লৌকিক না অলৌকিক’ সে তর্কে যেতে চাই না। তবে জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যার আসলে কোনো উত্তর হয়না। ব্যাখ্যাও হয় না।

এমন অলৌকিক অনেক ঘটনাই আমার সাথে ঘটে গেছে জীবনের বিভিন্ন সময়ে। এর ব্যাখ্যা আজও আমার অজানা।

ঘটনা একঃ ছোটোবেলায় প্রচন্ড দূরন্ত প্রকৃতির ছিলাম আমি। সব বিষয়ে প্রচন্ড সাহস ছিলো আমার। কি সন্ধ্যা কি দুপুর কি বা ঘন জঙ্গল আমি ঠিকই চলে যেতাম। মেয়ে হয়েও কখনো মেয়েলি টাইপ খেলা আমি খেলতাম না। তাই নানা বাড়ি বা দাদা বাড়ি গেলে পাড়ার সব ছেলেপুলের দলনেতা হয়েই আমি খেলতাম। নানাবাড়ির পাশে ফাঁকা জমিতে কিছু আশ্রিত মানুষ থাকতো ঘর তুলে। ওরা নানাবাড়ির সব রকম কাজে সাহায্য করতো। গ্রামের ভাষায় যাকে বলে কিষেণ। ওদের ছোটোছোটো ছেলেমেয়েদের সাথে আমি খেলতাম কারণ, আমার একটা মাত্র মামা। তার একটাই মেয়ে। আমার খালাতো ভাইবোনও সংখ্যায় কম। তাই ওদের দল বেশি ছিলো বলে ওদের সাথেই আমরা খেলতাম। মামাতো বোনটাও আমার এক বছরের ছোটো। যেহেতু শহরে থাকতাম তাই ধরতে গেলে আলাদা একটা ভাব থাকতো আমার। এটা কিন্তু অহংকারের কথা নয়। এটাকে শৈশবের সরলতাও বলা যেতে পারে।

আমরা নানাদের বড় উঠানে খেলতাম। কখনো কখনো আমরা পাশে সরকার বাড়িতেও খেলতে যেতাম। ওদের বাড়িতে অনেক ছেলেমেয়ে ছিলো। সরকার বাড়ি থেকে আমার নানাবাড়ি যেতে আসতে চার/পাঁচ মিনিট সময় লাগে। আসতে যেতে সরকার বাড়ির একটা বাগান ও নানাদের একটা বাগান পড়ে। তবে যেখানেই আমরা খেলতাম না কেনো সন্ধ্যার আযানের সাথে সাথে খেলা বন্ধ করে দিতে হতো। নানাবুর কড়া শাসন। আমরা দাঁড়িয়াবান্ধ্যাই বেশি খেলতাম। তারপর বউ কিতকিত। যাইহোক, তো একদিন ওদের বাড়ি থেকে খেলে সন্ধ্যার সময় আমি একা একা হেলতে দুলতে আসতেছি হঠাৎ দেখি সরকার বাড়ির বাগানে একটা ছোটো গাছের চিকন ডালে হুজুরমতো একটা ছেলে শুয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। আমি দেখে চোখ কোড়া করে মুখ ভেংচি কেটে চলে আসলাম। পিছনে ফিরে আর তাকাইনি। আমি সে বিষয়টাকে একেবারেই সিরিয়াস নেই নাই তখন। বয়স তখন একেবারে শৈশব তাই ধরেই নিছিলাম ওটা কোনো মানুষ ইচ্ছে করে শুয়ে আছে। রাতে শুয়ে আমার কেনো যেনো হঠাৎই মনে হলো এ লোকটাকে তো আমি কখনোই দেখি নাই। এ এলাকার এ বয়সী সব ছেলেপুলেকেই আমি বেশ চিনতাম। পরে রাতে নানাবুকে আমি বললাম ঘটনাটা। নানাবু আমাকে বলল, “এজন্যই তোকে আমি সন্ধ্যার আগে ঘরে ঢুকতে বলি।”

সত্যিই! এ বিষয়টা এখনো আমাকে ভাবায়। কারণ, সে হাসিটা আমার অদ্ভুত লাগে। কেমন যেনো অস্বাভাবিক ছিলো।

 

ঘটনা দুইঃ সরকার বাড়ির আনছার সরকারের এক ছেলে খেতিবাড়ি করতো। মানে, খেতে সবজি লাগাতো। একটা যায়গা ছিলো ওদের খাল পাড়ে। বসতবাড়ি থেকে একটু দূরে। ওখানে কোনোরকম থাকার একটা ঘরও ছিলো। সেখানে ঐ ছেলেটা নানারকম সবজি লাগাতো। বেগুনের সময় বেগুনও লাগাতো। তখন আমি মোটামুটি একটু বড়ই। কারণ, তখন নানাবাড়ি গেলে বাইরে কোনোরকম খেলাধুলা নিষেধ। একদিন নানাবাড়িতে সকালে ঘুম থেকে উঠলাম বিরাট হইচই শুনে। কি হয়েছে জানতেই শুনলাম, সে এক বিস্ময়কর কাহিনী। আর তা হলোঃ রাতে সরকারের বউ যখন তার ছেলেমেয়েকে খাবার খাওয়াচ্ছিলো তখন নাকি এক মহিলা এসে তাকে বলল, কিছু বেগুন ও টমেটো দিতে। সরকারের বউ বলল, তার ছেলের কাছে চাইতে ও দিনের বেলা আসতে। মহিলাটা তার ছেলের কাছে চলে গেলো কিনা তা আর সরকার বউ খেয়াল করলো না। ও হ্যাঁ, বলে রাখি তখন কিন্তু পুরো গ্রামে বিদ্যুতের ব্যাবস্থা ছিলো না। আনছারের ছেলেটি গরীব মহিলাটিকে দিনে আসতে বলল। কারণ, তখন গ্রামে এশার আযান দেয়ার পর মানে গভীর রাত। মহিলাটি নাকি রেগে গিয়ে তাকে খুব মারলো। সে ছেলেটি ছিলো বেশ স্বাস্থ্যবান। ছেলেটি বেশ তাগড়া জোয়ান বেশ স্বাস্থ্যবান যাকে বলে, হওয়ার পরেও শক্তিতে কিছুতেই মহিলাটির সাথে পারলো না। সকালে তাকে পাওয়া গেলো ক্ষেতে অজ্ঞান অবস্থায়। কোমরের নীচের অংশটা মাটির নীচে।

সে মহিলাটা কে ছিলো তা কেউ জানে না। কারণ, ওরকম বয়সী সব মহিলাকেই গ্রামের প্রতিটা মানুষ চেনার কথা। ওর ঘাড়টা আজও কুঁজো হয়ে থাকে সেই থেকে।

 

ঘটনা তিনঃ আমার দাদা বাড়িতে আমাদের নিজেদের পারিবারিক মসজিদ ও কবরস্থান আছে। মসজিদের পাশে সামান্য দূরেই কবরস্থান। তখন আমাদেন মসজিদে স্থায়ী কোনো ইমাম বা মুয়াজ্জিন ছিলো না। আমাদের মুন্সিবাড়িতে পুরুষরা মোটামুটি সবাই ভালো আযান দিতে পারতো। দাদা বেঁচে থাকতে দাদাই নামাজ পড়াতো শুনেছি। তারপর ছিঁড়া দাদা পড়াতো।

একদিন আমার দাদা ভরা পূর্ণিমার রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে বাইরের উঠোন পরিষ্কার দেখতে পাবার কারণে মনে করলো বুঝি ভোর হয়ে গেছে। যেহেতু তখন টোটালে গ্রামে বিদ্যুৎ ছিলো না। ঘড়িও ছিলো না। তাই দাদা খুব তাড়াতাড়ি মসজিদে গিয়ে আযান দিলো। আযানের পর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দাদা নামাজ পড়তে লাগলো একাই। তিনি নামাজে ডান দিকে সালাম ফিরিয়ে দেখলেন তার পিছনে অনেক লোক সাদা কাপড়ে নামাজ পড়তেছে। বাম দিকে সালাম ফিরিয়ে তিনি আর কাউকে দেখতে পেলেন না। কিছুক্ষণ পর তিনি বাড়িতে এসে আমার দাদীকে বললেন বারান্দাতে পাটি বিছিয়ে দিতে। তিনি দাদীকে এ ঘটনাটা বলতে বলতেই মারা গেলেন। তখন আমার আব্বা কিশোর বয়সের। পরে দাদাীর কাছে আমরা এ গল্প শুনেছি। আগে আমাদের ও মসজিদে এমন অচেনা লোক মাঝে মাঝেই দেখা যেতো।

ঘটনা চারঃ হঠাৎ হঠাৎ আমার মনে হয় কেউ আমার সাথে কথা বলছে। এবং আমি তার উত্তরও দিচ্ছি। হয়তো ঘরে একা বসে আছি খুবই সুন্দর এক অচেনা ঘ্রাণ নাকে আসে। বিশেষ করে বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টাইমটায়। সেদিন বিকালে আমি খুব মনোযোগ দিয়ে লিখছি। মনে হলো সামনে দাঁড়িয়ে থেকে কেউ আমাকে দেখছে। আমি হঠাৎ মাথা তুলে তাকাতেই ছায়াটা সরে গেলো খুব দ্রুত। আর সে ছায়াটা সত্যিই লাইব্রেরি রুমের দিকে চলে গেলো। আমি হুড়মুড় করে উঠে মেইন গেট খুলে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কাঁপতে লাগলাম। জুলফিকে ফোন দিলাম। সে অভয় দিয়ে ফোন কেটে দিলো।

মাঝখানে কিছুদিন আমার ঘরে প্রচন্ড ইঁদুর, ব্যাঙ ও তেলাপোকার উপদ্রব হইছিলো। আমি ও সাকি খুব পেরেশান ছিলাম ব্যাপারটা নিয়ে। শেষমেষ ওষুধ দিলাম। কোথাও ইঁদুর মরে প্রচন্ড গন্ধ বের হতে লাগলো। কিন্তু ফার্নিচারের কারনে তা খুঁজে বের করা মুশকিল হয়ে গেলো। ঘরে থাকাটাই আমার মুশকিল হচ্ছিলো। তার উপর রিয়ানের পরীক্ষা। আমি খুব অস্থিরতা নিয়ে সে রাতে ঘুমিয়ে পড়লাম। রাতে কে যেনো আমাকে বলছে,”তোমার ঐ রুমের অয়্যার ড্রপের নীচে শেষ কোণার দিকে একটা বড় ইঁদুর ও ছোটো ইঁদুর মরে পড়ে আছে। একদম স্পষ্ট মনে হলো কেউ আমাকে বলে দিলো। সকালে ঘুম থেকে উঠে বুয়াকে বললাম তাড়াতাড়ি অয়্যার ড্রপ সরাতে। আমি স্বপ্নে দেখেছি তাও সবাইকে বললাম। প্রথমে জুলিসহ সবাই হাসলো। কিন্তু যখনি ওখান থেকেই হুবহু ওরকম অবস্থায় ইঁদুর বের হলো, তখন সবাই একটু বিস্ময় নিয়ে আমার দিকে তাকালো।

আমি বাবুদের পড়াশুনা নিয়ে খুব টেনশন করি। রিয়ানকেও এবার ক্যাডেটে দিব। আমি তাকে কখন কি পড়াব তা মনে মনে ঠিক করে নেই। যাকে বলে একটা ছক করে নেয়া। কখনো কখনো মনে হয় কেউ আমাকে বলছে,’তোমার এটা পড়ানো হয়নি।’ সত্যিই আমি সকালে উঠে আগে ওটা পড়াই। এবং বিষয়বস্তুটা মনে হয় আমাকে স্পষ্ট করে কেউ বলে দিচ্ছে। মেমনের ক্যাডেটের রেজাল্টের আগের দিন মনে হলো নানাবু আমাকে কানের কাছে এসে বলছে,’বুগো বেশি বেশি করে ছোটোছোটো দোয়াগুলো পড়। তোর অনেক ভালো হবে বুগো।’ নানাবু আমাকে আদর করে বুগো বলতো।

আমার মাঝে মাঝে কিছু সমস্যা হয়। এমন হয় যে, আমি কাউকে সহ্য করতে পারি না। একদম চুপচাপ থাকতে ইচ্ছে করে। সারাদিন তখন আমি পড়ে পড়ে ঘুমাই। চোখমুখ আমার কালো হয়ে যায়, অকারণ রাগ হয়। অথচ আমি সদা হাসির একজন মানুষ।

ঘটনা পাঁচঃ জুলির ডায়েবেটিসের কারণে পায়ে তীব্র যন্ত্রণা হয়। শোয়ার আগে অনেকটা সময় পা ম্যাসেজ করে দিলে ও ঘুমাতে পারে। কখনো কখনো সকালেও যন্ত্রণা থাকে। কিন্তু রিয়ানের পড়ার জন্য আমি বেডরুমের দরজা চাপিয়ে অন্যরুমে এসে পড়তে বসি। জুলি সকালে ঘুম থেকে উঠে বলছে,”আজ যতো সুন্দর করে তুমি পা ম্যাসেজ করে দিছো আর কখনো তা দেওনি।” আমি বললাম,”আমি তো রুমে আর ঢুকিই নাই! ইয়ার্কি করে বললাম, তোমার মেয়ে এসে হয়তো তোমার পা ম্যাসেজ করে দিছে।” কারণ, তার বর্ণনা মতে সে নাকি পিছন থেকে একেবারে আমার মতো।

জুলি, আমি ও রিয়ান তো একেবারে অবাক! সত্যি সেই থেকে কয়েকদিন ওর পায়ে কোনো যন্ত্রনা ছিলো না।

ঘটনা ছয়ঃ ঢাকায় শ্যামলীর বাসায় থাকার সময়ও অদ্ভুত কিছু ঘটনা ঘটতো। আমার বাসাটা ছিলো শ্যামলী দুই নাম্বার রোডে একদম আগারগাঁও যে ঝিলটা ছিলো ওটার পাশেই। এখন সে ঝিল নেই। তখন মেমনের চার পাঁচ মাস বয়স। আমার চারতলার বাসাটায় তিনটা ফ্লাটে আমি একাই থাকতাম প্রায়ই। ঝিলের দিকে বড় একটা গ্লাস লাগানো বারান্দা ছিলো। গ্রিলের উপর সাদা গ্লাস লাগানো। ওটাকে আমি ডাইনিং রুম করেছিলাম। মাঝে মাঝেই প্রচন্ড জোরে ঝন ঝন করে উঠতো সে গ্লাস। জুলি তখন প্রচন্ড ব্যাস্ত। বাসায় আমি পুরো একা। যখন চোখ লেগে আসতো তখন দেখতাম একটা লোক ও তার ছোটো তিন থেকে চার বয়সী ছেলে আমার গ্লাসে বেয়ে বেয়ে উঠছে। মনে হতো তারা গ্লাস ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকবে। অবাক বিষয় হতো আমি চোখ খুললেও যেনো তাদের দেখতে পেতাম। আমি বেডরুমের দরজা বন্ধ করে দিতাম। বাথরুমের কাছে একটা জানলা ছিলো, যেটা টেনে বন্ধ করা যেতো কিন্তু কখনো কখনো বন্ধ করতে পারতাম না। মনে হতো কেউ খুব শক্ত করে ধরে রেখেছে। আমি সাহস করে আয়তল কুরসি পড়তে থাকতাম জোরে জোরে। সত্যিই পরে জানলাটা হালকা হয়ে যেতো।

জীবনে ঘটে যায় অনেক অনেক বিস্ময়কর ঘটনা। যার কোনো ব্যাখ্যা আছে কিনা আমার জানা নেই।

,,,রিতুু,,, কুড়িগ্রাম।

 

 

 

৪৮৪জন ৪৮৪জন
0 Shares

২৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ