” ঘুম তুমি এসো নিপবনে”

রেজওয়ানা কবির ৪ নভেম্বর ২০২০, বুধবার, ১০:০৯:৫৭অপরাহ্ন রম্য ২২ মন্তব্য

সোনেলায় রুকু আপুর লেখা রম্য পড়ে হাসতে হাসতে  প্রায় পেটে খিল পরে যায় যায় অবস্থা। একটা মানুষ এত সুন্দরভাবে কিভাবে রম্য লেখে? আমিতো বিরহ ছাড়া কিছুই লিখতে পারি না।  আমার এত বিরহ আসে কই থেকে এটাও বুঝি না। ইশ !  আমি যদি রম্য লিখতে পারতাম রুকু আপুর মত। আমার মনে ছোটবেলা থেকেই হিংসা, লোভ এই ২ টি অখাদ্যকর জিনিস নাই বললেই চলে। তবে সুস্বাদুকর খাদ্য “ভালোবাসা আর আবেগ এত বেশী যে যার জন্য প্রতিনিয়তই পেট খারাপ হয়।যাইহোক নিজের প্রশংসা অনেক করলাম😋আসলে বাঙ্গালী বলে কথা,” বসতে দিলে শুতে চায় “।’ সোনেলা ‘একটা প্লাটফর্ম দিয়েছে লেখার, সেখানে মনের মাধুরী মিশিয়ে লেখার ছলে নিজের যত গুনাগুন আছে তা সুযোগে সদ্বব্যবহার করছি। যাইহোক কেউতো আর আমার গুন,ভালো লাগা, ভালোবাসা বোঝে না অগত্যা এই সোনেলাকেই বলে ফেলি।

 

সেদিনও বলেছি আজও বলছি, কিছুদিন থেকে কোন লেখার উপাদান খুঁজে পাচ্ছি না, লেখার উপাদানগুলো মনে হয় কোন গিরগিটি এসে নিয়ে গেছে। এই গিরগিটি আমার এমন সর্বনাশ করল,যে আমার লেখার কলম, খাতা থেকে শুরু করে সব চুরি করে নিয়ে গেল। সব নিয়েছিসতো ভালো কথা, তাই বলে কি আমার বুকের ভিতরের হার্টবিট টাও নিয়ে গেলি😭? এখন আমি না পারি নিঃশ্বাস নিতে, না পারি কোনকিছু লিখতে। ওরে আমার গিরগিটি সোনা,তুমি প্লিজ আমার লেখার উপাদান ফিরিয়ে দাও।

 

পাঠকবৃন্দ,দেখলেনতো, আজ শখ করে  লিখতে চাইলাম রম্য, তারপরও শুরু করলাম বিরহ দিয়ে।ও গড😭 অনেকক্ষন থেকে বিছানার এপাশ ওপাশ করছি শুধুমাত্র ঘুমানোর জন্য। কিন্তু ঘুম আমার জীবনের একমাত্র ও পরম শত্রুু। এই ঘুম না আসার কাহিনীর জন্য দায়ী আমার প্রানপ্রিয় বাবা। আমি যখন কেবল বুঝি, সেই ছোটবেলা থেকেই, যখন রাতে মা আমাকে নিয়ে ঘুম পাড়ানী গান শোনাত, তখন আমি ঘুমের ভান করতাম আর ভাবতাম আব্বু কখন এসে আমাকে নিয়ে যাবে? যখন বেঁচারী আম্মুর গান ঘুমে বন্ধ হয়ে যেত, ঠিক তখনই আব্বু এসে আমাকে নিয়ে গিয়ে কোলে বসিয়ে স্বরচিত কবিতা শোনাত, দেশের সংবাদ শোনাত,নাটক, ছিনেমা দেখে আমাকে বুঝিয়ে দিত। তখন আমি কিছুই বুঝতাম না শুধু চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে থাকতাম আর  আব্বুর পাশাপাশি বসে সারারাত জাগতে পারব এটাই ছিল আমার একমাত্র ও বিশেষ লোভ। এভাবেই শুরু আমার রাত জাগা শেখা।

বাবা, কেন তুমি এই বদঅভ্যাস শেখালে এখন আর চাইলেও এই বদঅভ্যাস থেকে আর বের হতে পারি না। প্রত্যেক রাত আমার ঘুমহীনভাবে কেটে যাচ্ছে। প্রতিরাত ঘুম না হওয়ার কষ্টের চেয়ে  আর কিছু নেই তাই কি আর  করি, কোনদিন অনেক রাতে সাজগোজ করি, নিজের ছবি তুলি, আয়নায় নিজের সাথেই কথা বলি,  আজাদের ঘুমন্ত মুখ আমার সাজানোর ক্রিম, লিপস্টিক দিয়ে সাজিয়ে দেই, কখনো আবার ওর চোখ দুইটা টেনে ধরি, কিন্তু সে ঘুমে অচেতন,কিছুই টের পায় না, ঘুমে ঘুমে শুধু বলে মোনা ঘুমাও, সকালে উঠতে হবে। আজ কি করি, ভাবলাম এত বিরহ আর ভাল লাগছে না, দেখি রম্য লিখতে পারি কিনা?

 

কবুতরের মত অনেক পকপক করলাম।

এখন লেখা শুরু করি,,,,
এবার আসি ২০০৮ সালের ঘটনায়,,,তখন আজাদের সাথে আমার প্রেমের প্রথম দিকের ঘটনা, আমি সবে ভার্সিটি ভর্তি হয়েছি, হলে থাকি, আমরা তিন ক্লোজ ফ্রেন্ড এক রুমে থাকি, যারা হলে ছিলেন তারা সবাই জানেন হল লাইফ এত মজার, এত আনন্দের, এত স্বাধীন যারা পার করেছেন তারা সবাই জানেন। রাত ৩ টায় খিচুরি খাওয়া, কাঠাল,আম চুরি করা, রাতে গেট বন্ধ হলে পাচিল টপকায়ে ভিতরে ঢোকা এরকম কত মজার স্মৃতি । আহা ! আমার যে রুমমেট ছিল ওরাও আমার মত দুজনেই প্রেম করত। তফাৎ হল আজাদ থাকত কুড়িগ্রামে আর ওদের বয়ফ্রেন্ড থাকত ঢাকায়। তাই ওরা সকালে ক্লাস শেষে এই যে ঘুরতে বের হত সারাদিন বাইরে থেকে  হল বন্ধ হওয়ার আগে চলে আসত। আর ওদের প্রেমের গল্প শুনতে শুনতে অনেক  রাত হত। এভাবেই চলছিল আমাদের হল লাইফ। এমনিতেই আজাদ কত দূরে থাকে, দেখা হয় ছয় মাস, তিন মাসে, কখনো বা বছরে একবার। তার উপর সারাদিন সে এত ব্যস্ত থাকে যে কথা খুব কম হয় আমিও এভাবেই এই সম্পর্কে অভ্যস্ত হয়েছিলাম। রাতে আজাদ প্রোগ্রাম করে রাত এক/দুই /তিনটায় বাসায় এসে আমার সাথে ফোনে কথা বলত। তো প্রায় যে ঘটনা ঘটত, সেটা হল,আমি সারাদিন গুছিয়ে নিতাম কি কি কথা বলব,সেইভাবেই শুরু করার পরই,,,,কথা হত এমন,,,
আমিঃ হ্যালো, কি কি করলা?
আজাদঃ হুম কেবল আসলাম, তুমি খাইছো?
আমি ঃ হুম, জানো আজ কি হয়েছে, আমার না,,,,,,,,
আজাদঃ ঘোরৎ ঘোরৎ ঘোরৎ শব্দ।
আমি ঃ হ্যালো,হ্যালো।
ওপাশ থেকে আর কোন সাউন্ড নেই, শুধু নাক ডাকার শব্দ।
এভাবেই কেটে গিয়েছিল প্রায় ৭ বছর।

আমার ছোটবেলার একমাত্র বন্ধু,,,,,,ওই ছিল আমার ঘুরে বেড়ানোর সঙ্গী। একদিন আমরা রিক্সায় টি,এস,সি যাচ্ছি ওকে বলছি তুই এত ঘুমাস কেমনে?
ও ঃঃ কেন? আমি যখনই চাই তখনই ঘুম আসে।
>আমি ঃ যা ভাগ। তারপর মোক্তার ভাইয়ের দোকানে চা খাচ্ছি আমি মনের আনন্দে পকপক করছি, হঠাৎ দেখি, আমার বন্ধু গাছে হেলান দিয়েই নাক ডাকা শুরু করছে, আর আশেপাশের মানুষ সবাই ওর দিকে না তাকিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে আর মিটমিট করে হাসছে। আমি বিরক্ত হয়ে ওরে ধাক্কা দিয়ে ওর ঘুম ভাঙ্গালাম। ঘুম ভেঙ্গে ভাবখানা এমন যে কিছুই হয়নি। রাগে মনে হচ্ছিল,,,,,

শুরু হল কর্মজীবন,,,, আমার অফিসের পিয়ন ভাই, যার কাজ অফিসের কাজ শেষ করে গেটে বসে থাকা। সেদিন সবাই ফিল্ডে গিয়েছি, অফিসে উনি একা, প্রায় ৪ ঘন্টা পর এসে দেখি তিনি চেয়ারে বসে নাক ডাকছে। ওনাকে ডাকলাম, ভঁয়ে তরিঘরি করে উঠল, কিন্তু সেদিন অফিসের টিভি চুরি হয়েছে। চোর ব্যাটা জানত না যে সি সি ক্যামেরা আছে। সি সি ক্যামেরা অন করলাম, দেখলাম পিয়ন ভাই বিভরে ঘুমাচ্ছে আর চোর ব্যাটা তার নাকে মুখে হাত দিয়ে টেস্ট করে টিভি নিয়ে পালিয়েছে। ওরে ঘুমরে,,,,,,,

আমার প্রিয় আত্নার মানুষ যার সাথে কথা বললেই শুধু হাই তোলে, তার মানে আর একটু কথা বললেই নাক ডাকার আওয়াজ পাওয়া যাবে।

এখন সংসার জীবনের পালা,,,,

 

আমি, আজাদ, আর আবুল ভাই রাতে বসে মুভি দেখছি, হঠাৎ দেখি আবুল ভাই চেয়ারে বসে নাক ডাকা শুরু করছে, আজাদ আমার চেয়ে আরও দুষ্টু,সে আবুল ভাইয়ের নাকে কলম দিয়ে সুরসুরি দেয়া শুরু করল, আবুল ভাই ঘত, ঘত, ঘত শব্দ, ভেঙ্গে গেল আবুল ভাইয়ের ঘুম,আবুল তাকিয়ে আছে ফ্যালফ্যাল করে।

আমার বাসার রহিমা বু, প্রতিদিন সন্ধ্যায় রুটি বানায় দেয়, কাজের মানুষ পাওয়া যে কি কষ্টের সেই বোঝে। রহিমা বুকে সিরিয়াল দিয়ে ৫ মাস পর পাইছি, তাও আবার সন্ধ্যায় সে শুধু রুটি বানায়, আর সপ্তাহে একদিন ঘর মুছে, কাপড় ধোয়,মাসে দুইবার মাছ কেটে দেয়, এরকম অনেক শর্ত তার। আমি রুটি বানালে হয় বাংলাদেশের মানচিত্র। তাই রহিমা বুর সব আবদার হাসিমুখে মেনে নেই। আজ রহিমা বু রুটি বানাচ্ছে, আমি মোবাইলে কাজ করছি, আর রহিমা বুর সাথে গল্প করছি। রহিমা বু কানে শোনে না, তাই জোরে জোরে গল্প করছি, কিন্তু ওপাশ থেকে আওয়াজ নেই,আমি মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে  রহিমা বুর দিকে তাকিয়ে দেখি, রহিমা বু রুটি বেলনা হাতে  নিয়ে ঢুলছে আর সরাৎ সরাৎ করে নাক ডাকছে।  হাসবো না কাঁদবো বুঝতেছি না,,,,ঠিক সেই সময় রুকু আপুর ফোন

আমি ঃ হ্যালো !
রুকু আপু ঃশুধু হাসি ! হা হা হা হা
আমি ঃঃ হা হা হা হা
রুকু আপুঃ হাসিস কেন? আমার কথা শোন,
আমি ঃঃ আমার কথা তুমি শোন।
আপুঃ আমারটা শোন, ফোন দিয়েছি প্রতিবেশী বাংলাকে বাংলা কথা বলতে বলতে ঘোরৎ ঘোরৎ আর কোন শব্দ নাই। বেঁচারী বাংলা রুকু আপুর মন রক্ষার্থে আজ একটু বেশী কথা বলতে চেয়েছিল কিন্তু পারল না ঘুমের কাছে হেরে গেল।
আমি ঃ কিভাবে মিরাকেল ঘটল। আমার ঘটনা শোন, তারপর রুকু আপু আর আমার হাসাহাসির পর ফোন রেখে আমি শাশুড়ীর রুমে গেলাম হাসির কাহিনি শোনাতে। শুরু করার ৫ মিনিট পর দেখলাম শাশুড়ী মা আমার বিছানায় শুয়েই নাক ডাকছে বড্ড অসহ্য লাগছে, আশেপাশে এত নাক ডাকা আর ঘুমের ঘটনা কিন্তু আমার এই দুচোখে কোন ঘুম নেই, চোখের সামনে শুধু গিরগিটির আনাগোনা, আর গিরগিটির প্যানপ্যানানি। পাশে আজাদ আবারও নাক ডেকেই যাচ্ছে। রাগে গা জ্বালা করছে,বালিশ দিয়ে ওর নাকে দিলাম চাপা,কিচ্ছুক্ষণ নাক ডাকা বন্ধ তারপর আবার সেই বিরক্তিকর শব্দ,,,,,,  এবার স্ক্রু দিয়ে নাকে  দিলাম টাইট,,,
আজাদঃঃ উফফ ! ব্যথা পাইতো, শুরশুরি লাগে,মোনা ঘুমাও।

ওর জায়গায় আমি থাকলে হয়ত রেগে বকাঝকা করতাম,কিন্তু বেঁচারা এত ভালোবাসে বিধায় কিচ্ছু বলে না, আমার সব অত্যাচার সহ্য করে। ঘুম তো আসছেই না, তবুও ঘুমানোর চেষ্টায় চোখ বন্ধ করলাম, পাশে আজাদের নাক ডাকার শব্দ আর আমার মনে গিরগিটির আনাগোনা। গিরগিটি কে তুরি মেরে ফেলে দিয়ে ঘুমকে আদর করে বললাম,,,ঘুম তুমি এসো নিপবনে❤️❤️❤️❤️।

ছবিঃ নেট থেকে সংগ্রহ।

২০৬জন ৪৩জন
0 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য