সন্তান কি চায়?

নীরা সাদীয়া ২ মে ২০১৭, মঙ্গলবার, ০৮:৩১:২০পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ২৬ মন্তব্য

সন্তান কি চায়?

অনেকদিন যাবত ভাবছিলাম কিছু লিখব এ বিষয়টা নিয়ে।আজ লিখেই ফেললাম।
১.
শায়লার দুই বাচ্চা।একজনের বয়স ৫ বছর, অন্যজনের ২। শায়লা খুব সহজ সরল, কাওকে মুখের ওপর কথা শোনাতে পারে না। এই সুযোগে তার বড় বোন প্রায়ই তাকে বলে :

“তোর মেয়ে দেখি কিছুই পারেনা, আমার মেয়ে কত কাজ জানে!” (তার মেয়ের বয়স ১৬ বছর)

শায়লার বান্ধবী বেড়াতে এসে বলে,
“তোর মেয়ে কি রেজাল্ট করেছে? আমার ছেলে তো ফার্স্ট হয়েছে।”

ভাবী শায়লাকে বলছে,
“তোমার মেয়ে যে জেদী, সর্বদা বায়না করে।”

প্রতিবারই শায়লা নিরুত্তর। এরকম কথা,তুলনা অহরহ শুনতে হয় ছোট্ট মেয়ে রাহাকে। সে ভেতরে ভেতরে মুশড়ে পরে।তবে কি সে সবার চেয়ে নিকৃষ্ট? অন্যের ছেলেমেয়েরা সবাই ভাল, শুধু রাহাই ভাল নয়? লক্ষ্য করুন আপনার নিরুত্তর থাকা প্রতিবারই ভেঙে দিচ্ছে একটি শিশুর মন। শিশুরা উৎসাহ চায়, নিন্দে বা মুখঝামটা নয়।

এক্ষেত্রে আপনি যা করতে বা বলতে পারতেন,
“আমার মেয়ে যখন তোমার মেয়ের মত বড় হবে, তখন সেও সব শিখে যাবে।”

“আমার মেয়েও ধীরে ধীরে ভাল করছে, পরে আরো ভাল করবে।”

“আমার মেয়ে জেদী না সাহসী তা নিয়ে তোমার না ভাবলেও চলবে ভাবী।তুমি তোমার বাচ্চার কথা ভাব।”

২.
মিতা তার মাকে এসে বলছে,
“মা, ঐ আঙ্কেলটা ভাল না। আমি আর ওনার কাছে খেলতে/পড়তে যাব না।”
আপনি তাকে গালি দিলেন, “ফাঁকিবাজ মেয়ে, বড়দের নামে নালিশ করছ? এই তোমাকে ভদ্রতা শিখিয়েছি?”

লক্ষ্য করুন, আপনার শিশুর কাছে একমাত্র নিরাপদ অাশ্রয়স্থল আপনি (বাবা+মা). তাই তার জন্য এমন পরিবেশ তৈরি করুন যেন সে নির্ভয়ে আপনাকে কিছু বলতে পারে। তাকে সর্বদা বকাবকি না করে বুঝতে চেষ্টা করুন শিশুটি কেন অস্বাভাবিক আচরণ করছে। যদি যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ না থাকে তবে সেটাও তাকে বুঝিয়ে বলুন। বকাবকি করে তাকে যত দূরে সরিয়ে রাখবেন, সে ততই বিপদের ঝুঁকির মুখে পরবে।

৩.
বাড়িতে বেড়াতে এল বিন্তীর খালা,মামা ইত্যাদি স্বজনেরা।মিঃ রহমান ক্রমাগত তাদের কাছে নিজ ছেলেমেয়ের দোষত্রুটি বলে যাচ্ছেন। ফলে খালা, মামা আসার অানন্দটাতো রইলই না, বরং তাদের কাছ থেকে বকা ঝকা জুটল। বিন্তীর সম্পর্কে তাদের ধারনা খারাপ হল। পরবর্তীতে তারা বিন্তীকে যেখানেই দেখেন, সর্বক্ষণ সকলকে বলে বেড়ান, ও দুষ্ট মেয়ে, পড়ে না,কার্টুন দেখে। অন্যরাও তাদের ব্যপারে খারাপ ধারনা পেল।
.
বাচ্চা শুধু মিঃ রহমানেরই আছে,তা যেমন নয়, তেমনি শুধু ওনার বাচ্চাই কার্টুন দেখে তাও নয়। খালা মামাদেরো বাচ্চা আছে এবং তাদের বাচ্চাদেরো অসংখ্য দোষত্রুটি অাছে। কিন্তু তারা কি এসব গেস্টের সামনে বলেন? নিশ্চই না।
আপনার বচ্চাকে যদি আপনিই পাবলিক প্লেইসে খাট করেন, তবে অন্যেরাতো তা করবেই। তারা কেন সে সুযোগ ছেড়ে দেবে,বলুন? তাই তাকে শাসন করুন সবার আড়ালে, আর সবার সামনে তার ভাল দিক এবং সাফল্যগুলো তুলে ধরুন, যেন সে অণুপ্রেরনা পায়।
.
জেনে রাখুন, শিশুরাও কিন্তু যথেষ্ট আত্নসম্মানবোধ সম্পন্ন হয়। সুতরাং সকলের সামনে তাকে হেয় করলে তার মাঝে হীনম্মতা কাজ করে। কখনো সে বাবা মায়ের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। কখনোবা, সে বাবা মাকে শত্রু ভাবতে থাকে,তাদেরকে সহ্য করতে পারে না। ফলে ভুল পথে পা বাড়ায়। এহেন মানসিক অত্যাচার তার মানসিক বিকাশে তা বাঁধা দেয়।

৪.
মিলির বয়স আট। সে একা একটা ঘরে থাকতে ভয় পায়। তাই মিলিকে তার মা অাচ্ছামত বকেন,কেন সে ভয় পায়। তারপর মা পাশের বাড়ি চলে যান সিরিয়াল দেখতে। ভয়ে আর কষ্টে মিলি ফুঁপিয়ে কাঁদে, কান্নার শব্দ শুনতে পেলে মা আরো বকবেন,তাই জোড়ে কাঁদতে পারেনা।
.
নিজেরাই বাচ্চাদের সাথে সারাক্ষণ খিটখিট করবেন, তার সুবিধা অসুবিধা কিছুই পাত্তা দিবেন না,বুঝতে চাইবেন না, তারপর যদি বাচ্চাও খিটখিটে মেজাজের হয়ে যায়,তখন সবাই মিলে বাচ্চাকে দোষারোপ করে কি হবে? কখনো ভেবে দেখেছেন, সৃষ্টিকর্তা কতজনকে সন্তানই দেন না। আর আপনাদেরকে দিয়েছেন,তবু আপনারা তাকে যত্ন করছেন না!
৫.
কথার কোন সঙ্গী নেই। বাসায় সারাদিন একা বন্দী থাকে। তাই কেউ বেড়াতে গেলে সেও তুমুল উৎসাহ নিয়ে কথা বলতে ও শুনতে চলে অাসে। কিন্তু তার ঘষেটি খালার নিষেধ, বড়দের মাঝে তার আসা চলবে না। তাকে আশেপাশে দেখলেই দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়া হবে। যেন সে “এক প্রভুহীন পথের কুকুর”। ফলে একাকীত্বে আর বিষন্নতায় ভুগে বাচ্চাটা অস্বভাবিক হয়ে উঠছে।
৬.
চৈত্রের সন্ধ্যা। প্রচন্ড গরম,বিদ্যুৎ নেই। সবাই ঘরে টিকতে না পেরে উঠোনে নেমে এসেছে। কিন্তু যারার মা,মামাদের কঠিন নির্দেশ,নিজেরা টিকতে না পারলেও ২য় শ্রেনিতে পড়ুয়া যারাকে টিকতেই হবে বদ্ধ ঘরে। মোম জ্বালিয়ে একা বসে তাকে পড়তেই হবে। তার শরীরের বা মনের অবস্হা জাহান্নামে যাক।
ফলশ্রুতিতে অধিক গরম সইতে না পেরে বাচ্চাটি মাটিতে লুটিয়ে পরে জ্ঞান হারাল।

ভেবে দেখেছেন, কত নিষ্ঠুর উপায়ে আপনারা কেড়ে নিয়েছেন একটি বাচ্চার কাছ থেকে তার শৈশব? পরবর্তীতে বাচ্চাটি বেড়ে উঠবে এবং আপনাদের সাথে স্বাভাবিক আচরণ করবে না, এ সত্যটাও মেনে নিন।

এছাড়াও, বাচ্চাকে খেলতে না দেয়া, সর্বদা বাচ্চার সাথে খিটখিট আচরন করা, অল্প দোষে বড় শাস্তি দেয়া, সবার সামনে কান ধরে ওঠবস করানো, তার প্রতিটা পদক্ষেপে বাধা দেয়া,তার সকল আবদার নাকোচ করে দেয়া, তার পছন্দের পোশাক না কিনে দেয়া,তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে উদ্ভট পোশাক পরতে বাধ্য করা,বয়ঃসন্ধিকালে তার পোশাকের দিকে খেয়াল না রাখা, হোম টিচারের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিজে কোন খেয়াল না রাখা, তারপর রেজাল্ট মন্দ হলেই তাকে বকাঝকা করা, একদম টিভির ধারেপাশে ঘেষতে না দেয়া, বিনোদনের সমস্ত উপকরণ কেড়ে নেয়া, সারাক্ষণ জোর করে পড়তে বসিয়ে রাখা ইত্যাদি কোনটাই ঠিক নয়।

মনে রাখবেন, শিশুবেলা থেকেই একটা বাচ্চার মানসিক ভীত তৈরি হয়, তাই আপনি তার সাথে যেমন ব্যববহার করবেন, সে তেমনটাই তৈরি হবে। এ বয়সে বাচ্চাটি বেড়ে ওঠে,মানসিক ও শারিরীক বিকাশ ঘটে,তাই তাকে পুষ্টিকর খাবার দেয়া উচিত এবং ধৈর্য্য সহকারে তার মনটাকেও বোঝার চেষ্টা করা উচিত।

আর যেসব মামা, মামী,খালা, ভাবীরা বাচ্চাকে এক বোঝা কথা শুনিয়ে ঝেড়ে ফেলেন, তাঁরা পারলে বাচ্চার মাকে শিক্ষা দিন, ছোট বাচ্চাকে কিভাবে ধৈর্য্য সহকারে সামলাতে হয়। বাচ্চার ব্যপারে নিন্দে শুনে খুশিতে অাটখানা স্বজনরা বাচ্চাকে নয়, বরং তার বাবাকে বলুন,যেন তিনি বাচ্চার ত্রুটিগুলো পাবলিক না করেন, গেস্টের সামনে বাচ্চাকে বকাবকি না করেন। তার মর্যাদার দিকেও খেয়াল রাখেন। কারণ এখান থেকেই বাচ্চাও অন্যকে মর্যাদা দেয়া শিখবে।
.
সকল শিশুর শৈশব হোক অানন্দময়। শোলাকিয়ার মাঠে খেলতে আসা একটি শিশুও যেন বিষন্নতায় না ভোগে।

৪৩৫জন ৪৩৫জন
0 Shares

২৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ