তবুও তুমুলভাবে জীবন ভালোবাসি

রিমি রুম্মান ৭ জানুয়ারী ২০২১, বৃহস্পতিবার, ০২:২৩:১৮অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৬ মন্তব্য

কয়েস আমার পাড়ার ছেলে। একই পাড়ায় বেড়ে উঠলেও কোনোদিনই কথা হয়নি তাঁর সাথে। আসা-যাওয়ার পথে আমাদের দোতলায় ঝিম ধরা দুপুরে কিংবা সন্ধ্যার বেলকনিতে তাকাতো সে। চোখে চোখ পড়লে মাথা নুয়ে হেঁটে যেত বিশাল আকাশের নিচ দিয়ে। এইচ এইচ সি’র পর আমরা অনেকেই চাঁদপুর শহর ছেড়ে যাই। বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। কয়েস কোথায় ভর্তি হয়েছে জানা হয়নি। ছাত্রাবস্থায় আমেরিকা পাড়ি জমিয়েছি যদিও, কিন্তু আব্বার কাছ থেকে পাড়া-প্রতিবেশিদের খবর পেতাম ফোনে। একদিন জেনেছি কয়েস আমেরিকায় থাকে। কোন শহরে থাকে সে খবর নেয়া হয়নি। দূরবর্তী হাওয়ার মতো ছিল হয়ত কোথাও।

রমজান কিংবা ঈদ এলে আব্বা বলতেন, ‘ কয়েস মসজিদের জন্যে টাকা পাঠাইসে, তুই পাঠাইবি কিছু ?’ মসজিদটি আমার ধর্মীয় শিক্ষার পবিত্রস্থান। তাছাড়া মসজিদের জন্যে টাকা পাঠানো মানে, সংস্কার কাজ করানো, গ্রীষ্মের তপ্ত দিনে মুসল্লিদের নামাজের সুবিধার্থে ফ্যান লাগানো কিংবা বর্ধিতকরনের কাজ করানো। এমন মহৎ উদ্যোগের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করতাম আব্বার উৎসাহে।

একদিন জানতে পারি বৈধ কাগজপত্রের কূলকিনারা করতে না পেরে কয়েস দেশে পরিবারের কাছে ফিরে গেছে। যেন বিকেল নামার আগেই ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছে। আব্বার মৃত্যুর পর পাড়া-প্রতিবেশির আর কোনো খবর পাই না। গত ৩০শে ডিসেম্বর হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে কয়েসের মৃত্যু হয়। বন্ধুদের ফেসবুক পোস্টের ছবিতে দেখি, সাদা কাফনে ঢাকা কয়েসের শরীর। মুখের একাংশ খোলা। অনন্ত ঘুমে ঘুমিয়ে আছে সে। পাশে কবরের ছবি, যেখানে অন্তিম শয়নে শায়িত করা হয়েছে তাঁকে। যেন সমস্ত পৃথিবীর দিকে চোখ তুলে চেয়ে আছে বিষণ্ণ আঁধার, সদ্য মাটিচাপা দেয়া এক কবর। এই প্রথম আমি ধূসর কুয়াশার মাঝে শৈশব, কৈশোর খোঁজার মতো করে কয়েসের ফেসবুক আইডি খোঁজার চেষ্টা করি।

চেনা কেউ মরে গেলে, চিরতরে আড়াল হয়ে গেলে মনে হয় কেনো খোঁজ নেয়া হলনা! জীবনানন্দ দাশের কবিতার পঙক্তির মতো, ‘ যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের, মানুষের সাথে দেখা হয় নাকো তার…’। এই যে ফড়িং নামের অদ্ভুত সুন্দর সৃষ্টিকে প্রায়শই উড়ে বেড়াতে দেখি, অথচ তাদের জানা হয়না কোনদিনই। না জানার মাঝেই জীবন সমাপ্তিরেখা টেনে দেয়। তবুও জানা আর না জানার দোলাচল পেছনে ঠেলে আমরা তুমুলভাবে ভালোবাসি জীবন।

ডিসেম্বর এলে আমৃত্যু রুমিকে মনে পড়বে। কয়েসকে মনে পড়বে। ক্রমাগত আরও কাউকে। কিংবা কেউ আমাকে। তারপর একে একে সব বাতি নিভে গেলে পরে, আঁধারের দিকে পাশ ফিরে কাটিয়ে দিব অনন্তকাল।

 

রিমি রুম্মান

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

২৫৬জন ১৬০জন
0 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য