সময়-সমুদ্রে বাস, তবু সময় নেই

রিমি রুম্মান ২৯ জানুয়ারী ২০২০, বুধবার, ০৬:২৭:৫০পূর্বাহ্ন সমসাময়িক ১৪ মন্তব্য
আমাদের জীবনে যা কিছু সহায় সম্পদ আছে, তা যতটা মুল্যবান, তার চেয়েও অধিক মুল্যবান হলো ‘ সময়’। অর্থকড়ি খরচ করলে তা আবার উপার্জন করা যায়, কিন্তু যে সময় একবার খরচ হয়ে যায় জীবনের হিসেবের পাতা থেকে, তা আর ফিরে পাওয়া যায় না। সতেরো শতকের স্প্যানিশ লেখক ও দার্শনিক ব্যালটাজার গার্সিয়ানের সময় সম্পর্কিত উক্তিটি ছিল এমন, ‘ যার হাতে কিছুই নেই, তার হাতেও সময় আছে, এটাই আসলে সবচেয়ে বড় সম্পদ।’ কিন্তু আমরা অধিকাংশ মানুষ পিছনের কালে ফিরে আফসোস করি, জীবন থেকে যে সময় চলে গেছে হেলায়, তার কী হবে ? ‘ আগের নষ্ট করা সময়ের জন্যে এখন আফসোস করলে এখনকার সময়ও নষ্ট হবে’ বলেছিলেন আমেরিকান দার্শনিক মেসন কোলেই। তবুও আমাদের আফসোসের শেষ নাই। সুযোগ পেলে জীবনে কোন জিনিষটি ফিরে পেতে চাইবে, এমন প্রশ্নে অধিকাংশ মানুষই বলে উঠেন, ফেলে আসা সময়ের কথা, শৈশব, কৈশোরের কথা, বাবা-মা, ভাইবোনের সাথে কাটানো নিশ্চিন্ত এক সুখকর সময়ের কথা। কিন্তু সময় তো তার নিজস্ব নিয়মে স্বাভাবিক গতিতে অতিক্রান্ত হয়েছে! তাই আমি বলি ভিন্ন কথা। প্রবাস থেকে দীর্ঘদিন পর পর দেশে গিয়ে যে সময়টা অতিবাহিত করেছি, সেই সময়ের কথা। আমরা যারা প্রবাসি, দীর্ঘদিন পর যখন দেশে যাই, এক মুহূর্ত সময়ও ঘরে থাকতে মন চায় না আমাদের। ঘুরে বেড়াই পুরনো বন্ধুদের সাথে। দেশের ভেতরে অনেক সুন্দর সুন্দর দর্শনীয় স্থান তৈরি হয়েছে, বন্ধুদের কাছে, স্বজনদের কাছে এমন গল্প শুনে শুনে আমাদের ভেতরেও দেখার আগ্রহ জন্মায়। আর অমনি দলবেঁধে কয়দিনের জন্যে পরিকল্পনা করে বেড়িয়ে পড়ি। ফিরে এসে ব্যাস্ত হয়ে উঠি শপিংমলগুলোর উদ্দেশ্যে। জামাগুলো ঠিকঠাক বানানো হলো কিনা, ব্লাউজগুলোর ফিটিংস ঠিক হলো কিনা, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টেইলর সব কাজ শেষ করতে পারবে কিনা, সে নিয়ে ভাবনার অন্ত নেই। কেননা প্রবাসে ফিরে এলে আমাদের কতখানে ঘুরতে যাওয়া হয়! বন্ধুদের বাসায় পার্টি, নানান রকম অনুষ্ঠানাদি, পিঠা উৎসব, পিকনিক, আরও কত কী! আর তাই তো স্বল্প এই সময়ে পরিকল্পনা মাফিক সব গুছিয়ে আনা চাই!
আমার নিজের কথাই বলি না হয়। যখন অনেকদিন পরপর দেশে যেতাম, সে কী আনন্দ, উচ্ছ্বাস ভেতরে! বহুদিন পর বাবা-মাকে দেখবো, ভাইবোনদের দেখবো এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে! আমার দেশে যাওয়াকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বসিত হতেন বাবা-মা। আব্বা মসজিদে নামাজ পড়তে গেলে পাড়ার মুরুব্বিস্থানীয়দের সাথে দেখা হতেই উচ্ছ্বসিত স্বরে জানান দিতেন, ‘ শুনছেন হাফেজ সাব, আমাগো রিমি আইতাসে আমেরিকা থেইক্যা।’ বাজারে গেলে, কিংবা পথে ঘাটে ছোটবড় যার সাথেই দেখা হতো, প্রসঙ্গ একটাই, ‘সামনের মাসে আমাগো রিমি আইতাসে আমেরিকা থেইক্যা’। তীব্র আনন্দ আর ভালোলাগা গায়ে মেখে লাঠি ভর করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঘুরে বেড়াতেন আব্বা। আম্মা ঘরবাড়ি, আসবাব, সিলিং ফ্যান ঝাড়মোচ করাতেন চিনির মাকে দিয়ে। নির্দিষ্ট দিনে আব্বা-আম্মা ঢাকায় আসতেন। দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়াতে আমরা আবেগে আতিশয্যে একে অপরকে জড়িয়ে ধরতাম, কাঁদতাম। ২/৪দিন একসাথে সময় কাটাতাম। অতঃপর তাঁরা ফিরে যেতেন আমার জন্ম এবং বেড়ে উঠা মফঃস্বল শহরে। ‘ আমি কয়দিন পরে আসছি, ঢাকায় কিছু কাজ আছে’ বলে থেকে যেতাম। তাঁরা ফিরে গিয়ে আবারো ব্যস্ত হয়ে উঠতেন। বাড়িতে পেইন্ট করানো, এটা সেটা মেরামতের কাজ করাতেন মিস্ত্রী ডেকে যাতে আমাদের কোন কষ্ট না হয়। আব্বা-আম্মা বোধ করি, ভুলে যেতেন যে, সেই পরিবেশেই আমার বেড়ে উঠা এবং আমি সেইভাবে থেকেই অভ্যস্ত। তবুও আমাদের স্বল্পকালীন বসবাসের সবরকম সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা চাই। এমন কী নিজেদেরও ফিটফাট রাখা চাই তাঁদের! সেলুনে গিয়ে নিজের চুলটাও কাটিয়ে নিতেন আব্বা। আর তখন নাপিত নিতাই বাবুকেও জানাতে ভুলতেন না, ‘ সুন্দর করে কাটবা কিন্তু, আমার মেয়ে আসতেসে আমেরিকা থেইক্যা, বুঝলা ?’ সব প্রস্তুতি শেষে একদিন তুমুল অস্থিরতা বুকে পুষে খানিক অভিমানে ফোন করতেন ঢাকায়, ‘ কিরে, কবে আসবি চাঁদপুরে, মনে হইতেসে তুই এখনো বিদেশেই আছোস!’ আমিও আমতা আমতা করে লজ্জিত স্বরে বলতাম, ‘ এইতো আব্বা, কিছু কাজ বাকি আছে, শেষ হলেই চলে আসবো।’ এইদিকে আমার কত কাজ! ব্যস্ততা যেন ফুরায় না! অবশেষে যখন বাবা-মা’র কাছে থাকবো বলে মফঃস্বল শহরে যেতাম, ততদিনে আমার ফিরে আসার সময় ঘনিয়ে আসতো। আব্বা বলে উঠতেন, ‘মা রে, মনে হইতেসে চোক্ষের নিমিষে সময় শেষ হইয়া গেলো, আর কয়টা দিন সময় বাড়া, তোরে তো ঠিকমত তোর পছন্দের কত কী খাওয়াইতে পারি নাই। তোরে নিয়া কতখানে যাওয়ার আশা করসিলাম।’ আমিও বলে উঠতাম, ‘ এইবার না আব্বা, পরেরবার আসলে বেশি সময় নিয়া আসুম’। আমার ফিরে আসার সময় ঘনায়। বিদায়বেলায় আব্বা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলতেন, ‘ মনে হইতেসে স্বপ্নের মতন আইলি আর গেলি, সময়গুলা ঝড়ের বেগে চইল্যা গেলো!’ অতৃপ্ত থাকে আমার আব্বার মন। অশ্রুসিক্ত নয়নে আঙুলের ডগা দিয়ে চোখের কোণা ডলতে ডলতে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকেন আম্মা। সময় কী আসলেই ঝড়ের বেগে চলে যায় ? নাকি সময়ের সত্যিকারের ব্যবহার হয়নি ঠিকঠাকভাবে ? আজ জীবনের এ বেলায় এসে মনে হয়, বাবা-মা’র সাথে কাটানো সময়ের প্রতিটি মুহূর্তকে দখল করা হয়নি আমার। হয়নি দীর্ঘদিন পর বাবা-মাকে কাছে পাওয়ার পরও সময়টুকু উপভোগ করার। সময়, সে তো তার মত করে আসবে, আবার চলেও যাবে। কিন্তু যখন সময় আমাদের আয়ত্তে থাকে, তখন তার কাছ থেকে আমরা যা চাইবো, তা-ই পাবো। এ উপলব্ধি আমার যখন হয়েছে, তখন বড় বেশি দেশি হয়ে গেছে!
তখন দেশে যাবার উদ্দেশ্যে জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্টে ওয়েটিং এরিয়ায় অপেক্ষা করছিলাম আমরা স্বামী-স্ত্রী। ভিনদেশিদের অনেকেই প্রিয়জনদের ছেড়ে যাচ্ছে তাই পরিবেশটিতে শীতল এক নিরবতা বইছিল। পাশের চেয়ারে বসেছিল আমাদের চেনা প্রিয় এক আন্টি। তিনিও দুই সপ্তাহের ছুটিতে দেশে যাচ্ছিলেন। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে জানালেন, যে কয়দিন দেশে থাকেন, বাবা-মা’র সাথে পুরোটা সময় কাটান। ভাইবোনেরা আসেন, হৈ হুল্লোড় হয়। বন্ধুদের, স্বজনদের বাড়িতেই নেমন্ত্রন্ন করা হয়, সেই সুবাদে সকলের সাথে দেখা হয়ে যায়। কোন ঘুরাঘুরি নেই, শপিং নেই। তিনি বলেন, এতদিন পর পর দেশে যাই, চাই প্রতিটি মুহূর্ত বাবা-মার সান্নিধ্যে থাকতে। বিষয়টি আমার যারপরনাই ভালো লাগে। নিজের ভেতরে একরকম হাহাকার বোধ হয়। এই বোধ আরো আগে হলো না কেন, এই ভেবে আক্ষেপ হয়। মনে হয়, হায়, আমার সময়গুলো আমি কতটা ভুলভাবে ব্যবহার করেছি, নষ্ট করেছি। আসলে আমি আমার সময়ের মুল্যই বুঝিনি। দেশে গিয়েও সবসময় ব্যস্ত থেকেছি। কিন্তু কিসের পিছনে ব্যস্ত থেকেছি ? কোথায় সময় দেয়া জরুরি ছিল সেই উপলব্ধি এতো দেরিতে হলো যে, তখন বড় বেশি দেরি হয়ে গিয়েছে। ততদিনে বাবা-মা দুজনকেই হারিয়েছি আমি। সেই সাথে হারিয়েছি দেশে যাবার সেই উচ্ছ্বাস, আনন্দ, আগ্রহ। এপিজে আবুল কালামের একটি উক্তি মনে পড়ে আজ, ‘ জীবন এবং সময় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, জীবন শেখায় সময়কে ভালোভাবে ব্যবহার করতে, সময় শেখায় জীবনকে মুল্য দিতে।’ আর আমাদের রবিবাবুর মত সহজ সত্য করে বলি, ‘ সময়ের সমুদ্রে আছি, কিন্তু এক মুহূর্ত সময় নেই আমাদের।’ আমাদের অতীতকে, ফেলে আসা সময়কে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, হারিয়ে যাওয়া সময়ের অভাব পূরণ করাও সম্ভব নয়, কিন্তু ভবিষ্যৎ তো এখনো আমাদের হাতে।
রিমি রুম্মান
কুইন্স, নিউইয়র্ক
১৩২জন ৫৬জন
2 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য