বেঁকে যাওয়া পথের গল্প

রিমি রুম্মান ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৬, বুধবার, ০২:০৩:২৮অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ২০ মন্তব্য

রোজ সকালে ছেলেকে স্কুলে দিয়ে যে পথে বাড়ি ফিরি, সে পথে পাশাপাশি আরেক মা-ও ফিরেন। কিছু দূর হেঁটে আমাদের পথ বেঁকে যায় দু’দিকে। এই বেঁকে যাওয়ার আগ অবধি আমাদের কথা হয়। খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে দেন আমায়, কেমন করে খেলার ছলে বাচ্চাদের পড়ায় মনোযোগী হতে শেখাবো কিংবা ঘুমাতে যাবার আগে বই পড়ায় অভ্যস্ত করে তুলবো। ভীষণ সচেতন এক মা। তাঁর কাছ হতে আমার অনেক কিছু শেখা, জানা।

এরপর অনেকগুলো দিন আমি একলাই ফিরি। মনের গহীনে এক প্রশ্ন চিহ্ন নিয়ে ফিরি। ব্যস্ত শহরের ব্যস্ত মানুষ আমরা। কাউকে জিজ্ঞেস করবার কিংবা খোঁজ নেবার সময় হয় না !

জানলাম, ক্যান্সার ধরা পড়ার পর অনেকগুলো মাস হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন তিনি। জটিলতা ছড়িয়েছে পুরো শরীরে। এখন শুধু ব্যথাহীন মৃত্যু নিশ্চিত করার চিকিৎসা। ক’দিন হয় বাড়িতে এনেছে। সকাল বিকাল দুই বেলা নার্স ডিউটি করছে বাড়িতেই। ছেলেমেয়ে দুটি স্কুলে যায় নিয়মিত। স্বামীও জবে যায়। জীবন থেমে থাকে না কারো।

এক সকালে বাচ্চাদের স্কুলে দিয়ে ক’জন সেই অসুস্থ ভাবীকে দেখতে যাবেন বলে স্থির করলেন। আমি তাঁদের সাথে গেলাম না। একজন মানুষ নিশ্চিত মারা যাচ্ছে, আর আমি তাঁকে শেষ বিদায় জানাবো__ এতটা মানসিক শক্তি আমার নেই। আমি বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটি। এই প্রথম আমার বাড়ি ফেরার পথটুকু একলা লাগে। ভীষণ একলা। পৃথিবীর সমস্ত কিছু থেকে একা, বিচ্ছিন্ন এক পথ…

যারা দেখতে গিয়েছিলেন, তাঁরা কেউই পরবর্তী কয়েক রাত ধারাবাহিক ভাবে ঘুমোতে পারেনি। খেতে পারেনি। আকারে ছোট্ট এক শিশুর মত দেখতে, চুলহীন মাথা, অচেনা এক মানুষ … আমি আর সেইসব বর্ণনা শুনতে চাইনি। বাড়ি ফিরি প্রান চঞ্চল, হাসিখুশি মানুষটির মুখখানি মনে করতে করতে। ভেসে যাওয়া মেঘের আকাশ দেখতে দেখতে। দীর্ঘশ্বাস নেই। স্রষ্টাকে বলি, যা কিছু তাঁর জন্যে ভালো, তুমি তাই করো প্রভু।
সহসাই তিনি মারা গেলেন। ছেলে মেয়ে দুটিকে প্রতিবেশীদের কাছে রেখে স্ত্রী’র লাশ নিয়ে স্বামী একাকি দেশে গেলেন। ক’দিন থাকলেন। বিয়ে করলেন দ্রুততম সময়েই। বাস্তবতা হল, ছোট দু’টি ছেলে মেয়েকে দেখে রাখবার কেউ ছিল না এই এক্‌লার দেশে।

রোজ সকালে সেই একই পথ ধরে হেঁটে আসবার সময় এবার আমার পাশাপাশি অন্য একজন। নতুন মা। অল্প সল্প গল্প শেষে আমাদের পথ দুই দিকে বেঁকে যায়। দশ বছরের মেয়েটি এখন ষোলোতে। আজ তাঁর সুইট সিক্সটিন। অল্প পরিসরে ঘরোয়া ভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। অনুরোধ ফেলতে পারিনি, তাই যাওয়া। কালো লেহেঙ্গায় অদ্ভুত মায়াময় লাগছিলো মেয়েটিকে। বললাম, এত সুন্দর ড্রেস কে পছন্দ করে কিনলো ? চোখে মুখে আনন্দের হাসি খেলে গেলো তাঁর। বলল, ” ছোট মা “।
কিছু দৃশ্য বেশ গেঁথে থাকে মনে। “ছোট মা” মেয়েটিকে চুল বেঁধে দিচ্ছেন… ব্রেসলেট পরিয়ে দিচ্ছেন__ সব কিছুতে কেমন এক যত্ন আর মমতা মাখা। আগলে রাখা। প্রতিবেশী দুই একজন বলাবলি করছিল, ওদের মায়ের অভাব বুঝতে দেয়নি এই মা। ওরা ভালোভাবেই বেঁচে আছে অন্য এক মায়ের যত্ন আর মমতায়__ এরচেয়ে ভালোলাগা আর কি হতে পারে ?

অনুষ্ঠান শেষে বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটছি। চাঁদহীন আকাশ আর একলা আমি।
ভীষণ মনে পড়ছে মানুষটিকে যে আমাকে শিখিয়েছিল, কিভাবে বাচ্চাদের পড়াশুনায় মনোযোগী হতে শেখাবো কিংবা ঘুমের আগে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলবো।আমার গলা ভিজে আসে। এ ভেজা আনন্দের, সুখের, আশীর্বাদের।

আমরা প্রতিনিয়তই সৃষ্টিকর্তার পরীক্ষার সম্মুখীন হই, তাই না ?

৩৬২জন ৩৬২জন
0 Shares

২০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ