“আমি তোমার জন্য এসেছি (পর্ব-চার)

বয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে আছে প্রিয়ার মুখের উচ্ছাসটা কিছুক্ষনের মধ্যে হারিয়ে গেল মলিন মুখে বললো আসসালামু আলাইকুম। ওয়া আলাইকুম সালাম, আজাদ বাসায় নেই..? জ্বী আব্বু বাসায় আছেন।

আপনি ভিতরে আসুন বলেই প্রিয়া দরাজার সাইডে গিয়ে দাঁড়াল আরাফের বাবা ভিতরে ঢুকলো প্রিয়া দরজা আটকাবে অমনি বাইরে থেকে আরাফ এসে হাজির প্রিয়া চিৎকারের সুরে বললো মম আরাফ ভাইয়া আসছে…!
সবাই অবাক দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকাল আরাফ লজ্জা পেয়ে বাবার দিকে তাকাতে পারছে না দাদুমনির দিনে এগিয়ে গেল দাদুমনি পরম মমতায় আরাফকে জড়িয়ে ধরল কেমন আছো দাদাভাই আলহামদুলিল্লাহ্। আপনি কেমন আছেন..?
আলহামদুলিল্লাহ্, খুব ভালো আছি।
অনেকদিন পর প্রিয় ছাত্রকে কাছে পেয়ে আবেগে আপ্লুত আরাফের বাবা বুকে জড়িয়ে ধরলেন আজাদ কেমন আছো..?
জ্বী স্যার ভালো। আমার স্ত্রী, মিরা সালাম দিয়ে কৌশল বিনিময় করলো। দাদুমনির পাশেই দাঁড়িয়ে আছে প্রিয়া আজ গোলাপী রংয়ের একটা ফগ জামা পড়ছে টিউব লাইটের আলোয় গায়ের রংয়ের সাথে জামাটা মানিয়েছে বেশ, প্রিয়ার লম্বা চুল দু’বেনী করেছে তারপর গোলাপী জামা প্রিয়ার সৌন্দর্য বহুগুন বাড়িয়ে দিয়েছে। রুমের দরজা,জানালার পর্দা ফিরোজা রংয়ের সব মিলেয়ে অসাধারন লাগছে পরিবেশটা আরাফ অপলক দৃষ্টিতে প্রিয়াকে দেখল।স্যার আমার আম্মা, মা কেমন আছেন বলেই পা ছুয়ে সালাম করলেন, আপনার শরীর এখন কেমন আছে..?
ভালো। বসো বাবা, মাকে তো ভুলেই গেছ সেই কবে আসছিলে তারপর আর একবারও দেখতে এলে না কিছুটা বাচ্চা মানুষি সুরে কথা গুলো বললের আজাদের মা।
মা আপনার কথা সব সময় মনে পড়ে কিন্তু সময় সুযোগ হয়ে উঠে না তবে এবার থেকে মাঝে মাঝে আসবো বলেই সোফায় বসলেন।
মিরা মেহমানের জন্য নাস্তা রেডি করতে টেবিলে গেলেন, প্রিয়া এদিকে একটু আস তো মা..! জ্বী আসছি মম।
আরাফ সুযোগ খোঁজছিলো কিভাবে প্রিয়ার সাথে একটু কথা বলা যায় কিন্তু তাকে তো পাওয়াই যাচ্ছে না সারাক্ষন এদিন-ওদিক দৌঁড়াদৌড়ি করছে। দাদুমনি খেয়াল করলো আরাফের চোখ কিছু খোঁজছে তিনি প্রিয়ার নাম ধরে ডাকলেন
প্রিয়া চুপিচুপি দাদুমনির কাছে গিয়ে চেয়ার ধরে দাঁড়াল।
স্যার আমার মেয়ে প্রিয়া এবার পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে, খুব দুষ্টু একদম পড়তে চায় না বললেন আজাদ। মেয়েকে এক ক্লাসেই বুড়ি বানালে পড়াশোনার মন থাকবে কি করে..! আমার হিসাবে এই মেয়ের তো এইট-নাইন ক্লাসে পড়া উচিত ছিলো ভিড় ভিড় করে কথা গুলো বললো আরাফ। আলহামদুলিল্লাহ্, আজাদ তোমার মেয়ে দেখি মাশাল্লাহ্ অনেক সুন্দর হয়েছে। বাচ্ছা মানুষ একটু দুষ্টুমী করবে কিন্তু মা-মনি পড়াশোনা না করলে যে বাবা কষ্ট পাবে বলেই প্রিয়াকে সোফায় তার পাশে বসিয়ে দিলেন।
প্রিয়া আড়চোখে আরাফকে একবার দেখে নিল আরাফও প্রিয়ার দিকেই চেয়ে আছে, সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নিল আরফের বাবার প্রশ্ন প্রিয়া মা-মনি সামনে তো পরীক্ষা পড়াশোনার প্রস্তুতি কেমন চলছে..? স্যার দোয়া করবেন প্রিয়া খুব মেধাবী ছাত্রী, স্কুলের স্যার রা বলেন গত ১০বছরেও এমন মেধাবী স্টুডেন্ট এই স্কুলে হয়নি বললেন আজাদ। আলহামদুলিল্লাহ্।
আঙ্কেল আমার জন্য দোয়া করবেন, প্রিয়ার কথা শেষ করার আগেই আরাফ বললো, স্কুল ভালো,পড়াশোনায় ভালো স্যার ভালো বললেই হবে না নিজেকেও মনযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে, প্রিয়া লজ্জায় পেয়ে মাথা নিচু করে রাখলো। হা হা হা হা প্রিয়া বাবাকে পিচনে ফেলতে পার নাই আজাদ ক্লাস সিক্স থেকে ক্লাস টেন আমাদের স্কুলে সবচেয়ে মেধাবী স্টুডেন্ট ছিলো এমন কি বিভিন্ন খেলাধুলা করে অনেক পুরষ্কার আনছে স্কুলের জন্য সাথে সম্মান, আজও স্কুল আজাদকে মনে রাখছে তার কৃতিত্বের জন্য বললেন আরাফের বাবা।
দাদুমনির মুখে আনন্দের হাসি আজাদ এস.সি.সি পরীক্ষায় ময়মনসিংহ্ জেলায় প্রথম হয়,সেই খুশিতে আজাদের বাবা গ্রামবাসীকে ২ মন মিষ্টি বিতরন করেন খাওয়ান সেটা খুব প্রশংসার দাবী রাখে।
আজাদ নিজের প্রশংসা কৃতত্বের বিজয়ীর স্মৃতি শুনে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন, স্যার এই কারনেই আমার কর্মজীবনের প্রথম স্থান আমার গ্রামকে বেচে নেই আর গ্রামের অসহায় মানুষদের জন্য কাজ করি মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের সেবা করতে চাই।
বাবা,দাদুমনি,আঙ্কেল এর কথা শুনে গর্বে বুক ভরে যায় এমন একজন মহৎ আদর্শ বাবার সন্তান প্রিয়া সে যেন আর ভাবতে পারছিলো না বাবাকে জড়িয়ে ধরল খুব ভালোবাসি আব্বু তোমাকে, স্যালুট। বাবাও মেয়েকে আদর করলো প্রিয়া বাবার চেয়েও ভালো রেজাল্ট করতে হবে,বাবাকে পিচনে ফেলে যেতে হবে, সবার আগে একজন ভালো মানুষ হতে হবে রে মা।
ওকে আব্বু। স্যার আরমান অনেক ভালো স্টুডেন্ট ছিলো ক্লাসে আমি প্রথম ও দ্বিতীয় হতো খুব ভাব ছিলো আমাদের মাঝে এস.সি.সি পাশ করার পর আপনি ওরে নিয়ে ঢাকা ভর্তি করালেন আমি ময়মনসিংহে তারপর আমিও ঢাকা ভর্তি হলাম কিন্তু তখন আরমান সেনাবাহিনীতে যোগ দিল সে ভাবে দেখা হয়নি তারপর আরমান এর বিয়েতে দেখা হলো বললেন আজাদ। আরাফের বাবা বললেন, আজাদ আমার সব সন্তানেরাই খুব মেধাবী আরমান সেনাবাহিনীর মেজর,সায়মন ডাক্তার, আরাফাত ইঞ্জিনিয়ার, পরে মেয়ে আরিফা জাহান ব্যাংকার, সবার ছোট আরাফ সে সবার চেয়ে মেধাবী স্কলারশীপ নিয়ে পড়াশোনা করেছে। ঢাকা ইউনিভার্সিটি মেধা তালিকায় সারা বাংলাদেশে প্রথম স্থান অধিকার করে, তারপর উচ্চশিক্ষার জন্য সরকারী খরচে জাপান যায় সেখানে পড়াশোনা শেষ বলছিলাম জাপানে থেকে যেতে কিন্তু মা, দেশ এদের মায়া ছাড়তে পারবে না। দেশে ফিরে আসে অনেক ভালো ভালো চাকরির সুযোগ আসে কিন্তু সে সব সুযোগ ফিরিয়ে দেয় অবশেষে বেকার থাকবে বলে কলেজে চাকরি নেয়,পাশাপাশি কয়েকটা ব্যবসার দেখাশোনা করে এটাই নাকি তার জন্য স্বাধীর পেশা।
আরাফ ঠিক আমার মতো হয়েছে খুব সাধারন ভাবে জীবনযাপন করে,গরীবের প্রতি খুব মায়া দু-হাতে সবাইকে সাহায্য করে আমার সন্তানদের জন্য এসব কারনেই আরাফ আমার সবচেয়ে প্রিয় কথা গুলো খুব গর্ব করে বললেন আরাফের বাবা। প্রিয়াসহ সবাই খুব মুগ্ধ হলো প্রিয়া চেয়ে দেখলো আরাফ নরম তুলতুলে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে ঘাড় সোফার হাতলে রাখে আনমনে কি যেন ভাবছে আর মুচকি মুচকি হাসছে, তাইতো নিজের প্রশংসা শুনলে কার না ভালো লাগে..! তবে আরাফ দেখতে সুন্দর ব্যবহার ভালো,মানুষ ভালো এবার মেধাবী শব্দটা যোগ হলো তাতে করে ১হাজার মানুষের মধ্য এমন গুন একজনের থাকে আরাফ তাদের মধ্যে অন্যতম প্রিয়ার শ্রদ্ধাটা বেড়ে গেল সাথে ভালোবাসাও। দাদুমনি আরাফকে কাছে টেনে নিলেন খুব ভালো লাগছে তোমার কথা শুনে দোয়া করি সারাজীবন এভাবেই সম্মান আর ভালোবাসা পেয়ে বেঁচে থাকো দাদাভাই।
দাদুর কথায় যেন আরাফ সস্তি পেল প্রিয়ার সাথে যোগাযোগের জন্য দাদুমনিকে হাত করতে হবে কিন্তু কিভাবে পিচ্চিটাকে তো কাছেই পাইনা ওর সাথে কথা না হলে দাদুমনিকে কিছু বলা কি ঠিক হবে ভাবতে থাকে আরাফ।
মিরা ড্রইংরুমে নাস্তা দিয়ে গিয়েছিলো অনেক আগে গল্প করে সবাই নাস্তা খেল, ততক্ষনে মিরার রান্না শেষ কিচেন থেকে ওদের সব কথা শুনছিলো আর ভাবছিলো এত ধনী পরিবার দরকার নেই খুব সাধারন পরিবারের প্রিয়া বড় হলে এমন একটা ছেলে যেন বিয়ের জন্য পাই তাহলে মরেও শান্তি পাব মেয়েটাকে একজন ভালো মানুষের কাছে রেখে আসছি, আল্লাহ্ কবুল করুন। মিরা আজাদ সম্পর্কেও শুনছিলো সে জানে আজাদ খুব ভালো মানুষ বিয়ের জন্য যখন ঘটক যায়…!

…চলবে

  • সুরাইয়া নার্গিস আলিফ।
৫১১জন ৩৩৬জন
0 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য