মূল লেখায় যান

রায়হান সেলিম স্যার (এক) – যাঁদের কাছে ঋণী এ জীবন : অষ্টম ভাগ

নীলাঞ্জনা নীলাএকান্ত অনুভূতি৩৮টি মন্তব্য
জ্ঞানের কান্ডারী শিক্ষক...
জ্ঞানের কান্ডারী শিক্ষক…

দশ বছরের স্কুল জীবন শেষ করে যেদিন প্রথম কলেজে পা রাখলাম, তখন কি ভেবেছিলাম এখান নতূন এক আমার জন্ম হবে? সব শিক্ষকদের কথা আমি যেনো সিলেট উওমেনস কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দেই। বাপিকে বললাম বিশ্ববিদ্যালয় জীবন তো বাইরেই কাটাবো। এখন আমি কমলগঞ্জ কলেজে ভর্তি হই? বাপি কখনোই আমার আব্দার ফেলে দেয়নি। শমশেরনগরের থানা শহর কমলগঞ্জ কলেজে ভর্তি হলাম। কলেজ মানে স্বাধীনতা। অনেক বই নিয়ে যেতে হয়না। আটটা পিরিয়ড থাকেনা। এসব ভেবেই কি আনন্দ! যাক যেদিন ভর্তি হলাম, পরের সপ্তাহে ক্লাশ শুরু হলো। কলেজ জীবনের প্রথম ক্লাশ বাংলা। ক্লাশে গিয়ে বসলাম, একজন এলেন। বয়স অনেক কম, বুঝিনি উনি-ই শিক্ষক। কিন্তু উনি যেই ডায়াসে উঠলেন, চেয়ারে বসলেন। যে কয়েকজন এসেছিলাম ক্লাশে তখন উঠে দাঁড়ালাম। প্রথমে রোল কল করলেন। তারপর উনি দাঁড়িয়ে গেলেন। সাথে সাথে আমরাও। স্কুলের অভ্যাস কি সহজে বদলায়? স্যার বললেন, “আরে বসো, বসো। আমি বসে ক্লাশ নেয়াটা পছন্দ করিনা।” মামনিকে দেখেছি বসে ক্লাশ নিতো না। তারপর দেখলাম রায়হান স্যারকে।

পুরো কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা সেলিম স্যার বলে ডাকতো, আর আমি-ই শুধু রায়হান স্যার বলে ডাকতাম। স্যার ময়মনসিংহের মানুষ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স-মাষ্টার্স করেছেন। উনার প্রথম চাকরী আমাদের কমলগঞ্জ ডিগ্রী কলেজে। স্বাভাবিক ভাবেই স্যার সিলেটি ভাষা বুঝতেন না। তাই বেশ সমস্যায় পড়েছিলেন। যাক প্রথম দিন ক্লাশে এসে এতো সুন্দর করে বললেন যে আমার মনে গেঁথে গেলো কথাগুলো। জীবনের এক নতূন ধাপ যেমন আমাদের, ঠিক তেমনি স্যারেরও। শুধু দুটো পার্থক্য আমাদের সাথে স্যারের। প্রথমটা হলো, আমাদের উচ্চশিক্ষার যাত্রা শুরু, আর উনার শেষ। আর দ্বিতীয়, স্যারের নিয়োগ হয়েছে একজন শিক্ষক হিসেবে। আর আমাদের পরিচিতি শিক্ষার্থী। আভিধানিক অর্থে শিক্ষকের মানে হলো শিক্ষাদান করেন যিনি। কিন্তু শিক্ষা কি দান করা যায়? কারণ আমরা সকলেই আজীবন শিখেই চলি। শেখার কোনো শেষ নেই। তাই নাকি স্যার শিক্ষাদান করতে নয়, আমাদের থেকে শিখতে এসেছেন। আর উনি যা কিছু উনার শিক্ষকদের থেকে গ্রহণ করেছেন, সেসব আমাদের কাছে বলতে এসেছেন। এতো সুন্দরভাবে স্যার এ কথাগুলো বলেছিলেন আমি আজও ভুলিনি। ঠিক এভাবেই আমিও বলেছিলাম আমার ছাত্র-ছাত্রীদের, যখন কলেজে শিক্ষক হিসেবে চাকরীতে নিয়োগ পাই। ক্লাশে যে কয়জন ছিলাম আমরা চুপ করে শুনছিলাম।

তারপর আমরা বই খুলতেই স্যার জিজ্ঞাসা করলেন, ক্লাশে এমন কেউ কি আছে কবিতা-গল্প লেখে? আমাদের ক্লাশে দুজন কাইয়ূম ছিলো। একজন খাটো, হাল্কা-পাতলা তাকে ছোট কাইয়ূম বলা হতো। কাইয়ূম উঠে দাঁড়ালো, স্যার বললেন নিয়ে যেতে। আমার বন্ধু নাসিমা আমাকে খোঁচা দিয়েই যাচ্ছে, “তুই দাঁড়া।” আমি বললাম উফ নাহ! থামতো। হঠাৎ করে ও আমার খাতাটা টেনে নিয়ে দাঁড়িয়ে বললো, “স্যার নীলাঞ্জনা লেখালেখি করে।” আমি তো লজ্জ্বায় শেষ। সেদিনই বাসে আসার সময় খাতায় লিখেছিলাম,

আমি কোথায় যাবো ?
কোন বুকে শুয়ে বলবো আমি নষ্ট হয়ে গেছি পৃথিবী!
হাতের তালুতে হেমলক
তবুও ঠোঁটের কাছে এনে বলতে পারিনা
আমি আত্মহত্যা করতে চাই।
আকাশের সূর্য্যে
বিষাক্ত আলফা ভায়োলেট রে
তবুও চাইতে পারিনা
আমার চারপাশে অজস্র মানুষ–
তবুও কারো হাত ছুঁয়ে বলতে পারিনা
আমিও বাঁচতে চাই ।(নিঃসহায় , ১৯৯০ সাল)

স্যার খাতাটা রেখে দিলেন। আর বললেন, “লেখালেখি লজ্জ্বার কিছু নয়। সবাই লিখতে পারেনা। কখনো কেউ যদি জানতে চায়, মাথা উঁচু করে বলবে তুমি কবিতা লেখো। লজ্জ্বা কিসে জানো? অহঙ্কারে, মিথ্যে বলায়, ফাঁকি দেয়ায়।”

ক্রমশ

হ্যামিল্টন, কানাডা
৬ আগষ্ট, ২০১৬ ইং।

**স্যারের থেকে আরোও অনেক কিছু শিখেছি, জেনেছি। সে সবই বলবো। এই একভাগে স্যারকে নিয়ে লেখা শেষ হবার নয়।

মোট পড়েছেনঃ ১৩২৫জনআজ পড়েছেনঃ ০জন
ঘরে বসেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন

৩৮টি মন্তব্য

      1. ওহ তাই নাকি!!! আমি জানতাম না আপনার সব লেখা আমার থেকেই নিচ্ছেন যে! এভাবে ফ্রীতে বহু নিয়েছেন তাহলে? হায়রে! 🙁
        শুনুন কড়ায়-গন্ডায় হিসেব চাই। নইলে খবর আছে। :@

    1. আমি ঠিক মেনে নিতে পারলাম না কথাটা। যারা লেখালেখি করে তাদের মন অনেক বড়ো হয়। এমন অনেক মানুষ লেখালেখির ত্রিসীমানাতেও নেই। কিন্তু বিশাল বড়ো মন।

      তবে হুম লেখার এই প্রেরণা পাই আপনাদের ভালোবাসা মাখানো মন্তব্য থেকে।

      ভালো থাকুন ইঞ্জা। তা অভি আর অবণী কোথায় আছে?

  1. এমন একটি কবিতা সেইসময়েই লিখে ফেলেছো? দারুণ কবিতা নীলাপু। হাতের তালুতে হেমলক নিয়ে কারো হাত কি ছোঁয়া যায়?
    রায়হান স্যারের কথাগুলো সত্যিই খুব ভাল লাগলো, সব শিক্ষকরাই যদি এমন বন্ধুর মতো আচরণ করতো তাহলে আনন্দ নিয়ে পড়তো সবাই।

    1. শুন্য আপু আমি ভেবেছিলাম হেমলকসহ এই হাতটাই কেউ ধরুক।
      যার এই সাহস থাকবে, সে কখনোই ছেড়ে যেতে পারবে না। কিন্তু কপাল দেখো কেউই ধরেনি ভয়ে।
      আর তরুণ বেচারা হাত ধরে ফাঁদে পড়ে গেছে। 😀 :D)

      স্যারের কথা কি বলবো তোমায়! যা কিছু লেখা আমার সবই তো স্যারের থেকে পাওয়া।

    1. মজিবর ভাই স্যারের মতো মানুষ হয়না।
      এমন একজন মানুষ তিনি, যিনি কোনোদিন কখনো কারোও ওপর রাগ করেননি।

      প্রার্থনা করুন স্যার যেনো সুস্থভাবে বেঁচে থাকেন।

  2. হুম দারুন কবিতা, বাসে আসতে আসতে এত ভাল কবিতা লিখতে পেরেছেন- ভালই লাগল। কেননা, আজকালকার রাস্তাঘাটের যে অবস্থা, তাতে কোন নির্দিষ্ট দিকে মনযোগী হওয়া অনেক কষ্টকর। স্যারের সম্পর্কে পড়ে অনেক ভাল লাগল। স্যার নিজেও কি একজন লেখক? যাইহোক, স্যারকে নিয়ে পরের লেখার অপেক্ষায় রইলাম।

    1. আসলে শমশেরনগর-কমলগঞ্জ রুটের বাসে তখন সকালের দিকে কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা ভরা থাকতো। আর আমি সবারই একটু বেশী ভালোবাসা পেতাম। তাই বাসে সিটও থাকতো আমার জন্য। 😀

      স্যার অসম্ভব সুন্দর লেখেন। উনার কবিতার মধ্যে এতো কোমল এক আবেগ আছে কি বলবো! স্যার গান এবং আবৃত্তিও করেন।
      হুম স্যারকে নিয়ে লেখা আসবে। একটু ব্যস্ত আছি।

      ভালো থাকবেন।

  3. আরে, এইতো কার যেনো লেখায় পড়লাম, ওনাদের হাতে সব সময় একটা বিষের কৌটা থাকে। তাহাদের ভয় দেখাইবার এক্ষান এটম বম্ব। তা ১৯৯০, তাহা কি এক্তূ চেখে দেখেছিলেন!! স্বাদ কেমন!!

    1. সমস্যা তো এখানেই। হেমলকের স্বাদটা নেবার আগেই একজন আমার হাত ধরে নিয়ে ফেলে দিলো।
      তাই আর চেখে দেখতে পারলাম না।

      বিষের কৌটা আমি অবশ্য সাথে রাখিনা। নীল বিষ ভালোবেসে পান করেছি। 🙂

  4. ভার্সিটি জীবনের শুরুতে মাত্র তিনদিনের জন্য একজন শিক্ষক পেয়েছিলাম। উনি বলেছিলেন, তোমাদের সাথে আমার মিল কোথায় জানো?
    এখানে আমরা সবাই শিখতে এসেছি।
    তোমার সাথে আমার পার্থক্য কোথায় জানো?
    আমি তোমাদের চেয়ে বয়সে বড় তাই অভিজ্ঞতা একটু বেশি, কিন্তু অন্য কোন দিক দিয়ে তোমাদের সাথে আমার কোন পার্থক্য নেই। সুতরাং কাউকে শিখানোর জন্য নয় বরং নিজেরা শিখার জন্য এখানে এসেছি।

    দিদি, বই আমাদের কি শিক্ষা দেয়? তারচেয়ে কি বেশি শিক্ষা দেয় না আমাদের শিক্ষকদের মুখের কথা।

    লেখালেখির কথা সবাই জানতো, স্কুল কলেজে অনেকেই বলেছে ছেড়ে দিতে, কেউ বলেনি লিখতে। ভার্সিটিতে এসেও অনেকের কটু কথা শুনেছি। দুয়েকজন পেয়েছি যারা উৎসাহ দেয়।

    1. বাহ! একেবারে দেখছি রায়হান স্যারের মতো কথা! উনার সম্পর্কে জানতে ইচ্ছে করছে আনিছ ভাইয়া।

      আমি অনেক অনেক বাজে কথা শুনেছি আমার লেখা নিয়ে। তাতে লাভই হয়েছে, চেষ্টায় থেকেছি ভালো লেখার।
      যদিও এখনও মনের মতো লেখা লিখতে পারিনি।

      ভালো থাকুন।

      1. আপু, পুরু ভার্সিটি জীবন নিয়েই কিছু লেখার ইচ্ছা আছে তবে সেটা আরো অনেক পড়ে। আর যদি কখনো লিখি তাহলে সোনেলা নিশ্চয় জানতে পারবে।

  5. লজ্জ্বা কিসে জানো? অহঙ্কারে, মিথ্যে বলায়, ফাঁকি দেয়ায়।”
    স্যাররা ছাত্রদের সব সময়ই ভাল উপদেশ দেন।লেখাটির কবিতাটি চমৎকার সেই সময় হতেই আপনি পাকা এখনতো বলাই বাহুল্য।শুভ কামনা দিদি।বই বের করুন কিংবা করেছেন কি?

    1. মনির ভাই হুম একটা বই বের করেছিলাম। তবে সেটা আসলে আমার মনের মতো হয়নি।
      তবে আশা করছি সামনে আমি আর রায়হান স্যার মিলে একটা বই বের করবো।
      ২০১৮ সালে হয়তো বইমেলায় প্রকাশ করতে পারবো।

      ভালো থাকুন। 🙂

    1. নানা সব শিক্ষকদের নিয়ে লিখছি না। যে কয়েকজনের প্রেরণায় আমি ভালো কিছু করতে পেরেছি, শুধু উনাদের কথাই লিখছি।

      তোমার ভাগ্য খারাপ ছিলো কেন? শুনতে চাই। জানতে চাই।

      1. নানা জীবন কি আর পুরোটা লেখা যায়? আর যেটাই লেখো পাঠক কি তোমার সেই আবেগ নিয়ে পড়ে? তবুও যা কিছু লিখি আমরা ধরে নাও এটুকুই অনেক। অনেকের তো লেখার জায়গাও থাকেনা। আর এ পৃথিবীতে কারো ভাগ্য এমন, লেখার মান না থাকলেও প্রকাশিত হয়।

        তবু লেখো। যা জানলে কারো না কারো জীবনে কাজে আসতে পারে।

    1. জীবনের প্রথম লেখা আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যখন পড়ি, তখন স্কুল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিলো। তখন আমি তৃতীয় শ্রেণীতে ছিলাম। তারপর অগা-মগা-জগা কতোকিছুই না লিখলাম। পত্রিকায় স্থান পেলো এই লেখাটি-ই।

      তবে লেখার সাথে হয়তো এতোটা জড়ানো হতোনা, যদি জীবনে রায়হান স্যার না আসতেন।

      ভালো থাকুন।

  6. আমি কোথায় যাবো ?
    কোন বুকে শুয়ে বলবো আমি নষ্ট হয়ে গেছি পৃথিবী!
    হাতের তালুতে হেমলক
    তবুও ঠোঁটের কাছে এনে বলতে পারিনা
    আমি আত্মহত্যা করতে চাই।
    আকাশের সূর্য্যে
    বিষাক্ত আলফা ভায়োলেট রে
    তবুও চাইতে পারিনা
    আমার চারপাশে অজস্র মানুষ–
    তবুও কারো হাত ছুঁয়ে বলতে পারিনা
    আমিও বাঁচতে চাই ।

    সিরিয়াসলি!
    এত অল্প বয়সে এত অসাধারন কবিতা লিখলেন কেমন করে!! কবিরা বুঝি এমনই হয়! কিংবা কবিরা গুড গিফটেড! না আপনার লেখা কবিতা পড়লেই আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। আচ্ছা, আপনার কবিতার কোন বই আছে??

    1. কি বলবো বুঝে উঠতে পারছিনা। কিছু ভেবে তো কখনোই লিখিনি।
      আজও ভেবে পাইনা স্যার কি দেখেছিলেন এ লেখাটিতে। আবার আপনিসহ অনেকেই পছন্দ করেছেন।
      ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

মন্তব্য করতে লগিন করুন অথবা নিবন্ধন করুন।

অনলাইনে ডাক্তার দেখাতে চান?