মেয়ে! তুমি যখন সামনে এগিয়ে যেতে চাইবে, তখন কোন না কোনভাবে তোমার পেছন থেকে টান পড়বেই।

আমি বরাবরই পেছন থেকে টানকে পেছনে ফেলেই সামনে এগিয়েছি। যতক্ষণ পর্যন্ত না আমার বোধ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার বোধ যদি বাধা হয়ে দাঁড়ায় সেখানে আর এক কদমও এগুতে পারিনা। আর এই ব্যাপারটা এসেছে আমার মায়ের থেকে। একবার ছোট্টবেলা মা আমাকে বলেছিলেন, পথ চলতে গেলে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন লোক বিভিন্ন কথা বলবে, কিন্তু সবসময় সেসব কথার জবাব মুখ দিয়ে দিতে নেই, নিজের অবস্থান সঠিক রেখেই জানান দিতে হয়। অর্থাৎ মানুষের কথায় প্রভাবিত হয়ে পথচলা থামিয়ে দিলে হবেনা বরং বিবেক যা বলে তা শুনে, চিন্তা-চেতনায় সৎ থেকে সামনে এগিয়েই জানিয়ে দিতে হবে তোমার অবস্থানটা কি ছিলো। ছোট্টবেলা মায়ের সেই দিকনির্দেশনা অন্তরে এমনভাবে প্রোথিত হয়েছে যে আর এর বাইরে পা রাখতে পারিনি।

একটা সময় ছিলো, যখন আমি আমার অনুভুতিগুলোকে ডায়েরীতে লিখে রাখতাম। অনেক লিখেছি, আজও লিখছি কিন্তু এখন আর সব শুধু ডায়েরীতেই লিখা হয়না; অনলাইনে বিচরণের কারনে অনেক লিখালিখিই চলে আসে বহিরাঙ্গনে। আমার অভিব্যক্তি, আমার চিন্তা-চেতনার বেশিরভাগই এখন শেয়ারিং হয়। তাতে করে আমি শুধু নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশই নয়; বরং অন্য আরো অনেকের চিন্তা-চেতনার সাথেও নিজেকে সংযুক্ত করতে পারছি। ক্রমেই আমার অভিব্যক্তি প্রকাশের গতি বাড়তে থাকে, পরিধিও বাড়তে থাকে। পাশাপাশি সমান তালে নিজের জন্য সময় কমতে থাকে, পরিজনদের সময় দেয়া কমতে থাকে আর এখানেই বাধে বিপত্তি। অভিযোগের আংগুল উঠে আমার দিকে। তবে আমাকে নিরুৎসাহিত করার জন্য যে সে অভিযোগ তা কিন্তু নয়, তারপরও অবচেতন মন থেকে বলা অনেক কথাও যে প্রভাব ফেলতে পারে তা বোধ হয় সবার পক্ষে বুঝা সম্ভব হয়ে উঠে না।

২০১২ সালে প্রথম আমার একটা লেখা স্থানীয় একটি পত্রিকায় প্রকাশ পায়। আমার সহপাঠি তোফাজ্জল সোহেল একদিন আমায় অনুরোধ করে স্থানীয় পত্রিকায় একটা লেখা দিতে। সেসময় হবিগঞ্জ জজকোর্ট এলাকার জলাধার ভরাট নিয়ে বেশ গোলমাল চলছিলো। পরপর দুইবার অনুরোধ করায় ভাবতে বসলাম কি লেখা যায়, কেউ যখন বড়মুখ করে অনুরোধ করে তখন তাঁকে এড়ানো কঠিন। আর তাছাড়া ওই জলাধারটার প্রতি বরাবরই আমার দুর্বলতা ছিলো। কলম নিয়ে লিখতে বসলাম, দেখি একটু চেষ্টা করতেই মোটামুটি ভালোই একটা লিখা দাঁড়িয়ে গেছে। পরেরদিন মেইল করলাম। এদিকে আমার শ্বাশুড়ীমা তখন স্কয়ার হসপিটালে আইসিইউতে। সারাক্ষন দৌড়াদৌড়িতে ব্যস্ত আমি। লিখাটা যেদিন পাবলিশড হয়, সেদিন আমার শ্বাশুড়ীমা মারা যান। তাঁর মারা যাওয়ার ৩ দিন পর মায়ের বাসায় গেলে আম্মা বালিশের নীচে থেকে আমাকে পত্রিকাটি দেখান। সেসময় আম্মার চোখেমুখে একধরনের ভালোলাগার অভিব্যক্তি আমার দৃষ্টি এড়ায়নি। পত্রিকাটি আম্মা অনেক যত্ন করে বালিশের নিচে রেখে দিয়েছিলেন। তারপর থেকে সালেহ (আমার স্বামী) প্রায়ই আমাকে বলতো তুমিতো চাইলে লেখালিখিও করতে পারো, খারাপ তো আর লিখোনা।
এরপর ২০১৩ সালে গণজাগরনের উত্তাল সময়গুলিতে ফেইসবুকে নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে করতে কেমন করে যেনো রেগুলার হয়ে গেলাম। তখন প্রজন্মচত্বরে কোনদিন দুজনে মিলে ভোর ৬টায় গিয়ে হাজির হয়েছি, কোনদিন অফিস থেকে ফেরার পথে দুজনে নির্দিষ্ট এক জায়গায় মিলিত হয়ে সেখানে গিয়েছি আবার ছুটির দিনে কখনো সারাদিনই কাটিয়েছি আর বাসায় এসে এটাওটা লিখেছি।

বস্তুতপক্ষে এটাতো সত্য, প্রকৃতিগতভাবে অনেক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্বেও আমাদের সমাজে একটা নারী সবদিক সামলে সামাজিক পরিমন্ডলে ভুমিকা তখনই রাখতে পারে যখন তার পুরুষসঙ্গীটি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। নিদেনপক্ষে সহযোগিতা না করুক অন্ততঃ বিরোধিতা যদি না করে, তবেই নারীটি স্বচ্ছন্দে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সহযোগিতার বদলে অবদমন করেই রাখা হয়। কেউ সেটা করে কৌশলে আর কেউ করে জোর খাটিয়ে। আবার কিন্তু গলা উচিয়ে তাঁরাই বলে বেড়ায, মেয়েমানুষ! অতো কি আর বুঝে!! অথচ পর্দার অন্তরালে সেই মেয়েটাকেই কিন্তু অবদমন করে রাখা হয়। অদৃশ্য এক গণ্ডি একে দেয়া হয় তাঁর চারপাশে। এক্ষেত্রে হয় মেয়েটা মানিয়ে নেয়, না হয় বিদ্রোহ করে।
অবশ্যই আমি বলবো না সব নারীর ক্ষেত্রেই তা ঘটে। সত্যিকার অর্থে কিছুকিছু নারীও আছে যারা চারদেয়ালের ভেতরেই নিজেকে ধরে রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। সংসারের সীমাবদ্ধ গণ্ডির মধ্যেই জীবনকে উপভোগ করতে ভালোবাসে আর এ প্রকার নারীদের আবার সমাজও একটু বেশিই ভালোবাসে (আড়ালে তাচ্ছিল্য) কারন তাঁদের সাত কথায় রা নেই। ‘অ’ বললে ‘অ’ ই বুঝে ‘অজগর বুঝতে চায় না। আর যারা অজগর বুঝে ফেলে তাঁদের নিয়েই যত সমস্যা। কিন্তু মুলত ‘অ’ তে ‘অজগর যে বুঝে তাঁকে নিয়ে যারা পথ চলে তাঁরাই কেবল বুঝতে পারে কতোটা রিল্যাক্স লাইফ তাঁরা কাটাতে পারে। সে ক্ষেত্রে স্ত্রীকে তাঁরা লাইফপার্টনার হিসাবে ধারন করে বলেই হয়তো স্ত্রীকে বশীভুত করে রাখা বা তাঁর উপড় কর্তৃত্ব বজায়ের চিন্তা মনোজগতে খেলা করেনা। স্ত্রী হয়ে পড়ে তাঁদের কাছে বন্ধু। দুই যুগ আগেও যা কিনা ভাবা যেতোনা; বরং তখন স্ত্রী মানেই ভাবা হতো সেবাদাসী। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পুরুষতান্ত্রিক মনোজগতেও এখন পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে।

শুন হে পুরুষ ভাইয়েরা
“এ বিশ্বে যা কিছু মহান, চির কল্যানকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর”
সুতরাং, পাশে দাঁড়াও; সুন্দর পৃথিবী গড়ার প্রয়োজনে।

৪৫৩জন ৪৫৩জন
0 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ