দীপাবলির দাম্পত্য

খাদিজাতুল কুবরা ৩১ মে ২০২২, মঙ্গলবার, ১১:৫৩:৫২অপরাহ্ন গল্প ৭ মন্তব্য

আমি জেবা। আমার আর একটি নাম আছে কাছের মানুষদের দেওয়া,’ বই পোকা ‘। না আমি এতো পড়ে ও খুব বিদ্বান হতে পারিনি বা নিজের জন্য কোন পদবি ও অর্জন করতে পারিনি।

একটা সময় সমরেশ মজুমদারের লেখা পড়তাম গোগ্রাসে। ‘কালবেলা’ পড়ে কি ভীষন মন খারাপ হয়েছিল, আহারে লতার সাথে অনিমেষের বিয়েটা হয়নি বলে লেখকের উপর এতো রাগ হয়েছিল! তারা সারাজীবন একসাথে বসবাস করলো অথচ বিয়ের দিকে গেলোনা।লেখক চাইলেই ওদের বিয়ে দিয়ে ষোলকলা পূর্ণ করে দিতে পারতেন। তারপর ‘সাতকাহন’ পড়েছি সোৎসাহে। প্রতিবাদী দীপাবলির প্রতিটি পদক্ষেপ ভালো লাগত। পড়তে পড়তে নিজের জন্য একটা মাইল ফলক ও দেখে ফেলেছিলাম দিব্য দৃষ্টিতে। শেষটায় এসে দীপাবলি গাটছড়া বাঁধলেন। সুখের ঘরকন্না সাজালেন। সাজানো ঘর ছেড়ে একদিন প্রায় নির্বাসন নিলেন দাম্পত্য থেকে।

সন্ন্যাসী ঠাকুরদা বেঁচে থাকা স্বত্তেও স্বেচ্ছা বৈধব্য মেনে নেওয়া ঠাকুমাকে নিয়ে বাঁধলেন নতুন ঘর। মনের ভেতর আবিষ্কার করলেন আত্মবিশ্বাসী সৎ নিষ্ঠাবান সুপুরুষ অলোককে। জীবনের সাথে যার লেনাদেনা হয়নি বা হবেনা। আমি  কেন যেন মেনে নিতে পারিনি। দীপাবলি গোটা একটি জীবন একা থাকবে এটা আমার সেকেলে প্রথাগত চেতনা সেদিন বুঝতে পারেনি। লেখকের সাথে মতের মিল না পেয়ে খুব মন খারাপ হয়েছিল।

তখন আমি দীপাবলির জীবনের বাঁকে বাঁকে নিজের জন্য মাইলফলক দেখেছিলাম এটা সত্যি এবং আজও সেটাই আমার পথ বলে বিশ্বাস করি। তথাপিও আমি খুব স্বাভাবিকভাবে বঞ্চনা আর অসংগতিগুলোকে মেনে নিতে না পারলেও মানিয়ে নিয়ে খুব নিষ্ঠার সাথে দাম্পত্য যাপন করেছি প্রায় সতেরো বছর ধরে। ইনশাআল্লাহ আর ও সতেরো বছর করব যদি বেঁচে থাকি। বিয়ে পরবর্তী হানিমুন এপিসোড শেষ হওয়ার পর  সংসার, সন্তান নিয়ে আমাদের চাঁদের হাট। লোকমুখে আমাদের জয়জয়কার।আমরা আদর্শ দম্পতি। বিশেষ করে কৃতিত্বটা আমাকেই দেওয়া হতো, কেননা গত দশবছর পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে আমার তিনি হুইলচেয়ারে আটকে ছিলেন। পাদুটো অকেজো হয়ে তার বাকশক্তির প্রখরতা বেড়েছিল কয়েকগুণ। তিনি তার পুরোটাই কাজে লাগাতেন আমার উপর।আর তার ভালো গুণগুলি কাজে লাগাতেন কর্মক্ষেত্রে। তিনি তাঁর কর্মজীবনে অত্যন্ত সফল ব্যাক্তি।হাঁটাচলায় অক্ষম হওয়ার পর ও বাড়িতে বসে ব্যবসা পরিচালনা করতেন। তার বিশ্বস্ত লোক ছিল। যাদের সাথে পূর্ণ পেশাদারিত্ব এবং সদ্ভাব রেখে তিনি কাজ করতেন। তার যতো হম্বিতম্বি আমার সাথে। আমি সারাক্ষণ আতংকে তটস্থ থাকতাম এই বুঝি কোন ভুলচুক ধরা পড়ে! পান থেকে চুণ খসলে বাড়ি মাথায় তুলবেন। তাতেই ক্ষান্ত হবেননা, বাজার খরচের টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিবেন। গরীবের ঘোড়া রোগের মতোই আমার ও সুখের অসুখ আছে। আমার দুটো বিড়াল আর দুটো কুকুর আছে। ওদের আমি ছেলে মেয়ের মতোই ভালোবাসি! আহা ভালোবাসা! মানুষের মনে কমতি থাকলেও বেচারা বোবা প্রাণীগুলোর অন্তর ভরা ভালোবাসায়!  আমায় বড্ড ভালোবাসে ওরা!  ভালোবাসা আমাকে বিবশ করে, আমি নিজের অবস্থান নড়বড়ে হওয়া স্বত্তেও ওদের হাত আলগা করতে পারিনা। কাজের মেয়েটা আমার সাথে দিনের অধিকাংশ সময় থাকে। গুটুর গুটুর করে তার কষ্টগুলো বলে। বলে, সারাদিন খাটুনির পর কামুক বরের দেহের ক্ষুধা মেটাতে তার কী পরিমাণ কষ্ট হয়! একদিনের জন্য ও মাফ নেই। ওর বাচ্চাটা থেলাসেমিয়া রোগী। মনটা হুহু করে উঠে আমার! আহা!  বেচারির কতো কষ্ট!  বললাম তুই আমাদের সাথেই ডালভাত খাস যা কিসমতে থাকে। শুনে যে হাসিটা ওর মুখে ছড়িয়ে যেতে দেখেছি তার কোন মূল্য হয়না। এতো সুন্দর হাসি দেখার সৌভাগ্য খুব কম মানুষের হয়। আমি সৌভাগ্যবতী এই বোধ আমাকে পরম তৃপ্তি দেয়। পঙ্গু স্বামীর ঘর করে লোকের বাহ্বা আমাকে লোভী করে তোলে। আমি আমার সহ্যশক্তি বাড়িয়ে নিই। কর্তা তার কতৃত্ব বাড়াতে থাকেন সমানতালে। সুযোগ পেলে কারণে অকারণে অকথ্য ভাষায় অপমান অপদস্ত করেন। দোষ জানতে চাইলে বলেন, আমার দান দক্ষিণার স্বভাব তাঁর পছন্দ না। তিনি রাগ হলে বকেন এটাকে আমি যেন বড় করে না দেখি। মনে মনে ভাবি আহারে! আমিই অসহিষ্ণু! আমারই আকল জ্ঞান কম। পঙ্গু মানুষ আমাদের জন্য কতো কষ্ট করে রোজগার করছেন আর আমি কিনা দুটো কটু কথা শুনেই মন খারাপ করি!অপরাধ বোধে ভুগি। কিন্তু আমার পোষ্যদের ফেলতে পারিনা। এটা আমার অক্ষমতা। সবকিছু মিলে দিনগুলো দারুণ সুখের না হলেও মন্দ ছিলোনা। একদিন করোনা হানা দিলো আমার শতছিন্ন ভাঙা ঘরে। সবাই আক্রান্ত হলেও তিনি ছাড়া কারুরই তেমন সিরিয়াস কিছু হয়নি। তাকে আইসিউতে ভর্তি করতে হলো। ভিজিটিংয়ের সময় মানুষটা সাব কনশাসে থেকে ও আমাকে ইশারা করে বলেন ‘বাড়ি যাব’। আমি তাঁর সামনে কাঁদতে চাইনা কিন্তু চোখের পানি বাঁধ মানেনা। এই মানুষটা চব্বিশ ঘণ্টা আমার উপর নির্ভরশীল ছিলো।একটা কাঁটা ফুটলেও সহ্য করতে পারতেন না। সে মানুষ কেমন করে এতোগুলা যন্ত্রের খোঁচাখুঁচি সহ্য করছেন? সামনের বেঞ্চিতে শুয়ে দিনরাত কাঁদি আর ভিজিটিং আওয়ারের জন্য অপেক্ষায় থাকি কখন তাকে একটু দেখতে পাব। তাঁর প্রাণপ্রিয় ছেলে মেয়েরা তার জন্য আমার মতো কাঁদেনি। অথচ এই লোকটিই আমাকে তাঁর সম্পদের কানাকড়ি ও দেয়নি। বাচ্চাদের নামে দলিল রেজিস্ট্রির পর পথিমধ্যে তাকে বোঝালাম বাচ্চাদেরকে এখন বলার দরকার নেই। ওরা বিগড়ে যেতে পারে। তিনি বাড়ি এসে সে কাজটিই যতদ্রুত সম্ভব করলেন এবং  বাচ্চাদেরকে হুশিয়ার করে বলেছেন তোদের মা সবকিছু মানুষকে দিয়ে দিবে। তোরা খেয়াল রাখিস। যার নতিজা আমার সদ্য কিশোর ছেলে দেখাতে শুরু করেছে। ভুলে গেছিলাম এই লোকটিই অঢেল ধন সম্পদ থাকা স্বত্তেও আমাকে একতোলা স্বর্ণ দিয়ে সম্মান দেখাননি। ভুলে গেছিলাম এই লোকটিই আমার অষ্ট্রপ্রহর বিষিয়ে তুলতো। শুধু মনে হতো মানুষটা কষ্ট পাচ্ছে। তার আরামের জন্য আমি কি না করেছি?  সৃষ্টিকর্তাকে বলেছি তার কষ্টগুলো আমাকে দাও।শহরের সব বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের জড়ো করলাম তাকে বাঁচানোর শেষ সম্ভাবনাটুকু ও যেন হাতছাড়া না হয়। শেষ রক্ষা হয়নি। তিনি আমাকে নিষ্কৃতি দিলেন নিত্যকার অসহনীয় অবহেলা থেকে। আমি কোন এক অদ্ভুত কারণে শূণ্যতায় ডুবে গেলাম। ঝগড়া করার জন্য, অকারণে বকা দেওয়ার জন্য মানুষটাকে ছাড়া আমার চলবেনা। খাঁ খাঁ বিরান ঘরে যেন তাঁর চিৎকার, চেঁচামেচি, কটুবাক্যগুলি প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। হাউমাউ করে কাঁদতাম। কাঁদতে কাঁদতে দাঁতের পাটি লেগে যেত। জ্ঞান ফিরলে নিজের সাথে বোঝাপড়া করতাম কেন এই মূর্চ্ছনা? তাঁর সাথে প্রেম হয়নি কখনো, ভালোবাসা ও না। বন্দনের শেষ সুতাটা ও আলগা হয়েছে বহু আগে। তাহলে কিসের জন্য শোকে চূর্ণ হয় বুক? আমার সত্তা নিরুত্তর! নিজেই নিজেকে সুধাই তবে কি আমরা পরস্পরের অভ্যেস?  সেই মানুষটি ও একটা রাত কোথাও তিষ্ঠাতে পারতোনা পঙ্গুত্বের আগেও। অথচ সে আমার মুখোমুখি বসতেন যেমন করে জীবনানন্দ বনলতার মুখোমুখি বসেছিলেন।  যত্ন করে বলতেন আমাকে তাঁর মানুষ হিসেবে খুব পছন্দ স্ত্রী হিসেবে নয়, কারণ তার মানসকন্যার মতো তীক্ষ্ণ নাক, টানা চোখ, ধারালো চিবুক কোনটিই আমার মুখে নেই। আমি হতাশা লুকিয়ে মৃদু হেসে বলতাম বাদ দেন, দিন চলে যাচ্ছে। তবে একটা কথা বলি কিছু মনে করবেন না। আপনার বয়সী অন্য  লোকেদের আমার কাছে বৃদ্ধ মনে হয় কিন্তু আপনাকে কখনো মনে হয়নি। চোখে পড়েনি আপনার কুঁচকানো চামড়া। এমনকি চলাফেরা অক্ষম বলেও বোধ হয়না যে সব ছেড়ে ছুঁড়ে যেদিকে দু’চোখ যায় চলে যাই। তিনি মৃদু হেসে পাল্টা জবাব দিতেন তোমার এই গুণই আমাকে তোমার কাছে আটকে রাখে! আমি খুশিতে আরও গুণী হতে চেষ্টা করতাম।মোটামুটি এই ছিল আমার আর তাঁর রসায়ন। ছেলে মেয়ে সংসার ভেসে যাচ্ছে, আমি তাঁর তিক্ত স্মৃতির কাতরতা ছেড়ে বেরুতে পারিনা। ডাক্তারের শরণাপন্ন হলাম। তিনি আমার পারিবারিক ডাক্তার। হিস্ট্রি জানতেন তাই কিছু বলতে হলোনা। এন্টিডিপ্রেসেন্ট নিয়ে বেঘোরে ঘুমালাম তিনমাস। শোক, দুঃখ, আনন্দ কিছুই আর বোধের মধ্যে রইলোনা। ভেবে দেখলাম এভাবে ঘুমিয়ে কয়েকমাস চলতে পারে কিন্তু পুরো জীবনতো নয়। ঔষধ ছাড়া বাঁচার উপায়  জানতে চাইলাম ডাক্তারের কাছে,  তিনি পরামর্শ দিলেন বিয়ে করতে। প্রথমে পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা ভেবে মন সায় দিলোনা, এদিকে ঔষধ বন্ধ করার পর শরীর মন কোনটিই আর কথা শুনছেনা। সারা জীবন তাদের দাবিয়ে রেখেছিলাম বলে এখন তারা আমায় শাস্তি দিতে বদ্ধপরিকর। সাহস করে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলাম। একজনের সাথে বন্ধুত্ব হলো, তার নাম অয়ন। ডিফেন্সে আছে। আমার লেখা পড়ে অনেকদিন থেকে। আমার লেখা নাকি তাকে চৌম্বকীয় আকর্ষণ করে। টুকটাক কথা হয়। সে তার কথা বলে, আমি আমার। কথায় কথায় দুজন দুজনের অনেক কিছু জানতে পারি। অয়নের বাল্যবন্ধু সোমার সাথে কিভাবে তার প্রেম হয়, কতো খুনসুটি, হাসি আনন্দে তারা কলেজ জীবন কাটায় সেসব গল্প সে আমাকে খুলে বলে। হঠাৎ করে তার বাবার মৃত্যুতে জীবন তাকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। ভালো ফিটনেস থাকায় মেধাবী অয়ন চাকরি পায় নেভিতে। সোমার সাথে পারিবারিকভাবে বিয়ের পাকা কথা হয়। সোমা ঢাকায় পড়াশোনা করে আর অয়ন চট্টগ্রাম পতেঙ্গায় সমুদ্রসীমা রক্ষায় প্রশিক্ষণরত। চাকরি পারমানেন্ট হওয়া পর্যন্ত বিয়ের জন্য অপেক্ষা। হঠাৎ একদিন অয়ন ফোন করে সোমাকে পায়না। ফোন ধরে সোমার বড় বোন। অয়ন জানতে পারে সোমা তার কোন এক বন্ধুকে বিয়ে করে ফেলেছে। পৃথিবী বদলে যায় অয়নের। এ প্রতারণা সে মেনে নিতে পারেনা। মা বোন, বন্ধু স্বজন সবার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয় সে। একবছর বাড়ি যায়না। বাড়ি গেলে সোমার সাথে কাটানো স্মৃতিগুলো জীবন্ত হয়ে উঠবে এই ভয় মনে! তার বিধবা মা’র কান্না ও তাকে গলাতে পারেনা। আসলে বিচ্ছেদ পরবর্তী সময়টা এমন থাকে যেন চোখের আলো আছে দেখার দৃষ্টি নেই! অদ্ভুত কষ্ট, দুঃখ, শূন্যতার সীমারেখা কোন দিকচক্রবালে গিয়ে ঠেকে মানুষটি তা বুঝতে পারেনা। মজার ব্যাপার হলো; সত্যি এটাই, সময়ই গিরিখাতে ফেলে আবার সময়ই টেনে তোলে। তাই কিছুই চিরস্থায়ী নয় এটুকু মাথায় গেঁথে নিতে পারলেই বোধহয় মুক্তি! যা কিছু আমরা নিজের বলে বিশ্বাস করি তা একমুহূর্তে যখন পর হয়ে যায় মনকে তা মানানো ফটাফট টাইপ করে কিছু নীতিবাক্য লেখার মতো সহজ নয়। যা-ই হোক একসময় অয়নও জীবনের মূলস্রোতে ফিরে আসে। মা, ভাই-বোন আর চাকরি এই নিয়ে পৃথিবী সাজায়। একদিন অয়ন আমাকে বলে, আমি মেয়েদের এড়িয়ে চলি, ভয় হয় খুব!  কিন্তু আপনাকে খুব ভালো লাগছে, এড়িয়ে যেতে পারছিনা। বললাম এড়িয়ে যাওয়ার দরকার কী? আমি সাঁইত্রিশ বছর বয়সী বিধবা আর তুমি ত্রিশোর্ধ যুবক, আমার সাথে তোমার বড়জোর বন্ধুত্ব হতে পারে। বিশেষ কিছুতো নয়। জবাবে অয়ন বলে, জানিনা। মনে মনে ভাবি আমি আত্মবিশ্বাসী, আমি জানি আমার দ্বারা আর যা-ই হোক অয়নের ক্ষতি হবেনা। এভাবে বেশ কিছুদিন পর অয়ন আমাকে বিয়ের প্রপোজাল দেয়। এক শব্দে না বলি কেননা ঐটুকুন ছেলের জীবনটা নষ্ট করার কোন ইচ্ছে নেই আমার। তাছাড়া আমার চাই একটি শক্ত কাঁধ যাতে নিশ্চিন্তে মাথা রেখে একঘুমে বাকী পথের জার্নিটা শেষ করতে পারি। ওতো নিজেই দগ্ধ!  কিন্তু ও নাছোড়বান্দা, তার আমাকেই চাই। একসময় হার মানলাম নিজের ভেতরের অর্বাচীন হরমোন আর অয়নের জেদের কাছে। সে নাকি আমার কান্নাভেজা চোখের মায়ায় পড়ে গেছে। বললাম আমি তোমাকে সন্তান দিতে পারবোনা তার জবাব পৃথিবীতে সবাই কি বাবা হয়?  বললাম আমার মেনোপজের সময় সন্নিকটবর্তী তার জবাব তোমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমুতে পারলে আর কিছু লাগবেনা! এরকম রোমান্টিক আলাপচারিতা একটি সম্পর্কের টুইস্ট হলেও মূল ভীত নয়। বাচ্চাদের স্কুল, কোচিং, ঘর বাহির মিলিয়ে আমার দম ফেলার ফুরসৎ নেই। দিনে আমি সময় পাইনা বললেই চলে। রাতেও বাচ্চাদের পড়াশোনা শেষ হলে ওদের খাইয়ে, আনুষাঙ্গিক কাজ সেরে ঘুমাতে যেতে মিনিমাম বারোটা বেজে যায়। শুলেই চট করে ঘুম আসেনা আমার। হয় দু’চার লাইন পড়ি অথবা লিখি। ফোনের কল্যাণে বাতি নিভিয়ে বাচ্চাদের পাশে শুয়েই দিব্যি কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। আমার এ অভ্যেসগুলি পরিবার,আত্মীয় স্বজন সবাই জানে। আর জানে আমার সীমারেখা,তাই কেউ কিছু মনে করেনা। কিন্তু মনে করছে অয়ন। সে সিভিল ডিফেন্সের মানুষ। তার জীবনযাত্রা ঘড়ি ধরে চলে। সে কিছুতেই আমার জীবন যাপন সূচী মেনে নিতে পারেনা। যেহেতু আমি লেখালেখি করি। পাঠকের মন্তব্য পড়ে ও সে হতাশ। অনেকেই আবেগঘন মন্তব্য করেন। অয়নের ধারণা আমি রাতজেগে লোকজনের সাথে চ্যাট করি, আমার প্রচুর বন্ধু আছে। শুনে কান ঝাঁঝাঁ করে। আমার এতো বছরের একলা জীবনের সব গল্পই তাকে বলেছি। তাহলে সে আমাকে কতোটুকু বুঝলো? না-কি পুরুষ তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত বুঝতে চায়না? আমি দ্বিধান্বিত জীবনের নতুন অধ্যায় নিয়ে। এই মধ্য চল্লিশে এসে নিজেকে বদলানো কি সম্ভব? যার জন্য নিজেকে খোলস বন্দি করতে হয় তার সাথে জীবন কতটা সুখের হবে? এক কোপে গাছ কাটা যায়না এটা ভেবে তাকে বোঝাই যে, তুমি আমাকে জানোনা বলেই এমন ভাবছ। যখন জানবে এরকম ভাবার জন্য অনুতপ্ত হবে। সে সরি বলে, আর আমাকে বলে রাতে নেট অফ করে ঘুমাতে।আমি ও মেনে নেই। কেননা ছোট্ট একটা যন্ত্রের প্রভাব জীবনে পড়তে দেওয়া ঠিক হবে না। আমার একাকীত্ব দূর করার জন্যতো একজন মানুষকেই চাই! কাজের ফাঁকে অয়নকে কল দিই, সে কখনো রিসিভ করে কখনো করেনা। পরবর্তীতে কল ব্যাক ও করেনা। আমি তাকে বলি যে আমারতো প্রেম করার বয়স নেই। এসব ছেলেমানুষি আমাকে মানায়না, তুমি বাড়িতে কথা বল। তার উত্তর হলো আমার সময় হলে আমিই তোমাকে বলব।শুনে আমি হতভম্ব! সবেতেই সে, তার ইচ্ছে, তাহলে আমি কোথায়? আমার অস্তিত্ব কোথায়? একজন গত হয়েছেন তার পৃথিবীতে ও আমি কোথাও ছিলামনা। তাঁর ইচ্ছে আর তাকে প্রতিষ্ঠিত করাই ছিলো আমার কাজ। তাহলে পুরুষ মানে কী “যে লাউ সে কদু”?হোক সে স্বৈরাচারী স্বামী, হোক সে দেবদাস প্রেমিক!  নিজেকে বোঝাই এভাবে ভাবতে নেই। তার জন্য এই অসম সম্পর্ককে বাস্তব রূপ দেওয়া সত্যিই কঠিন! আমি অপেক্ষা করি অয়নের কখন সুযোগ হবে সেই মহেন্দ্রক্ষনটির জন্য।আমার ছেলের বয়স পনেরো বছর, মেয়ের তেরো বছর। আমি ওদের সাথে কথা বলি যে, আমি তাদের বাবার মৃত্যুতে একা হয়ে গেছি। আমার মধ্যে একাকীত্ব গেঁড়ে বসেছে। ডাক্তার আমাকে বিয়ে করতে বলেছেন। সবশুনে মেয়ে বললো আম্মু তুমি যেভাবে ভালো থাক তাই কর। ছেলে অগ্নিশর্মা হয়ে বললো, অবশ্যই তোমার অধিকার আছে বিয়ে করার কিন্তু তুমি বিয়ে করলে আমি কি করব আমি নিজেই জানিনা,আমি বুঝব তুমি আমাকে কখনো ভালোবাসনি। যা খুশি করে ফেলবো। আমি তখন বাকরুদ্ধ! ছেলেকে শান্ত করার মত শব্দ খুঁজে পাইনা। সেদিন ছেলে আমার দানাপানি  মুখে দেয়নি, চোখ দুটো রক্তজবার মত লাল হয়ে আছে, দেখে বোঝা যাচ্ছে ও লুকিয়ে কাঁদে!. আমার মুখেও সেদিন আর কিছু রোচেনি।সারারাত দুচোখের পাতা এক করতে পারলামনা। শুধু ভেবেছি, বাচ্চাদের ভালোভাবে মানুষ করার জন্যই ভালো থাকতে চেয়েছি, আরও ক’টা বছর বাঁচতে চেয়েছি। আমার ভালো থাকা যদি ওদের কচি মনে কষ্টের কারণ হয় তাহলে ও কি আমি সত্যিকার অর্থে ভালো থাকতে পারব?  নিজের সাথে বোঝাপড়া করলাম। না বিয়ে করবোনা। ছেলের চোখে ঘৃণা দেখে, মেয়ের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে আমি ভালো থাকতে পারবোনা। অয়নকে মেসেজ লিখলাম। সবশুনে সে চুপ করে ছিলো। আমি ভাবলাম যাক বিষয়টি ও স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে। সকালে ছেলের সাথে বসে কথা বললাম। বললাম বাবা তুমি কষ্ট পাও এমন কিছুই আমি করবোনা। তার চোখে মুখে শংকা!

আমি আর বেশি কিছু বললাম না। বুঝলাম ওর সময় লাগবে। এদিকে বিয়ের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে আমি যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। জোর করে আর যা-ই হোক প্রেম ভালোবাসা হয়না। অয়নকে হারানোর কষ্ট হলোনা একটুও। শুধু একজন মানুষকে কথা দিয়ে রাখতে পারিনি তাই অপরাধ বোধ হচ্ছিল। বুঝলাম আমার দাম্পত্য স্থির হয়েছিল একজনের সাথেই। দুর্ভাগ্যক্রমে সেটি সুখের হয়নি যদি ও। তাঁর জীবদ্দশায় সতেরো বছর, আর তার দুর্বিষহ স্মৃতির সাথে যতদিন বাঁচি সংসার করব। এ আমার পদবী না হলেও নিয়তি। অয়ন আমাকে কিছু  না বললেও নিজের টাইমলাইনে আমার দিকে ইঙ্গিত করে বিভিন্ন পোস্ট করতো। আমি পড়তাম আর অপরাধবোধে ভুগতাম। প্রায় একমাস পর সে আমাকে মেসেজ লিখলো, দেখা করতে চায়!আমি বললাম এখন আর দেখা করা ঠিক হবেনা। সে বললো এতো অহংকার ভালো নয়, আমাকে বিয়ে করবেনা ঠিক আছে কিন্তু বন্ধু হিসেবেতো দেখা করতে পারো। আমি রাজি হইনি, কারণ ছেলেটাকে মায়ায় জড়ালে তার ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সে আমাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল শুরু করল। প্রথমে বলল আমার মৃত বাবার কসম! মায়ের দুধের কসম! আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তোমার জন্য অপেক্ষা করবো! তোমাকে না পেলে কখনো বিয়ে করবোনা। বোঝালাম যে এটা আবেগীয় সিদ্ধান্ত। আমি দুটো অবুঝ বাচ্চার ইচ্ছেকে সম্মান জানানোর জন্যই তাকে না বলেছি। তারপর সে বলল তোমাকে না পেলে আমি বিষ খাবো!এবার সত্যিই ভয় পেলাম! তাকে কল দিলাম। বললাম তুমি আমাকে বিপদে ফেলতে চাও কেন?  আমার বাচ্চাদের আমি ছাড়া কেউ নেই, তুমি প্লিজ এমন করোনা!সে কথা বলতে পারছেনা হাউমাউ করে কাঁদছে!  আমি হুটহাট কাঁদতে পারিনা। কিন্তু হতবিহ্বল লাগছিলো। এই ছেলেটি হয়তো আমাকে সত্যিই ভালোবেসেছে! কিন্তু আমি যা পাবার আশায় পুনরায় বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলাম তা দেওয়ার মতো মনস্তাত্ত্বিক ক্ষমতা ওর নেই। ছোটবেলা থেকে ও যা দেখে বড় হয়েছে সে পারিপার্শ্বিকতার বাইরে গিয়ে একজন মহিলাকে যথাযোগ্য সম্মান দেওয়ার মনোভাব ওর মনোজগৎ অর্জন করতে পারেনি। একই ভাবে আমার ছেলেরও স্ত্রীর প্রতি তার বাবার আচরণবিধি দেখে বড় হওয়া মনোজগৎ উৎকৃষ্ট মনোভাব অর্জন করতে পারেনি। হয়তো আর কখনো পারবেনা। আমি এটুকু বুঝেছি এ পোড়া দেশে পুরুষ পুরুষই থেকে যায় প্রেমিক হতে পারেনা। আমি হয়তো উপন্যাসের দীপাবলি নই তাই সব ছেড়ে ছুঁড়ে বেরিয়ে যেতে পারিনা। রয়ে গিয়ে ও কতোটা আছি সেটাই প্রশ্ন?

অয়নকে ব্লক করলাম সব সংযোগ থেকে….

২১০জন ৩২জন
0 Shares

৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন



লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য




ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ