োগ দেখছি। চশমার ফাঁকা দিয়ে চোখে ডালপালা, ইষ্টক পাথর সবই ঢুকে পরছে। আশেপাশে কী হচ্ছে দেখার উপায়ও নাই। তারপরও চোখ খুলে যায় অবচেতন মনে। বিড়াল হলে হয়তো দেয়ালটাকে খামচে ধরা যেতো। কারণ দাঁড়িয়ে থাকাটা বেশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। পাশে কেউ একজন জোড়ে চিৎকার করে তার মা কে ডাকছে। অন্য একজন আজান দিচ্ছে। আরেকজন তার ঈশ্বরের নাম জপছে। কী আকুতি সেই ডাকে। এ এক ভয়ঙ্কর অন্ধকারের দৃশ্য। পাশের দেয়ালটা যেন আর দেয়াল নয়। সাপের ফণার মত ফোঁসফোঁস করছে। এ যেন ভয়ংকর এক নৃত্য যার শেষ হবে তার বিষ ছড়িয়ে দিয়ে। তাহলে এইই কী শেষ! পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখার কত কী বাকী রয়ে গেলো। আর কী তা দেখা হবেনা! আমিতো এই সৌন্দর্য দেখতে দেখতে বড় অভ্যস্ত হয়ে গেছি। যে প্রকৃতির রূপকে ভালবেসে এতোটুকু পথ চলে আসলাম, সেই প্রকৃতিই কী না আমাকে অন্ধকার এবং ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখিয়েই নিয়ে যাবে! আমি যেতে চাই না। আমার ভালবাসার মানুষগুলো ছেড়ে যেতে চাই না।

একসময় ঘুম ভাঙল সাদা আকাশের নীচে। আকাশ তো নীল হবার কথা। অথচ চারিদিকের বেড়াগুলো নীল রঙের। স্বপ্ন দেখছি কী না যাচাইয়ের জন্য চিমটি কাটতে চাইলাম। হাত দুটো ভারি অলস, নড়তে চাচ্ছে না। নড়বেই বা কি করে। হাত সহ সারা শরীরটাকেই তো মমি বানিয়ে রেখেছে কারা যেন। মনে পড়ছে না আমি এখানে এলাম কী করে। একসময় একজন সবুজ পোশাকধারী নারী এলেন হাসি মুখের অভিনয় নিয়ে। নাহ, ভালো অভিনেত্রী সে নয়। খেই হাড়িয়ে বলে ফেললেন, “ঈশ্বর মহান”।

হাতিয়ে বেড়াচ্ছি নিউরনেরা কে কোথায় কেমন আছে। আরে, এইতো, এইতো মস্তিষ্ক কাজ করছে। অন্ধকার দৃশ্য ভেসে বেড়াচ্ছে। দেয়ালটা সাপের মত ফণা তোলেনি, সমুদ্রের ঢেউ তুলেছিল। আর সেই ঢেউ এসে একসময় আমার উপড়ে আছড়ে পড়লো। আমার সাথে আরও কয়েকজন মিলে সেই ঢেউয়ের নীচে পড়ে রইলাম। পরক্ষণেই দেখি পাশে দুটো খোলা চোখ নিস্পলক ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। সেই চোখ দুটো করুন ভাবেই আমাকে যেন কী জিগ্যেস করেছিলো। আমিতো চোখের ভাষা পড়তে জানি। কী যেন বলেছিল,

ও হ্যাঁ, মনে পরেছে,“আমি কি বেঁচে গেছি”?

 

ছবিঃ নেট থেকে নেয়া

কিছু তথ্যঃ নেট সংযোগ

১) ঝড়ে দেয়াল ধ্বসে বাড্ডায় তিন জনের মৃত্যু 

২) ঝড়ে রাজধানীতে ৩ জনের মৃত্যু আহত ১৬  

৩) সোনেলা ব্লগে পোষ্ট : ব্লগার নাসির সারওয়ার আহতাবস্থায় চিকিৎসাধীন

 

মোট পড়েছেনঃ ১৩৩৯জনআজ পড়েছেনঃ ০জন

৩৫টি মন্তব্য

  1. প্রকৃতির রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে
    ভয়াল রূপের কথা বর্ণনা দিলেন।
    লোম শিহরিয়ে উঠল।
    লিখতে পারেন ভাল
    তাই তো জানা হল।
    ভাল থাকবেন। শুভ কামনা।

      1. হা হা হা
        আপনার লেখার প্রথম পাঠক ও মন্তব্য কারী
        হিসেবে বলছি ভালই লিখলেন মাইরী।
        চালিয়ে যান। শুভ কামনা।
        ও করের খোলা চিঠিতে আসবেন বলছিলেন
        অপেক্ষায় আছি।

  2. সেদিনের কথা ভুলতে পারিনা, বাতাশের গর্জন সাথে মানুষের আতংকিত দৌড় যাপ, সেদিন রাতেই নিউজে দেখলাম বাড্ডায় দেওয়াল ধসে কয়েকজন নিহত এবং আহত।
    পরে খবর পেলাম আপনিও ছিলেন এবং ভাগ্যবলে বেঁচে গেছেন, আলহামদুলিল্লাহ, এ ছিলো সবচেয়ে বড় পাওয়া।

    ভাইজান আপনি আরও দীর্ঘায়ু পান সবসময় এই দোয়া।

    1. হ্যা। মনে থাকার মতই ঝড় ছিলো সেদিন। ভালো একজন বন্ধু অনেকের সাথে শেয়ার করেছিলো যা হাসপাতালে শুয়ে দেখেছিলাম।
      আল্লাহ্‌ কৃপা করেছেন।

      অনেক ধন্যবাদ আপনার আশীর্বাদের জন্য।
      ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

  3. বিধাতা রক্ষা করেছেন আপনাকে। এমন বিপদ থেকে বেঁচে ফেরা সত্যি লোমহর্ষক ঘটনা। আপনার দীর্ঘায়ু কামনা করছি। নিরাপদে থাকুন সুস্থ থাকুন শুভকামনা অবিরাম

    1. আল্লাহ মহান। সব প্রশংসা তার জন্যই রইলো। ৫ জনের দু জন ওখানেই মারা গেলো। আর একজন হাসপাতালে যেতে যেতে মারা গেলো।

      আপনার আশীর্বাদ অনেক ধন্যবাদের সাথে রেখে দিলাম। ভালো থাকুন।

  4. আল্লাহ পাক চাইলেই সব পারেন।কাউকে বাঁচিয়ে রাখেন বা দেন, আবার কাউকে মৃত্যুর পথে পাঠান।আপনার হায়াত তিনি বেশী দিয়েছেন, এবং তিনি বাঁচিয়ে দিয়েছেন,আলহামদুলিল্লাহ।
    কেউ আগে, কেউ পরে,তবে সেই পথে সবাইকেই একদিন যেতে হবে এটাই চির সত্য।দুঃখজনক ঘটনাবলী একান্ত নিজের মত সুন্দর উপস্থাপন করেছেন।দীর্ঘ জীবি হন,সুন্দর লেখা উপহার দিন।আমরা পড়ার সুযোগ পাই।ভাল থাকুন।

    1. আল্লাহ্‌ পাক সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করেন। আমরা শুধু বেঁচে থাকার আদম্য চেষ্টা নিয়ে ব্যস্থ থাকি।

      ভালো একটা মন্তব্য আর আশীর্বাদ অনেক ভালো ভাবেই নিয়ে নিলাম। চেষ্টা করবো মাঝে মাঝে লিখতে। তবে আমি কিন্তু লেখক নই। নিজের কিছু কথাবার্তা শেয়ার করি মাত্র।

      ভালো থাকুন।

  5. জীবনের এ ও এক রূপ, কাছে থেকে দেখা, এটি সবার দেখা হয় না, আপনার সাথের তিনজন
    দেখতে পায়নি। এ বর্ধিত নূতন জীবন আপনার জন্য আল্লাহর আশীর্বাদ হিসেবেই নিচ্ছি।
    বাকীটুকুও টুপ করে লিখে ফেলুন। আমারা পরে একটু জানি, কী করিলে কেমন লাগে।

    1. এ রূপ না দেখাই ভালো। দুঃস্বপ্নের মতো সাথে বেড়াচ্ছে।
      আল্লাহ্‌ মহান।
      পাশের ১৬/১৭ বছরের ছোটখাট যুবকটির যে ওখানে মোজা বিক্রি করতো। তার মা কে খুঁজে পেয়েছিলাম। না, কোন সান্ত্বনা বাণী শোনাবার জন্য নয়। শুধু বলেছিলাম, “আপনার ছেলেটাকে বাঁচাতে কোন সুযোগই পাইনি। মাফ করে দেবেন”।

      কিছু লেখা আছে ছাপাখা্নায়। আসলেই পেয়ে যাবেন।

  6. প্রাকৃতিক বিপর্যয় যতোই ভয়াবহ হোক না কেনো আমি উপভোগ করি প্রাকৃতিক সৌর্ন্দয্যের মতোই। ১৯৯৫ আমি দু-আড়াই বছরের। প্রচণ্ড বর্ষনে যখন আমাদের মাটির প্রাচীরটা ভেঙ্গে পড়লো আমার সে কী আনন্দ। লাফিয়ে লাফিয়ে হাত তালি দিয়ে উঠছিলা ( মা বলেন)। সবাই যখন নিরাপদ আশ্রয় ছুটছেন আমি তখন মায়ের হাত ছাড়িয়ে বন্যার পানিতে নেমে খবখা অবস্থা। এই যে ঝর, বন্যা আমার খুর ভালো লাগে। সেবার বড়মা দের ঘরের টিনগুলো উড়িয়ে নিলো কালবৈশাখীর ঝর সবাই যখন হাহাকার করছিল আমি তখনও…

    1. আপনি অনেক শক্তপোক্ত মানুষ। প্রাকৃতি আমাকে অনেক টানে, তাই বলে তার ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে আমি রাজি না। বিশেষ করে যা নিজে দেখেছি, তা আর কোন দিনই দেখতে চাইবো না।
      ভালো থাকুন। ঝড় বন্যা সহ সব ঝঞ্জাল উপভোগ করুন।

    1. সে এক বিশাল অভিজ্ঞতা যা কাউকে যেন পেতে না হয়।
      অবশ্যই প্রকৃতির সাথে আমরা অনেক বিদ্রুপ করি। আর তারই প্রতিবাদ করে বসে সে মাঝে মাঝে।
      ভালো থাকুন।

  7. মানুষ তো বোঝে না, প্রকৃতির নিষ্ঠুর, অমোঘ রূপ। অথচ অবলীলায় প্রকৃতির কতো ক্ষতি করি। গাছ লাগাই, পরিবেশ বাঁচাই। প্রকৃতি নিজের নিয়মেই সব।কিছু বুঝিয়ে দেয়।

  8. প্রকৃতির কাছে আমরা অসহায়। আপনার সাথে সম্পৃক্ত বিপদজনক এই দুর্ঘটনাটি আমি সেদিনই জিসান ভাইয়ের কাছ থেকে জেনেছিলাম। আল্লাহ দয়াময়, আপনি ভালো আছেন জেনে সেদিন শুকরিয়া আদায় করেছিলাম ভাইজান। আজ এই লেখা পোষ্ট না হলে আপনি হয়তো এসব জানতেই পারতেন না।

    ভালো থাকুন ভাই। শুভকামনা সবসময়।

    1. উপরে কোন একটা মন্তব্যে আমি আমার প্রিয় একজন বন্ধুর কথা বলেছি। আমি জানি সে অনেকের সাথেই শেয়ার করেছে। সবার দোয়ায় আল্লাহ বাচিয়ে রেখেছেন।

      ভালো থাকুন।

  9. প্রকৃতি আমাদের আনন্দ দেয়, আবার ভয়ংকর বিপদেও ফেলে।
    যে সমুদ্রের নোনা জলে আমরা লাফালাফি করি আনন্দে, সমুদ্র আমাদের আনন্দ দেয়।
    সে সমুদ্রই আবার ডুবিয়ে তছনছ করে দেয় জনপদ।

    আল্লাহ্‌র অসীম কৃপায় আপনি আজ আমাদের মাঝে। একই দেয়ালের নীচে চাপা পরে তিনজন আজ অন্য জগতে।
    ঢাকায় ছিলাম ঐ দিন। কত ভয়ঙ্কর বেগে বাতাস বয়েছিল তা এখনো মনে আছে।
    স্মৃতিটা সামনে এনে দিলেন সুন্দর উপস্থাপনায়।

    শুভ কামনা সব সময়ের জন্য।

    1. হ্যা। প্রকৃতি আমাদের আনন্দের সাথে অল্প কিছু বেদনাও দেয়।
      এরকম ঝড়ের মাঝে কেউ যেন আর না পরে।

      একজন ভালোবাসার বন্ধু হাসপাতালে এসেছিলেন। অনেক আপ্লুতের সাথে ভালো লাগার ক্ষন ছিলো তা।

      ভালো থাকবেন আপনিও।

মন্তব্য করতে লগিন করুন অথবা নিবন্ধন করুন।