মূল লেখায় যান

আমার পরী হওয়া হলো না….

খেয়ালী মেয়েএকান্ত অনুভূতি২৭টি মন্তব্য

আমার স্বপ্ন দেখা শুরু সেই ছোটবেলা থেকেই—ভাইয়া আপুর সাথে বয়সের ব্যবধান, তার উপর খেলার সাথী হিসেবে সমবয়সী কেউ ছিল না বাসায় কিংবা আশেপাশে প্রতিবেশীদের কেউ—একা একাই খেলতাম-কমিকস পড়তাম-আর রূপকথার গল্প পড়তে পড়তে তো হারিয়ে যেতাম রূপকথার জগতে—সেই ছোট্ট বয়স থেকেই নিজের একটা আলাদা জগৎ গড়ে নিয়েছিলাম নিজের মত করে—স্বপ্নময় একটা জগৎ………….

ছোট্টবেলা থেকেই পরী হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম—যার ডানা থাকবে—যখন যেখানে মন চায় উড়ে যাবে—হাতে ১টা রূপালী রঙের যাদুর কাঠি থাকবে—সেই কাঠির অনেক ক্ষমতা থাকবে—আম্মুর মুখে পান্তা বুড়ির গল্প অনেক শুনেছি—যখন মা গল্প বলতো তখন পান্তা বুড়ির জন্য আমার অনেক কষ্ট হতো—আর চোরটার উপর অনেক রাগ হতো—আগে আমার বিশ্বাস ছিলো চোর মানে যার ১টা লম্বা লেজ আছে-মাথার উপর বাঁকা ২টা শিং-অনেক বড় বড় দাঁত-হাতে লম্বা লম্বা নখ—চোরের কথা শুনলে খুব ভয় লাগতো—তখন আমি আবার আমার স্বপ্নে চলে যেতাম—ডানা মেলে আমি বুড়ির বাড়ি চলে যেতাম—যাদুর কাঠি দিয়ে চোরের লেজটা আমি ভ্যানিশ করে দিতাম—তারপর চোরটাকে শাস্তি দিতাম—এই স্বপ্নগুলো দেখতে যে কত্তো ভালো লাগতো……………..

বাসার ছাদে ভাইয়ারা যখন ঘুড়ি বানিয়ে আকাশে উড়িয়ে দিতো তখন কি যে আনন্দ লাগতো—আকাশে ঘুড়ি উড়ছে-তার সাথে সাথে আমিও উড়ছি আকাশে ডানা মেলে—আমার এই পরী হওয়ার স্বপ্ন কারো অজানা নয়—স্কুলে যেমন খুশি তেমন সাজ সাংস্কৃতিক প্রতিযোগীতায় আম্মু আমায় পরী সাজিয়ে দিতো—আব্বু আমার জন্য পরীড্রেস/যাদুর কাঠি সবই এনেছিলো—পরী সেজে আমি আকাশে উড়তে পারিনি ঠিক কিন্তু প্রাইজ আনতে পেরেছিলাম—প্রথম ১/২ বছর যেমন খুশি তেমন সাজ প্রতিযোগীতায় আমাকে পরী সাজতে দেখে—পরের বছরগুলোতে সবাই আগে থেকেই বলে দিতো যে আমি এবারও পরী সাজবো—ভুল বলতো না—সত্যি আমি পরীই সাজতাম………………..

৮ম শ্রেণীর স্কলারশীপের রেজাল্টের পর কুমিল্লার ডিসি এবং ডিপিইও এসেছিলেন স্কুল ভিজিটে—আমরা যে কজন টেলেন্টপুলে স্কলারশীপ পেয়েছিলাম ডিসি আমাদের উদ্দেশ্য প্রশ্ন রেখেছিলেন তোমরা কে কি হতে চাও—আমার বন্ধুরা বিজ্ঞানী/প্রকৌশলী/শিক্ষক/পাইলট তাদের এমন বড় বড় ইচ্ছেগুলোর কথা বলল—আর আমিও খুব গর্ব করে বলেছিলাম আমার সেই দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পরী হওয়ার কথা—এখনও চোখে ভাসে আমার কথা শুনে সবাই খুব হেসেছিল—তখন খুব খারাপ লেগেছিল—কিন্তু ডিসি স্যার আমার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন-ভেরি গুড ড্রীম,উইশ ইউ অল দ্যা বেষ্ট বেবি—তখন আমার অনেক ভালো লেগেছিলো—এমন কতো পাগলামিই না করেছিলাম ছোটবেলায়—এখনও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ফ্যামিলির সবাই যখন একসাথে হয় আমাকে এই পরী হওয়া নিয়ে অনেক ক্ষেপায়—তবু স্বপ্ন দেখা হয়নি বন্ধ………………

দিন যায়-সময়ও বয়ে যায়—সময়ের স্রোতে কতো কিছুই না গেল ভেসে—শুধু স্বপ্নগুলো রয়ে গেছে মনের মনিকোটায় অতি নীরবে—এখন আর আগের মতো বলি না আমি পরী হবো-আমি ডানা মেলে উড়বো-আমি সব অন্যায়কে যাদুর কাঠিতে ভ্যানিশ করে দিবো-ঘরের দেয়ালে আমি এখন আর কোন গল্পের বইএ দেখা পরীর ছবি আঁকি না-এখন আমি আর যখন তখন পরী সাজার বায়নাও ধরি না—সময় সত্যি অনেক গড়িয়েছে—আর অনেক স্বপ্নকে সময় একঘরে করে রেখেছে—হায়রে আমার স্বপ্নরা………………

তবে এখন আমি বাসার পিচ্ছিগুলোকে মাঝে মাঝে পরী সাজায়—পরীদের নিয়ে নানান রূপকথার গল্প শুনিয়ে, তাদেরকে রূপকথার জগত ঘুরিয়ে আনি—স্কুলে বার্ষিক প্রতিযোগীতায় বাচ্ছাদেরকে কতো কিছুই না সাজতে দেখি-কিন্তু কাউকে আজো পরী সাজতে দেখলাম না—আমাদের সুখ ৩বছর হয় স্কুলে আছে-গাঁয়ের বধু/আদর্শ শিক্ষক/মুক্তিযোদ্ধার মা এগুলো সাজতেই ও বেশি পছন্দ করে-পরী নয়—আমিও মাঝে মাঝে আমার স্টুডেন্টদের কাছে খুব আগ্রহ নিয়ে জানতে চাই –কি স্বপ্ন ওরা দেখে?—কোন স্বপ্ন নিয়ে ওরাও স্বপ্নালোকে হারিয়ে যায়?—সবাই খুব স্মার্টলি অ্যানসার করে, তাদের স্বপ্নগুলো অনেক বড়—আমার মতো কেউ বোকা বোকা স্বপ্ন দেখে না……………………

আজও বিকেলে যখন ছাদে গেলাম আশেপাশে দেখি অনেকেই ঘুড়ি উড়াচ্ছে—চোখ মেলে শুধু চেয়েই থাকি-কিন্তু সেই ঘুড়িগুলোর আশেপাশে কোথাও আমি আমাকে দেখলাম না—স্বপ্ন আমার স্বপ্নই রয়ে গেলো-আর আমি আমিই রয়ে গেলাম-পরী হওয়া হলো না আমার–এখন আমি অনেক বড় হয়ে গিয়েছি—এখন আমি বুঝতে পারি, এই স্বপ্ন কখনো সত্যি হওয়ার নয়—কতো বোকা ছিলাম আমি, পরী হতে চেয়েছিলাম-যা কখনোই আমি হতে পারবো না……………..

স্বপ্ন সেতো স্বপ্নই—পূরণ হবারতো নয়……..
যা পূরণ হয়, তা হয়তো আমাদের প্রয়োজন/চাহিদা কিংবা লক্ষ্য থাকে—স্বপ্ন নয়—অনেক দেরিতে হলেও এই সত্যটা অনুধাবন করতে পেরেছি……..

তবুও স্বপ্ন দেখতে আমার নেইকো মানা—
স্বপ্নেই আমি উড়ে যাই মেলে স্বপ্ন ডানা—
ডানা মেলে আমি উড়ি আকাশে—
মাঝে মাঝেই যাই মিলিয়ে বাতাসে—
তারাদের গল্পের আসরে আমিই হলাম মধ্যমনি—
চাঁদের বুড়ির সাথে দেখা করতে নিয়ে যাই পান সুপারি—
রঙধনুতে বসিয়ে দিই আমার নরম হাতের ছাপ—
সূর্য্যি মামা তাইনা দেখে হয় কুপোকাত—
সপ্তর্ষিদের সাথে আমার গলায় গলায় ভাব—
ধ্রুবতারা জানতে চায় কি আমার নাম?—
মেঘেদের সাথে করি ছুটোছুটি—
রৌদ্রের সাথে খেলি লুকোচুরি—
আমি হলাম স্বপ্ন পাগল এলোমেলো এক স্বপ্নপরী…………………

(খেয়ালী মেয়ের রং হারানো স্বপ্ন)

মোট পড়েছেনঃ ১০২৯জনআজ পড়েছেনঃ ০জন

২৭টি মন্তব্য

  1. খুব আন্তরিক ভাবে আপনার স্বপ্নের কথা লিখলেন।
    অনেকেই ইচ্ছে গুলোর কথা এমন সুন্দর করে গুছিয়ে লিখতে পারেননা।
    ইচ্ছে প্রকাশে আপনি সফল।

    লেখার সমাপ্তিতে কবিতা লেখাটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
    পরীর মতই আপনার ইচ্ছেটা সুন্দর।

    ভালো লেগেছে খুব।

  2. আপনি তো আসলেই পরী। যার এত এত কল্পনার ডানা থাকে সে কি আর সাধারন মেয়ে?
    আমার সাথে দেখি আমার অনেক মিল।আমিও সেই পিচ্চি কাল থেকে কল্পনায় ভেসে ভেসে মহাকাশ থেকে হিমালয় সব জায়গা ঘুরে বেড়াই।যদিও পরী হতে চাই নি কখনো,কিন্তু আমারও এমন হাজারও কল্পনার ডানা ছিল,কিছু কিছু ভেঙ্গে গেছে,কিছু এখনো আছে।
    আর একটা ব্যাপারেও আপনার সাথে আমার মিল আপনি যেমন অদেখা ড্যামিশ কে চিঠির পর চিঠি লেখেন,আমারও এমন একজন অদেখা অনিমেষ আছে,তাকে অবশ্য আমি কখনো খুঁজেই পাই নি,তবু তাকে মনে মনে চিঠি লিখি,ভাবি সে আশেপাশেই আছে,কিন্তু খুঁজেই পাই না।
    কত্ত মিল আমাদের তাই না?
    🙂

      1. আপনার সাথে দেখি সত্যিই আমার অনেক মিল..

        আপনার অনিমেষকে মনে মনে যে চিঠিগুলো লিখেছেন সেগুলো পড়তে মন চাচ্ছে(চিঠির প্রতি আমার অনেক র্দূবলতা রয়েছে)………..

  3. কে বলেছেন আপনি পরী হতে পারেননি ?পরীর মত ঘুরে ঘুরে আপনি সবার লেখা পড়তে যান। কে কি লেখেন তা ঠিকই দেখেন আপনি। বাস্তবে আপনার ডানা নেই সত্য কিন্তু মনের আপনার ঠিকই দুটো সুন্দর ডানা আছে আপু। আজ থেকে আমি আপনাকে পরী আপু বলেই ডাকবো। খুব সুন্দর করে আপনি নিজকে প্রকাশ করতে পারেন।

  4. ‘ প্রথম ১/২ বছর যেমন খুশি তেমন সাজ প্রতিযোগীতায় আমাকে পরী সাজতে দেখে—পরের বছরগুলোতে সবাই আগে থেকেই বলে দিতো যে আমি এবারও পরী সাজবো—ভুল বলতো না—সত্যি আমি পরীই সাজতাম ‘ কত সহজ সরল স্বীকারোক্তি 🙂 ছোট বেলার এই ইচ্ছেকে ধরে রাখুন আপু আজীবন। অনেক ভালো লেগেছে আপনার এই লেখাটি। আপনি খেয়ালী মেয়ে হয়েই এমন স্বপ্ন লালন করুন।

  5. যে এমন লিখতে পারে তার স্বপ্ন রঙ হারিয়ে যেতে পারে না।
    আপনার লেখা পড়ে আপনাকেই পরী মনে হচ্ছে।

    ছন্দময় অংশটুকু সুন্দর হয়েছে।

    আপনি দেখছি দারুণ লেখেন। পড়ব নিয়মিত।

  6. খুব ভালো উপস্থাপনা, নিজের স্বপ্নের প্রকাশ, ডানা আর কাঠি ওয়ালা পরী না হয় নাই হলেন বাস্তব জগতের পরী হোন, পাখার বদলে বিমানে ওড়েন তার জন্য চাই কঠিন সাধনা কেননা বিমানে এমনিতেই চড়া যায় কিন্তু আপনি সেই বিমানেই চড়বেন সেই কাজেই যাবেন যেখানে দেশের উন্নতে হবে আপনার সেই স্বপ্নের যাদুর কাঠিতে না মুখের কথায় আর কাজে, শুভ কামনা রইলো অবাধ্য অপূর্ণ স্বপ্ন গুলু ভিন্ন আঙ্গিকে পূরন হোক

  7. আজ দুপুরেই পড়েছি আপনার এই লেখা। এখন আবার পড়লাম। নিজের ইচ্ছে, স্বপ্নকে অসাধারন ভাবে উপস্থাপন করলেন। কোমল একটি ভাব আছে লেখায়। শেষের কবিতায় অশেষ ভালোলাগ।

  8. জীন পরী শুনেছি ছিল দেখিনি কখনও কেউ বাস্তবে দেখেছে বলে মনে হয় না তবুও সবাই স্বপ্ন দেখে পরী হতে তবে সাবধান পরীদের মাঝেও খারাপ পরীও আছে সেটা হবার যেন ইচ্ছে না হয়।

  9. পরী, আকাশে উড়বে, গান গাইবে, মন খারাপ করা মানুষের মন ভালো করবে, এমনটাই তো রূপকথার গল্পগুলিতে শুনেছিলাম। সত্যিই কি আপনি মনে মনে আকাশে উড়তে পারছেন না আপনার স্বপ্নগুলিকে নিয়ে? সত্যিই কি পারছেন না দুষ্টুমি করে, গান গেয়ে ছোট ছোট এই রত্নগুলিকে আনন্দ দিতে? মন খারাপ হলে মজার কোন কৌতুক বলে সত্যিই কি পারছেন না মন খারাপ গুলিকে দূর করে দিতে? তাহলে আপনার পরী হবার স্বপ্নটা আর অপূর্ণই বা থাকলো কোথায়।

    একটা জায়গায় আফসোস করলেন যে আমাদের বাচ্চাগুলি এখন আর পরী সাজতে চায় না, তারা অনেক বেশি রিয়েলস্টিক কিছু সাজতে চায়। দোষটা কিন্তু আসলে তাদের ন। আগে আমরা পরিবারের দাদী, নানী কিংবা এই গোছের কারো কাছে গল্প শুনতাম। আর সেখানেই থাকতো সেইসব কল্পনার পরীরা। আর সেই পরীগুলি গল্প থেকে আমাদের মনে স্থান করে নিতো। এখন কি হচ্ছে বলুন তো? এখন ছোটবেলাতেই কমিক দেখিয়ে বাচ্চাদের গল্প শোনানো হচ্ছে। আর সেই গল্পে ভিনদেশীদের গল্প বলা থাকে। সেখানে আমাদের শৈশবের পরীরা স্থান পায় না। আর এই কারণেই তারা এখন আর পরী হবার জন্যে আগ্রহ প্রকাশ করে না।

    একটা স্বাধীন মন আর মানুষকে আনন্দ দেবার ক্ষমতা কিন্তু কোন পরীর যাদুর কাঠির থেকেও কম নয় 🙂

     

     

মন্তব্য করতে লগিন করুন অথবা নিবন্ধন করুন।