বৈশাখ মাসের তীব্র গরম। প্রখর সূর্যের আলোয় পুড়ছে নগর, পুড়ছে মানুষ। একটু আদ্রতার আশায় ক্লান্তিহীন ডাকা ডাকছে নগরের কাক। উত্তপ্ত নগরের উত্তপ্ত নাগরিক ব্যস্ততায় আক্রান্ত মানুষের কি আর সেসবে কান দেওয়ার সময় আছে। মানুষ হাঁটছে, শিশুরা স্কুল থেকে ফিরছে, যুগলেরা রিকশার হুড তুলে শরীরের উষ্ণতা দিয়ে প্রকৃতির উষ্ণতাকে ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। কোন এক বৃক্ষ ছায়ার নিচে বসে জীবন নিয়ে হাহুত্যেশ করছে এক দল মানুষ। নগরের উষ্ণ এক পিচ ঢালা পথ ধরে বিরামহীন হাঁটা হাঁটছে কোন এক ৭০ বছরের বৃদ্ধ নুরু মিয়া। ঘাড়ে একটি বাঁশে আটকানো বিভিন্ন সাইজের কয়েকটি লাল সবুজ পতাকা। এক দৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে গোটা গোটা পা ফেলে হাটছে সেই বৃদ্ধ, জগতের সকল ক্লান্তিকে উপেক্ষা করে। আপাতত তার গন্তব্য মিরপুর দশ নম্বর গোলচত্বর। সকালবেলা ৫ টাকা দিয়ে খাওয়া টোষ্ট বিস্কিটের আয়ু ইতমধ্যেই ফুরিয়েই এসেছে। জাঁকিয়ে বসেছে আবহমান ক্ষুধা। প্রবল আক্রোশে সে তার অস্তিত্বকে জানান দিচ্ছে। নুরু মিয়া সেটিকে অগ্রাহ্য করার চেষ্টা করছে। অবশ্য তা না করে উপায়ও নেই তার । আজ সারা দিন সে ফার্মগেট, ধানমন্ডী এলাকায় পতাকা নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে। বিক্রি হয়নি একটি পতাকাও, এমনকি বিক্রি হয়নি গতকালও। এই শহরের মানুষ পতাকা কিনে ডিসেম্বর আর মার্চে । বিশাল অট্টালিকার ছাদে পতাকা উড়িয়ে নিজেদের দেশপ্রেমের জানান দিতে ভালবাসে নগরের মানুষ । এটা মে মাস। কার এত শখ পড়েছে এ মাসে পতাকা কিনার। তবুও প্রতিদিন সকাল ৮টার মধ্যেই নুরু মিয়া তার পতাকার বান্ডিল নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। এই পতাকা বিক্রিই তার নেশা। একটি পতাকা বিক্রির আশায় সে ঘুরে বেড়ায় ফার্মগেট ,ধানমন্ডী , কারওয়ান বাজার। কোনদিন একটা দুইটা বিক্রি হয়, কোন দিন সেটিও না। তবুও পতাকা বিক্রির দুরবস্থা মোটেও ক্লান্ত করে না নুরু মিয়াকে। প্রতিদিন সকালে সে তার পতাকার বান্ডিল নিয়ে রাস্তায় বেরোয় । রোদ, ঝড়, বৃষ্টিতেও গত দশ বছরে তার এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি। পতাকা বিক্রি করে পাওয়া কিছু অর্থ আর সারাদিনের এক রাশ ক্লান্তিকে সঙ্গী করে সন্ধ্যায় কারওয়ান বাজারের খুপরি গলিতে মেয়ে হালিমার ঘরে ফিরে সে। হালিমা তার স্বামী কাশেম আর আট বছরের মেয়ে সুমীকে নিয়ে সেখানেই বাস করে। সেই ঘরের সামনের বারান্দাই এখন নুরু মিয়ার আবাসস্থল। লেপ তোশক দিয়ে সেই বারান্দার এক কোণাকেই নিজের জগৎ বানিয়ে ফেলেছে নুরু মিয়া। বারান্দার সেই কোণাই এখন নুরু মিয়ার চিরকালীন ঠিকানা ।

নুরু মিয়ার দেশের বাড়ি সিরাজগঞ্জ। বছর দশেক আগে প্রমত্তা যমুনা যখন তার শেষ সম্বল হিসেবে টিকে থাকা বাস্তুভিটাটাও কেড়ে নিল তখন আর ঢাকায় আসা ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিল না নুরু মিয়ার। এক সকালে মা মরা ১৬ বছরের ছেলে আজগরকে নিয়ে ঢাকায় পা রাখে সে। মেয়ে হালিমা আর তার স্বামী কাশেম আগে থেকেই ঢাকায় বসবাস করতো। অগ্যতা তাদের সঙ্গে থাকা ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিল না নুরু মিয়ার। জামাই কাশেমের দেখা দেখি ছেলে আজগরও রিকশা চলানো শুরু করে। ছেলের আয়ে মেয়ে জামাইয়ের সংসারে তার দিন মোটামুটি ভালই চলে যেত।
একদিন ছেলে আজগর নুরু মিয়াকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিল- আব্বা তোমারে কিছু টাকা দিতাছি । তুমি একটা কাম করবা?
চোখে মুখে আগ্রহ নিয়ে নুরু মিয়া জিজ্ঞেস করেছিল- কি কাম ?
-তুমি পতাকা বেচা শুরু করো। তুমি তো মুক্তিযোদ্ধা দেখাবা তোমার কাছ থাইক্যা কত মানুষ পতাকা কিনবো।

পতাকা বিক্রির কথা শুনে অদ্ভুত এক ধরনের রোমাঞ্চ অনুভব করে নুরু মিয়া। এই লাল সবুজ পতাকার সঙ্গে অনেক পুরনো একটা গভীর আবেগ জড়িয়ে আছে নুরু মিয়ার। অনেক পুরনো হলেও আজও সেই আবেগ সম্পূর্ণ সজীব, এখনো চোখ বন্ধ করলে সেটা তীব্র ভাবে অনুভব করে সে। ৪৪ বছর আগে দেশে যখন ভয়ানক যুদ্ধ শুরু হয়েছিল তখন সেই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল সে সময়ের ২৫ বছরের টগবগে যুবক নুরু মিয়া। যুদ্ধ কি জিনিস তার কিছুই বুঝতো না নুরু মিয়া, বুঝতো না সে রাজনীতি , অর্থনীতি সমরনীতি। অন্যের বাড়িতে কামলা খেটে দিন পার করত সে। শ্যামপুর গ্রামের নারায়ন মাষ্টারের ক্ষেতে কাজ করার সময় একদিন এক বীভৎস অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয় সে। সেই অভিজ্ঞতার কথা মনে হলে আজও গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে নুরু মিয়ার। আট দশটা দিনের মত সেদিনও গ্রামের ক্ষেতে কাজ করতে গিয়েছিল সে কিন্ত কে জানতো সেদিনই সেই গ্রামেও হানা দিবে পাকিস্তানী বাহিনী। আর্মির জিপের শব্দে গ্রামের লোকজন যে যেখানে পারে ছুটে পালাতে থাকে। আতঙ্কিত লোকদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে হানাদার পাক বাহিনী। মুহূর্তেই রক্তে ভেসে যায় গ্রামের মেঠো পথ। প্রাণ ভয়ে ছুটতে থাকা নুরু মিয়া আশ্রয় নেয় এক খড়ের গাদায়। খড়ের গাদায় আশ্রয় নিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হলেও এক বর্বর ঘটনার সাক্ষী হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি সে। নারায়ন মাস্টারের ১৪ বছরের মেয়ে বরুনাকে ধর্ষণ আর বেয়নেট চার্জে হত্যার দৃশ্য নিজের চোখে দেখেছে সে। একটা অল্প বয়সী মেয়ের প্রতি এমন বর্বর নির্যাতন গভীর প্রভাব ফেলেছিল নুরু মিয়ার মনে। এই ঘটনার পর পাকিস্থানীদের প্রতি প্রবল আক্রোশ জন্ম নেয় নুরু মিয়ার। সকল হত্যা আর নির্যাতনের প্রতিশোধ নেওয়ার নেশায় উন্মত্ত হয়ে উঠে সে । নেংটা কালের বন্ধু সামাদ ৪০ টাকা বেতনে রাজাকারে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল কিন্ত রাজী হয়নি নুরু মিয়া। পাকিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সে করবেই। একদিন যুদ্ধের নেশায় বর্ডার ক্রস করে মুক্তিবাহিনীতে নাম লিখিয়ে ফেলে নুরু মিয়া । তবে যুদ্ধ করতে চাইলেই তো আর যুদ্ধ করা যায় না, আগে দরকার ট্রেনিং। শুরু হয় নুরু মিয়ার কষ্টকর ট্রেনিং অধ্যায়। অল্পবয়সী এক বাঙ্গালী তরুণ ক্যাপ্টেন তাদের ট্রেনিং পরিচালনা করতো । অস্ত্র ধরা ,গুলি চালানো , ক্রলিং , গেরিলা আক্রমন আরও কত কি ? অল্প বয়সী সেই ক্যাপ্টেনের মাথায় সব সময় একটা লাল সবুজ পতাকা বাধা থাকতো । সবাই বলাবলি করতো এইটা হইলো দেশের পতাকা । পতাকা বলতে এতদিন শুধু গ্রামের স্কুলে ঝোলানো চাঁদ তারা খচিত একটি সবুজ কাপড়কেই বুঝতো নুরু মিয়া। এরকম কোন লাল সবুজ কাপড়ের টুকরা যে পতাকা হতে পারে এ ব্যাপারে কোন ধারনাই ছিল না তার। সেই আশ্চর্য সুন্দর লাল-সবুজ কাপড়ের টুকরোকে ঘিরে নুরু মিয়ার এক ধরণের কৌতূহল ছিল। এরকম একটি কাপড়ের টুকরোকে মাথায় জড়িয়ে যুদ্ধ করার স্বপ্ন দেখতো সে। একদিন জমানো কিছু টাকা দিয়ে সীমান্তের ওপারের এক দর্জির কাছ থেকে একটা লাল সবুজ পতাকা বানিয়ে ফেলে নুরু মিয়া। এরপর যত দিন সে যুদ্ধ করেছে ততদিন সে এই পতাকাটিকে মাথায় বেধেই যুদ্ধ করেছে। প্রায় চল্লিশ বছর পর ছেলে আজগর যখন তাকে পতাকা বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিল তখন সেসময়ের দিনগুলোর স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠে নুরু মিয়ার। ছেলের প্রস্তাবে না বলার কোন কারণ ছিল না তার। ছেলের টাকায় এক দর্জির কাছ থেকে কিছু পতাকা বানিয়ে তা ফেরি করে বিক্রি করা শুরু করে সে । প্রথম প্রথম পতাকা্র বেচাবিক্রি বেশ ভালই হত। তার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টুকু শুনলে অনেকেই তার দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকাতো , কৌতূহলী তরুণেরা মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতে চাইতো। নুরু মিয়া প্রবল আগ্রহে তাদের মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনাত। মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতে এতটুকুও ক্লান্তি ছিল না তার। এই ভাবে দেখতে দেখতে কখন যে পতাকা বিক্রি করা পেশা থেকে নেশায় পরিণত হল টেরই পায়নি নুরু মিয়া । অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে পতাকা ছাড়া অন্য কিছু বিক্রি করতে মন চায় না তার। ছেলে আজগর বাপের মানসিকতা বুঝতো তাই এই ব্যাপারে ঘাটাতো না তাকে । এরই মধ্যে একদিন ট্রাকের চাপায় পড়ে ছেলে আজগরটা মারা গেল। শুরু হল নুরু মিয়ার দুর্দশা। অতঃপর মেয়ে জামাইয়ের ঘরে সম্পূর্ণ রুপে আশ্রিত হওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিল না নুরু মিয়ার। মেয়ের সংসারে এমনিতেই অভাব, সেখানে নুরু মিয়ার আগমন নুতুন অশান্তি ব্যতীত অন্য কিছুর সৃষ্টি করলো না। আশ্রিত শ্বশুরের পতাকা বিক্রির বিলাসিতা মেনে নিতে মোটেও রাজী নয় জামাই কাশেম। গত কয়েকদিন ধরেই সে নুরু মিয়াকে বলছে- আব্বা পতাকা বেইচ্যা কোন ফায়দা নাই , আমি কিছু টাকা দিতাছি, আপনে বাদাম বেচা শুরু করেন।
মেয়ে জামাইয়ের কথার জবাবে খানিকক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল নুরু মিয়া, হ্যা কিংবা না কিছুই বলতে পারে নি সে। কিছু বলার মত অবস্থায়ও ছিল না সে। পতাকা ছাড়া অন্য কিছু বিক্রি করার কথা ভাবতে পারে না সে । আবার সরাসরি আশ্রয়দাতা মেয়ে জামাইয়ের কথার বিরুদ্ধে যাওয়ারও সাহস হয় না তার। ইতমধ্যে মেয়ে হালিমা তার বাবার পক্ষ নেওয়ায় একদিন কাশে্মের হাতের চড় খেয়েছে। আজ সকালেও এ নিয়ে একটা ছোট খাট ঝগড়া হয়েছে। মেয়ে হালিমা কাঁদতে কাঁদতে নুরু মিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেছে- আব্বা তুমি পতাকা বিক্রি ছাড়, আমি আর কত কথা শুনুম ।

যথারীতি আজও নুরু মিয়া কিছুই বলতে পারেনি। মেয়ের কান্না সহ্য করতে না পেরে সকালের খাওয়াটুকু অসম্পূর্ণ রেখেই পতাকাগুলো নিয়ে রাস্তায় বেরিয়েছে নুরু মিয়া। পকেটে জমানো দশটা টাকা নিয়ে নিয়ে সে গিয়েছিল গলির মোড়ে মোতালেবের দোকানে। সেখানে দুটো টোষ্ট আর বাকিতে এক কাপ চা খেয়েছিল সে। নুরু মিয়াকে আসতে দেখে চেয়ার এগিয়ে দিয়েছিল দোকানী মোতালেব। বলেছিল -নুরু চাচা, কাল কয়টা পতাকা বেচলা।
মাটির দিকে তাকিয়ে নুরু মিয়া উত্তর দিয়েছিল- বেচা বিক্রির অবস্থা ভাল না।
মোতালেব বলতেই থাকে – তোমার জামাইয়ের কথা শোন , পতাকা বেচা ছাইড়া অন্য কিছু বেচা ধরো। পতাকা বেইচা লাভ কি?
মোতালেবের কথা শুনে মেজাজ বিগড়ে যায় নুরু মিয়ার । চায়ের কাপটা মুহূর্তেই মাটিতে আছড়ে ফেলে সে। বলে- আমি কি বেচুম না বেচুম সেইটা কি তোরে কইতে হইব। তুই কথা কওনের কেডা হারামজাদা ?

দোকানে সামনে থাকা লোকজন নুরু মিয়ার অগ্নিমূর্তি দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল। শান্ত স্নিগ্ধ নুরু মিয়ার যে এরকম একটা রুপ আছে কেউ কখনো কল্পনা করেনি। অন্যরা এগিয়ে আসায় পরিস্থিতি আর বেশি খারাপের দিকে এগোয়নি। রাগে গজরাতে গজরাতে সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিল নুরু মিয়া। পিছন থেকে ভেসে আসছিল মোতালেবের টিটকারি- পকেটে নাই টাহা, গরম আছে ষোলআনা।

দুপুর একটা পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পার্কের বেঞ্চিতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল নুরু মিয়া। সেখানেই পূর্ব পরিচিত বাদাম বিক্রেতা বাতেনের সঙ্গে দেখা। বাতেন বলেছিল- নুরু চাচা , আজ কোন পতাকা বেচবার পারছো ?
নুরু মিয়া না সুচক উত্তর দেয়।
বাতেন বলেছিল -তুমি এক কাম করো। তুমি মিরপুর দশ নম্বরের দিকে যাও। আজ বাংলাদেশ আার পাকিস্তানের খেলা আছে। খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে যাওয়া লোকেরা নাহি পতাকা কিনে। ঐহানে পতাকা বেচবার পারবা ভাল। এই হানে ঘুইর‍্যা লাভ নাই।

আমার যেইহানে ইচ্ছা সেই হানে যামু তাতে তোর কি বলে সেখান থেকে উঠে এসেছিল নুরু মিয়া কিন্ত বাতেনের পরামর্শটিকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মত বলে মনে হয় না তার। মিরপুর দশ নম্বর যাওয়ার উদ্দেশ্যে মনস্থির করে সে। পকেটে টাকা না থাকায় অগ্যতা পা দুটোই ভরসা। তাই পায়ে হেটেই নগরের উত্তপ্ত পথ ধরে মিরপুরের উদ্দেশ্যে হাঁটছে সে।

২)
দশ নম্বর গোল চত্বরের ওভারব্রীজের এক পাশে পতাকার বান্ডিল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে নুরু মিয়া। অন্তত একটি পতাকা তাকে আজ বিক্রি করতেই হবে। খেলা শুরু হতে এখনো কিছু ক্ষণ বাকি। তরুণ তরুণীরা গালে মুখে পতাকা একে স্টেডিয়াম এলাকায় ঘোরাফেরা করছে। ঢোল বাজাতে বাজাতে বাংলাদেশ বাংলাদেশ বলে চিৎকার করছে কয়েকজন তরু্ণ। সবার মধ্যেই প্রবল উৎসাহ উদ্দীপনা। লোকজনের উৎসাহ উদ্দীপনা দেখতে ভাল লাগছে নুরু মিয়ার। যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে সে তার কয়েকগজ সামনে একদল তরুণ তরুণীর জটলা দেখতে পায় নুরু মিয়া। তাদের কথোপকথন কানে আসে নুরু মিয়ার। জটলার মধ্য থেকে এক তরুণ বলছে – আজকে বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তান খেলায় বাংলাদেশ অবশ্যই জিতবে। কি বলিস তোরা?
সবাই একসঙ্গে উত্তর দেয় – হ্যা অবশ্যই ।
সেই তরুণটি বলতেই থাকে- আজ বাংলাদেশের জন্য চিৎকার করে গলা একেবারে ফাটিয়ে দিব। বাংলাদেশ কে না জিতিয়ে আজ মাঠ ছাড়ছি না ।
সবাই সেই তরুনটির কথায় সায় দেয়। শুধু জটলার মধ্য থেকে সুদর্শনা এক তরুণী বলে-গাইজ আমি বাংলাদেশকে সাপোর্ট করবো তবে আফ্রিদির ব্যাটিং এর সময় আমি কিন্ত আফ্রিদির সাপোর্টার ।
অন্য এক তরুণী বলে উঠে- কি বলিস তুই এইসব রাহা, আফ্রিদির ব্যাটিং এর সময় তুই বাংলাদেশকে সাপোর্ট করবি না!!
রাহা নামের সেই তরুণীটি উত্তর দেয়- এত অবাক হওয়ার কি আছে? তোরা তো জানিস আফ্রিদি আমার প্রথম ক্রাশ। আফ্রিদির ব্যাটিং এর সময় আমি নাওয়া খাওয়া ভুলে যাই । তাছাড়া খেলার সাথে রাজনীতি মেশানোও ঠিক নয়।
সেই তরুনীকে সমর্থন করে এগিয়ে আসে আরেক তরুণ। বলে -ঠিকই বলেছিস রাহা, চেতনা থাকবে চেতনার জায়গায়। খেলা থাকবে খেলার জায়গায়, সব কিছুতে চেতনা টেনে আনা ঠিক নয় ।
প্রতিবাদী তরুণীটি বলে উঠে – আসিফ তুইও এই কথা বলতে পারলি! এখানে আফ্রিদি কোন ব্যক্তি আফ্রিদি হিসেবে খেলছে না। খেলছে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির হয়ে। সে এখানে যে রাষ্ট্রটির প্রতিনিধিত্ব করছে সেই রাষ্ট্রটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার জন্য আজও ক্ষমা চায় নি। এমনকি প্রকাশ্যে গণহত্যার দায় পর্যন্ত অস্বীকার করছে। এখানে ব্যক্তি আফ্রিদিকে সমর্থন মানে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটিকে সমর্থন।
যাকে ঘিরে বিতর্কের সুত্রপাত সেই তরুনীটি বলে – তোরা না কিসের মধ্যে কি টেনে আনিস । তোদের সাথে তর্ক করার কোন মানেই হয় না।
তাদের তর্ক-বিতর্ক মীমাংসা করতে এগিয়ে আসে এতক্ষণ নীরব থাকা অন্য এক তরুণ। সে বলে -বাদ দে তো এই সব। এই সব পলিটিক্সের ব্যাপার স্যাপার । ফাকিং পলিটিক্স নিয়ে তর্ক করতেই আমার ভাল লাগে না । আই হেইট পলিটিক্স। খেলা দেখতে আসছি। চল খেলা দেখে এনজয় করি।

সেই ছেলেটির কথা সমর্থন করে অন্যরা। অগ্যতা বিতর্ক ভুলে স্টেডিয়ামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় তারা। হঠাৎ কি যেন মনে করে একটা ছেলে বলে উঠে- তোরা একটু দাঁড়াবি , আমি একটা পতাকা কিনে আসি।
ঠিক আছে আমরা ওয়েট করছি- অন্যরা উত্তর দেয়।
সেই ছেলেটি নুরু মিয়ার দিকে এগিয়ে আসে। বলে -মামা পতাকা কত করে পিচ?
ক্লান্ত নুরু মিয়ার ম্রিয়মান কন্ঠ বলে উঠে -বড়টা ১৫০, মাঝারিটা ১০০ আর ছোটটা আশি টাকা।
-এত দাম ?
-কই দাম বাবা!
-বড়টা ১০০ টাকায় দিবা?
-একশ টাকায় আসলও উঠবো না বাবা
-আচ্ছা ঠিক আছে ১২০ টাকা দিতাছি আর দামাদামি কইরো না
ছেলেটা একটা একশ টাকা আর একটা বিশ টাকার নোট নুরু মিয়ার দিকে এগিয়ে দেয়। নুরু মিয়ার কম্পিত হাত টাকা গুলো গ্রহন করে।

এই টাকাগুলো দিয়ে কি করবে তা প্রথমে ভেবে পায় না নুরু মিয়া। টাকা গুলো ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে আকাশে উড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে তার। দৃশ্যটি কল্পনা করতেও এক ধরণের সুখকর অনুভূতি হয় নুরু মিয়ার। কিন্ত আজন্ম লালিত ক্ষুধার কাছে হার মানে নুরু মিয়ার এই গদ্যময় ভাবনাগুলো, বলা যায় মানতে বাধ্য হয়। রাস্তার পাশের একটি সস্তা হোটেলে ঢুকে পড়ে নুরু মিয়া। তাকে বসতে দেখে এগিয়ে আসে অল্পবয়সী ওয়েটার। বলে- কি খাইবেন ?
– কি আছে তোগো হোটেলে ?
-শুটকি মাছ, কাচকি মাছ আর মুরগীর মাংস।
-কি মাছের শুটকি ?
-কি মাছের শুটকি তা দিয়া আপনের কাম কি ? আপনে খাইবেন কি না কন ?

নুরু মিয়া হ্যাঁ সুচক উত্তর দেয়। ছেলেটি ভাত এবং নলা মাছের শুটকির তরকারীর বাটিটি নুরু মিয়ার টেবিলে রাখে। নুরু মিয়ার লোভাতুর চোখ সেই ভাতের প্লেট থেকে দৃষ্টি ফেরায় না। গরম সাদা ভাতগুলোর দিকে তাকিয়ে নুরু মিয়ার মধ্যে অন্য রকম একটা অনুভূতির জন্ম হয়। অনেক প্রগাঢ় একটা প্রিয় অনুভূতি ,আরো একবার স্বাধীন হবার অনুভূতি। নুরু মিয়া এক দৃষ্টিতে ভাতের প্লেটের দিকে তাকিয়ে থাকে। গরম সাদা ভা্ত, ধোঁয়া উঠছে। নুরু মিয়ার চোখ চকচক করে উঠে…

৫০১জন ৫০১জন
0 Shares

২৪টি মন্তব্য

  • দীপংকর চন্দ

    আমাদের দুর্ভাগ্য, মুক্তির চেতনাকে সমৃদ্ধ স্তরে স্থান দিতে অসচেতনার পরিচয় দিয়েছি আমরা বারবার!

    জীবন বাঁচিয়ে রাখতে খাবারের প্রয়োজনীয়তা যেমন অনস্বীকার্য, তেমনই মনকে বাঁচিয়ে রাখতে সমৃদ্ধ চেতনা লালন করা অপরিহার্য।

    আশাবাদ জীবন্ত থাক, শুভদিন আসবেই।

    বিজয়ের শুভেচ্ছা থাকছে ভাই।

    ভালো থাকবেন। সবসময়।

  • শুন্য শুন্যালয়

    অপার্থীব আমি আপনার লেখার ফ্যান হয়ে গেছি আসলে আগের লেখাতেই, তবে এবারের টা আরো কএকগুন ভালো ছিল।
    পড়তে পড়তে আমি যেন নুরু মিয়াই হয়ে গিয়েছিলাম। মানুষ তার সব কাজেই নিজের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করায়, তখন সে আসলে বোঝেনা সে ভুল না শুদ্ধ। খেলার সাথে রাজনীতি মেশানোও সেরকমই। যে ইমরান খানের জন্য একসময় ছেলে মেয়েরা নাওয়া খাওয়া ভুলে যেত, তার পক্ষে আমাদের সেই সোনার মানুষেরা কি বলে জানতে মন চায়।
    গরম ভাতের সাথে স্বাধীন হবার যেই অনুভুতির কথা বললেন, অসাধারন অপার্থীব।

    • অপার্থিব

      আপনার সুন্দর মন্তব্যে উৎসাহিত হলাম। পাকি প্রেমিকরা খেলার সাথে রাজনীতি মেশায় না কিন্ত ধর্ম ঠিকই মেশায়। এদেশে পাকি ও পাকি প্লেয়ারদের এত সমর্থনের পিছনে মূল কারণ এদের তথাকথিত সাচ্চা মুসলিম পরিচয় । যাই হোক এই ইমরান খান ১৯৭৯ সালে পাকিস্তান টিমের হয়ে বাংলাদেশ সফরে এসেছিল । সেবার তাকে দেখতে বিমানবন্দরে উপস্থিত হওয়া দর্শনার্থীদের উদ্দেশ্যে নমস্কার সুচক অঙ্গভঙ্গি করে বিতর্ক তৈরী করেছিল। আরো কিছু পাকি ক্রিকেটার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করায় ক্ষুদ্ধ দর্শক চট্টগ্রামে ম্যাচ চলাকালীন মাঠে ঢুকে খেলা পন্ড করে দিয়েছিল, বাঁহাতি স্পিনার ইকবাল কাসিমের হাত ভেঙ্গে দিয়েছিল। তবুও এরা শিক্ষা নেয় নি , বাঙ্গালীদের আবেগের প্রতি নুন্যতম শ্রদ্ধা এখনো এদের নেই। তবে এখনো যে এদের কিছু প্রেতাত্না এদেশে বহাল তবিয়তে বাস করছে এটই জাতি হিসেবে আমাদের জন্য সবচেয়ে লজ্জাকর।
      ধন্যবাদ আপনাকে। বিজয়ের শুভেচ্ছা। -{@

  • অনিকেত নন্দিনী

    নুরু মিয়াকে সম্মান জানাই।
    পেটের জ্বালা বড় জ্বালা। পেটে খিদে থাকলে অনেক কিছুই দাবিয়ে রাখতে হয়।

    সুন্দর লেখনী। বানানের ব্যাপারে আরেকটু যত্নবান হতে বললে রাগ করবেন কি?

  • নীলাঞ্জনা নীলা

    প্রিয়তে নিলাম।

    অনেক আগে কোথায় জানি পড়েছিলাম, মানুষ সবচেয়ে বেশী অন্যায় করে ক্ষুধা নিবারণের জন্যে। আজ নুরু মিয়ার ভাতের সাথে স্বাধীনতা মেশানো একটি অসাধারণ গল্প পড়লাম।
    আমি কিছুতেই পাকিস্তানীদের সাপোর্ট করিনা, কখনও করবোও না।

    • অপার্থিব

      পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত বাক্যটি কি জানেন ? “ক্ষুধা লেগেছে”। এই ক্ষুধার জন্য মানুষ তার নীতি , নৈতিকতা , আদর্শ , শরীর , মন সবই বিক্রি করতে পারে। পেটে ভাত না জুটলে নীতি, নৈতিকতা, মূল্যবোধ , কবির কাব্য সবই অর্থহীন হয়ে যায়। এটা আমাদের জন্য জাতীয় লজ্জা যে যারা এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষ ভুমিকা রেখেছে তাদের অনেককে আজও বেঁচে থাকার সংগ্রামে প্রতিদিন রাস্তায় নামতে হয় । রাষ্ট্র মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রনালয় নামের একটা মন্ত্রনালয় বানিয়েই তার দায়িত্ব শেষ করছে কিন্ত এই মন্ত্রনালয়ের প্রদান কৃত সুযোগ সুবিধা সমুহ প্রান্তিক পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে কতটুকু যেতে পারছে তা নিয়ে হাজারো প্রশ্ন তোলা যায়।

      অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

  • শুন্য শুন্যালয়

    আপনাকে তো বলাই হয়নি, এই লেখাটি আমার প্রিয় লিস্টে আছে। 🙂
    শুভ নববর্ষ অপার্থিব। পার্থিব জগতের সব আনন্দ আপনার হোক। ভালো থাকুন। -{@

  • শুভ মালাকার

    আমি একজন “বি এন সি সি ক্যাডেট। আমি এবং আমাদের প্লাটুনের সকল ক্যাডেট, প্রতিটা বিশেষ রাষ্ট্রীয় দিবসে উপস্তিত সম্মানিত প্রধান অতিতিকে “গার্ড অব ওনার” দিয়ে থাকি। আর আজ সেই একই ভাবে হৃদয়ের গভীর থেকে এই মুক্তিযোদ্ধা “নুরু মিয়া”কে সম্মান প্রদর্শন করছি।

    আর ধন্যবাদ জানাচ্ছি “অপার্থিব” ভাইয়া কে এরকম কিছু উপস্থাপনার জন্য। ভালতো লেগেছেই আর অতিতেরও উপলব্দি হল।

    শুভ নববর্ষের শুভেচ্ছা রইল। -{@

    • অপার্থিব

      মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আপনার প্রগাঢ শ্রদ্ধা দেখে মুগ্ধ হলাম। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই এই দেশ থেকে সাম্প্রদায়ীকতা, জঙ্গীবাদ দূর করে দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় পাথেয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আপনার মত দেশের সকল মানুষের মধ্যে জাগ্রত হোক নুতুন বছরে এটাই হোক আমাদের প্রধান প্রত্যাশা । নববর্ষের শুভেচ্ছা রইলো। নুতুন বছর অনেক ভাল কাটুক। -{@

  • সকাল স্বপ্ন

    point of view——– কোন এক বৃক্ষ ছায়ার নিচে বসে জীবন নিয়ে হাহুত্যেশ করছে এক দল মানুষ।

    সকালবেলা ৫ টাকা দিয়ে খাওয়া টোষ্ট বিস্কিটের আয়ু ইতমধ্যেই ফুরিয়েই এসেছে। জাঁকিয়ে বসেছে আবহমান ক্ষুধা।

    অন্য এক তরুণী বলে উঠে- কি বলিস তুই এইসব রাহা, আফ্রিদির ব্যাটিং এর সময় তুই বাংলাদেশকে সাপোর্ট করবি না!!

    সেই ছেলেটি নুরু মিয়ার দিকে এগিয়ে আসে। বলে -মামা পতাকা কত করে পিচ?
    খড়ের গাদায় আশ্রয় নিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হলেও এক বর্বর ঘটনার সাক্ষী হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি সে। নারায়ন মাস্টারের ১৪ বছরের মেয়ে বরুনাকে ধর্ষণ আর বেয়নেট চার্জে হত্যার দৃশ্য নিজের চোখে দেখেছে সে। একটা অল্প বয়সী মেয়ের প্রতি এমন বর্বর নির্যাতন গভীর প্রভাব ফেলেছিল নুরু মিয়ার মনে। এই ঘটনার পর পাকিস্থানীদের প্রতি প্রবল আক্রোশ জন্ম নেয় নুরু মিয়ার। সকল হত্যা আর নির্যাতনের প্রতিশোধ নেওয়ার নেশায় উন্মত্ত হয়ে উঠে সে । নেংটা কালের বন্ধু সামাদ ৪০ টাকা বেতনে রাজাকারে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল কিন্ত রাজী হয়নি নুরু মিয়া। পাকিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সে করবেই

    ক্লান্ত নুরু মিয়ার ম্রিয়মান কন্ঠ বলে উঠে -বড়টা ১৫০, মাঝারিটা ১০০ আর ছোটটা আশি টাকা।

    নুরু মিয়া হ্যাঁ সুচক উত্তর দেয়। ছেলেটি ভাত এবং নলা মাছের শুটকির তরকারীর বাটিটি নুরু মিয়ার টেবিলে রাখে। নুরু মিয়ার লোভাতুর চোখ সেই ভাতের প্লেট থেকে দৃষ্টি ফেরায় না। গরম সাদা ভাতগুলোর দিকে তাকিয়ে নুরু মিয়ার মধ্যে অন্য রকম একটা অনুভূতির জন্ম হয়। অনেক প্রগাঢ় একটা প্রিয় অনুভূতি ,আরো একবার স্বাধীন হবার অনুভূতি।
    -এত দাম ?
    -কই দাম বাবা!
    -বড়টা ১০০ টাকায় দিবা?
    -একশ টাকায় আসলও উঠবো না বাবা
    -আচ্ছা ঠিক আছে ১২০ টাকা দিতাছি আর দামাদামি কইরো না

    থিংক অফ ভিউ——- লেখা অনেক ভালো ——- ধনবাদ এমন একটি লেখা আমদের উপহার দেওয়ার জন্য——–

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ