মূল লেখায় যান

দুর্লভ পাখি কাস্তেচরা

শামীম চৌধুরীপরিবেশ৩০টি মন্তব্য

মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ। খোলা আকাশের নিচে হাঁটছি। বেশ ক্লান্ত। বিশ্রামের জন্য বাইক্কা বিলের টাওয়ারে উঠে বসে আছি। টাওয়ারের সামনে অল্প পানিতে পদ্মপাতা ভেসে আছে। সেই পাতার নিচে খুঁজে খুঁজে শৈবাল খাচ্ছে জলচর পাখি।। এমন সময় পাখির একটি ঝাঁক এসে বসলো জলজ উদ্ভিদের উপর। পাখিগুলো দেখে প্রথমে ভেবেছিলাম বক জাতীয় পাখি। পরে এই পাখির পরিচয় জানতে পারি। এদের নাম ‘কাস্তেচরা’। অনেকেই মনে করেন এরা পরিযায়ী পাখি। আসলে এরা পরিযায়ী নয়। আমাদের দেশের দুর্লভ পাখি।

কাস্তেচরা Threskionis পরিবারের অন্তর্ভূক্ত মাঝারি আকারের ৭৫ সেমি দৈর্ঘ্যের জলচর পাখি। বয়স্ক পাখির মাথা ও ঘাড় পালকহীন। ঠোঁট নিচে বাঁকানো ও কালো রঙের। মাথা ও ঘাড় ছাড়া দেহ সাদা। ঘাড়ের গোড়ায় কিছু পালক ঝুলে থাকতে দেখা যায়। ডানা সাদা-ঢাকনিতে ধুসর আভা। বুকে হলুদ আভা। অনেক সময় কাঁধে সাদা পালক থাকে। ঘাড় নীলচে কালো। চোখ লাল বাদামী। পা লম্বা। পায়ের পাতা কুচকুচে কালো। প্রজননের সময় পুরুষ পাখির ঘাড়ে পালকে সজ্জিত থাকে। পুরুষ ও মেয়ে পাখির চেহারায় ভিন্নতা আছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথা ও ঘাড়ের নিচের অংশ কালো ও নরম পালক থাকে। ঘাড়ের সামনের অংশ সাদা।

কাস্তেচরা জলাভূমি, নদী, তৃণভূমি, ধানক্ষেত, কাদাচরা ও উপকূলের জোয়ার-ভাটার খাঁড়িতে বিচরণ করে। এরা সচরাচর দল বেঁধে থাকে। একেকটি ঝাঁকে অন্তত ২০০-২৫০ পাখি দেখা যায়। কাদা বালু ও অগভীর পানিতে ঠোঁট ঢুকিয়ে এরা খাবার খুঁজে খায়।  মাছ, ব্যাঙ, ছোট শামুক, কেঁচো, শৈবাল এদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে। শীত মৌসুমে এরা নীরব থাকে, কিন্তু গরমের সময় ঘোঁত ঘোঁত শব্দ করে ডাকে। ওড়ার সময় এরা বকের মত গলা ভাঁজ করে না।

জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত এদের প্রজনন সময়। প্রজননকালে বক ও পানকৌড়ির সঙ্গে মিশে যায়। পানির ধারে জলমগ্ন গাছে কিংবা গ্রামের কুঞ্জবনে ডালপালা দিয়ে ছোট মাচার মত বাসা বানায়। নিজেদের বানানো বাসায় মেয়ে পাখিটি ২-৪টি সাদা ডিম পাড়ে। ২০-২৫ দিনের মাথায় ডিম থেকে বাচ্চা ফোটে। মা-বাবা উভয়েই বাচ্চা লালন-পালন করে।

কাস্তেচরা আমাদের দেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি। শীত মৌসুমে বরিশাল, হাতিয়ার নিঝুমদ্বীপ, মহেশখালীর সোনাদিয়া দ্বীপ, শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিল, টাঙ্গুয়ার হাওর, রাজশাহীর পদ্মার চর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ভোলায় দেখা যায়। এ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমারসহ এশিয়ার অনেক দেশেই এদের বিচরণ রয়েছে। বিশ্বে ৫ প্রজাতির কাস্তেচরা আছে। কিন্তু আমাদের দেশে এক প্রজাতি দেখা যায়।

বাংলা নাম: কাস্তেচরা

ইংরেজি নাম: Black-headed Ibis

বৈজ্ঞানিক নাম: Threskionis melanocephalus

ছবিগুলো হাতিয়ার নিঝুমদ্বীপের দমারচর  ও ভারতের ভরতপুর থেকে তোলা।

মোট পড়েছেনঃ ১৪৯৯জনআজ পড়েছেনঃ ০জন

৩০টি মন্তব্য

  1. অনেকদিন পর পাখি নিয়ে বিস্তারিত লিখতে শুরু করলেন দেখে খুব ভালো লাগলো, কাস্তেচরা যে আমাদের দেশিয় দূর্লভ পাখি তা আজ জানলাম।
    পোস্টটির জন্য ধন্যবাদ ভাই।

    1. আসলে ভ্রমন কাহিনীতে অনেক সময় গিয়েছে। যার জন্য পাখি নিয়ে বিশদ লেখার সুযোগ ও সময় হয়ে উঠে নি। যে পাখিগুলি ভ্রমন কাহিনীতে দেখেছেন সেগুলি নিয়ে ভাবছি বিস্তারিত লিখবো।
      ধন্যবাদ ভাই সঙ্গে থাকার জন্য।

  2. অনেকদিন পর পাখি নিয়ে বিস্তারিত লেখনী।
    খুবি সুন্দর পরিবেশে তাদের বিচরণ।
    বিশ্বে ৫ প্রজাতির কাস্তেচরা আছে। কিন্তু আমাদের দেশে এক প্রজাতি দেখা যায়। বিলুপ্তপ্রায় মনে হয়?
    .
    খুবি ভালো লাগলো,দাদা।

    1. সত্যি কথা কি দাদাভাই, ভ্রমন কাহিনী নিয়ে সময় দিতে হয়েছিল। গল্পটি শেষ হওয়ায় এখন সময় পাচ্ছি। তাই আবার শুরু করলাম পাখি পরিচিতি।
      ধন্যবাদ সঙ্গে থাকার জন্য।

  3. পাখিগুলো দেখে প্রথমে ভেবেছিলাম বক জাতীয় পাখি। মাছ শিখারে ব্যস্ত যেমন দেখি খালে বিলে
    পাশের গ্রামের নদীর তীরে।
    আপনার থেকে জানতে পারলাম পাখির নাম ‘কাস্তেচরা’।
    ভাল লাগলো। শুভ কামনা।

  4. কাস্তেচরা পাখি নিয়ে বিশদভাবে জানানোর জন্য অফুরন্ত কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ ভাইয়া। পাখিটিকে আমার খুব ভালো লেগেছে অবশ্য পাখি আমার খুব প্রিয় প্রাণীদের মধ্যে। এরা পরিযায়ী নয় দুর্লভ পাখি আমাদের দেশের এটা শুনে ভালো লাগার পাশাপাশি মনটা খারাপ হয়ে গেল দুর্লভ বলে। যেভাবে বনাঞ্চল উজাড় হচ্ছে, অভয়ারণ্য নষ্ট করা হচ্ছে তাতে এমনটা হওয়াটাই স্বাভাবিক। শুভ কামনা রইলো অফুরন্ত

    1. দিদিভাই.
      ভরতপুরে যে পাখিগুলি পেয়েছিলাম ভাবছি এই পাখিগুলি নিয়ে পাখির পরিচিতি তুলে ধরবো। তাতে পাঠকরা অনেক অজানা তথ্য জানতে পারবেন। আর তাদের জানানোটা আমার কর্তব্য। এরা দূর্লভ হয়ে শুধুমাত্র উচু উচু গাছ নিধনের জন্য। সত্যিই বলেছেন আপনি। আর পাখি ও ফুল কার না ভাল লাগে।
      শুভ কামনা রইলো।

  5. টুকিটাকি ছবি উঠানোর চেষ্টা করি বলে ক্যামেরা হাতে থাকলে পাখিদের খুঁজে বেড়ায় আমার চোখ। এই কাস্তেচড়া পাখিটা এখনো আমার চোখে পড়েনি। আপনার এমন পোষ্টগুলো পড়ে পাখিদের সম্পর্কে অনেক জানা হচ্ছে ভাই………শুভ সকাল।

    1. কামাল ভাই,
      কাস্তেচরা দেখতে হরে হাওর বা বিলে যেতে হবে। মার্চ থেকে এপ্রিল মাস এদের দেখা পাবেন। যদি দেখতেই মন চায় তবে এই সময়ে বাইক্কা বিল বা টাঙ্গুয়ার হাওর বা নিঝুম দ্বীপে চলে যেতে পারেন।

  6. আমিতো প্রথমে বক ভেবেছিলাম। আমাদের গ্রামে কালো বক দেখেছি। কিন্তু এখন দেখছি এ পাখিটির নাম কাস্তেচরা। খুব সুন্দর পাখি। উড়ন্ত অবস্থায় বেশি ভালো দেখতে।
    ধন্যবাদ ভাইয়া সুন্দর সুন্দর ছবি এবং বিস্তারিত জানানোর জন্য।

    1. আপনি ঠিকই বলেছেন। ব্ল্যাক বিটার্ন বা কালো বক এখনও গ্রামের পুকুর ধারে ও ঝোপে দেখা যায়। প্রচুর মাছখেঁকো পাখি। কাস্তেচরা লোকালয়ে আসে না। এরা হাওড় বিল ও উপকূলীয় পাখি। তাই দেখা হয়নি কখনো।
      অনেক ধন্যবাদ সুন্দর মন্তব্য দেবার জন্য।

মন্তব্য করতে লগিন করুন অথবা নিবন্ধন করুন।