সন্তানের কিছু হলে সবার আগে জানেন মা।তাইতো মাকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ সন্মানীত আসনে রাখেন এই পার্থিব জগতে সকল ধর্মের অনুসারীরা।সুতরাং মায়ের কোন বিকল্প নেই।জয়ের মা ফুলী সেজদায় পড়ে আছেন ছেলে তা লক্ষ্য করলেন।জয় মাকে আর জাগাতে চাইলেন না সে নিঃশব্দে ঘর হতে বাহির হবার চেষ্টা করেন ঠিক সে সময় গোয়াল ঘরে গরুর খাবার দেয়ার সময় হওয়াতে গরু হাম্বা শব্দ করে তার পরিচর্চা দাতাকে ডাক দিলে সেই শব্দ ফুলীর কর্ণে স্পর্শ করল।অমনি সে জেগে জয়কে দরজা পার হতে দেখলেন তবুও সে পিছু ডাক দিলেন না;শুভ যাত্রায় যদি অমঙ্গল হয়।কিন্তু জয় বুঝতে পেরে সে নিজেই মায়ের নিকট আসেন।
-মা আমাকে এখন বেরুতে হবে।
-কও কি এই না এলে,
-হ’ ঐ অফিসে একটু তাড়া আছে,তাছাড়া আজ কলেজে অনেক ক্লাশ করতে হবে।
-ঠিক আছে দেখে শুনে যেও….ওহ্যা তুমি না টাকাগুলো নিয়ে যাবে।
-না মা থাক,আমি দুপুর দিকে আরেক বার এসে নিয়ে যাব।
-কি জানি তুমি যা ভাল মনে কর।
-আসি মা..আল্লাহ হাফেজ।
-ফি আমানিল্লা…।

কাধে একটি কবি ভাব ব্যাগ ঝুলিয়ে চৈত্রের প্রচন্ড তাপ যুক্ত রৌদ্রে রাস্তার এক পাশে জয় দাড়িয়ে অপেক্ষা করছেন।ঘামে কপাল বেয়ে জল ঝরছে।কিছু ক্ষণ পর পর হাতের এক আঙ্গুলে ঘাম গুলো মুছলেন।দুজনের একটি মটর বাইক আসে সামান্য সময়ের জন্য,চলন্ত অবস্থায় ব্রেক কষলেন জয়ের সামনে।মটর বাইকে এক জনের হাতে মখলম কাগজে মোড়ানো একটি প্যাকেট তার হাতে ধরিয়ে মটর বাইকটি দিলেন স্প্রীডে টান।এরই মধ্যে অপর প্রান্ত হতে ছোট একটি মাইক্রো এসে জয়কে তুলে নিয়ে গেলেন।
চলছে হাওয়ার বেগে মাইক্রোটি।ভিতরে চার জন জয়ের ন্যায় সম বয়সী যুবক।কথা হচ্ছে ফিস ফাস আর তাদের নিজস্ব তৈরী বর্ন মালায় কেননা মাইক্রো বাসটি ভাড়ায় আনা হয়েছে।ড্রাইভারও অচেনা।
ট তে বো ফিক ঠি দু পা মি…এ ভাবে সাংকেতিক ভাষায় যার যে কাজ তাকে সে ভাবে বুঝিয়ে অবশেষে জয়কে বুঝালো তার এক সহ কর্মী।জয় মাথা নেড়ে প্যাকেটটি সহ কর্মী লিটনের হাতে দিলেন।লিটন প্যাকেটটি খুললেন।বের হয়ে এলো একটি সার্কেট প্লেট।নিশ্চিত এটা কোন কারিগরি কাজে ইউজ হবে কোন না কোন নিশানাকে খুজেঁ পেতে।জয় অবশ্য জিজ্ঞাস করেই ফেললেন।
-এটা দিয়ে কি হবে লিটন ভাই?
-এটা এটা দিয়ে কি হবে?সাথেইতো আছেন জানতে পারবেন।কথাটা এড়িয়ে গেলেন সে।ওহ হে সবার সব কথা মনে আছেতো।তবে যাই করবেন ঠান্ডা মাথায় অতি সাবধানে।
সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে আসছে এখনো ছেলের ঘরে ফেরার নাম নেই।মায়ের মন কত ভাবাই না ভাবেন অথচ আমরা সন্তানেরা তার কিঞ্চিৎও ভাবি না।ফুলী গরুগুলোকে গোয়াল ঘরে ঢুকাচ্ছেন ঠিক সে সময় পাড়ার এক ছেলে দৌড়ে আসেন ফুলীর কাছে।
-খালাগো অ খালা হুনলাম জয় ভাইজান আইছে হেয় কই?
-ওতো সেই সকালেই ভার্সিটিতে পড়তে গেছে সন্ধ্যা হয়ে এলো এখনোত ফিরল না!কেন কি জন্যে?
-না ভাইজান কইছিলো হের লগে দেহা করতে..কি কাম বলল আছে।আচ্ছা ঠিক আছে ভাই জান আইলে তুমি কইও আমি আইছিলাম।
-আচ্ছা….
ফুলী গরুর ঘামলায় হাত দিয়ে খাবার মিশানোর এক পর্যায় পশ্চিমের আকাশে অস্তিমিত লাল টুক টুকে রং ধনুর রংয়ে চোখ পড়ল।ভেজাঁ হাতটি কাপড়ের আচলেঁ মুছলেন।ধীর স্থির কিছু ক্ষণ তাকিয়ে রইলেন রক্তিম আভা আকাশ পানে।কত দিন এমন একটি আকাশ দেখা হয়নি রক্তাক্ত আভাগুলো যেনো এ দেশের স্বাধীনতার কথা বলছে,অথচ নেই সেই স্বাধীনতা,নেই জনতার মৌলিক অধিকারগুলো বাস্তবায়নে কোন সরকারের আগ্রহতা।পাঠকদের মনে আছে কি না জানি না এই সেই ফুলী যার প্রতিটি কদমে ছিলো ভাগ্যের বিড়ম্ভবনা।সে এ দেশে এক জন নারী কতটা স্বাধীন কতটা সন্মানীত হয়েছিলেন পুরুষ শাষিত এ সমাজে!তা অনুধাপন করেছেন বিগত তার জীবন চলার বৈচিত্রময় অধ্যায়গুলোতে।অথচ এ দেশের এমন পাগল করা সৌন্দর্যময় প্রকৃতির রূপ দেখলে মনেই হয় না এ দেশের অন্দরে অন্দ্ররে নিঃশব্দ চাপা কান্নার আকুতিঁর দীর্ঘশ্বাস,কোথায় হে আমার স্বাধীনতা!।
সূর্য অস্তিমিত হলো রাতকে স্বাগত জানালো,পাখিরা ফিরছে যার যার নীড়ে,গ্রামের হাট ভাঙ্গছে দলে দলে লোক ফিরছে যার যার ঘরে শুধু তার একমাত্র ছেলে জয় ফেয়ার কোন লক্ষন নেই,,,আসা যাওয়া পথে দূর দিগন্তে ছেলে ফেরার পথ চেয়ে বসে রইলেন নিজ বাড়ীর ঘাটে।

সরকারের গোপন নির্দেশ মতে দেশের প্রতিটি থানায় প্রত্যহ কম করে হলেও আট দশ জন গ্রেফতার দেখাতে হবে নতুবা থানার বড় দাড়োগার বারোটা বাজিয়ে দিবেন!সেই রুটিনওয়ার্কে আজও থানার বড় দাড়োগার নিকট জবান বন্দি দিতে এক এক করে আসছেন সন্ধ্যে বেলায় গ্রেফতার হওয়া বেশ কিছু যুবক।তাদের সেই সারির মধ্যে জয়ও ছিলেন।জয়কে সেই সারিতে একটু বেমান লাগছিল কারন কবি ভাব কাধে ঝুলানো ছয় ফুট লম্বা বিশাল দেহী এই যুবকটির সাথে অন্যরা সবাই বট বৃক্ষের পরগাছা যেন।জয়ের সামনের লোকটিকে ইচ্ছে মত বকা ঝকা করছেন আর বেতের আঘাত করছেন দারোগা বাবু।
-শালা শুয়োরের বাচ্চা…তুই এ নিয়ে কয় বার ধরা খেলি রে?
-এ..ই স্যার এক গন্ডা…।
-কি করেছিস ঐখানে….
-ভাগ্য মন্দ সখিনার লগে দেহা করতে গেছিলাম।
দাড়োগা বাবু উচ্চস্বরে হাসতে হাসতে বললেন।
-হা হা হা হালায় কয় কি!খানকি পাড়ায় ওর সখিনা থাকে…হা হা হা,,,,।যা ভিতরে যা…বলে তার পাছায় এক লাথি দিলেন দাড়োগা।এর পর সামনে এলেন জয়।দারোগা ওর পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভাল করে দেখে মনে মনে ভাবলেন ওনিশ্চিত মালদার পার্টি হবে।
-হুম!দেখেতো মনে হচ্ছে কোন ভদ্র ঘরের ছাওয়াল তা কি নাম তোমার?
-জয়..
দাড়োগা সঙ্গে সঙ্গে চেয়ারে বসা থেকে দাড়িয়ে তাকে স্যালুট করলেন।
-বলেন কি!মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর ছেলে ‘জয়’ আপনি! ।
-না,,,এক অভাগা মায়ের সন্তান আমি।
দাড়োগা আবারো চেয়ারে বসে হাতে লাঠিটি ঘুরাচ্ছেন।
-হুম,,,বুঝলাম তা বাপের নাম কি?
– করিম ভুইয়া,কখনো দেখিনি।মাই আমার সব।
-মানে?
-বাবাকে জন্মেই দেখিনি,মাকে জিজ্ঞাসা করেও কোন উত্তর পাইনি।
-কোথা থেকে গ্রেফতার হলে?
-ভার্সিটি চত্বর থেকে।
-কি করো?
-আমি ঐ ভার্সিটির রাষ্ট্র বিজ্ঞানের শেষ বর্ষের ছাত্র।
-তা রাষ্ট্র পরিচালক আপনাকে যে এখন থেকে জেলে থাকতে হবে।
-কিন্তু কেনো?
-আমাদের কাছে ইনফরমেসনস আছে,,,ভার্সিটিতে কিছু জঙ্গিদের আনা গোনা আছে।সেই সন্দেহে তোমার নামে মামলা হবে।
-না স্যার,আপনি এমন কাজ করবেন না আমাকে ছেড়ে দিন আমার মা আমার জন্য চিন্তা করছেন।
-হুম,ঠিক আছে যদি কাল সকালের মধ্যে তোমার মা থানায় না আসেন তবে তোমাকে কোর্টে চালান করে দিবো।তোমার মাকে খবর দাও।
-হ্যা হ্যা ঠিক আছে আমি খবর দিচ্ছি।
এক সিপাহী তাকে ধরে জেলের ভিতরে ঢুকালেন।কাধে ঝুলানো ব্যাগ থেকে মোবাইলটি বের করে কাকে যেন ফোন করলেন জয়।ঐ দিকে দারোগার কাজ চলতে থাকে।

চলবে…

ঘূণে ধরা সমাজে ফুলীর সন্তানেরা ০১

৫৫৭জন ৫৫৭জন
0 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ