দাদা যখন মারা যায় তখন আমি খুব ছোট। মনে নেই তার চেহারা সুরত। কিন্তু দাদা  আমারদের ভাই বোনদের মধ্যে আমাকে খুবই আদর করতেন।তার পাশে পাশে রাখতেন।আমার কিছুই মনে নেই।  আমার নানার মৃত্যু আমি দেখেছি খুব কাছে থেকে। খুব গুছানো বিদায় পর্ব। ঢাকা থেকে আম্মা সহ ভাই বোন মিলে চলে গেছি গ্রামে। দুপুরের দিকে পৌছে দেখি বৈঠক খানায় নানা শোয়া। আমার এসেছি দেখে হুলস্থুল বাধিয়ে দিলেন গুরতর অসুস্থ অবস্থায়্ও। এরে বলেন আমার ঝি আসছে এইটা আন সেইটা আন। এইটা কর সেইটা কর। আমি অযু করে কোরআন তেলাওয়াত করতে বসালাম। দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত আমি  না খাওয়া এটা নানা এসময়েও ভুলনেনি। কাকে যেন কড়া বকা ঝকা দিচ্ছেন। নাতিটা সেই কখন আইছে না খাওয়াই রাখছে…….। নানা  মারা গেলেন রাতের বেলায়। মরা আগে নিজের অগোছালো লুঙ্গিটা তিনি নিজে নিজে ঠিক করে সোজা হয়ে গেলেন। তারপর চির বিদায়।  কাছে থেকে দ্বিতীয়  মৃত্যুটা দেখেছি আমার দাদী শাশুড়ীর।তার মৃত্যুটাও গোছানো। কোরআন তেলাওয়াত করছি। তা শুনতে শুনতে তার মৃত্যূ। এরপর ২০০৯ সালে আমার বাবার মৃত্যূটাও  কাছ থেকে দেখি। এরপর অনেকগুলো বছর পর কাছে দেখলাম পর পর কতগুলো মৃত্যূ।

২০১৫ সাল। অক্টোবর মাসটায় মালাকুল মউত মানে (আজরাঈল আ: বাইবেল সমর্থিত নাম) মনে হয় আমাদের সাতাইশ এলাকা নিয়ে বেশি ব্যস্তততম সময় পার করছিলেন। একটার পর একটা উইকেট খালি ফেলেই যাচ্ছে। আমার বন্ধু প্রতিম ছোট ভাই কামরুলের আব্বাকে দিয়ে শুরু হয়েছে। এর পর গেল খাইরুল সাহেব তারপর গেল তৌফিরে আম্মা (আমার মাউই)। এরপর আবার গেল মাটিয়া পাড়ার লতুর মা। যাচ্ছেতো যাচ্ছেই।

আজ ২০২০ সালে।এপর্যন্ত সাতাইশ এলাকা থেকে একের পর এক চলে গেছেন পরিচিত মুখ আরো অনেকে। এভাবেই সবাইকে যেতে হবে। আসার সিরিয়াল আছে যাওয়ার নাই। পরবতী টার্গেট কে? আমি কিংবা আপনি ননতো? আল্লাহই মালুম। ভাইয়েরা নামাজ রোজা যারা করেন না। তারাতারি শুরু করেন। কেযে কখন আজরাঈল অ. এর সামনে পরে যাবেন ঠিক নাই। আর পড়লেইতো সব শেষ। খেল খতম। জীবন হজম। আজাব আর বিচার শুরু।

সাতাইশ কবরস্থানের পাশে আমার বাসা। তাই এর পাস দিয়ে দিনে একাধিকবার যাওয়া আসা হয়। যতবার যাই ততবার দেখি। কবরের জায়গাটাতে কতজন শুয়ে আছে। অথচ পাসের চায়ের দোেকানে চলছে আড্ডা আর টিভি দেখা। একটু কষ্ট করে পিছনে ফিরলেই তারা কবরস্থানটি দেখতে পায়। কিণ্তু আনন্দ হিল্লোলে মক্ত মানব পিছনে ফিরে তাকাবার সময় পাছ্ছে না। তাকালেই দেথতে পেতো তার ভবিষ্যত সুপ্ত আছে এ কবরের কোন এক কোনে। কোন এক সারে তিন হাতের ঠিকানায়। যখন তখন সেখানে চলে যেতে হতে পারে।

কামরুলের বাবা মারা গেল। গত ৩ তারিখ শুক্রবার স্বন্ধ্যায়। ৮ টা কি সাড়ে ৮টা হবে এ্যম্বুলেন্সে করে তাকে আনা হল। সবাই কামরুলদের বাসায় শান্তনা দিতে গেল। আমার মাও গেল। যদিও তাকে বাড়ন করা হয়েছে । সে নিজেও অসুস্থ। তারপরও গেলেন। সবার মতো তৌফিকের আম্মাও গিয়েছিলেন। কামরুলের মাকে শান্তনার বানী শুনিয়ে বাসায় ফিরলেন। নামজ আদায় করার সময় অসুস্থ হয়ে গেলেন। সিরিয়াস ভাবে। তিনি ব্রেন ষ্ট্রোক করলেন। বমি আর বমি। তোষক সমেত তাকে যখন সিএনজি উঠানো হল তখনও তিনি অনবরত বমি করছেন। এভাবে রাত সাড়ে বারটায় তাকে বাংলাদেশ মেডিকেলে ভর্তি করা হলো। সিটি স্কেন শেষে দেখা গেল তার ব্রেন মারত্মক ভাবে হেমারেজের স্বীকার হয়েছে। তাকে আই.সিইউতে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে রাখা হল। সেদিন থেকে তিনি অজ্ঞান অবস্থায় ছিলেন মৃত্যর আগ পর্যন্ত।তার জ্ঞান ফিরেনি। স্বামী পুত্র কন্যা আত্মীয় পরিজন পারপ্রতিবেশী কারো কাছেই শেষ বিদায় নেয়া হল না। না ফেরার দেশে চলে গেলেন অনেকটা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে। এক সপ্তাহ আগে যখন তিনি কামরুলের বাবাকে দেখতে গিয়েছিলেন তখন কি তিনি ভেবেছিলেন পরের সপ্তাহে ঠিক সেই রাত সড়ে ৮টার দিকে ঐ সময়টাতেই উনি থাকবেন কবরের ভিতরে।। আসলে উনি কেন কেউ ই জানে না । কার মৃত্যু কখন কোথায় কিভাবে হবে।

আল্লাহ প্রতিটি ঘটানা দিয়ে আমাদের কিছু দেখাত চান । বুঝাতে চান । শিখাতে চান। আমরা এতোটা নির্বোধ হয়ে গেছি যে, স্রষ্টার সে নিদর্শন সে ভাষা বুঝতে পারছি না বা বুঝতে চাইছি না। অথচ এ চরম বাস্তবতা সবার জন্যই অবিশম্ভাবি। ধার্যকৃত একটি বিষয়। স্রষ্টার কাছে যেতেই হবে। কোন ছাড় নাই। হয়তো কেউ কিছু আগে কেউ পরে।

তাই মরতে যেহেতু হবেই। স্রষ্টার কাছে যেহেতু যেতে হবেই। খালি হাতে কেন? আরে ভাই শশুর বাড়ী বেড়াতে গেলেতো খালি হাতে যান না। মিষ্টির বাক্সটা আর শাশুড়ির জন্য পানটা , নিতেতো ভুলে না। আর মহান সৃষ্টি কর্তা আল্লাহর কাছে যাবেন খালি হাতে । লজ্জা করবেনা। শশুর বাড়তে মিষ্টি না নিলেও বা পান না নিলেও শাশুড়ী জামাই আদর করবে কারন মেযেটা সুখ শান্তির কথা চিন্তা করে বলে। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে কারো মুকাপ্রেক্ষিতা নেই। তাই তার নির্ধারিত উপহার না নিলে তিনি কিন্তু ছেরে নাও দিতে পারেন। এটা মনে রাখতে হবে। আর আল্লাহ যদি কারো প্রতি রুষ্ট হন তবে তার খবর আছে। তাই আসুন বেশী বেশী মৃত্যূকে স্মরন করি আর মালাকুল মউত আসার আগেই এই মুহুর্ত থেকে আল্লাহর গোলাম হিসেবে তার ইবাদতে নিজেকে নিযোজিত করি। মহান আল্লাহ আমাদের যেনো মুসলিম বানিয়ে এবং জান্নাতের মেহমান বানিয়ে মৃত্যু দান করে ।

২৯৫জন ২০৫জন
5 Shares

৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ