মূল লেখায় যান

বিধর্মী উৎসব (ম্যাগাজিন)

নীলাঞ্জনা নীলাএকান্ত অনুভূতি, গল্প৩৮টি মন্তব্য

ওই যে যেখানে নি:শব্দ শুয়ে আছে, তার ঠিক একটু সামনে এগিয়ে একটা গলি। সেই গলি পেরিয়ে সামনে এগোলে ডান দিকে পড়বে বড়ো রাস্তা। সেই রাস্তার ধার ঘেঁষেই একটা সবুজ লেক। ঠিক ওখানেই আজ অভিজাত কোলাহলের উৎসব। হুম কোলাহল কোনো মানুষের নাম নয়, আমার নাম। আমি কে? সেই পরিচয় দিতে গেলে যে কাহিনী সংক্ষিপ্ত থাকবে না। আর আমি চাইওনা আমাকে নিয়ে আরও কোনো কোলাহল হোক। যাক সেসব কথা! ওই যে দিনের বেলাতেও মেঘলা আকাশ কেমন উজ্জ্বল হয়ে আছে! আর এই ফায়ারওয়ার্কসের শব্দে নি:শব্দের বিরক্তি প্রকাশ। নাহ পারছে চোখ বুজে ভাবতে, না ঘুমোতে। নিঃশব্দ আমার একমাত্র শত্রু। ওকে দেখলেই আমার অসহ্য লাগে। ওর কাছে বিষণ্ণতা থাকে, তাই ঘেণ্ণা করি।

ওসব কথা থাক! ওই যে ওদিকে রঙিন পানীয় হাতে নরনারী; কয়লায় পুড়ছে মাংস, সুস্বাদু খাদ্য গ্রহণের অপেক্ষায় লোলুপ জিহ্বা। এটা কিন্তু বারবিকিউ উৎসব নয়, তার পাশেই হট ডগেরও ভ্যান। আজ এখানে খাবারের মিছিল চলছে যেনো। আমার মধ্যে গান বেজে চলছে। বিভিন্ন ধরণের গান। গানের জন্য কোনো পাসপোর্ট-ভিসার প্রয়োজন পড়েনা, তাই সমস্ত পৃথিবীর অনেকগুলো দেশের সুরে ভরে আছে আমার প্রাঙ্গণ। আরেকটু সামনে এগিয়ে গেলে শোনা যাবে “মেলায় যাই রে!” আমি এমনই এক কোলাহল, যার কোনো দেশ নেই, সংস্কৃতি নিয়ে ভাববার জন্য কোনো নিউরণ নেই।

দেখে যাচ্ছি, আজকের উৎসব পহেলা বৈশাখকে নিয়ে। আরেকটু সরে এগিয়ে গেলে পান্তা-ইলিশ বাঙ্গালীর ঐতিহ্য। কবে থেকে কে জানে পান্তার সাথে ইলিশের বন্ধন হলো! কাঁচা লঙ্কা, লবণ, চা-মুড়ি, ছোলা, চানাচুর, ফুচকাও রাখা আছে। আভিজাত্যপূর্ণ ডলারের জাতে উঠেছে এরা। আঙুল, হাতের তালু সব ঢাকা গ্লাভসে। নাক সিটকানোর কোনো কিছুই নেই। ধুলো-বালি নেই, মাছিদের উড়াল নেই। একা একা আমি হাসি, দেখি! কোলাহলের কাজই হলো নিঃশব্দে দেখে যাওয়া। বোমা মারলেও দেখি, সাম্বা নৃত্যও দেখি। কে যায়, কে আসে, কে কি বলে, কে চুপ করে থাকে ওসব নিয়ে ভাবার মতো আমার মেধা নেই যে!

সাদা-লাল পোষাক পরিহিত নারী ভরে আছে চারপাশ, মাথার উপর অবশ্য ইরানী পরিচ্ছদ। পুরুষদের দেখছি পাঞ্জাবি-প্যান্ট। একদিন অন্য আরেক উৎসবে কেউ একজন বলে উঠলো নারীদের উপরই বর্তায় ধর্ম ও সংস্কৃতিকে ধারণ করা। আমি কোলাহল, চুপ করে সবকিছুই শুনি, বলতে কিছু পারিনা। আসলে হঠাৎ করে এলে বোঝাই যাবেনা বৈশাখী নাকি ইরানী কোনো উৎসব! পঞ্চাশ শতকের এক দম্পতি লাঠিতে ভর দিয়ে এসে চারিদিক চেয়ে দেখছেন। ভদ্রলোক দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলছেন, “পহেলা বৈশাখে ইরানী নারীরাও দেখি শাড়ী পড়েছে! বাহ বাহ দেশীয় ঐতিহ্য সারা পৃথিবী জুড়ে, বেশ বেশ!” সাথে সাথে কে একজন বলে উঠলো, “ও দাদু কি বলছেন ওরা ইরানী নয়, বাঙ্গালী।” বয়ষ্ক ওই দম্পতি ম্লান হাসলেন, ভদ্রমহিলা বললেন, “যুদ্ধ করে কি এনেছি আমরা, স্বাধীনতা নাকি ধর্মের মাধ্যমে জাতিবিদ্বেষ?” ভদ্রলোক নিশ্চুপ। কিন্তু আরেকজন বলে উঠলেন, “আজ নাকি পহেলা বৈশাখ, আসলে তো এটা বিধর্মীদের উৎসব।” তর্ক শুরু হলো। চলছে তো চলছেই।

এতো কিছুতেও উৎসব থেমে থাকেনি, আমিও না। আমার নাম কোলাহল। কোথাও ভীড় হলেই আমাকে থাকতে হয়। মন্দির, মসজিদ, গির্জা, প্যাগোডা, কবরস্থান কিংবা শ্মশান, হাসপাতালে জন্ম কিংবা মৃত্যুতে, বোমার শব্দে, চিৎকারে, কান্নায়, হাসিতে সবকিছুতে আমাকে থাকতেই হয়। আমার যে কোনো ধর্ম নেই।

 হ্যামিল্টন, কানাডা
২৮ মার্চ, ২০১৭ ইং।
মোট পড়েছেনঃ ৯৫৫জনআজ পড়েছেনঃ ০জন

৩৮টি মন্তব্য

  1. তুমি তো তুমিই, তা আমি সব সময়ই বলি। জান আপু, কয়েকদিন ধরে কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে খুঁজে আমি বড় ক্লান্ত। ‘কে আমি? আমি কি? এই আমি কি সেই আমি? বিশ্বাস করো এই আমিকে আমি চিনি না। এ যেন আমার নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে। একে ধরতে চাচ্ছি, আটকাতে চাচ্ছি পারছি না। তবে কি আমি দুর্বল?
    যাক, এবার তোমার লেখায় আসি, এতো কিছু তুমি দেখ! তোমার মনের চোখটি আমায় দিবে? একটু শান্তির পরশ দিয়ে যেও সাথে কিছু।
    কিছু গান দাও এমন তোমার গানের মতো।
    অনেক অনেক ভাল হয়েছে। ভাল থেকো আপু। ভালবাসা নিও। -{@ (3 -{@ (3

    1. শান্তসুন্দরী নিজেকে যখন ঠিক খুঁজে পাওয়া যায়না, তখনই আমরা অস্থির হয়ে যাই। ছুঁয়ে দেখি আয়নায় এই তো আমি, অথচ মন বলে নাহ ওটা অন্য কেউ। ঠিক এমন ব্যাপার সবারই হয়। তবে এভাবে নিজেকে অচেনা ঠেকলে একটা লাভ হয় কিন্তু। এমন কিছু লেখার জন্ম হয়, যা নিজেকেও অবাক করে দেয়। তাই এভাবে অচেনাই রাখো নিজেকে, আরও একটা সুন্দর লেখা পেয়ে যাবো আমরা সবাই।

      গতবছর পহেলা বৈশাখের রূপ তুলে ধরেছি। এখানে শাড়ীর চেয়ে হিজাবী বেশি গো আপু। জানো এখন আমাদের দেশের মানুষ কোন এলাকা থেকে এসেছি সেটা জানার আগে জিজ্ঞাসা করে আপনি কি মুসলিম? যদি অন্য দেশের মানুষেরা জিজ্ঞাসা করতো খারাপ লাগতো না। বরং অন্যরা জানতে চায় কোন দেশ থেকে এসেছি আমরা। বুঝেছো কেন লিখেছি এমন লেখা?

      অনেক অনেক ভালোবাসা। ভালো থেকো। সুস্থ থেকো। আর হ্যা মন খারাপ করোনা মোটেও। -{@ (3

  2. নারীদের উপরই বর্তায় ধর্ম ও সংস্কৃতিকে ধারণ করা।
    যুদ্ধ করে আমরা স্বাধীনতা আনতে পারিনি, এনেছি ধর্ম বিদ্দেস আর গোরামী।

    অনেক অনেক ভাল লেগেছে লেখাটি।

      1. নানা ১৯৫২ সালেও নারীরা আন্দোলন-মিছিল করেছিলো। ধর্ম-বর্ণ সেখানে ছিলোনা, শুধু আমরা বাঙ্গালী এই ছিলো পরিচয়। আর আজ দেশ পেয়েছি, ভাষা পেয়েছি। কিন্তু হারিয়েছি আমাদের বাঙালিয়ানা।

  3. আভিজাত্যপূর্ণ ডলারের জাতে উঠেছে এরা। আঙুল, হাতের তালু সব ঢাকা গ্লাভসে। নাক সিটকানোর কোনো কিছুই নেই। ধুলো-বালি নেই, মাছিদের উড়াল নেই। একা একা আমি হাসি, দেখি! কোলাহলের কাজই হলো নিঃশব্দে দেখে যাওয়া। বোমা মারলেও দেখি, সাম্বা নৃত্যও দেখি। কে যায়, কে আসে, কে কি বলে, কে চুপ করে থাকে ওসব নিয়ে ভাবার মতো আমার মেধা নেই যে!
    অসাধারণ লেখা দিদি।বৈশাখের ভাল মন্দ এত সু্নদর করে ফুটে তুলেছেন যে অতুলনীয়। -{@

  4. ঠিকই বলেছো নীলাদি, যুদ্ধ করে আমরা হানাহানি আর বিদ্বেষ এনেছি।
    সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সব ভুলে বসে আছি আমরা।
    খুব সুন্দর লিখেছো।

  5. নিঃশব্দ কে ঘেন্না করলেও এমন লেখার সামনে আমি নিঃশব্দই হয়ে গেলাম!
    কোলাহল আমার অনেক প্রিয় যেমন তেমন করেই তোমার লেখাটি। এতো লিখেও তোমার ভাবনা ফুরায় না!
    এখন যে সবকিছুতেই ধর্ম লাগে নীলাপু, নইলে কোলাহলের শব্দ বদল হবে কিভাবে! প্রিয়তে নিয়েই ছাড়ছি না। তারকা দিলাম, পঞ্চ।

  6. নানা মুনির নানামত। জাত গেলো জাত গেলো বলে।

    মায়া মহব্বত নায়, ধর্মে বাধা আমাদের হাতপা।
    কোলাহল সেটা কী??? আনন্দ তাও অনেক জায়গায় ধর্মে মানা।
    সুন্দর একটি পোষ্ট আপু।

    1. মজিবর ভাই আমাদের বর্তমান আদিম যুগে চলে গেছে। ভুলে গেছি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই কবিতাটির কথা,

      “জাতের নামে বজ্জাতি সব
      জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া,
      ছুঁলেই তোর জাত যাবে?
      জাত ছেলের হাতের নয়তো মোয়া।”—কবি যদি জানতেন এখন আগে নাম জিজ্ঞাসা করা হয় না। কোন ধর্মের সেটা জিজ্ঞাসা করা হয়।

      খুবই সুন্দর একটি মন্তব্যের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

  7. আপু, আপনি এতো কিছু দেখেন কি করে, তাও ওই দেখায় থাকে কাব্যিকতা, আসলেই কি কবিদের চোখ মন কাব্যিকতায় ভরা থাকে, যা দেখেন তাই কাব্য হয়ে যায়? ;?

    1. আপা কখনো কি ভেবেছি এমন একটি লেখা আমাকে লিখতে হবে? আমাদের মানব ধর্মটা কোথায় যে হারিয়ে গেলো!

      সুন্দর একটি মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।
      ভালো থাকুন।

  8. “১৯৬৭ সাল নাগাদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ও কবিতার প্রচার সীমিত করিয়ার উদ্যোগ নতুন করিয়া নিলে পূর্ব বাংলার গ্ণতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবিসমাজ সেই উদ্যোগের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াছিলেন। সেই প্রতিরোধ আন্দোলনের অঙ্গ আকারেই শুরু হয় প্রতি বছর ঢাকা শহরে ঘটা করিয়া বাংলা নববর্ষ (পহেলা বৈশাখ) এবং রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন (পঁচিশে বৈশাখ) পালন।” গরিবের রবীন্দ্রনাথ—–সলিমুল্লাহ খান, পৃষ্ঠা… ২০।

    পান্তা-ইলিশের কথা তো কিছু পাইলাম না।
    ক্রমাগত ভাল লিখতেই আছেন!!
    ভালোতো, খুবই ভাল।

    1. কুবিরাজ ভাই পাবার তো কথা না। কারণ এই পান্তা-ইলিশ আমি ২০০৯ সালেও দেখিনি সিলেটে। দেশে আমার সবশেষ পহেলা বৈশাখ ওই ২০০৯ সালে। সিলেট শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম বৈশাখী মেলায়।
      ইলিশের মরসুম শুরু হয় আষাঢ় মাসে। চৈত্র মাসে তো জাটকা ইলিশ পাওয়া যায়। কেন আজ এতো ইলিশ মাছের সঙ্কট, এই জাটকাগুলোকে খাওয়া হলে মাছ পাওয়া যাবে কিভাবে? আমাদের বাসায় এখনও পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়া হয়না।

      ভালু আর কই পারি লিখতে! পারলে তো হইতোই, দাঁত কিলিয়ে খালি নাচতাম এইভাবে। 😀 \|/

      লেখা দিচ্ছেন না কেন? :@

      1. ওহো বানানে বড়ো ভুল করি আমি। আসলে লিখতে চেয়েছিলাম, “শুনিয়া বড়োই পীড়িত হইলাম।” 🙁

        নূতন লেখা খুঁজেন আফনে, আগে কইবেন না?
        ন্যাঁনঁ দ্যাঁখেঁনঁ গিঁয়াঁ, নূঁতঁনঁ লেঁখাঁ দিঁছিঁ। 😀

  9. আপু আপনিই পারেন এমন লেখা লিখতে!
    সব কিছুতে মেয়েদের গন্ডি! সব কিছুতেই ওদের আলাদা করে চেনা যায়। ছেলেদের নয়। শাঁখসিঁদুর পড়া হিন্দু মেয়ে,শাঁখাসিঁদুর ছাড়া মুসলিম মেয়ে। হিজাব,বোরখা পড়া মুসলিম মেয়ে, হিজাব না পড়া সে হয়তো হিন্দু মেয়ে।
    কিন্তু দেখেন একটা পাঞ্জাবী পড়া ছেলেকে দেখে কি বুঝতে পারবেন সে হিন্দু,না মুসলিম,না বৌদ্ধ, নাকি খ্রিস্টান?
    সব কিছুতেই আমদের গায়ে কেনো সিল মারা থাকে।

    1. পিচ্চি আপু আমি নারীর আগে একজন মানুষ, নারীরা সেটা কি কখনো ভাবে?
      আমরা নিজেরা বলি, এই লেডিস ফার্ষ্ট। মহিলা বাসের অপেক্ষা করি। মহিলা সিট খুঁজি। নারীদের জন্য আলাদা পত্রিকা-ম্যাগাজিন। নারীকে কি নারীরা নিজেরাই আলাদা একটা বিভাগ করে রাখছেনা? এই বৈষম্যতাকে দূর করার জন্য নারীকে নিজেই এগিয়ে আসতে হবে। যেদিন এগিয়ে এসে দাঁড়াবে, সেদিন নারী মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।

      ভালো থাকুন আপু।

  10. আপনার বান্ধবী যে নরকে যাবে, আপনার বন্ধুটি স্বর্গে, আপনি কোথায় যাবেন?
    আমার কোন ব্যালেন্স নাই।
    মাঝামাঝি থাকতে চান? সেটা খুব ভালো, এক চেটিয়া সুখে থাকার চেয়ে সুখ দুঃখ মিলিয়ে থাকা ভালো। মানুষ তো, বেশি সুখ সহ্য হবে না, বেশি দুঃখও না। মানুষ হিসাবেই থাকুন, এর বেশি হতে হবে না। ধর্ম নয় মানুষই আপনার পরিচয়।

    ধর্ম এমন এক সেনসেটিভ ইস্যু যে এ বিষয়ে আর কথা বলতে ইচ্ছা করে না, ভয় লাগে।

মন্তব্য করতে লগিন করুন অথবা নিবন্ধন করুন।