একটি লাল পাঞ্জাবি

জিয়া আল-দীন ২৯ জুন ২০২২, বুধবার, ০২:১৫:৩২পূর্বাহ্ন গল্প ১২ মন্তব্য

 

 

তোমার বাবা এলো কলকাতা থেকে।তুমি আমাকে উপহার দিলে কলকাতার বরোলিন,দুলালের তাল মিসরি আর একটি লাল পাঞ্জাবি। তোমার অনুরোধে তখনি পরে দেখাতে হলো পাঞ্জাবি ঠিক ঠাক ফিটিং আছে কিনা। তুমি আশ্বস্ত হলে।

দুলালের তালমিসরি খেতে গিয়ে বোতলের গায়ে লেখা  কবিতার দুটি লাইন দেখে একটু জোরে সোরেই তা পাঠ করলাম– “আসল নকল নিয়ে কেন এত হৈ চৈ কোন দিন ছিল নাতো ছবি আর সই”। দুজনেই শব্দ করে হাসলাম। তাল মিসরি মুখে দিয়ে দাঁতে কড় কড় করে ভেঙে খেতে গিয়েই তুমি বললে, তাল মিসরি চুষে খেতে হয়,চিবিয়ে নয়।

– তা কেমন করে চুষবো?

তুমি আমার ঠোঁটে মুখ লাগিয়ে ক্ষণিক চুষে দিয়ে বললে– এই ভাবে! আমরা আবারো শব্দ করে হাসলাম!

বৈশাখের প্রথম দিন।লাল পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে বাঙালি বাবু হয়ে তোমাকে নিয়ে বের হলাম।তুমিও সাজলে আবহমান কালের বাঙালি নারী সাজে। খোঁপায় কৃষ্ণচুড়া ফুল দেখে মুগ্ধ হলাম।

দু’জন উড়ে বেড়ালাম সারা ঢাকা শহর।ফিরতে সন্ধ্যা হলো।বাসার কাছে আসতেই তোমার মা’য়ের মুখোমুখি হলাম।তিনি আমার গায়ে লাল পাঞ্জাবি দেখে কপালে চোখ তুললেন!তবে মুখে কিছুই বললেন না।

দুই দিন তোমার খবর নাই।খবর নিতে গিয়ে দেখি,তোমাদের বাসা ভরতি মেহমান।তিনদিন পর তোমার ছোট বোনের দেখা পেলাম।তার মুখে শোনলাম – আমাকে পাঞ্জাবি দেওয়ার অপরাধে তোমার মা তোমাকে খুব মারধর করেছে।আমি তখনি পাঞ্জাবিটা ফেরৎ দিতে চাইলাম।তোমার বোন দৌড়ে পালালো।

ভার্সিটি খোলার দিন আমি আগে ভাগেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে তোমার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম।শ্রাবণের আকাশের মতো মুখ অন্ধকার করে তুমি এলে।আমরা রিক্সা নিলাম।তুমি আমার দিকে একবারও তাকালে না।কেমন মুখ ভার করে চুপটি মেরে রইলে।তোমার মৌনতা ভাঙতে কত কথা,কত রকম গল্প বলেও  তোমার কোন সাড়া পেলাম না। একটি নোংরা চুটকীও বললাম- কাজ হলো না– তুমি হাসলে না।

কী হয়েছে তোমার?অত ভাব নিচ্ছো কেন?কোনদিন তো এমন করোনি।আজ কেন এমন করছো?রিক্সায় তুমি সারাক্ষণ ট্যাঁ ট্যাঁ করে এটা কি ওটা কি, এই গল্প সেই গল্প বলে আমাকে জ্বালিয়েছো।না,শোনলে চিমটি কেটেছো।হঠাৎ আজ কি এমন হলো? কেন মোড অফ?কারণটা বলো শুনি।

তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি চোখের জলে ভাসছো!আমার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠলো।তোমাকে জড়িয়ে ধরে হাতটা শক্ত করে ধরে শত চুমু দিয়ে বললাম–কি হয়েছে আমাকে খুলে বলো।যত কঠিনই হোক তা আমি সহজ ভাবে নেবো। তোমার মা মেরেছে?

তুমি কিছুই বললে না। চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়াচ্ছে। চোখে কাজলও নেই,ভেজা চোখ সুন্দরও লাগছে না।শেষমেশ বই খাতার ঝুলি থেকে তোমার দেওয়া উপহার সেই লাল পাঞ্জাবি খানি তোমার কোলে রাখতেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলে।সে কি কান্না!তোমার কান্নার শব্দে রিক্সার গতি শ্লথ হয়ে এলো।রিক্সা চালক পেছনে ফিরে বলে ওঠলো-কি অইছে আফার– আফা কান্দে কেরে?

মামা,তুমি সামনে তাকিয়ে রিক্সা চালাও,এক্সিডেন্ট করবে তো!

১৫৭জন ৩৩জন
0 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ