প্যারেন্টিং যখন প্রশ্নবিদ্ধ

রিমি রুম্মান ২৯ এপ্রিল ২০২১, বৃহস্পতিবার, ১১:৪৩:৫৪অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৬ মন্তব্য

সব অভিভাবকই তাঁদের সন্তানদের ভালোবাসেন, এটি দিন-রাতের মতো সত্য এবং পরিষ্কার। কিন্তু সন্তানদের মানসিক অবস্থা আমরা ক’জন অভিভাবক আন্তরিকভাবে বুঝার চেষ্টা করি? নিজেদের অজান্তেই ভুল করে ফেলি আমরা। জানতেও পারি না কোথায়, কী কারণে আমাদের পেরেন্টিং প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বড় রকমের কোনো দুর্ঘটনা ঘটে গেলে আমরা অভিভাবকরা নড়েচড়ে বসি। কথায় কথায় অন্যের উদাহরণ টানি। তখনই আত্নশুদ্ধির বিষয়টি সামনে এসে দাঁড়ায়।  নিজের টিনএজ সন্তানের সাথে ঘটে যাওয়া প্রশ্নবিদ্ধ পেরেন্টিং নিয়ে লিখছি এবারের লেখায়।

রিয়াসাত। আমার প্রথম সন্তান।
যখন তাঁর আধো আধো উচ্চারণে কথা শুনে আমাদের মুগ্ধ হবার কথা, তখন আমরা হতাশার গাঢ় অন্ধকারে নিমজ্জিত হলাম। এক চিলতে আলোর সন্ধানে হাতড়ে বেড়ালাম চারপাশ। যখন এক পৃথিবী মুগ্ধতা নিয়ে তাঁর ছুটে বেড়ানো দেখবার কথা আমাদের, তখন আমরা ছুটে বেড়ালাম ডাক্তার, বিশেষজ্ঞের দ্বারে দ্বারে। মনের ভাব বুঝিয়ে বলতে না পারা, অন্যমনস্ক থাকা, একা একা আনমনে দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলা, অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলায় অনীহাসহ নানাবিধ সমস্যার মধ্যদিয়ে যাচ্ছিল সে।

দিন, মাস, বছর পেরিয়ে সে যখন স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিতে গেলো, শিক্ষক হার্ট শেপ দেখিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, এটা কি? সে বলল, আই লাভ ইউ। মিস্‌ অ্যান ফিক করে হেসে দিয়ে বলেছিলেন, এটি হার্ট শেইপ। অতঃপর যে কঠিন যুদ্ধে কোমর বেঁধে নেমেছিলাম, সেখানে আমার আমি বলতে কিচ্ছু ছিল না। কিচ্ছু না। আমি মানেই আমার আত্নজ। আমি মানেই আমার সন্তান। আমার ধ্যান জ্ঞান সবটা জুড়ে ছিল শুধু সে। সবটুকু সময় তাঁকে উজাড় করে দিয়েছি। সবটা আদর, ভালোবাসা তাঁর জন্যেই বরাদ্দ রেখেছি। তাঁকে হাসাতে নানান ভঙ্গিতে অভিনয় করেছি। কোমর দুলিয়ে কার্টুনের মতো করে নেচেছি। ব্যাঙের মতো লাফিয়েছি। এতে সে হা হা হো হো শব্দে হেসে উঠেছে। আমার প্রতি মনোযোগী হতে শুরু করেছে।

সে ভালো কিছু করলে যেমন জড়িয়ে ধরেছি, রাগলে বা ভুল করলেও ধমক দেয়ার পরিবর্তে জড়িয়ে ধরেছি। চুমু খেয়েছি। আমার ধারণা ছিল, এতে সে নিরাপত্তাহীনতা বোধ করবে না। এবং এইসব ভালোবাসার স্পর্শে তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়বে। পারিবারিক মতভেদ কিংবা কোনো কারণে কখনো স্বামী-স্ত্রী একের প্রতি অন্যের ক্ষোভ থাকলেও তাঁর সামনে প্রকাশ করিনি কখনো। একজন সচেতন অভিভাবক হিসেবে হয় দাঁতে দাঁত চেপে হজম করে গিয়েছি, নয়তো নিজের জেদ নিজেই গিলে ফেলেছি। ক্ষতিকর নয় সন্তানের এমনসব পছন্দকে সবসময় অগ্রাধিকার দিয়েছি। কিন্তু ন্যায়-অন্যায়, আদবকায়দার সঙ্গে আপোষ করিনি। ‘দাদু বকা দেয়’ সন্তানের এমন অভিযোগে কখনো আস্কারা দেইনি। বলেছি, দাদু এ পরিবারের বয়োজোষ্ঠ, তাঁকে মানতে হবে। সম্মান জানাতে হবে।

শিশুরা ল্যাপটপ, ফোন নিয়ে খেলতে পছন্দ করে,জানি। গেইমিং এর প্রতি আসক্ত যেন না হয়, নির্দিষ্ট সময়ের পর তা সরিয়ে নিয়েছি। বলেছি, এটি প্রতিনিয়ত খেলার জন্যে খেলনা নয়। সে চিৎকার করে কেঁদেছে। মেঝেতে গড়াগড়ি দিয়েছে। বমি করে ভাসিয়ে ফেলেছে। তবুও ভালোমন্দ, ন্যায় অন্যায় শিক্ষার বিষয়গুলোতে কঠিন কঠোর থেকেছি। জানতাম একদিন, দুইদিন, তিনদিন কাঁদবে। কিন্তু চতুর্থদিন সে ঠিকই বুঝে নিবে যে, অহেতুক কেঁদে লাভ নেই। বিষয়টি আমায় শিখিয়েছেন স্পীচ থেরাপি দিতে আসা সংশ্লিষ্ট বিভাগের দুইজন নারী কর্মী।(যদিও তাঁকে স্পীচ থেরাপি দেয়া হয়নি বয়স পেরিয়ে যাওয়ায়)। গাড়িতে ভ্রমণের সময় কারসীটে কিছুতেই বসতে চাইত না। দু’হাত বাড়িয়ে দিতো কোলে বসবে বলে। প্রত্যাখ্যান করেছি। সে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে গলা ভেঙে ফেলেছে, দম আঁটকে যাবার দশা হয়েছে। ভেতরে ভেতরে আমার বুক ভেঙে গিয়েছে। কিন্তু নিয়মকানুন, আইন, এসবের বিষয়ে আপোষ করিনি কোনোদিন। অতিরিক্ত আদর, কিংবা অতিরিক্ত শাসন কোনোটিই শিশুর জন্যে ভালো নয়, বলেছিলেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক। আমি শুধু উপদেশগুলো অনুসরণ করেছিলাম মাত্র।

একসময় আবিষ্কার করলাম, সে রোজ আমার সঙ্গে পার্কে যেতে চায়। আমার সঙ্গ তাঁকে আনন্দিত করে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় আমি উচ্চস্বরে কথা বললে আস্তে কথা বলার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়। কারো রূঢ় ব্যবহারে মনঃকষ্ট পেলে এড়িয়ে যেতে বলে। স্কুলে তাঁর ভালো ফলাফলে আমি আনন্দিত হলে জড়িয়ে ধরে। রাগলে কিংবা মন খারাপ করলেও জড়িয়ে ধরে। অর্থাৎ আমি যা কিছু শিখিয়েছি একদা, শব্দের প্রতিধ্বনির ন্যায় ফিরে ফিরে আসে সেইসব। সন্তানের স্কুলের নানান রকম সম্মানসূচক এ্যাওয়ার্ডে আমার ড্রয়ার পরিপূর্ণ হয়ে উঠে ধিরে ধিরে। আমি আরও আশাবাদি হয়ে উঠি। অষ্টম শ্রেণীতে যখন সে বিশেষায়িত স্কুলে ভর্তির জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিল, বললাম, তুমি নিউইয়র্কের অন্যতম সেরা হাইস্কুল স্টাইভেসেন্ট এ সুযোগ পেলে আমি যারপরনাই আনন্দিত হবো। ত্রিশ হাজার শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে স্টাইভেসেন্ট হাই স্কুলের গর্বিত শিক্ষার্থী হয়ে আমায় চমকে দিয়েছে। আমার চাওয়া পূর্ণ করেছে। এরই মাঝে দুইবছর গানের তালিমও নিয়েছে। কোরআন খতম করেছে। এই সব কেনো করেছে? তাঁর ভাষায়, ” আমি তোমাকে সুখি দেখতে চাই”।

‘আমি তোমাকে সুখি দেখতে চাই’ সন্তানের মুখে এমন কথা শুনে যে কোনো অভিভাবকের যারপরনাই আনন্দিত হবার কথা। কিন্তু আমি কোথায় যেন আঁতকে উঠলাম। তীব্র মনখারাপে পেয়ে বসলো। নিজের কাছে নিজেকে ছোট মনে হলো। মস্তিষ্কের নিউরনে একটি প্রশ্নই আবর্তনের মতো ঘুরতে ঘুরতে তলিয়ে যেতে লাগলো। আমি কি তবে তার উপর আমার চাওয়াগুলোকে চাপিয়ে দিচ্ছি? বললাম, তোমার গানের ক্লাসে যেতে ভালো লাগে না? সে না সূচক মাথা নাড়লো। আমি একবাক্যে মেনে নিলাম। জানালাম, তোমার কাল থেকে গানের ক্লাসে যেতে হবে না। সে খুশি হলো। এতদিন নিঃশব্দে, বিনা বাক্যব্যয়ে ছোট্ট মানুষটি আমাকে খুশি করে গিয়েছে। আমি তাঁর সুখের কথা কতটুকু ভেবেছি? আমি তাঁর চাওয়াকে কতটুকু গুরুত্ব দিয়ে জানার চেষ্টা করেছি? আমার ভেতরে একরকম অপরাধবোধ কাজ করতে শুরু করলো। তাঁর চাওয়া-পাওয়াকে আগের চেয়ে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করলাম। সে আমাদের সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ঘুরতে যাবে কিনা মতামত জানতে চাইলাম। যা আগে কখনো করিনি। কখনো সে বলেছে তাঁর প্রচুর হোমওয়ার্ক জমে আছে। পড়ার চাপ থাকলে বলেছি, তোমার যেতে হবে না। তাঁর অভিব্যক্তি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কখনো আমাদের সঙ্গে গেলে আমার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বাড়ি ফিরে আমি তাঁকে আনন্দে জড়িয়ে ধরে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছি, ‘তুমি সঙ্গে গেলে আমাদের দিনটি অসাধারণ হয়ে উঠে।’ সে মৃদু হেসে আমায় ওয়েলকাম জানিয়েছে। এইসব বিগত গ্রীষ্মের কথা।

ধিরে ধিরে তাঁর কলেজে ভর্তি হবার সময় ঘনিয়ে আসে। কোন কলেজে ভর্তি হবে? দূরের কলেজে যেতে চাইলে আমার তো বাঁধা দেয়া ঠিক হবে না। একজন অভিভাবক হিসেবে বড় জোর ভালোমন্দ বুঝিয়ে বলতে পারি। আমি তাঁর মতামতকে গুরুত্ব দিতে চাই, উপলব্ধি করতে চাই। কিন্তু যে ছেলেটি কোনোদিন একা কোথাও থাকেনি, সে কেমন করে হোস্টেলে থাকবে? তাঁকে ছাড়া আমরাইবা কেমন করে দিন কাটাবো? আমার বুক ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে লাগলো। কিন্তু মুখে বললাম, তোমার যেখানে ভালো লাগবে, সেখানে ভর্তি হবে। সে সানন্দে লিস্ট লিখতে বসে গেলো। পছন্দের ছয়টি কলেজ ক্রমানুসারে সাজালো। এইদিকে রাত জেগে আমিও চুপিসারে গুগল সার্চ দিতে লাগলাম। কলেজগুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিলাম। কোন কলেজ র‍্যাংকিং এ কততম। কোনটি সেরা। যে বিষয়ে সে পড়তে চাচ্ছে সে বিষয়ের জন্যে কলেজগুলো কতোটা যুতসই ইত্যাদি। মুখে প্রকাশ না করলেও স্বার্থপরের মতো মনে মনে খুব করে চাইছিলাম, সে যেন ‘নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি'(NYU)পড়ে। এতে সে বাসা থেকে এসে যেয়ে ক্লাস করতে পারবে। কিংবা পড়াশোনার সুবিধার্থে হোস্টেলে থাকলেও আমি যখন ইচ্ছে গিয়ে তাঁকে দেখে আসতে পারবো। কিন্তু চাইলেই তো আর মানুষের সকল চাওয়া পূর্ণ হয় না! দীর্ঘশ্বাস তাড়া করে ফিরল। কেননা এটি আমেরিকার সেরা ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এগারতম। প্রতি একশজন আবেদনকারীর মধ্যে মাত্র ১৬ জন সেখানকার গর্বিত শিক্ষার্থী হবার সুযোগ পায়। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। আমার মনের সুপ্ত বাসনা প্রকাশ করে আমি তাঁকে মানসিক চাপের মধ্যে ফেলে দিতে চাচ্ছিলাম না। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম, সেও একই বিশ্ববিদ্যালয়য়ে পড়তে আগ্রহী হচ্ছে।

শুরু হলো এপ্লিকেশন সাবমিট করা। সঙ্গে একটি রচনাও লিখতে হবে। সে বিষয় নির্বাচন করল। লিখল তাঁর পরিবার নিয়ে। চুপিসারে রচনাটি পড়ার সুযোগ পেলাম। প্রতিটি শব্দ, বাক্য, লাইন বুঝার চেষ্টা করলাম। গুগল ট্র্যান্সলেটের সাহায্য নিলাম। দ্বিতীয়বারের মতো আঁতকে উঠলাম। নির্ঘুম রাত কাটালাম। তাঁর পরিবার নিয়ে এ কী লিখেছে সে!এ কী অনুভূতি শেয়ার করেছে! চায়নিজ মিথলজি দিয়ে রচনাটি শুরু করেছে। এবং হ্যাপী এন্ডিং দিয়েছে যদিও, কিন্তু মাঝের কিছু কথা আমাদের প্যারেন্টিংকে দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করলো। জন্মাবধি আমরা যেখানেই গিয়েছি, সে আমাদের সঙ্গে গিয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে, বন্ধুদের বাড়িতে, পার্টিতে নয়ত দূরদূরান্তে প্রকৃতির সান্নিধ্যে, পিকনিকে। দিনব্যাপী আমাদের সঙ্গে সে আনন্দে মেতেছে, হাসিমুখে সাঁতার কেটেছে, ব্যাডমিন্টণ খেলেছে, বাস্কেটবল খেলেছে। শহরের বাইরের হোটেলে রাত্রি যাপন করেছে। অথচ ঘুণাক্ষরেও আমরা জানতে পারিনি যে সবসময়ই তাতে সে আনন্দ পায়নি। হাসিমুখের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছে অনিহা, বিরক্তি আর কষ্টবোধ। রচনায় সে লিখেছে, ‘আমার প্যারেন্ট চেয়েছে সবসময় আমি তাঁদের সঙ্গে যাই। তাই গিয়েছি। কিন্তু সকল সময় তা আমার জন্যে আনন্দদায়ক ছিল না।’ যদিও রচনাটি শেষ হয়েছে এভাবে,” যখনই আমি পরিবারের সঙ্গে বাহিরে গিয়েছি, বাড়ি ফিরে আমার মা আমাকে প্রতিবারই ধন্যবাদ দিয়েছে। চায়নিজ মিথলজিটি আমার ভেতরে এই বোধ জাগ্রত করতে সাহায্য করেছে যে, পরিবারই বড় শক্তি। আমি আমার সেইসব দুঃসময় কাটিয়ে উঠেছি। আমি সত্যিই আমার পরিবারকে ভালোবাসি”।

তীব্র শীতের সেই সময়টাতে জানালায় দাঁড়িয়ে অবিশ্রান্তভাবে তুষারপাত দেখতে দেখতে কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিনের পর দিন ভেবেছি। সন্তানের এত কাছাকাছি থেকে, এত সময় দিয়ে, এত সচেতন অভিভাবক হয়েও আমি বুঝতে পারিনি কিসে তাঁর অনিহা ছিল। কিসে বিরক্তিবোধ। কোথায় তাঁর বিষণ্ণতা ছিল। তাঁর যে নিজস্ব পৃথিবী আছে, ভালোলাগা মন্দলাগা আছে, আমি কেমন করে তা বেমালুম ভুলে থাকলাম? এই যে বিরক্তি আর অনীহা নিয়ে অনেকটা সময় সে নিরানন্দের কাটালো, আমার এইসব দেখার মতো চোখ, উপলব্ধি করার মতো হৃদয় এতদিন কোথায় ছিল? নিজের উপর নিজের বড় রাগ হলো।

এইদিকে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নানাবিধ অফার দিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে ‘ ওয়েলকাম’ লেটার পাঠালো। কেউবা ফুল স্কলারশীপ, অনার ক্লাস অফার করলো। কিন্তু তাঁর প্রথম পছন্দ NYU এর রেজাল্টের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলাম। অবশেষে সে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) একজন গর্বিত শিক্ষার্থী হবার সুযোগ পেলো। আমরা যারপরনাই আনন্দিত। তাঁর বাবা সিদ্ধান্ত নিলো, পড়ালেখার সুবিধার্থে ডর্মে থেকে সে তাঁর পড়া চালিয়ে নিবে। কিন্তু বাঁধ সাধে সে। বলল, ” আব্বুজি, আমি ডর্মে যেতে চাই না। আমি আমার ঘর ভালোবাসি”। তাঁর বাবা ব্যাখ্যা করছিল, হোস্টেলে থাকলে তোমার আসা-যাওয়ার সময়টুকু বেঁচে যাবে। কিন্তু তাঁর এক কথা, ” আমার ঘর ভালো লাগে”। পিতাপুত্রের কথোপকথনের মধ্যবর্তী সময়টুকুতে প্রগাঢ় আনন্দে আমার বুক ভারী হয়ে এলো। আমি কান্না লুকাতে আড়াল হই। বারান্দায় গিয়ে একাকি আকাশের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে থাকি। আকাশের শূন্যতার দিকে তাকিয়ে আমার প্রয়াত আব্বার করুণ মুখ ভেসে উঠতে দেখি। প্রয়াত আম্মার অশ্রুসিক্ত মায়াবী মুখ ভাসে। রিয়াসাতের বয়সে আমি কেমন করে শহর ছেড়ে দূরবর্তী নগরে গিয়ে ভর্তি হবো সেই অজুহাত খুঁজেছিলাম। ঘর ভালো লাগেনি। বাবা-মার আদর যত্নের কমতি ছিল না। শুধু এত এত নিয়ম শাসনের বেড়াজালে হাঁসফাঁস লাগত। দমবন্ধ লাগত। ঢাকায় ইডেন কলেজে অনার্স ভর্তি হয়েছিলাম। তল্পিতল্পা নিয়ে হোস্টেলে উঠেছিলাম। মনে হয়েছিল খাঁচার পাখি ছাড়া পেয়েছি। সেদিন বুক ভরে শ্বাস নিয়েছিলাম। নিজেকে মুক্ত বিহঙ্গ মনে হয়েছিল। আর এত বছর বাদে একই বয়সে আমার সন্তান কিনা বলে, ” আমি আমার ঘর ভালোবাসি, আমার ঘর ভালো লাগে!” অভিভাবক হিসেবে আমরা হয়ত তাঁকে যেমন আদর ভালোবাসা দিয়েছি, তেমনি নিয়ম শাসনের বেড়াজালে আঁটকে রাখিনি। আর এ কারণেই হয়তো ঘর তাঁর কাছে শান্তির, স্বস্তির জায়গা হয়ে উঠেছে।

রিমি রুম্মান
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

১৬৫জন ৫৮জন
20 Shares

৬টি মন্তব্য

  • রোকসানা খন্দকার রুকু

    গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। এ জায়গায় সত্যিই সব বাবা মা সফল হতে পারে না। তাই সন্তানরা দুরে থাকতে একা থাকতে পছন্দ করে। সবাই সামলে উঠতে পারে না। কেউ কেউ খারাপ পরিনতিতে যায়। এক্ষেত্রে আপনারা সফল বলা চলে।
    প্রত্যেকটা মানুষেরই একটা নিজস্ব স্পেস দরকার হয় এবং এটা জরুরী। ছেলে একজন ভালো মানুষ হয়ে সামনে এগিয়ে যাক এই কামনা।

  • তৌহিদুল ইসলাম

    আপনার এই লেখাটি প্রত্যেকের জন্য শিক্ষণীয় বলে মনে করি। প্যারেন্টিং এর আদ্যপ্রান্ত এবং আবেগীয় অনুভূতির সুক্ষ্ম দিকগুলি পড়ে চমৎকৃত হলাম আপু। রিয়াসাত বাবার জন্য দোয়া ও শুভকামনা রইলো।

    আপনিও ভালো থাকুন আপু।

  • সুপর্ণা ফাল্গুনী

    আপনার ও আপনার পুরো পরিবারের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা রইলো। এভাবে যদি সব বাবা-মা সন্তানকে বুঝতো, তাদের চাওয়া পাওয়া কে মূল্যায়ন করতো তাহলে ঘরে ঘরে হীরের টুকরো গড়ে উঠতো যাদের কাছে সবার আগে ঘর, পরিবারের লোকজন প্রিয় থাকতো। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের দেশের অধিকাংশ বাবা-মা ই এই বিষয়ে খুব স্বার্থপর। তারা নিজেদের ভালো লাগাতেই সুখ খুঁজে বেড়ায়। আপনি যেভাবে সন্তানের কাছ থেকে অনেক সমস্যা, কষ্ট লুকিয়ে রেখেছেন, সংসারের বাজে বিষয়গুলো চেপে রেখেছেন আবার তার আনন্দের বিষয় গুলো সমান গুরুত্ব দিয়েছেন তার জন্য ধন্যবাদ দিতেই হয় আপনাকে। শাসনের বিষয়টিও খুব ভালো লেগেছে, তার অবোধ, ভুল চাওয়া গুলো প্রশ্রয় দেননি।
    ভালো থাকুন নিরাপদে থাকুন শুভকামনা অবিরাম

  • মনির হোসেন মমি

    একটি পরিবারের মা বাবা একজন সন্তানের সুপথে বেড়ে উঠার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন এবং নির্ভরযোগ্য জায়গা।এদিকটায় মা বাবার সন্তানের সুবিদা অসুবিদা ইত্যাদি বিষয়ে সবচেয়ে বেশী সতর্ক থাকতে হয়।
    চমৎকার লেখা।জীবন পাল্টে দেবে এ লেখাটি পড়লে।

  • হালিমা আক্তার

    কী বলব, অনেক সময় নিয়ে মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। বোঝার আছে অনেক কিছু। ধন্যবাদ আপনাকে সন্তানের সব কিছুই গভীর ভাবে চিন্তা করছেন। বেশিরভাগ ভাগ বাবা মা নিজের ইচ্ছে কে সন্তানের উপর চাপিয়ে দেন। শুভ কামনা।

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য