বিদায় এক বর্নাঢ্য রাণীর

রোকসানা খন্দকার রুকু ৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, শুক্রবার, ০৯:০৭:০১অপরাহ্ন সমসাময়িক ৬ মন্তব্য

গ্লামার কুইন রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ (এলিজাবেথ আলেকজান্দ্রা মেরি) আর নেই। ১৯৫২ সাল থেকে বর্তমান ২০২২ পর্যন্ত তিনি গ্রেট ব্রিটেনের রানী ছিলেন। তিনি বিশ্বের ইতিহাসের দীর্ঘতম শাসনকারী নারী রাষ্ট্রপ্রধান এবং বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক সফল রাজ্যশাসক ছিলেন। ৯৬ বছর বয়সে তিনি মারা গেলেন স্কটল্যান্ডের প্রাসাদে। দীর্ঘ ৭০ বছর ব্রিটিশ সিংহাসনের দায়িত্ব পালন করেছেন। এতো সময় ধরে সফলতার সাথে রাজ্যশাসনের এক বিস্ময়কর অধ্যায়ের অবসান হলো।

” দ্যা ইউনাইটেড কিংডম অফ গ্রেট ব্রিটেইন”- মূলত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় পরিচালিত একটি দেশ। সেখানে কয়েকটি রাজনৈতিক দল আছে। নির্বাচনও হয়। জনগন দ্বারা নির্বাচিত একটি সরকার থাকে। একজন প্রধানমন্ত্রীও থাকেন তবুও সেখানে রাজা বা রানীই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।
জনগন রাজতন্ত্র ও গনতন্ত্র দুই শাসনে শাসিত হন। রাজা- রাণী তাদের কাছে পরিবারের বাবা- মায়ের মতো। আইনের চেয়ে রাজা- রানীর পরামর্শ  যা প্রথা বলে পরিচিত তাই বেশি কার্যকর। তাইতো গ্রেট ব্রিটেনের সংবিধান বিশ্বের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সংবিধান। রাজপরিবারের জন্ম ও মৃত্যু তাদের কাছে অতি আনন্দের ও অতি কষ্টের। যেমন রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুতে গ্রেট ব্রিটেনের মানুষ গভীর শোকাহত।

দ্বিতীয় এলিজাবেথ উইন্ডসর রাজবংশ থেকে এসেছেন। তিনি তার পিতা রাজা ষষ্ঠ জর্জের মৃত্যুর পর ২৫ বছর বয়সে ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সালে তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন।
এলিজাবেথ বাড়িতে অধ্যয়ন করেছিলেন। তবুও তিনি একটি চমৎকার উদার শিল্প শিক্ষা পেয়েছিলেন। তিনি উচ্চ স্তরে শিল্প, ধর্ম, আইন এবং বিশেষ করে ব্রিটিশ সংবিধান অধ্যয়ন করেছেন। দ্বিতীয় এলিজাবেথ ফরাসি ভাষায় সাবলীল ছিলেন।
তিনি মহিলাদের আত্মরক্ষা স্কোয়াডে যোগ দেয়। রাজকুমারী হয়েও অ্যাম্বুলেন্স চালাতে শিখেছিলেন। একজন মেকানিক হিসাবে প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে লেফটেন্যান্ট পদে উন্নীত হন। তিনিই একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান যিনি যুদ্ধে সত্যিকারের জনসেবা করেছিলেন। তাঁর অন্যতম শখ ঘোড়া চালনা ও কুকুর পালন।

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ব্রিটিশ কমনওয়েলথ অফ নেশনসের প্রধান এবং গ্রেট ব্রিটেন ছাড়াও ১৫টি স্বাধীন রাষ্ট্রের রানী: অস্ট্রেলিয়া, অ্যান্টিগুয়া এবং বারবুডা, বাহামা, বার্বাডোস, বেলিজ, গ্রেনাডা, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, পাপুয়া নিউ গিনি, সেন্ট ভিনসেন্ট এবং গ্রেনাডাইনস, সেন্ট কিটস এবং নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, টুভালু, জ্যামাইকা। তিনি অ্যাংলিকান চার্চের প্রধান এবং ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ডার ছিলেন। গ্রেট ব্রিটেনের নিয়মই হলো রাজা বা রানী এসব আজীবন ক্ষমতার অধিকারী হন।

” ডিফেন্ডার অব দ্য ফেইথ অ্যান্ড সুপ্রিম গভর্নর অব দ্য চার্চ অব ইংল্যান্ড” – বিশ্বের একটি বিশ্বয়কর ব্যাপার হলো নারীও চার্চের( ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের) প্রধান হতে পারেন। যেমন রাণী এলিজাবেথ ছিলেন। নিয়মমাফিক রাজপরিবারের বড় সন্তান রাজা বা রানী হবেন।
প্রথমদিকে সন্তান মেয়ে হলে সেটা নিয়ে নানা জটিলতা ছিল। পরবর্তীকালে নারী বা পুরুষ কোন কথা নয়, বড় সন্তান হলেই তিনি রাজা বা রানী হবেন এবং আজীবন চার্চেরও প্রধান থাকবেন। ইংল্যান্ডের উদারচিন্তার সমাজব্যবস্থা তা সাবলীল ভাবেই গ্রহন করেছে।

বিশ্বজুড়ে যখন একে একে রাজতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘটে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাচ্ছিল। সে সময়ও ব্রিটিশরা রাজতন্ত্র ত্যাগ করেনি। তবে অতি উচ্চাভিলাষী জীবন- যাপন ও উচ্ছৃঙ্খলতার জন্য জনগন আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। পরবর্তীতে রাজপরিবার জনগনের বিশ্বস্ততা অর্জনে সক্ষম হয়।
যেমন- এলিজাবেথ দাতব্য ও সামাজিক কর্মকান্ডে ৬০০ টিরও বেশি বিভিন্ন পাবলিক এবং দাতব্য সংস্থার ট্রাস্টি।
দ্বিতীয় এলিজাবেথকে গণমাধ্যমে বারবার মানব হৃদয়ের রানী বলা হয়েছে। এই মহিলার মানবতা এবং উদারতা, যিনি তার শপথের প্রতি সত্য থাকেন, এবং তিনিই বলেছিলেন, মানুষের মধ্যেই তার জনপ্রিয়তার মূল চাবিকাঠি।

এলিজাবেথ লন্ডনের মেফেয়ারে ইয়র্কের ডিউক এবং ডাচেস রাজা জর্জ এবং রাণী এলিজাবেথ এর প্রথম সন্তান হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার বাবা ১৯৩৬ সালে নিজের ভাই রাজা অষ্টম এডওয়ার্ডের পরে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। আর সেই সময় থেকেই এলিজাবেথ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ছিলেন। ১৯৪৭ সালে তিনি গ্রিক ও ডেনমার্কের প্রাক্তন রাজপুত্র ডিউক অফ এডিনবরা ফিলিপকে বিয়ে করেন।
এলিজাবেথ-ফিলিপ দম্পতির চারটি সন্তান হয়: ওয়েলসের যুবরাজ চার্লস; রাজকুমারী অ্যান; ইয়র্কের ডিউক যুবরাজ অ্যান্ড্রু এবং ওয়েসেক্সের আর্ল যুবরাজ এডওয়ার্ড। তাঁর মৃত্যুর পরে যুবরাজ চার্লস বর্তমান রাজা হবেন।

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার বাবা রাজা জর্জ মারা গেলে এলিজাবেথ কমনওয়েলথের প্রধান হন এবং সাতটি কমনওয়েলথভুক্ত দেশের রেজিমেন্টের প্রধান হন। দেশগুলো হচ্ছে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান এবং সিলন।  তাঁর অনেক ঐতিহাসিক পরিদর্শন এবং সভার মধ্যে আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রে একটি রাষ্ট্রীয় সফর এবং পাঁচবার পোপের দর্শন বা সফর অন্তর্ভুক্ত। উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলিতে ১৯৫৩ সালে তার রাজ্যাভিযান এবং ১৯৭৭, ২০০২ এবং ২০১২ সালে যথাক্রমে তার রৌপ্য, স্বর্ণ এবং হীরক জয়ন্তী উদ্‌যাপন অন্তর্ভুক্ত। ২০১৭ সালে, তিনি নীলকান্তমণি জয়ন্তীতে পৌঁছানো প্রথম ব্রিটিশ রাজ্যশাসক হয়েছিলেন।

শিক্ষাজীবনে চৌধুরী সারের ক্লাসে বসে বর্নাঢ্যময় ব্রিটেনের রাজনৈতিক ও রাজপরিবারের গল্প শুনতে শুনতে একপ্রকার স্বপ্নে বিভোর হয়ে যেতাম। প্রিন্স উইলিয়াম সে সময় আমাদের ক্রাশ ছিলো। বন্ধুরা একে অপরে রাণী এলিজাবেথকে দাদী-শাশুড়িও বলতাম। পরবর্তীতে উইলিয়াম তাঁর বয়সে ৮ মাসের বড় কেট মিডলটনকে বিয়ে করে আমাদের হ্রদয় ভেঙ্গেছিল।

সে সময় বহুল আলোচিত ছিলেন প্রিন্সেস ডায়ানা। প্রিন্স চার্লসের স্ত্রী। শাশুড়ীর পরে তাঁকেও গ্লামার কুইন বলা হতো। তাঁর মতো আকর্ষণীয় প্রিন্সেস ব্রিটিশরা হয়তো আর পাবে না। পরবর্তীতে বিবাহ বিচ্ছেদ, পরোকীয়া, মৃত্যু রাজপরিবারের জন্য বড়মাত্রার হুমকি ছিল। দুই সন্তান উইলিয়াম ও হ্যারি সহজেই তা কাটিয়ে উঠেছিল। হয়তো তা সম্ভব ছিল রাণীর জন্যই। ব্রিটিশরা তাদের একজন পরম অভিভাবক হারিয়ে ফেললো। আমরা তাদের জন্য সমব্যাথী। ওপারে ভালো থাকুন গ্লামারকুইন শ্রেষ্ঠ শাসক।

তথ্য সহযোগিতা ও ছবি- উইকিপিডিয়া!

১৪৮জন ৬৭জন
0 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ