সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

নিশি’তে নিগুঢ়

দালান জাহান ৭ আগস্ট ২০২১, শনিবার, ০৫:৪১:১৪পূর্বাহ্ন উপন্যাস ৩ মন্তব্য

চার

+++++

এরপর নিগুঢ়ের ঘোর ভাঙে। বড়শি থেকে ছোটে যাওয়া মাছের বেঁচে থাকার আনন্দ অন্যসব মাছের আনন্দের চেয়ে অন্যরকম হয় নিশ্চয়ই। 

কিন্তু মৃত্যু কিভাবে মানুষকে আনন্দ দিতে পারে ? এটা ভেবে পায় না নিগুঢ় কিন্তু মুক্তি একটা উপলক্ষ চায় সবসময় এটা সে বুঝতে পারে।

দুর্গন্ধ যুক্ত জায়গায় যতোই প্রলেপ লাগানো হোক তার গন্ধ ছড়াবেই, আর সে গন্ধটা নিগুঢ় পেয়েছিলো অনেক আগেই।

কিন্তু কিছু বলা অথবা বোঝার মতো শক্তি অথবা স্বাধীনতা কোনটাই তার ছিলো না।

মাঝে মাঝে মুশফিকের সাথে দেখা হলে নোট বুক চাইতো নিগুঢ় । মুশফিক তার চোখের দিকে তাকাতে পারতো না।

কিন্তু আজ সেই হরিণীর মতো চোখ দুটো ক্যামন সস্তা হয়ে গেছে। সেই সাহস ভরা উঁচু বুক তার কেমন উবে গেছে।

অথচ এই মুখখানা দেখার জন্য কতোদিন সে তার বাড়ির রাস্তায় ঘুরঘুর করেছে। পরদিন স্কুলে দেখা হওয়ার পর নিগুঢ়  জিজ্ঞেস করেছেন , “তুই রোজ রোজ আমাদের বাড়ির পাশে ঘুরঘুর করিস ক্যান?

নিগুঢ় আসলে কিছু জানতে চেয়েছে। জলটা পরিস্কার নাকি ঘোলাটে বুঝতে চেয়েছে। কিন্তু মুশফিক লজ্জায় চুপ থেকেছে , যেন সে কিছুই করেনি কিছুই জানে না।

কিন্তু আজ মুশফিক কোনকিছু না ভেবেই নিগুঢ়কে বিয়ে করে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। কিন্তু বাড়িতে যাওয়ার পর তার বাবা আসেক আলী বিষয়টি একদম মেনে নিতে পারলেন না এবং তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করলেন কিন্তু তাতে মুশফিকের রাগ হয়নি।

রাগ হলো তখন যখন তার বউকে নষ্টা বললেন। তখন মুশফিক শুধু তার বাবার দিকে তাকিয়ে ছিলেন চোখ বড়ো করে সাথে সাথে তার বাবা মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন এবং তারও মৃত্যু হলো।

বিষয়টি আর গোপন রইলো না। একদিনে দুটো মৃত্যুর কারণ পুরো গ্রামে ছড়িয়ে গেলো। মুশফিক কারো প্রতি রাগ করলে সে মানুষ বাঁচে না। এটা সবাই বোঝে গেলেন এবং একটা আতঙ্ক চারদিকে ছড়িয়ে গেলো।  দলে দলে মানুষ জড়ো হতে শুরু করলেন।

মুসফিক নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন নিগুঢ়ের দিকে। যদিও এমন বিয়ে কখনও চাইনি নিগুঢ়  কিন্তু আজ এই বিয়েটা তার মৃত্যুর চাইতেও অধিকতর লজ্জাজনক এটা সে বুঝতে পারছেন ।

বাড়ির মহিলারা খুঁটে খুঁটে খুঁটা দিয়ে যাচ্ছে। তাদের কথার খোঁটায় দাউদাউ আগুনে সে আগুনে ঝলসে যাচ্ছে নিগুঢ়ের হৃদপিণ্ড। 

কোন কোন মানুষের স্বপ্ন দেখতে নেই। এ কথাটা ভালোভাবে বিশ্বাস করেন নিগুঢ়। তাই মুশফিক তার পছন্দের হওয়া সত্বেও সে কথা কখনও সে মুশফিক কে মুখ ফুটে বলেননি বরং তার কাছ থেকে পালিয়ে থেকেছেন যতোটা সম্ভব ।

কারণ মুশফিকের বাবা বড়ো কৃষক কিন্তু নিগুঢ়ের বাবা গরীব কৃষক তিনি পরের জমি চাষাবাদ করতেন।

কিন্তু আজ যখন মুশফিক সবার সামনে তাকে বিয়ে করে নিয়ে আসলেন , নিগুঢ় কেমন নিশ্চুপ হয়ে গেলেন এবং কিছুই বলতে পারেননি। 

কীই-বা বলতে পারতেন নিগুঢ় । স্বামী ছাড়া একটা মেয়ে যেন দোকানের মিঠাই। সবাই কেজি ধরে কিনে নিতে চায়। এই দীর্ঘ যন্ত্রণা সে উপভোগ করেছেন।

ক্ষুধা মানুষের পেটে থাকে কিন্তু ক্ষুধা কোন এক সময় শেষ হয়ে যায় কিন্তু লজ্জার আঁচল কলঙ্কের বাতাসে উড়তেই থাকে যতোক্ষণ না মাটিতে মিশে যায় দেহ।

বাড়ির ভেতরে বাহিরে লোকে লোকারণ্য। কী করবেন মুশফিক ভেবে পাচ্ছেন না। চিন্তায় তার চোখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। কিন্তু লোকজন ভয়ে কেউ মুশফিকের সামনে আসছেন না।

এমনকি নিজের বাড়ির চাচা /কাকারাও না। অবশেষে মুশফিক ঘর থেকে বের হলেন। সবার সাথে শরিক হয়ে তার বাবার জানাজা ও কবর দেওয়া সম্পন্ন করলেন।

কবরের পর লোকজন একত্রিত হয়ে মুশফিককে এলাকা ছেড়ে যেতে অনুরোধ করলেন। মুশফিক তাদের কথায় সম্মতি জানালেন।

 1.কিন্তু কোন কারণ জিজ্ঞেস করলেন না। শুধু এটুকুই বললেন, “আমি চলে গেলে যদি এই গ্রামের মানুষের শান্তি ও সমৃদ্ধি হয় তাহলে আমি অবশ্যই চলে যাবো।

 

 

১৮০জন ১১জন
27 Shares

৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য