বারমুডায় বক্সী – ১

নবকুমার দাস ২০ জুন ২০২১, রবিবার, ১২:৪৩:৩০অপরাহ্ন উপন্যাস ১১ মন্তব্য
২রা মে,খোয়াই (বোলপুর )
 
          বারমুডা নিয়ে আমার বরাবর আগ্রহ আছে।
      এই বারমুডা কোন বিশেষ পা`জামা নয়, আমি বারমুডা ত্রিকোণের কথা বলছি , সারা পৃথিবীর তাবৎ লোক যেটাকে শয়তানের ত্রিভুজ বা ডেভিল`স  ট্রায়াঙ্গেল বলে থাকে।
        লেখক-সাংবাদিক ভিনসেন্ট হায়েস গাড্ডিসের ভাষায় আমেরিকার  ফ্লোরিডা উপদ্বীপের মিয়ামি থেকে শুরু করে পুয়ের্তোরিকোর সান জুয়ান পর্যন্ত কল্পিত সরল রেখার দুই প্রান্তে কল্পিত দুই বিন্দু থেকে দুই রেখাকে মাঝ অতলান্তিক মহাসাগরের বারমুডা দ্বীপের সঙ্গে যোগ করলে যে কাল্পনিক ত্রিভুজের ধারনা পাওয়া যায় সেই এলাকাই বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল।
      তবে, জাতি সঙ্ঘের ভৌগোলিক নামকরণের বোর্ড অবশ্য আজও এই নামকরণকে স্বীকৃতি দেয়নি। তাছাড়া নানাজন এই  বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের এলাকার বিস্তৃতি নিয়ে নানান উদ্ভট দাবি করে আসছেন। কারও কারও  মতে এর বিস্তৃতি তেরো লক্ষ বর্গ কিলোমিটার সামুদ্রিক এলাকা তো অন্য আরেক দলের মতে এর বিস্তৃতি ঊনচল্লিশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। এই দুই হিসাব মোটেও উনিশ-বিশ নয় বরং বিস্তর ফারাক। বিভিন্ন জনের দাবী মতে বিস্তীর্ণ এই এলাকায় বিমান দুর্ঘটনা কিংবা নৌদুর্ঘটনার সংখ্যা বা হার দুইই বড়ই গোলমেলে রকমের বেশি।
         এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো এই এলাকার মধ্যেই আছে উত্তর আমেরিকা সহ ইউরোপ ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে যাতায়াতের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত আকাশ ও সমুদ্রপথ। তাই স্বাভাবিক ভাবেই বেশি সংখ্যায় যান-বাহন চলাচল করে। আর বেশি যান চলাচলে যান্ত্রিক দুর্ঘটনা একটু বেশিই ঘটবে সেটা স্বতঃসিদ্ধভাবেই স্বীকৃত। সাধারণ  পাটিগণিতের অতি সাধারণ ঐকিক নিয়মের মত সহজ।
         কিন্তু আস্ত জাহাজ , নৌকা, প্রমোদ তরী ইয়াট ,প্লেন ,কপ্টার ইত্যাদির বেমালুম উধাও হয়ে যাওয়াটা নিশ্চয়ই রহস্যের।
        এই ব্যাপারটা আমায় বেশ টেনেছিল।মাস্যাচুসেট্স-এ পড়ানোর সময়ে একবার ইচ্ছে হয়েছিল ব্যাপারটা একটু তলিয়ে দেখি। একটু গবেষণা করি। কিন্তু আমার  সহকর্মী ও গবেষকদের  মধ্যে এই বিষয়ে কেমন একটা অবজ্ঞার ভাব দেখেছি। ওদের মতে বিষয়টা প্যারানর্মাল কিংবা এক্সট্রাটেরিস্চিয়াল বলে চালানো হলেও সারবত্তা বলে কিছু নেই ,আসলে আফিমখোরদের গল্পের মত উর্বর মস্তিষ্কের কষ্ট-কল্পনা।

      যাইহোক না কেন, বিষয়টা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। ইদানিং এই সব নিয়ে বিস্তর তথ্য ও কাহিনী পড়েছি এবং পড়ছি। এই সব নিয়ে অনেক ভিডিও এবং অডিও টেপ  খতিয়ে দেখছি ও শুনছি।

৩রা মে,বনবাস,খোয়াই (বোলপুর )

বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল বিষয়ে যত পড়ছি , দেখছি ও জানছি দেখি বিষয়টা কেমন যেন চুম্বকের মত টানছে। নাহ : একটু খতিয়ে না দেখলে আর চলছে না।  কিন্তু হাতে কলমে দেখবো কি করে যদি না সেখানে যাই ?
ব্রিটিশ পর্বতারোহী জর্জ ম্যালোরির বিখ্যাত তিনটি শব্দ মনে পড়ে যাচ্ছে। সাংবাদিকরা জানতে চেয়েছিলেন, “আপনি এভারেস্টে উঠতে চান কেন?”
উত্তরে ম্যালোরি বলেছিলেন , “বিকজ ইট’জ দেয়ার — কারন ওটা ওখানে “।
আমিও তেমন বোধ করছি। আমাকে যেতে হবে সেই শয়তানের ত্রিভুজে।বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের খাসতালুকে।যেখানে হাজার হাজার জাহাজডুবি ঘটেছে বলে দাবি করা হয়ে আসছে ।  কত শত বিমান নাকি ডুবে গেছে কোন অতলে । অতল তল থেকে সেই রহস্যের উন্মোচন না করতে পারলে শান্তি নেই যেন।
জর্জ ম্যালোরি শেষ পর্যন্ত এভারেস্টের চূড়ায় উঠতে পেরেছিলেন কিনা সারা পৃথিবীর জানা নেই। তবে শেষবার তাঁকে দেখা গিয়েছিল চূড়া থেকে মাত্র ২৪৫ মিটার দূরে। নর্থ ইস্ট কল ধরে চূড়ার দিকে এগোচ্ছিলেন তিনি । সঙ্গী ছিলেন আন্ড্রু আরভিন। এইতো কিছু দিন আগে মৃত্যুর প্রায় ষাট বছর পরে অভিযাত্রীরা এভারেস্টের  চুড়োর কাছাকাছি ম্যালোরির অবিকৃত মৃতদেহ খুঁজে পেয়েছেন । তিনি শেষ পর্যন্ত চূড়ায় উঠতে পেরেছিলেন কিনা তা আজও রহস্য আবৃত।  আরভিন আজও নিখোঁজ। জীবিত বা মৃত কোন খোঁজ নেই। ফলাফল যাই হোক না কেন উদ্যমটা কেন জানিনা মনে থেকে যায়। তেনজিং নোরগে ও এডমন্ড হিলারি পরবর্তীকালে প্রথমবার এভারেস্টে উঠেছেন বলে স্বীকৃত হয়েছেন ঠিক, কিন্তু ম্যালোরি ও আরভিন কে নিয়ে কৌতূহল আজও আছে । তবে আমি কোন স্বীকৃতির জন্যে নয় বরং আবিষ্কারের আনন্দে বা জানার আনন্দেই জানতে চাই।
ভাবছি আমার রুশ বন্ধু পল দ্রিমিত্রভকে ইমেইল করে দেব।  একজন সঙ্গী থাকলে মন্দ হয়না।

৪ঠা মে,বনবাস,খোয়াই

      না , শুধুমাত্র পল-কে একা  নয় ।
ম্যাসাচুসেটস-এ আমার প্রাক্তন মার্কিন সহকর্মী রিচার্ড টমসনকেও ই-মেল করে আমার ইচ্ছের কথা জানালাম।
দুই জনই উৎসাহ দেখিয়ে ফিরতি ই-মেল করেছে।  তবে হাতে এখন অনেক কাজ থাকায় পল এবার সময় করতে পারবে না। ওদিকে রিচার্ড লিখেছে ,”ডক্টর বক্সী আপনি ডাকলে আমি হাজার কাজ  বা ব্যাস্ততা থাকলেও আমি আসব । এম আই টি-তে আপনার সহকারী হিসাবে  যেটুকু শিখেছি তার জন্যে সারা জীবন আমি কৃতজ্ঞ থাকবো। ”

    ইতিমধ্যেই অনেকগুলি কেস ডায়েরি পড়লাম , এছাড়া অগুন্তি জার্নাল ও বই পড়েছি । সাংবাদিক গাড্ডিস সাহেব জায়গাটিকে নিজের লেখনীর মাধ্যমে বিখ্যাত করে তুললেও প্রথম নজরে নিয়ে আসেন এডওয়ার্ড ভন উইঙ্কল জোন্স । উনিশ-শ’ পঞ্চাশ  সালের সেপ্টেম্বর মাসের সতেরো তারিখে ‘দি মিয়ামি হেরাল্ড’ পত্রিকায় তিনি আটলান্টিকের এই অঞ্চলে ঘন ঘন জাহাজ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা প্রথম নজরে আনেন । এই লেখার বছর দুই পরে জন এক্স স্যান্ড  নামে এক ভদ্রলোক তত্কালীন ‘ফেট ‘ পত্রিকায় “সী মিস্ট্রি আট আওয়ার ব্যাক ডোর ” নামে এই বিষয়ে একটি অসাধারণ আর্টিকল লিখলেন । এই লেখায় প্রথম দাবি করা হয়েছিল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ‘ফ্লাইট নাইনটিন’ ও মার্কিন নেভির পাঁচ পাঁচটি  ‘টর্পেডো আভেঞ্জার’  সহ আরো অনেকগুলি উড়ান এবং জাহাজ এই  ত্রিকোণ এলাকায় আচমকা তলিয়ে গেছে বা একেবারে হারিয়ে গেছে ।তবে এইগুলির কোন চিহ্ন এমনকি কোন ধংসাবশেষ এই চত্ত্বরে দেখাও যায়নি।
বিষয়টি স্বাভাবিক ভাবেই সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জন এক্স স্যান্ডের এই লেখাটাই প্রকৃত পক্ষে বর্তমানে প্রচলিত বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের এলাকার বিস্তারিত লিপিবদ্ধ বিবরণ। সে যাই হোক না কেন , এরপর প্রায় বারো বছর পর ১৯৬২ সালের এপ্রিল সংখ্যার আমেরিকান লিজিয়ন পত্রিকায় ‘ফ্লাইট নাইনটিন’ -এর ঘটনার কথাটি পুনরায় উল্লেখ করা হয়। এই লেখায় লেখক অ্যালেন ডাব্লিউ একের্ট দাবি করেন বিমান বাহিনীর প্রধান রেডিও বার্তায় বিমান চালকের মুখে শুনেছেন , ” আমরা সাদা জলের ভিতরে প্রবেশ করছি। কোনকিছুই ঠিক নেই। না না আমরা কোথায় তা ঠিক বুঝতে পারছি না , জলের রঙ এখন সবুজ , সাদা নয়।”
তিনি আরো লেখেন যে নৌবাহিনীর তদন্তে থাকা আধিকারিকরা জানিয়েছেন, “উড়োজাহাজ গুলি মঙ্গল গ্রহের দিকে উড়ে গেছে “।
এই রকম অবিশ্বাস্য ঘটনার বর্ণনা স্বাভাবিক ভাবেই বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং অবশ্যই অনেকেরই ঘুম কেড়ে নেয়।
তবে স্যান্ডের প্রবন্ধে কোনো সুপার ন্যাচারাল বা অলৌকিক শক্তির উল্লেখ করা হয় , বিশেষ করে ফ্লাইট নাইন্টিনের ঘটনায়। ওই এলাকার অদ্ভুত আচরণের বর্ণনা দিয়ে ১৯৬৪ সালে অর্গসি পত্রিকায় ভিনসেন্ট গাড্ডিস নতুন একটি আর্টিকেল লিখলেন।  “দি ডেডলি বারমুডা ট্রায়াঙ্গল “ নাম এই লেখায় সেই ফ্লাইট নাইন্টিনের ঘটনার পুনরুল্লেখ করে রহস্যের দাবিকে আবারো উত্থাপন করলেন।  শুধু এখানেই থেমে না থেকে গাড্ডিস পরের বছরেই  ‘ইনভিজিবল হরাইজন’ বা ‘ অদৃশ্য দিগন্ত ‘ নামে বই লিখে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে উঠলেন।
এরপর একেএকে অনেক লেখক লেখিকা এই আসরে নেমে পড়লেন , জন ওয়ালেশ স্পেনসার ১৯৬৯ সালে প্রকাশ করলেন ‘লিম্বো অফ দি লস্ট ‘ বইটি যেটা ১৯৭৩ সালে পুনর্মুদ্রিত হয়। এই বইটি আমি পড়লাম।  বেশ লেখা, তোফা লেখা , কিন্তু বিশ্বাস করা কঠিন। চার্লস বার্লিটজ-এর ‘দি বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল’ এবং রিচার্ড উইনারের ‘দি ডেভিলস ট্রায়াঙ্গেল’ বই দুটিতেও সেই একই ঘটনা এবং এর সম্ভাব্য কারন-অকারণ রহস্য নিয়ে নানান আলোচনা করা হলেও মূল সুর সেই একের্টের মত। সবার দাবি অলৌকিক কিছু আছে।
সত্যিই কি অলৌকিক কিছু না লৌকিক এবং বিজ্ঞান-ই  একমাত্র এর উত্তর  দিতে পারে ,তার জন্যেই আমি অপেক্ষা করছি।
( ক্ৰমশঃ )
অনুসরণে সুবিধার জন্য পরবর্তী অনুভাগটির লিংক দেখতে পারেন
https://www.sonelablog.com/%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%a1%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%ac%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b8%e0%a7%80-%e0%a7%a8/
১৪৪জন ২৯জন
0 Shares

১১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য