iDxJmGLYdGEv

পরের দিন মিল্লাত প্রেসে গিয়ে হাশিম সাহেবের সাথে দেখা করি। পাশের ঘরে আমার সহকর্মীরা চুপ করে বসে আছে; শুনবে আমাদের কথা। আমি খুব শান্তভাবে তাঁকে বললাম, “প্রেসটা নাকি বিক্রি করবেন?” বললেন, “উপায় কি, প্রত্যেক মাসেই লোকসান যাচ্ছে, কি করি? আর চালাবে কে?” আমি বললাম, খন্দকার নূরুল আলম তো ম্যানেজার হয়ে এতোকাল চালাল। খরচ কমিয়ে ফেলল। প্রেসটা বিক্রি করে দিলে কর্মচারীদের থাকবে কি? আর আমরা মুখ দেখাতে পারব না। সমস্ত বাংলাদেশ থেকে চাঁদা তুলেছি, লোকে আমাদের গালি দিবে।” হাশিম সাহেব হঠাৎ রাগ করে ফেললেন এবং বললেন, “আমাকে বেচতেই হবে, কারণ দেনা শোধ করবে কে?” আমি বললাম, “কয়েকমাস পূর্বে যে প্রেসটা বিক্রি হল তাতে দেনা শোধ হয় নাই?” তিনি ভীষণ রেগে গেলেন, আমারও রাগ হল। উঠে আসার সময় বলে এলাম, “প্রেস বিক্রি করতে গেলে আমি বাধা দেব, দেখি কে আসে এই মিল্লাত প্রেসে?” হাশিম সাহেব খুব দুঃখ পেলেন আমার কথায়। পরের দিন ঐ সমস্ত বন্ধুরা আবার আমার কাছে এসে বলল, “হাশিম সাহেব খানা খান না। শুধু বলেন, ‘মুজিব আমাকে অপমান করল!’ তুই আবার দেখা কর, আর বলে দে, যা ভাল বুঝেন করেন।” আমি বললাম, “তোমরা খেলা পেয়েছ!”

আমি শহীদ সাহেবের কাছে এখন রোজই যাই। তাঁর সাথে মাঝে মাঝে সভা সমিতিতে যাই—যেখানে সাম্প্রদায়িক সৎভাব সৃষ্টির জন্য সভা হয়। শহীদ সাহেবকে বললাম, সকল ইতিহাস। তিনি আমার উপর রাগ করলেন, কেন আমি খারাপ ব্যবহার করলাম হাশিম সাহেবের সাথে! কত বড় উদার ছিলেন শহীদ সাহেব। আমি হাশিম সাহেবের কাছে যেয়ে বললাম, “আপনি কিছু মনে করবেন না, আমার এভাবে কথা বলা অন্যায় হয়েছে। আপনি যা ভাল বুঝেন তাই করুন। আমার কিছুই বলার নাই।” হাশিম সাহেব হিন্দুস্তানে থাকবেন, আমি চলে আসব পাকিস্তানে। আমার বাড়িও পাকিস্তানে। আমি যাওয়াতে তিনি খুশি হয়েছিলেন। তাঁর সাথে ভিন্ন মত হতে পারি, কিন্তু তাঁর কাছ থেকে যে রাজনীতির শিক্ষা পেয়েছি, সেটা তো ভোলা কষ্টকর। আমার যদি কোন ভুল হয় বা অন্যায় করে ফেলি, তা স্বীকার করতে আমার কোনোদিন কষ্ট হয় নাই। ভুল হলে সংশোধন করে নেব, ভুল তো মানুষের হয়েই থাকে। আমার নিজেরও একটা দোষ ছিল, আমি হঠাৎ রাগ করে ফেলতাম। তবে রাগ আমার বেশি সময় থাকত না।

আমি অনেকের মধ্যে একটা জিনিস দেখেছি, কোন কাজ করতে গেলে শুধু চিন্তাই করে। চিন্তা করতে করতে সময় পার হয়ে যায়, কাজ আর হয়ে ওঠে না। অনেক সময় করব কি করব না, এইভাবে সময় নষ্ট করে এবং জীবনে কোন কাজই করতে পারে না। আমি চিন্তা ভাবনা করে যে কাজটা করব ঠিক করি, তা করেই ফেলি। যদি ভুল হয়, সংশোধন করে নেই। কারণ, যারা কাজ করে তাদেরই ভুল হতে পারে, যারা কাজ করে না তাদের ভুলও হয় না।

অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান। (পৃষ্ঠা নং-৮০ ও ৮১)

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৬৭)

৫৪০জন ৫৪০জন
0 Shares

৩টি মন্তব্য

  • নীলাঞ্জনা নীলা

    বাহ! এই কথাটা খুব দাগ কাটলো মনে। তুলনা করছি না, সেই যোগ্যতাও নেই আমার। তবে আমি যা ভাবি সেটা করে নেই। ভুল হলে সংশোধন করার চেষ্টা করি। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীর এই পর্ব পড়ে বেশ লাগলো। আমার রাগও ক্ষণস্থায়ী, তবে যখন উঠে তখন কন্ট্রোল করতে পারিনা।

    রুবা’পু অনেক ধন্যবাদ ধারাবাহিকটি ধারাবাহিকভাবে লিখে চলার জন্য।
    ভালো থেকো।

  • বাবু

    ভালো লেগেছে এই পর্বটা, আরও পড়ার ইচ্ছে জাগছে মনের মাঝে । পড়বো আশা করি আপনার লেখনী । চালিয়ে যাচ্ছেন-তো-যান আমি পড়তে চাই।

  • মোঃ মজিবর রহমান

    তাঁর সাথে ভিন্ন মত হতে পারি, কিন্তু তাঁর কাছ থেকে যে রাজনীতির শিক্ষা পেয়েছি, সেটা তো ভোলা কষ্টকর। আমার যদি কোন ভুল হয় বা অন্যায় করে ফেলি, তা স্বীকার করতে আমার কোনোদিন কষ্ট হয় নাই। ভুল হলে সংশোধন করে নেব, ভুল তো মানুষের হয়েই থাকে। আমার নিজেরও একটা দোষ ছিল, আমি হঠাৎ রাগ করে ফেলতাম। তবে রাগ আমার বেশি সময় থাকত না।

    যারা কাজ করে তাদেরই ভুল হতে পারে, যারা কাজ করে না তাদের ভুলও হয় না।

    শিক্ষার আছে অনেক রুবা আপু।

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ