‘চার্লস ডিকেন্স’-এর বিখ্যাত নভেল ‘অলিভার টুইস্ট’

সে সময়ের ব্রিটেনের সামাজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি এবং  ‘দারিদ্র্যের দুরাবস্থা’

নার্গিস রশিদ

বাড়ি না   থাকাতে  রাস্তায় রাত্রি যাপন

চার্লস ডিকেন্স  নামটি আমাদের কমবেশি সবারই জানা। তার সেই বিখ্যাত নভেল ‘অলিভার টুইস্ট’ ছবিটি দেখেনি এরকম মানুষ খুব কমই আছে। তার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন সেই সময়ের মানুষের জীবনচিত্র, দারিদ্র, কঠোর জীবন; যা মন ছুয়ে যায়। জীবনের কষ্টগুলো ফুটিয়ে তুলতে কেন  পারদর্শী হয়েছিলেন এই  লেখক! কারণ তিনিও বড়ো হয়েছেন এই দারিদ্রের মধ্যে দিয়ে।
‘দারিদ্র হচ্ছে দাহ, আপনি এটাকে দেখেন না, জানতে হলে আপনাকে যেতে হবে এর মধ্যে দিয়ে।’ ‘আদাবওয়া’  নামে এক ঘানার লেখক বলে গেছেন।
ভিক্টোরিয়ান এরা :
১৮৩৭- ১৯০১ সময়টিকে বলা হয় ‘ভিক্টোরিয়ান এরা’ । সময়টি যদিও ছিল শান্তিপূর্ণ এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে দ্রুত উপরের দিকে উঠার, কিন্তু সমাজে ছিল শ্রেণি বৈষম্য । উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং দরিদ্র শ্রেণি ।
দরিদ্র শ্রেণি ধনীদের কলকারখানায় কাজ করত, ধনীরা প্রফিট বানাত সস্তা মজুরি দিয়ে। যাকে বলা হয় শ্রম চুরি ।  ভিক্টোরিয়ান ক্লাশ বেশড সোসাইটি ব্রিটেন,  সেসময়  পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে  একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিল। দ্রুত শিল্পে উন্নত একটি রাষ্ট্রে যেখানে ধনী ছিল খুবই ধনী আর চারভাগের তিন  ভাগ জনসংখ্যা ছিল ওয়ার্কিং ক্লাশ । ইন্ডাস্ট্রি পরিচালনার জন্য এই দরিদ্র জনগোষ্ঠিকে কাজে লাগিয়ে ইন্ডাস্ট্রি প্রসার করতে সুবিধা হয়েছিল। দেশের ৮০% দরিদ্র জনসংখ্যা ইন্ডাস্ট্রি ছাড়াও ধনীদের  বাড়িতে মেড হিসাবে কাজ করত। ধনী পুরুষ মানেই তাদের বিচরণ ছিল রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ, অনেক টাকার বেতন, প্রপার্টি বা ইন্ডাস্ট্রির  মালিক। কিন্তু  ভিক্টোরিয়ান আমলের প্রথম দিকে দারিদ্র ছিল প্রকট। বাড়ি-ঘরহীন, চিকিৎসার সুযোগ না থাকা, অস্বাস্থ্যকর নোংরা পরিবেশ, সুপেয় পানির অভাব, শীতে গরম কাপড়হীন অবস্থায় দরিদ্র জনগোষ্ঠি দিন কাটাত।
শিশু মৃত্যুর হার :
১৮৪০ সালে দিকে প্রতি ছয়জন শিশুর মধ্যে একজন মারা যেত পাঁচ বছর হওয়ার আগেই। প্রতি ছয়জনের তিনজনই মারা যেত জন্ম জটিলতার কারণে জন্ম হতে গিয়ে।
দেশান্তর ( Migrant) :
দারিদের কারণে ভালো জীবনের আশায়   দলে দলে লোক দেশান্তর হতো। দেশান্তর হওয়ার পেছনে আর একটা কারণ ছিল; ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য। ১৮১৫ থেকে ১৯১৪  পর্যন্ত ১০ মিলিওন লোক ব্রিটেনে দারিদ্রের কষাঘাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দেশান্তর হয় ।
লেডি অফ দি লেজার :
উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির মহিলারা সব কাজ কাজের মানুষ দিয়ে করাতো এবং তারা  বাইরে চাকরিও করত না। জীবন ছিল ‘লেডি  অফ দি লেজার’  যার ফলশ্রুতিতে তারা অবিসিটি (অতিরিক্ত মেদ )-তে পরিণত হতো।
‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’
 দারিদ্রের কষাঘাত, অমানুষিক খাটুনি, অল্প মজুরির দরিদ্র শ্রেণি এই কঠিন জীবনকে ভুলে থাকার জন্য  অপিয়াম জাতিও ড্রাগ সেবন এবং মদ পান করে মাতাল হয়ে পড়ে থাকতো, শুধু কষ্ট ভুলার জন্য। দুর্ভাগ্যবশত ক্ষুধার জ্বালা এবং কাজ না থাকার জন্য অনেক মেয়েকে বেশ্যাবৃত্তি করতে হতো।
 
শিশু শ্রম :
শিশু শ্রম  এবং রাস্তায় দরি বেঁধে নিদ্রা 
দরিদ্র ভিক্টোরিয়ানরা অল্প বয়েসে উপার্জনের জন্য সন্তানদের কাজে প্রবেশ করিয়ে দিত । ১৮৪৮ সালে ৩০,০০০ গৃহহীন পরিবার রাস্তায় বা নোংরা খুপরিতে অস্বাস্থ্য পরিবেশে গাদাগাদিভাবে টয়লেট/গোছলখানা  ছাড়া পরিবেশে বসবাস করত।
২৫% জনসংখ্যা দারিদ্র সীমার নিচে বাস করত। এই অবস্থায় পড়ার জন্য কারণ ছিল অধিক সংখ্যক সন্তান, প্রধান উপার্জনকারীর মৃত্যু বা অসুস্থ হওয়া, শারীরিক অক্ষমতা অথবা কাজ না থাকা, বাবার পরিবার থেকে পলায়ন অথবা জেলে থাকা।
অলিভার টুইস্ট :
চার্লস ডিকেন্স  (Charles Dickens) :
চার্লস ডিকেন্স তার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এই দারিদ্রতার বিখ্যাত নভেলে ফুটিয়ে তুলেছেন এবং তা দিয়ে ছবি বানিয়েছেন। এক এতিম বালক যার জন্মের সময় মা রাস্তায় পড়ে থাকা অবস্থায় মৃত্যু হয়। পিতৃ পরিচয়হীন অবস্থায় এতিম খানায় সে বড়ো হতে থাকে। দৃশগুলোতে দেখা যাচ্ছে এতিমখানায় বাচ্চাদের আধপেট খাবার দেয়া হচ্ছে। ক্ষুধা থাকাতে আর একটু খাবার চাওয়াতে কীভাবে তাদেরকে গালিগালাজ করা হচ্ছে। এক দৃশে একজন মহিলাকে স্বামীর হাতে বিনা কারণে মারধর এর শিকার  হতে হচ্ছে। অথচ পালাবার স্থান না থাকাতে সে অবস্থাতেই তাকে দিন অতিবাহিত করতে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে পথশিশুদের দিয়ে থাকা খাবারের বিনিময়ে চুরিবিদ্যা শিখিয়ে  এবং তাদের দিয়ে চুরি করিয়ে গ্যাং নেতা ব্যবসা করছে।
স্ট্রাগল, জীবন যুদ্ধ, হার্ডশিপ, শ্রেণি বৈষম্য, অবিচার, অত্যাচার এবং শিশুশ্রম এই গল্পের প্রতিবাদ্য  বিষয়। বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে তা তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন।
এইভাবে তিনি দরিদ্র মানুষের জীবন, ম্যাটারনিটি হাসপাতালে প্রয়োজনিয়তা, অসহায় স্বামীর হাতে  অত্যাচারিত মহিলাদের মহিলা হোস্টেল কেন দরকার, শিশুশ্রম বন্ধ করা এবং পথ শিশুদের ঠিক মতো ব্যবস্থা না নিলে কী হতে পারে তা দেখিয়ে দিয়েছেন।
এই বইটি প্রকাশ হয় ১৮৩৭-১৮৩৯ এ ।
এর আগে মানুষ এই শ্রেণি নিয়ে বই লিখত না। তাকে এড়িয়ে চলা হতো।  উচ্চবিত্তদের প্রেম-ভালোবাসা ছিল তাদের লেখার বিষয়বস্তু। চার্লস ডিকেন্স দারিদ্রের দুরবস্থা তুলে ধরতে পেরেছেন। কারণ তিনি নিজেও ভুক্তভোগী ছিলেন। তার জন্ম ১৮১২ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি পোর্টসমাউথ এ । ৯ বছর বয়েসে তার স্কুল জীবন আরম্ভ হলেও ১২ বছর বয়েসে স্কুল ছাড়তে হয় জীবিকা অর্জন এর জন্য। জুতো পালিশ করার ফ্যাক্টরিতে তিনি লেবার ছিলেন ।  বাবা ‘জন’-কে জেলে যেতে হয়েছিল দেনার দায়ে। বাবা  ছিলেন একজন সামান্য বেতনের  ক্লার্ক ।
ওয়েলফেয়ার কান্ট্রির উৎপত্তি :
১৯০০ – ১৯১০ সালে ওয়েলফেয়ার কান্ট্রির সূচনা এবং ক্রমাগতভাবে ডেভলপ হতে থাকে। ব্রিটিশ সরকার লিবারাল ওয়েলফেয়ার কান্ট্রির মধ্যে আসতে থাকে। Sir William Beveridge হলেন এর উদ্যোক্তা । দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর লেবার পার্টি ওয়েলফেয়ার কান্ট্রির গোড়াপত্তন হয় । তার উদ্দেশ্য  ছিল সমাজ থেকে দারিদ্র এবং হার্ডশিপ  বিদায় করা।
ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ক্ষমতা হ্রাস এবং কলনিওজম এর বিদায় :
১৮৩২ সালে The reform Act দ্বারা পার্লামেন্টে ডেমোক্রাসি এর জন্ম। ১৯০০ সালে লেবার পার্টির জন্ম, যখন ট্রেড ইউনিয়ন এবং সোসালিস্ট পার্টি ভালো মতো সংঘটিত হয়। রাজতন্ত্রের ক্ষমতা সংকোচিত হয়ে শুধুমাত্র symbolic এবং ceremonial এ পরিণত হয় । ভিক্টোরিয়ান আমলের শেষের দিকে House Of Commons এর ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং House Of Lords শক্তি হারাতে থাকে। যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে এক সময় সূর্য অস্ত যেত না তা চলে যেতে থাকে। এক এক করে সমস্ত কলোনি দেশগুলো স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এই শতাব্দীর শেষ দিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যর  ক্ষমতা কমতে থাকে।
ভিক্টোরিয়ান আমলে পুরুষরা নারীকে মনে করা হতো  দুর্বল এবং ভোগের বস্তু। ক্রমাগতভাবে নারী সংঘ গঠিত হয় । নারী সংগঠন এবং শ্রমিক সংগঠন মাথা চাড়া দিতে  থাকে।
সোসাল সিকিউরিটি বা সামাজিক নিরাপত্তা :
সোসাল সিকিউরিটি  মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা দিল। এর আওতায় আসলো বেকার ভাতা, শারীরিক/মানসিক প্রথিবন্ধক ভাতা,  ফ্রি চিকিৎসা , সিক লিভ , সবার জন্য পেনশন, বিধবা ভাতা, ফ্রি এডুকেশন, সিঙ্গেল মাদার ভাতা, গরিবদের জন্য বৃদ্ধ বয়েসে বিনাপয়সাতে দেখাশোনা, গৃহহীনদের গৃহের ব্যবস্থা।
চার্লস ডিকেন্সদের মতো লেখক লেখার মাধ্যমে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন দরিদ্রদের কষ্ট । তারই পথ ধরে  সমাজে সচেতনা আসে।
‘রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙ্গালের ধন চুরি’
কলোনি দেশগুলো থেকে দরিদ্র কৃষক দিয়ে কাঁচামাল উৎপাদন করিয়ে  নিয়ে আসা, মেশিনারির উৎভাবন এবং স্থানীয় দরিদ্র জনগনকে লেবার  হিসাবে ব্যবহার করে ধনী আরও ধনী হয়েছিল।
তথ্য সূত্র :
Poverty in the Victorian era , Wikipedia
Victorian era History Society and Culture Britannica
ফটো ক্রেডিট :
Victorian era immigration
Malnourished and brutally beaten , Torian Britain Daily Mail On Line
Oliver Twist Drama
উইকিপিডিয়া
৩৬৪জন ৯০জন
0 Shares

১৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য