বিশ্বাসে/অন্ধ বিশ্বাসে আমরা প্রতিনিয়ত কত রকম নিয়মের নামে অ-নিয়ম গুলো ধারণ করে বাঁচি তার খবর নিজেরাও রাখি না। কখনো ধর্মের নামে, কখনো শিক্ষার নাম দিয়ে আবার কখনো প্রচলিত সামাজিক সংস্কৃতির নামে পালন করে যাই যত কর্মকাণ্ড। বংশ পরম্পরার মাঝেও রাখা থাকে নিয়মের নামে নানাবিধ অ-নিয়ম। এই নিয়ম গুলোই এক এক সময় পরিনত হয় সংস্কার বা কু-সংস্কারে। এই কু-সংস্কার গুলো ছড়িয়ে পড়ে মানুষ হতে মানুষে। কিছু কিছু ব্যাপার মানুষ মেনে নেয় নিজ থেকেই। আর কিছু চাপিয়ে দেওয়া হয় জোর করে। আমাদের সমাজে কত রকম কু-সংস্কার ছড়িয়ে আছে তার সঠিক ধারনা পাওয়া রীতিমত অসম্ভব। কু-সংস্কার এমনই একটি বিষয় যা কিনা যেকোনো মানুষের যেকোনো মুহূর্তের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দিতে সক্ষম। দৈব্যযোগ বা কাকতালীয় ভাবে যদি একটি অপরটির সাথে মিলে যায় তবে বিজ্ঞানের যুক্তি প্রতিষ্ঠা করা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

জানা-শোনা কিছু ঘটানার উল্লেখ করছি। কোনোটির ব্যাখ্যা আছে। আর কোনোটির ব্যাখ্যা পাঠক দিতে পারবে বলে মনে করি।

ঘটনা ১ঃ  দশ/এগারো বছরের এক মেয়ে শীতের ছুটিতে, গ্রামে দাদীর বাড়ি বেড়াতে গেছে। সাথে মা, ভাইবোন। দাদী, ফুফুরা অনেক আদর করেন। সন্ধ্যাবেলা দাদী নিজ হাতে পিঠা বানাতে বসলেন। মা আর ফুফু সাহায্য করছিলেন। মেয়েটির তর সইছিলো না, সে পিঠা খেতে চাইলো। দাদী বললেন, এখন না বুবু একটু পরে তোমাকে দিবো। আগে “তেনাদের”পাঁচ টি পিঠা দিতে হবে।তার পর আমরা সবাই খেতে পারবো। মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো কাদের কথা বলছেন দাদী? দাদী বললেন, রাতের বেলায় তাদের নাম নিতে নেই। পিঠা বানালে অবশ্যই আগে তাদের দিতে হয় নয়তো বাড়িতে অমঙ্গল হয়। দাদী তেলে ভাজা পাঁচটি পিঠা একটি থালায় রেখে ফুফুকে বললেন উঠোনের মাঝখানে রেখে আসতে। ফুফু গিয়ে রেখে আসলো। মেয়েটির মাথায় তখন দুষ্টুবুদ্ধি। সে স্কুলে পড়েছে ভুত বলতে পৃথিবীতে কিছু নেই, সব মানুষের কল্পনা ও ভুল ধারনা। সে তখন চুপিচুপি গিয়ে পিঠার থালাটি এনে ঘরের মাঝে লুকিয়ে রাখলো। কেউ তা খেয়াল করলো না। রাতের খাওয়া শেষে সবাই ঘুমিয়ে পড়লো। শেষরাতে মেয়েটির ঘুম ভেংগে গেলো অনেক মানুষের চিৎকার আর হৈচৈ শুনে। বিছানা থেকে উঠে দেখে তার দাদী বাড়িতে দুর্ধর্ষ চুরি হয়েছে। সিঁদ কেটে ঘরে ঢুকে চোর যা পেয়েছে সব নিয়ে গেছে।  মেয়েটি বসে ভাবতে লাগলো “এটাকি পিঠা লুকানোর ফল”?

ঘটনা ২ঃ  দশম শ্রেনীতে পড়ুয়া এক মেয়ে স্কুল ছুটি শেষে বান্ধবীদের সাথে বাড়ি ফিরছিলো।পথ আগলে দাঁড়ালো মাথা ভর্তি চুলওয়ালা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক তরুন। হাতে লাল টুকটুকে কাঁটা সহ গোলাপ।এর আগেও সে মেয়েটির কাছে কয়েকবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। তাতে সে মোটেও নিরাশ হয়নি। শেষবারের মত আবার এসেছে।
* তোমাকে ভালোবাসি। ফিরিয়ে দিওনা। ফুল টা নাও প্লিজ। তা না হলে তোমার সামনেই আত্মহত্যা করবো।
** আপনি আবার এসেছেন? আপনার আত্মসম্মান বলে কিছু নেই? পথ ছাড়ুন, নয়তো আপনার বাবা ও মায়ের কাছে নালিশ করবো।
* তুমি আমায় এভাবে অপমান করলে!!যাও তোমাকে অভিশাপ দিলাম,তোমার কোনোদিন বিয়ে হবেনা। তুমি আজীবন চিরকুমারী হয়ে থাকবে।
** দাঁড়ান, আমি কোনো কিছু ফ্রিতে নেই না। আমিও আপনাকে অভিশাপ দিচ্ছি, আপনি গরুর রাখাল হবেন। সারা জীবন গরুর চড়াবেন।
তাদের দেখা হয়েছিল, ঐ ঘটনার একুশ বছর পর। মেয়েটি তখন তিন বাচ্চার মা। এক কোরবানীর ঈদে রাস্তা দিয়ে হেটে যাওয়ার সময় পিছু ডেকে ছিলো এক টেকো লোক। মেয়েটি দাঁড়িয়ে ছিলো পিছু ডাকে। সাড়া মুখে হাসি ছড়িয়ে বলে উঠেছিল সেই অপরিচিত মুখ,”তোমার অভিশাপ আজ আমাকে সত্যিই গরুর রাখাল বানিয়েছে।এবার ঈদে পনেরোটা গরু বিক্রি করেছি”।

ঘটনা ৩ঃ আঠারো বছরের মেয়েটি সাত ঘন্টা ধরে যন্ত্রনায় ছটফট করছে। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পৌছে স্মরণ করে যাচ্ছে সৃষ্টিকর্তাকে। দাই বসে আছেন পাশেই। আরো কিছু নিকট আত্মীয়ারাও আছেন এখানে। তারা বিভিন্ন দোয়া-দুরুদ পাঠ করে মেয়েটির দেহে, মাথায় ফু দিচ্ছেন। কিন্তু তেমন কাজ হচ্ছে না। বয়স্কা একজন জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি কখনো এলোচুলে ঘুরে বেড়িয়েছো? মেয়েটি উত্তর দিলো, হ্যা। মাঝে মাঝে মাথার ঘোমটা খুলে যেতো। বয়স্করা শুনে চোখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন। মেয়েটির স্বামীকে আতুর ঘরে ডেকে পাঠালেন। স্বামী এলে তাকে বলা হলো, একগ্লাস পরিস্কার পানিতে তার দু-পায়ের বুড়ো আংগুল গুলো ডুবিয়ে ধুয়ে সেই আংগুল ধোয়া পানি সহ গ্লাস টি দিতে হবে। স্বামী ঠিকমত কাজটি করে পানিটা ভেতরে পাঠিয়ে দিলেন। এবার মেয়েটিকে বলা হলো বিসমিল্লাহ বলে এক নিঃশ্বাসে পানিটা পান করতে হবে, তাহলে তার পাপ দূর হয় যাবে ও সন্তান প্রসব করা সহজ হয়ে যাবে। কারণ এলোচুলে ঘোরাঘুরি করে অনেক পাপ করেছে বলেই এত কষ্ট করতে হচ্ছে। ততক্ষণে মেয়েটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, মরে যাবে তবুও এই কু-সংস্কার সে মেনে নিবে না। তার ঠিক পাঁচ মিনিট পরেই মেয়েটি অপূর্ব সুন্দর এক কন্যা শিশুর জন্ম দিলো। মেয়েটির সকল কষ্ট, অপমান,পাপ থেকে সে মুক্তি নিলো সেদিন থেকেই।

ঘটনা ৪ঃ রোকন মিয়ার পাঁচটি মেয়ে। তার প্রয়োজন একটি ছেলের। ছেলের কামাই(আয়-রোজগার)খেতে ছেলে চান না তিনি, কবরে মাটি দেওয়ার জন্যে একটি ছেলে চান। ছেলে পাওয়ার জন্যে কত কিছুই না করেছেন।এক বছর টানা রোজা রেখেছেন। রাতের বেলা বাঁশ বাগানে গিয়ে বাঁশ কেটে এনে সেই বাশেঁর তৈরী পাত্রতে পানি পান করেছেন দিনের পরদিন। হুজুরের কথামত প্রতি শুক্রবার মসজিদে মিলাদ দিয়েছেন। মাছ, চার-পায়া জীবের(গরু,ছাগল,ভেড়া) মাংস খাওয়া বাদ দিয়েছেন। তবুও ছয় নাম্বার বাচ্চাটিও যখন মেয়েই হলো তখন সে আর নিজেকে স্থির রাখতে পারলেন না। সব দোষ গিয়ে পরলো বউয়ের উপর।বউ কোনো গতি না পেয়ে চললেন এক পীরের মুরিদ হতে। দুইজোড়া কানের দুল আর আস্ত এক খাসির বিনিময়ে হাতে পেলেন অমূল্য এক তাবিজ। সেই তাবিজের গুনে ঠিক দশ মাস পরে তাদের ঘরে এলো এক পুত্র সন্তান। পীরের জয়-জয়কার আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পরলো। তবে বাতাসে এই খবরটিও রটে ছিলো,,অনেকের ঘরে এখনো মেয়ে সন্তানই জন্মাচ্ছে,,পীরের চরণে জোড়া-খাসি দিয়েও।

★ সমাপ্ত ★

১৩৮জন ১৩৮জন
0 Shares

২৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ