জাল

দালান জাহান ২৩ জুন ২০২২, বৃহস্পতিবার, ১০:০০:৫১পূর্বাহ্ন গল্প ৩ মন্তব্য
  1. জাল (প্রথম পর্ব)
হাতে একটি জাল নিয়ে
দিনরাত শ্মশান ঘাটে বসে থাকেন জেলে পাড়ার সুমঙ্গল । সারাদিন সে জালটা সেলাই করে খুব যত্নে। আর সন্ধ্যার পরেই কী ভেবে নিজ হাতে ছিঁড়তে থাকে জালটা। আর মাঝে মাঝে ভীর ভীর করে কথা বলে জালের সাথে।  উঠোন ভর্তি জল ঘর ভর্তি মাছ। মাছরা মাথায় সাঁতার কাটছে। মিছিলে যাচ্ছে মাছের গন্ধ!
আবার মুহুর্তেই বলছে, “আমার মাছগুলো চলে যাচ্ছে। কে বা কারা জাল দিয়ে আমার সব মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে।  দুনিয়া একটা জাল। এই জালের শিকার সবকিছু।  এই জাল ছিঁড়তে হবে।”
কয়েকদিন আগে করোনায় স্ত্রী মারা যায়। লোকে বলে স্ত্রী’র মৃত্যুর পর সুমঙ্গলের মাথা খারাপ হয়েছে। সুমঙ্গল শ্মশানের পূর্ব দিকে মুখ ফিরে দিন-রাত বসে থাকে আর আবোলতাবোল বকে। লোকে তাকে পাগল বলে ;কিন্তু সুমঙ্গল নিজেকে পাগল মনে করে না। বস্তুত পৃথিবীর কোন পাগলই নিজেকে পাগল মনে করে না। সে হাত মুখ বেঁকিয়ে আঙুল কুঁচিয়ে জাল! জাল বলে ! মানুষকে কি একটা বুঝাতে চায় কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারে না। হঠাৎ মনে না হওয়া হারানো শব্দের মতো সে বাকশক্তি হারিয়ে তখন চুপচাপ বসে থাকে।
শ্মশান ঘাটের পূবেই মরা নদ ব্রম্মপুত্র। কিন্তু তখন নদ মরা ছিলো না। নদ ভর্তি জল ছিলো। বর্ষায় পূর্ব এলাকা পানিতে ভাসমান থাকতো।
সুমঙ্গল যৌবনকালে ব্রম্মপুত্রে মাছ ধরতেন। শুধু সুমঙ্গল না তার পূর্ব পুরুষেরাও তাই করতেন।
অতীতের এক চাঁদনী রাতে জল হাতে নিয়ে সুমঙ্গল’র বাবা জলের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকেন। যেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে  দিয়ে জলের পি এইচ পরিমাপ করছেন সে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তার বাবা সেদিন সুমঙ্গলকে বলেছিলেন, “বুঝলে সুমঙ্গল জীবনে জলের গুরুত্ব অপরিসীম। জল থেকেই জাল আর জাল থেকে জেলে। জলের সাথে আমাদের প্রাগৈতিহাসিক সম্পর্ক আছে বলেই আমরা জেলে। জলকে কখনও অসম্মান করবে না। যেদিন পৃথিবীতে জল থাকবে না সেদিন পৃথিবীতে কিছুই থাকবে না।  জলই আমাদের জীবন জালই আমাদের  জীবন।”
“জেলের জীবন জালেরই প্রতিবিম্ব। মূলত প্রতিটি মানুষের জীবনেই ছড়িয়ে থাকে জাল।
জাল তা মাছ ধরার জালই হোক আর মানুষ ধরার জালই হোক জাল যেন ছেঁড়া না থাকে খেয়াল রাখবে বাবা। জাল ছেঁড়া থাকলে মাছ চলে যায়। আবার জীবনের জাল ছেঁড়া থাকলে মানুষ ও চলে যায়। বস্তুত পৃথিবী একটা প্রাগৈতিহাসিক জাল এই জাল প্রতিদিন কেউ না কেউ ছিঁড়ে এই জালে প্রতিদিন কেউ না কেউ পড়ে । “
সে রাতে সিঁদুর রঙের দুটো রুই ধরা পড়ে জালে। সুমঙ্গল বলেন ” বাবা রুই কেমন করে দিদির সিঁদুরের মতো লাল হয়?
 দুইডাই কী বিক্রি করবা?” এই কথা শোনে সুমঙ্গলের’র বাবা মুখ ভার করে। তার গাল বেয়ে একটা বিরক্তির স্রোত দৃষ্টির সাথে মিশে একবার  রুই’য়ের দিকে তাকায় আরেকবার সুমঙ্গলের দিকে তাকায়।
সারারাত জাল টেনেও সকালে তিনশো টাকার মাছ ও বিক্রি করা হয় না। একমাত্র ছেলে সুবিমলকে নিয়ে তিনজনের সংসার। কিন্তু এখন আর চলে না। তারমধ্য বাজারের গোসাঁই ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করার জন্য চাপ দিচ্ছেন। সুমঙ্গল বলেন, “ছেলে স্কুলে গেলে জাল টানবে কেডা”?
গোসাঁই বলেন, ” নদে কী আর মাছ আছে জাল টেনে কী হবে ? বাদ দাও জাল টানা বাজারের আড়ৎ এ বসে মাছের ব্যবসা শুরু করো এখন। মাছ কিনবা বেচবা।  সুমঙ্গল মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে কথা কয় না, তার বাবার কথা মনে পড়ে। কিন্তু এটাও ভাবে যখন জলই নেই তখন জাল দিয়ে আর কী হবে।
সুমঙ্গলের স্ত্রী রানুও বলেন “গোসাঁই ত ঠিহি কইছে মরা গাঙে  জাল টানা বাদ দিয়া বাজারে মাছ বেছলেও ভালা অহন।” কিন্তু জীবন সংসার তো চালাতে হবে রুটি আর চালের শক্তি শরীরে না থাকলে মানুষ বাঁচে না। তাই অবশেষে ” স্ত্রী’র গলার হাড় বিক্রি করে পুঁজি নিয়ে বাজারে মাছ বিক্রি শুরু করেন সুমঙ্গল। সুমঙ্গল মজা পায় পয়সা পায় কাঁচা টাকা হাতে আসে। ছেলেটা স্কুলে যায় ছাত্র ও ভালো। এরমধ্যে ছেলেটা মেট্রিকে ভালো রেজাল্ট ও করেছেন।
ছেলের রেজাল্টে খুশি তার স্ত্রী রানু বাক-বাকুম করে। কিন্তু সুমঙ্গল কথা কয় না। রানু জিজ্ঞেস করে , “তোমার কি মনডা খারাপ, মুকটা গম্ভীর কেন? ” সুমঙ্গল চুপ থাকে তারপর বলে, “একটা কথা কই তোমারে , রাগ করবা না তো! ছেলেডা কী সত্যিই আমার। ” রানু রাগে গোখরার মতো ফণা তোলে বলেন, “এইডা তুমি কী কইলা , এর চেয়ে আমার মরণই ভালা ছিলো। “
“তাইলে এই ছেলে এতো ভালো রেজাল্ট করে ক্যা? বাবুদের ছেলে-মেয়েরা দুধ-কলা মিঠাই মণ্ডা খায়া-আও হের সাথে পারে না ক্যা?  আমি তো জেলে। জেলের ছেলে এতো ভালো রেজাল্ট করবে ক্যা ?”
ইন্টারমিডিয়েটের পর সুমঙ্গলের ছেলে সুবিমল
মেডিক্যাল পরীক্ষায় চান্স পেয়েছে। খবরটা শোনে জেলে পাড়ার সকলেই খুশি। কিন্তু সুমঙ্গল খুশি না। তার মাথায় জাল জল আর মাছ ছাড়া কিছুই কাজ করে না। সে হাঁটতে গেলে রাস্তায় জাল দেখে বৃক্ষের দিকে তাকালে জল দেখে আর মানুষের দিকে তাকালে মানুষের জায়গায় দেখে মাছ।
নিজের একমাত্র ছেলের ডাক্তারি পরীক্ষায় চান্স  হওয়ার কথা শোনে সুমঙ্গলের শরীরের উত্তাপ কারেন্টের মতো। কথা বললেই শর্ট করছে, ছেলে রানু প্রতিবেশী কাউকে পাত্তা দিচ্ছে না সে। শেষে ল রানুকে ডেকে বললো, “সুবিমলকে বলো, বিকেলে আমার সাথে বাজারে যাবে মাছ বেঁচতে যাবে। ডাক্তার! গরীবের স্বপ্ন এতো বড়ো ক্যা !  জেলের ছেলে ডাক্তার অইব ক্যা?
ডাক্তার অইব বাবুদের ছেলেরা।” রানু মুখ গোমড়া করে বলে, “এইডা তুমি কী কও আমার ছেলে মাছ বেঁচতে যাইবো ক্যা ? তুমি আমার ছেলেরে মাছের কাছে  টানবা না! ” সুমঙ্গল বলে, ” ডাক্তারি পড়ানোর মতো আমার কি আছে কও? বাজারে মাছ বেইচ্যা কী আমি ডাক্তারি পড়াইতাম পারব ? 
 
এই বলে ছেলেকে নিয়ে বাজারে চলে যায় সুমঙ্গল। সুমঙ্গল মাছ বিক্রি করে সুবিমল টাকা গুণে নেয়। বাকি টাকা খাতায় লিখে রাখে । বিষয়টি পাড়ার সবাই লক্ষ্য করেন। পরদিন সকালে সুমঙ্গলের বাড়িতে একে একে জেলে পাড়ার সবাই আসতে থাকেন আর বাবুদের পাড়া থেকে আসেন গোসাঁই। 
 
লোকজনের আগমন ও প্রশ্নের তোপে সুমঙ্গল দিশেহারা। নিজের ছেলেকে নিয়ে মাছ বিক্রি করিয়ে সে যেন মহা অন্যায় করে ফেলেছেন। একটা সামাজিক চাপ নেমে আসে বুকের ঠিক মাঝখানে বড় টাওয়ারের মতো ওজন তার। সুমঙ্গলের দম বন্ধ হয়ে আসে।  সে এই চাপ সহ্য করতে পারে না। এক পর্যায়ে সুমঙ্গল ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, “আমার ছেলেরে আমি পড়াইতাম না, তাতে তোমরার কী ? তাতে কার মহাভারত অশুদ্ধ হয়!”
 
গোসাঁই এতোক্ষণ কিছু বলেননি, শুধু শুনেছেন। কিন্তু সুমঙ্গলের  কথা শোনে ; গোসাঁই রেগে গিয়ে বলেন, “ছেলেডা তোমার একার না সুমঙ্গল এই কথাডা জাইনা রাইখো , সুবিমল আমাদের সকলেরই ছেলে তারে আমরা সবাই  মিলেমিশে তারে পড়াইবাম। তাতে তোমার এতো আপত্তি কেন?” গোসাঁইয়ের কথায় , নিজের চেতবার লেজ গুটিয়ে সুমঙ্গল পরাজিত নায়কের মতো বিষন্ন আনমনা হয়ে তাকিয়ে থাকে ব্রম্মপুত্র নদের দিকে। 
 
হাত ভর্তি মাছের গন্ধ কিন্তু এই গন্ধটার সাথে আরেকটা গন্ধ সে গন্ধটা খুব চেনা। সুমঙ্গল মাথা ঘুরিয়ে তাকায় এবং চোখের সামনে নিজের বাবাকে দেখে অবাক হয় সে। ” বাজান তুমি?  কইত্তে আইলা, কেমনে আইলা? তোমারে ত আমি চিতা শালে পুড়াইয়া আইছি।” “নারে বাজান দুনিয়ায় সবকিছু পুড়ানো যায় কিন্তু মামুষের আত্মা পুড়ানো যায় না। মানুষের আত্মা রোদ ঝড় বৃষ্টিতে ভিজে না ; অমর এবং অক্ষয় এক সত্তার নাম হলো আত্মা। নিয়তির বিধানকে কেউ খণ্ডাতে পারে না সুমঙ্গল। তুইও মেনে নে দুঃখ করিস না। যে যাবে তারে তো বেঁধে রাখা যায় না। ” বাজারে মাছ বেঁচা বাদ দে আবার নদীতে আয়। দেহা অইব তোর লগে।”
 
তন্দ্রা ভাঙলে সুমঙ্গল অবিচ্ছিন্ন এক জগত থেকে ফিরে আসে। ভোরের দুয়ার খোলে বের হয় ব্রম্মপুত্রে’র দিকে ব্রম্মপুত্র যেন দুবাহু প্রসারিত করে আজীবন ধরে তাকে ডাকছে। 
 
যদিও সকলের সহযোগিতায় সুবিমল ডাক্তারি পাশ করেন সুমঙ্গল ও তার সাধ্যমতো ছেলের খরচ পাঠায়। সুমঙ্গল মাছ বিক্রি করে টাকা জমিয়ে বাজারে একটা ঘর কিনেছিলেন। ছেলের পড়ালেখার খরচ দিতে গিয়ে সে ঘরটাও সে বিক্রি করে দেন। 
 
ডাক্তারি পাশ করার পর শেষ যখন বাড়ি এসেছিলো সুবিমল তার হিসাব সুমঙ্গলের কাছে নেই। রানুর কাছে তার হিসাব বারো চান্দের  মতো। রানু ছেলের জন্য কাঁদে কিন্তু  সুমঙ্গল ও কাঁদে না। সুমঙ্গল কাছে কান্নার অন্যরকম অর্থ আছে। তার কাছে কান্না মানে জীবন শুকিয়ে যাওয়া, বৃক্ষের মরে যাওয়া। 
গত বছর গোসাঁই বাবু বললেন , সুমঙ্গল একখান মোবাইল পাঠাইছেন। 
 
সুমঙ্গল যাকে বলেন টেন্ডেস্টার। এটা দিয়ে কয়েকজনকে দিয়ে কল করাইছে সুমঙ্গল কিন্তু একটা মেয়ে বলে সংযোগ নাই। সুমঙ্গল মেয়েটির কথা শোনে, জিজ্ঞেস করে “এই মেয়েডা কে ? যে আমার ছেলের সাথে কতা কইতে দেয় না! ফোন করলেই কয় সংযোগ নাই। মেয়েডার কী মা-বাফ নাই! মায়া দয়া নাই ?”
জমিদার আমলের করের মতো চারদিকে বেড়েছে করোনার উপদ্রব। বাজার দোকান মানুষ সহ সবকিছু লকডাউনের কবলে।
বাজারে মানুষ না আসলে মাছ বিক্রি হবে কোথা থেকে। একটু পর পর পুলিশের গাড়ি। মাথায় হ্যালমেট মুখোশ পড়া মিলিটারি বাজারে ঘুরতেছে। বনের পাখির মতো সন্ধ্যা হলেই মানুষ চুপচাপ ঘরে ঢুকে যায়। আর বের হয় না। সময়টা কেমন পরিচিত লাগে সুমঙ্গলের কাছে। কেমন যেন একাত্তর-একাত্তর লাগে।
১০০জন ১জন
0 Shares

৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন



লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য




ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ