‘ তুমি আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দিবো ’ নেপোলিয়ন বোনাপার্টের এই উক্তিটি কতটা গ্রহণযোগ্য আর বাস্তবসম্মত তা আমরা জীবন চলার পথে হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করি। কিন্তু আমাদের চলমান জীবনের কঠিন বাস্তবতা কী বলে ? আমরা আমাদের কন্যাসন্তানদের যতটা না সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার কথা ভাবি, তারচেয়েও অধিক চিন্তিত হয়ে উঠি কতো কম বয়স থাকতে তাকে সুপাত্রে পাত্রস্থ করা যায়। ‘ বয়স বেশি হয়ে গেলে উপযুক্ত পাত্র পাওয়া দুরহ হয়ে উঠে’ এমন ভাবনা ভাবিত করে আমাদের। অন্যদিকে অধিকাংশ পাত্রের পরিবার কম বয়সি কিশোরীকে বাড়ির বউ করে পেতে চাইলেও বিবাহ পরবর্তী সময়ে সংসারের সব কাজকর্ম করা এবং পরিবারের সকল সদস্যের মন জয় করে চলার জন্যে সেই কিশোরীর কাছ থেকে একজন পরিপূর্ণ নারীর আচরণ আশা করে। এমনটি বেশ ক্ষোভের সাথেই জানালেন, লিপিকা পাল।
লিপিকা আমার পূর্বপরিচিত নন। তার সাথে আমার পরিচয় এই নিউইয়র্ক শহরেই। জ্যাকসন হাইটসে ইন্ডিয়ান শাড়ির দোকানে চাকুরি করতেন একসময়। দেখতে একটু বেশিই রূপবতী। দেশে থাকাকালীন সময়ে বিয়ে হয় মাত্র সতেরো বছর বয়সে। সবে এসএসসি পাশ করে কলেজে ভর্তি হয়েছিল। আচমকা একদিন বলা নেই কওয়া নেই অনেকটা তাড়াহুড়ায় পরিবারের চাপে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। কেন এই তাড়াহুড়া ? স্রষ্টা প্রদত্ত অতি সৌন্দর্যই তার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাকে নিয়ে বাবা-মা’র যতো ভয়, যতো ভাবনা। বিয়ের পর স্বামী বিদেশে ফিরে গেলে লিপিকা পড়াশুনা চালিয়ে নেয় অদম্য মনোবলে। লেখাপড়া শেষ করে নিজে স্বাবলম্বী হবে এমন স্বপ্ন নিয়ে গ্রাজুয়েশন শেষ করে। এরই মাঝে লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে স্বামীর কাছে চলে আসতে হয় এই বিদেশ বিভূঁইয়ে। এদেশে কলেজে ভর্তি হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে সে। স্বামীর অনিচ্ছায় এখানেই দমে যেতে হয় তাকে। শুধু তাই নয়, অল্পবয়সি লিপিকার নিজের পছন্দের পোশাক পরার স্বাধীনতা ছিল না সেই সময়ে। স্বাধীনভাবে চলার স্বাধীনতাও ছিল না। প্রতি পদে পদে বাঁধ সাধেন স্বামী। এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না, এমন করে কথা বলা যাবে না, উচ্চস্বরে হাসতে মানা! বয়সের ব্যবধান মানেই চাওয়া-পাওয়ার ব্যবধান। এই ব্যবধানের শেষ পরিণতি হয়ে উঠে বিচ্ছেদ। বেশ শ্লেষের সাথেই লিপিকা বলেন, ‘ স্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণ করাই কি স্বামীর একমাত্র কাজ ?’ যখন কিছুতেই পেরে উঠে না, তখন মিথ্যে অপবাদ দিয়ে বিচ্ছেদ নেয় স্বামী। প্রবাসের একলা জীবনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে একদিন লিপিকার মা তার বিদেশের বাড়িতে বেড়াতে এলে দীর্ঘদিনের জমানো গোপন দীর্ঘশ্বাস বুকে চেপে মাকে প্রশ্ন করে বসে, কেন এতো কম বয়সে তাকে বিয়ে দেয়া হয়েছিল, কেনই বা লেখাপড়া শিখিয়ে স্বনির্ভর করে তোলেনি ? লিপিকার বিব্রত মায়ের ঈষৎ ইতস্তত উত্তর, ‘ তুই বেশি সুন্দর ছিলি, তাই তোকে নিয়ে সবসময় অজানা আশংকা তাড়া করে ফিরতো।’ এমন জবাবে সন্তুষ্ট হতে পারেনি লিপিকা। তার জীবনটা এলোমেলো হয়ে যাবার জন্যে বাবা-মায়ের ভুল সিদ্ধান্তকে দায়ী করেন। মাকে পাল্টা প্রশ্ন করে সে, ‘ তবে বড়বোন বীথিকাকে কেন লেখাপড়া শেষ করতে দাওনি, কেনই বা তাকে নিজের পায়ে অন্তত দাঁড়াতে দাওনি, সে তো দেখতে সুন্দরী ছিল না, তবে ?’ এবার মায়ের অপরাধি ভঙ্গিতে জবাব, ‘ বীথিকার গায়ের রং কালো, ওর জন্যে পরে পাত্র পাওয়া কঠিন হতো।’
তবে কি কন্যা সন্তান দেখতে সুন্দর হলে দোষ ? অসুন্দর হলেও দোষ ? নিজের ঘরই যদি কন্যাসন্তানের উচ্চতর শিক্ষা অর্জনে প্রতিবন্ধক হয়, তবে সে কেমন করে শিক্ষিত মা হবে ? শিক্ষিত জাতি উপহার দিবে ? লিপিকার এমন প্রশ্নের কোন উত্তর সেদিন আমার জানা ছিল না। শুধু নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করেছি আনমনে, ‘ সন্তান প্রতিপালন, স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির সকলের মন জয় করে চলাই কি একজন নারীর জীবনের একমাত্র করণীয় ?’
এবার আসি নূপুরের প্রসঙ্গে। এটি তার ছদ্মনাম। সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করে চাকুরি খোঁজার সময়টাতে পারিবারিকভাবে বিয়ে ঠিক হয় নুপুরের। ছোটবেলা থেকেই যে তুমুল মেধাবী মেয়ে নূপুর! তাই বিয়ের সময় পাত্রপক্ষকে জানানো হয় বিয়ের পর নূপুরের পড়াশোনা করা, চাকুরি করার তীব্র আকাঙ্ক্ষার কথা। পাত্রপক্ষ সব মেনে নিয়ে সম্মত হয়। লোক জানাজানি হবার ভয়ে খুব দ্রুততম সময়ে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ফেলে তার পরিবার। কেন এই ভয় ? কেনই বা তাড়াহুড়া ? জানা গেলো, আমেরিকান সিটিজেন পাত্র হাতছাড়া হয়ে যাবার ভয়। বয়স বিবেচনায় পাত্র নূপুরের চেয়ে দ্বিগুণ বড়। কিন্তু তাতে কী! পাত্রের আর্থিক অবস্থা ভালো। অর্থনৈতিক নিরাপত্তার চেয়ে বড় নিশ্চিন্তের কী হতে পারে কন্যাদায়গ্রস্ত বাবা-মায়ের কাছে! ছাত্রাবস্থায় পাত্রের পড়াশুনা বেশিদূর এগোয়নি, তাতেও সমস্যা নেই। সমস্যার সূত্রপাত তখনই হয়, যখন নূপুর এদেশে এসে আরো পড়াশুনা করার আগ্রহ প্রকাশ করে এবং স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে শুভাকাংখিদের সহযোগিতায় লেখাপড়া চালিয়ে নেয়, পাশাপাশি নতুন চাকুরিতে যোগ দেয়। নূপুরের ভাষায়, ‘ যখন আমি স্বনির্ভর হই এবং বিদেশে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠি, তখনই শুরু হয় পারিবারিক অশান্তি।’ স্বামীর চাওয়া স্ত্রী ঘরে থাকুক, স্বামীসেবা করুক, সন্তান প্রতিপালনে অধিক মনোযোগী হোক। বিবাহপূর্ব প্রতিশ্রুতির কথা বেমালুম ভুলে যায়। যাই হোক, অবশেষে চলমান অশান্তির শেষ পরিনতি বিচ্ছেদে রূপ নেয়। চোখ ছলছল দৃষ্টিতে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে নূপুর বলেন, ‘ কোন নারীর চলনে বলনে দৃঢ়তা থাকলে সমাজ সংসার তাকে অন্যচোখে দেখে, বেয়াড়া নারী হিসেবে বিবেচনা করে। পরাধীনতার শেকল ভাঙতে চাইলেই পরিবারে অশান্তি নেমে আসে।’ সে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায়। বলে, ‘ নারীর পূর্ণতা কি কেবলই মাতৃত্ব, পরাধীনতা আর পতিসেবায় ?’
এ প্রশ্নের উত্তর আমার জীবনে দেখেছি একেবারেই ভিন্নরূপে। আমার বাবা ফাইভ/সিক্স পড়ুয়া এক গাঁয়ের বালিকাকে বিয়ে করে শহরে বসতি গেড়েছিলেন। সেই বালিকা বধূ আমার মা। পড়ালেখায় সীমাহীন আগ্রহ দেখে মাকে ভর্তি করিয়ে দিলেন শহরের মাতৃপীঠ গার্লস স্কুলে ক্লাস সেভেনে।আমার মেধাবী মা ক্লাসে প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় হতেন। ভয়াবহ টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়েও স্কুলে শুয়ে এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। কৃতিত্বের সাথে পাশ করলেন। চাঁদপুর সরকারী কলেজ থেকে এইচ এইচ সি পাশ করলেনও কৃতিত্বের সাথে। অতঃপর ঘনিষ্ঠজনদের পরামর্শে দীর্ঘমেয়াদি পড়াশোনায় না গিয়ে ভর্তি হলেন তিন বছরের প্যারামেডিকেল কোর্সে। সেই সময়টাতে আমরা ছোট দুইবোন বাবা, নানু আর খালার তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠছিলাম। ব্যবসার পাশাপাশি বাবা আমাদের সময়মত খাওয়াতেন, গোসল করাতেন, ঘুম পারাতেন। আমরা থাকতাম মফঃস্বল শহরে। মা থাকতেন ঢাকায় প্যারামেডিকেল হোস্টেলে। মাসের শেষ শুক্রবার ভিজিটর ডে তে বাবা আমাদের নিয়ে লঞ্চে চড়িয়ে ঢাকায় নিয়ে যেতেন মায়ের সাথে দেখা করাতে। প্রতিমাসের এই দিনটির জন্যে মা ব্যকুল হয়ে অপেক্ষায় থাকতেন। সারামাস জুড়ে পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে হাতে সেলাই করে যে সুন্দর সুন্দর জামা বানাতেন, দেখা হলেই তা পরিয়ে স্টুডিওতে নিয়ে যেতেন। ছবি তুলতেন। শেষে বুকে জড়িয়ে অশ্রুজলে বিদেয় দিতেন আমাদের। পরবর্তী এক মাস সেই ছবি দেখে দিন কাটাতেন। একটা সময় পড়া শেষ হলে মা ফিরে এলেন। চাকুরিতে যোগ দিলেন।
আমার প্রায়ই মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা, যখন মাঝে মাঝেই মায়ের অফিসে যেতাম। মাকে দেখতাম গভীর মনোযোগে মাইক্রোস্কোপের বাটন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দু’চোখে কিছু দেখছেন আর পাশাপাশি ফাইলে লিখছেন। ব্যস্ততার মাঝেও অফিসের পিয়ন খালেক কাকাকে পাঠিয়ে হোটেল থেকে পরোটা, রসগোল্লা আনাতে ভুলতেন না। সেইসব খাবার খালেক কাকা খুব যত্নে সুন্দর করে পরিবেশন করতেন। আপ্যায়ন করতেন মায়ের ব্যস্ত থাকার সময়টাতে। চেয়ারে পা দুলিয়ে রসগোল্লার রসে পরোটা ডুবিয়ে ডুবিয়ে খেতে খেতে ছোট্ট আমি খুশিতে মরে যেতে চাইতাম। মাইক্রোস্কোপে মনোযোগী মাকে খুব স্মার্ট এবং সুন্দর দেখাতো। ছোট্ট বুক গর্বে ভরে যেতো এই ভেবে যে, মানুষটি আমার মা। অফিস শেষে বাড়ি ফিরে জোহরের নামায আদায় করেই মা ডায়নিং টেবিলে বসে যেতেন দুপুরের খাবার খেতে। কেননা, বাবা সহ আমরা তিন ভাইবোন না খেয়ে অপেক্ষায় থাকতাম। খেতে বসে মা মৃদু তিরস্কার করতেন এই বলে, “এতো করে বলি আমার জন্য না খেয়ে বসে থাকিস না, খিদা লাগলে খাইয়া ফেলিস, কিন্তু কে শুনে আমার কথা !” আমার ধারণা, মা মুখে তিরস্কার করলেও মনে মনে খুশিই হতেন আমাদের এই গভীর ভালোবাসা দেখে।
এর পিছনের গল্পটি সুখের ছিল না মোটেও। অনেকেই বাবার কান ভারী করতো এই বলে, ‘ বউকে বেশি পড়াইলে এই বউ থাকবো ?’ কিন্তু আমার বাবা সেসব পরোয়া করেননি। ছয় বছর বয়সে পিতৃহারা হয়েছেন তিনি। লেখাপড়া করতে পারেননি বেশিদূর। মাঝে মাঝে গল্প করতেন, কলাগাছের ভেলায় চড়ে বর্ষার দিনে এক মাইল দূরের স্কুলে যেতেন, হারিকেন কিংবা কুপিতে কেরোসিন কম খরচ করতে দিনের আলোয় পড়তেন। নিজে পড়াশুনা শেষ করতে পারেননি বলে বুকের গহিনে না পাওয়ার বেদনা ছিল, তাই আমার মাকে তাঁর স্বপ্ন পূরণের রাস্তায় হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন বহুদূর, সাফল্যের শীর্ষে।
একজন সফল পুরুষের সফলতার পেছনে একজন নারীর অবদান যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি একজন নারীর এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একজন বাবা, ভাই, জীবনসঙ্গী কিংবা পুত্রের নিরবচ্ছিন্ন সমর্থন ও সহযোগিতা প্রয়োজন। আমরা যতো যা-ই বলি না কেন, একা এগিয়ে যাওয়া একজন নারীর ক্ষেত্রে সত্যিই কঠিন। নারীর লক্ষ্য এবং স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে একজন পুরুষের উপর নির্ভর করতে হয়। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়ার কথা বলা যেতে পারে। আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলের নারীদের জীবন তো আরো কঠিন। কঠিন যুদ্ধ করে টিকে থাকা পরিশ্রমী এক জীবন তাদের। কিন্তু ভিনদেশে বেড়ে উঠা নারীদের জীবন কেমন ? নিউইয়র্কে আমার বাসার পাশেই ওষুধের দোকানে চাকুরি করেন মারিয়া। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় যাবত প্রতিমাসে শাশুড়ির নিয়মিত ওষুধ আনতে যেতে হয় সেখানে। ব্যস্ততা না থাকলে আমরা দাঁড়িয়ে গল্প করি ক্ষণিক। জাতিতে হিস্প্যানিক মারিয়া জানালেন, স্বামী-স্ত্রী দু’জনে সহপাঠী ছিলেন তারা। ছাত্রাবস্থায় স্বামীর চেয়েও মেধাবী ছিল সে। বিয়ের পর সংসার, স্বামী, এবং চারটি সন্তান সামলে আর পড়া চালিয়ে যাবার সুযোগ হয়নি। সন্তানরা সকলেই স্কুলে পড়ে বিধায় ওই সময়টায় নিজের হাতখরচ মেটাতে কাজ করছেন ওষুধের দোকানে। স্বামীর সহযোগিতা পেলে এগিয়ে যেতে পারতো অনেকদূর। হতাশা আর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পাই তার কথায়। শুনতে পাই ভাঙ্গনের শব্দ। হৃদয়ভাঙ্গা এইসব দীর্ঘশ্বাস সংক্রমিত হয় বাতাসে। শীতল বাতাস কেটে কেটে সন্ধ্যার নিয়নের আলোয় পিচঢালা পথ ধরে হেঁটে বাড়ি ফিরি আমি। ‘ তবুও শান্তনা যে, আমার শিক্ষা আমার সন্তানদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে কাজে লাগছে ‘ মারিয়ার হতাশার মাঝেও বলা এই শেষ কথাটুকু একরকম ভালোলাগার অনুভূতি জাগায় মনের ভেতরে। সবাইকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা।
১৫৬জন ৮০জন
25 Shares

১৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য