সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

আমার দারিদ্র জীবন ও অনলাইন জীবনী

নিতাই বাবু ১৫ এপ্রিল ২০১৭, শনিবার, ০১:১১:৩৩অপরাহ্ন বিবিধ ১৬ মন্তব্য

আমার জন্ম ১৯৬৩ সালে, জন্মেছিলাম  নোয়াখালীর বজরা রেলস্টেশনের পশ্চিমে মাহাতাবপুর গ্রামে। ছিলাম চার বোন দুই-ভাইয়ের মধ্যে আমি সবার ছোট। আমার বয়স যখন পাঁচ-বছর, তখন একজন শিক্ষক ও পুরোহিত দ্বারা আমার হাতেখড়ি দেওয়া হয়। সেই হাতেখড়ি অনুষ্ঠানে আমি সহ আমাদের পাশের বাড়ির আরও ৩/৪ জনকে হাতেখড়ি দেয় যার-যার অভিভাবক-রা। হাতেখড়ি দেওয়ার কলম ছিল বাঁশের-ছিঁপ আর খাতা ছিল এক-টুকরা কলা-পাতা। হাতেখড়ি দেওয়ার কয়েকদিন পরই আমাকে স্কুলে ভর্তি করে দেয় আমার বড়-দাদা। স্কুলে যেতাম একটা বাল্যশিক্ষা বই আর শ্লেট-পেনসিল নিয়ে। তখন টাকার খুব দাম ছিল। লোকমুখে আর মায়ের মুখে শুনতাম আমার বাবা  কোনো একসময়  ২০ টাকা বেতনে নারায়ণগঞ্জ শহরে চাকরি করতো। সময়-টা হতে পারে ১৯৬৪/৬৫ সালে।

আমার বাবা আর বড়দা চাকরি করতেন নারায়ণগঞ্জে। বাবা আর বড়দা’র চাকরির সুবাদে মায়ের সাথে মাঝেমাঝে আসা হতো নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানাধীন লক্ষ্মণখোলা সংলগ্ন আদর্শ কটন মিলে। আমাদের বাড়ি-টা ছিল মোটামুটি একটা বড়-বাড়ির মতো। আমার বাপ-কাকা-রা ছিলো তিন-ভাই, আর বাবার জেঠাত ভাই ছিল দুইজন। এক বাড়ি হলেও সংসার ছিল আলাদা-আলাদা ভাবে যার-যার মতো। আমাদের বাড়ির ঘর-গুলো ছিলো মাটি দিয়ে তৈরি, সেই মাটি আনা হয়েছিল চাটগাঁও (চট্টগ্রাম) থেকে গহনা নৌকা করে। সেজন্য আমাদের বাড়ি-টাকে সবাই নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় ‘মাইটগা দেলান-ওয়ালা বাড়ি’ নামেই চিনত-জান-তো। আমার দুই কাকা আমাদের বাড়িতে থাকত না, থাকত যার-যার ভাবে। একজন থাকত চাঁদপুরে, অপর-জন পার্বত্য চট্টগ্রামে। আমি একটু বুঝের হয়ে দেখেছি যে, আমার দুইজন কাকা-ই বাড়ির বাহিরে থাকে। বাড়িতে আসতো কোনো পূজা-পার্বণ উপলক্ষে পরিবার-পরিজন নিয়ে।

আমাদের গ্রামের আমার বয়সী সব ছেলে-দের মধ্যে আমি ছিলাম একটু দুষ্টু টাইপে’র। যে-কোনো খেলা-ধুলায়-ও ছিলাম সবার আগে সবার ওপরে। আমার বয়স যখন ৭/৮ বছর, তখন-ই আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ৭-মার্চ ঢাকার রেড-ক্রস ময়দা-নে দিয়ে দিলেন স্বাধীনতা’র ডাক, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতা’র সংগ্রাম । এরপর ২৫ মার্চ হতে শুরু হয় গণহত্যার মধ্যদিয়ে মুক্তিযুদ্ধ। সে-সময় আমার বাবা আর বড়-দাদা থাকত নারায়ণগঞ্জে, মা’ আর আমার তিন বোন সহ থাকি আমাদের গগ্রামের বাড়িতে। স্বামী সন্তানে’র চিন্তায় মা পাগলের মতো হয়ে ঘুরে বেড়ায় গ্রামের বড়-বাড়িতে রেডিওর খবর শোনার জন্য। তখন আমাদের গ্রামে শুধু বড়-বাড়িতেই একটা ওয়ান বেন্ডর রেডিও ছিল, টেলিভিসন কী জিনিস তা মানুষ বুঝত-ই না। গ্রামের মানুষের মনে তখন শুধু আতঙ্ক আর ভয়, কখন যেন শুরু হয়ে যাবে জ্বালাও পোড়াও। এদিকে পাক-হানাদার বাহিনী সারাদেশ রক্তাক্ত করে ফেলছে, বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর  আসতে লাগল।

এভাবে চলতে-চলতে কেটে গেল প্রায় দুই-মাস, এরপর হঠাৎ একদিন বাবার আগমন। ঠিক সকালবেলা সবার অজান্তে বাবা বাড়িতে এসে হাজির, ক্লান্ত শরীর আর ময়লা জামা-কাপড়ে। বাবা-কে দেখে আমার তিন-বোন আর আমি খুশি-তে দৌড়ে গিয়ে বাবা-কে ঝাপটে ধরলাম। কিন্তু আমার মা’ তেমন খুশি হতে পারে-নি বড়-ছেলে-কে সাথে না-দেখে। আমার মা’ আমার বাবা-কে বলছে, আমার নিমাই কোথায়? মায়ের কথা শুনে বাবা’র কোনো কথা নাই, যেন বোবা হয়ে গেছে। তখন বাড়ি’র সবাই বাবা-কে জিজ্ঞেস করল, নিমাই কোথায়? বাবা শুধু এইটুকুই বলল যে, জানি-না। তবে শুনেছি ও-নাকি স্মরণার্থী হয়ে ভারত চলে গেছে। বাবা’র কথা শুনে তখন বাড়ির সবাই আমার মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, আর কান্নাকাটি না-করতে বারণ করছে। এদিকে বাবা নারায়ণগঞ্জ থেকে এসেছে একেবারে খালি হাতে বহু কষ্ট করে, সাথে দুটি টাকা-ও আনতে পারে নাই। এদিকে যুদ্ধ চলছে সারাদেশে, তুমুলযুদ্ধ।

তখন দেখছি, রাতের-বেলায় আমাদের ‘বজরা রেলস্টেশনের’ দোকান-গুলিতে লাগানো আগুনের লেলিহান শিখা, আর সাদা-কালো ধোঁয়া’র কুণ্ডলী। এসব দৃশ্য দেখে মনে হতো, হানাদার বাহিনী যেন আমাদের গ্রামের আশেপাশে-ই অবস্থান করছে। পাক হানাদার বাহিনী আর রাজাকার-দের ভয়ে এভাবে চলতে থাকল আমাদের জীবন। সময়-টা তখন মে ১৯৭১ সাল। বাবা বেকার, ঘরে ৬ জন খানা-ওয়ালা। তখন কার-ও কাছে কিছুর জন্য গেলে কেউ কিছু দিতে চাইত না, যুদ্ধ জানি কতদিন গড়ায় সেই ভয়ে। উপায়ান্তর না-দেখে আমার মা’ সর্ব-শেষ তার এক-জোড়া কানের-দুল মাত্র ১০০ টাকা বিক্রি করে বাবা-কে মুড়ি’র ব্যবসায় নামিয়ে দেয়। মুড়ি বিক্রি করে-ই পুড়ো যুদ্ধের সময়-টা আমরা দুমুঠো ভাত খেয়ে বাঁচতে পেরেছি।

এর-মধ্য দিয়ে আমাদের বাড়ি’র আশেপাশের গ্রাম থেকে মুক্তি-বাহিনীতে যোগদান করা মানুষ-জন আমাদের বাড়িতে আসতে লাগল আমার জেঠা-মশাই এর সাথে দেখা করার জন্য। আমার জেঠা-মশাই ছিলেন সেই পাকিস্তান  আমলের পুলিশ বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য তাই। মুক্তি-বাহিনীরা আমার জেঠার সাথে শলাপরামর্শ করে আমাদের বাড়ি প্রতিদিন রাতের জন্য মুক্তি-বাহিনীর ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি নেয়। এতে আমরা-ও মহা খুশি আমাদের নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে। আমাদের বাড়িটা ছিল গ্রামে প্রবেশ করার প্রথম বাড়ি আর গ্রাম থেকে বাহির হওয়ার শেয বাড়ি। আমাদের বাড়ি’র পাশেই ছিল রাস্তা, সেই রাস্তা দিয়ে যেতে হয় হাট-বাজারে আর অন্যান্য গ্রামে। বজরা রেলস্টেশন থেকে পাক-বাহিনী আমাদের গ্রামে প্রবেশ করতে হলে-ই আমাদের বাড়ির পাশ-দিয়ে বা আমাদের বাড়ি’র ওপর দিয়ে প্রবেশ করতে হবে বলে-ই আমাদের বাড়ি-টাই ছিল মুক্তি-বাহিনী-দের পছন্দের জায়গা। প্রতিদিন সন্ধ্যা’র পর ৮/৯ জনের একটা গ্রুপ আসত আমাদের বাড়ি।  জেঠা-মহাশয়-কে সাথে নিয়ে বসত আড্ডা। আড্ডায় চলত যুদ্ধ নিয়ে আলাপসালাপ আর অপারেশনে’র পরিকল্পনা।

এভাবে-ই কেটে গেলো দীর্ঘ ৯ মাস। সময় তখন ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল। যেদিন দেশ স্বাধীন হল, ১৬ ডিসেম্বর বিকালবেলা দেখেছি আমাদের বাড়ি’র পাশের রাস্তা দিয়ে মুক্তি-বাহিনীরা রাজাকার-দের পিছনে হাত বেঁধে নিয়ে যেতে, কোথায় নিয়ে যাচ্ছে বা নিয়ে গেলো তা জানি-না, তবে দেখেছি সেদিনের মুক্তিযোদ্ধা-দের আনন্দ আর মানুষের আনন্দ উল্লাস। রাজাকার-দের হাত বেঁধে যখন রাস্তা দিয়ে নিয়ে যায়, তখন রাস্তার সাইটে ফসলি জমিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শতশত নারী-পুরুষ মুক্তিযোদ্ধা-দের স্বাগত জানায়। তখন সবার মুখে ছিল জয়-বাংলা জয়-বাংলা জয়ধ্বনি।

দেশ স্বাধীন হওয়া’র ১৫ দিন পর আমার বাবা বাড়ি থেকে নারায়ণগঞ্জ চলে যায়। আমরা থেকে যাই গ্রামের বাড়িতেই মা সহ চার ভাই-বোন। তখনো আমার বড়-দাদা’র কোনো খবর হয়-নি, সে কোথায় আছে কেমন আছে তাও কেউ জানেনা।  বাবা নারায়ণগঞ্জ আসার ১০/১২ দিন পর বড়-দাদা ভারত থেকে বাড়িতে না-গিয়ে সোজাসুজি নারায়ণগঞ্জ চলে আসে, যেখানে দাদা চাকরি করত সেখানে। বাবা আর দাদা যুদ্ধ চলাকালীন ৯ মাসের বেতন পেলেন। সে-খবর বাবা আমার মাকে চিঠি দিয়ে জানালেন, চিঠি পেয়ে আমার মা’ বেজায় খুশি। কিছুদিন পরে আমাদের গ্রামের স্কুল-টি খুললে আবার স্কুলে যেতে শুরু করি একটু বিদ্বান  হওয়ার আশায়। সেই আশা আর আমার পূরণ হলো-না, দেশ স্বাধীনের কিছুদিন পর শুরু হয়ে গেল ডাকাতের অত্যাচার। গ্রামের সবগুলো বাড়ি হতে আমাদের বাড়িতেই বেশি হানা দিতে লাগল ডাকাত-রা। কারণ ছিল একটাই, যুদ্ধের সময় মুক্তি-বাহিনী-দের জায়গা দেওয়ার অপরাধ।

ডাকাতি হওয়ার খবর পেয়ে বাবা বাড়িতে এসে আমার দুই জেঠার সাথে আলাপ-সালাপ করে বাড়ি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। বাড়ি বিক্রি করার বিষয়টি পাকা-পাকি করে নারারায়ণগঞ্জ যাওয়ার সময় আমার তিন-বোন-কে বাবার সাথে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে যায়। উদ্দেশ্য ছিল একটাই, ডাকাতের হানা থেকে ইজ্জত রক্ষা করা। তার কিছুদিন পর বাবা আবার দেশে আসলেন। বাড়ি বিক্রির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন । বাবা বাড়ি বিক্রি করে দিলেন স্থানীয় একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর কাছে। কত-টাকায় বাড়ি বিক্রি করেছেন তা-আমার জানা নাই। আমাদের সাথে তাল-মিলিয়ে আমার দুই জেঠা-মশাই-ও বাড়ি বিক্রি করে দিলেন সে ব্যবসায়ীর কাছে। আমার বাবা আর বড়-দাদা যখন নারায়ণগঞ্জ থাকত, তখন আমাদের বাড়ি পাহারা দেবার জন্য আমার মা’ এক জেলে পরিবার-কে আমাদের বাড়িতে আশ্রয় দেয়। ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে আমরা যখন সপরিবারে  নারায়ণগঞ্জ আসি, তখন আমাদের ঘরের সব জিনিসপত্র ওই জেলে পরিবার-কে দিয়ে আসি।

১৯৭৩ সাল, আসলাম নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানাধীন লক্ষণখোলা আদর্শ কটন মিলে, বড়-দাদা যেখানে চাকরি করতেন সেখানে। থাকতাম মিলের শ্রমিক কোয়ার্টারে। আমার লেখাপড়া আপাতত বন্ধ, বছরের মাঝামাঝি সময় তাই। বড়-দাদা বললেন সামনের জানুয়ারি মাসে আমাকে স্কুলে ভর্তি করে দিবেন, কিন্তু না, তাও হয়-নি অভাব-অনটনের কারণে। এর-মধ্যে আমার এক বোনের বিবাহের দিন-তারিখ ঠিক হয়ে গেল। (এর বহু আগে আমার বয়স যখন দেড় বছর, তখন দেশে থাকতেই সবার বড়বোনের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। বিয়ের পর বোনের জামাই দিদিকে নিয়ে ভারত চলে যায়, থাকে পশ্চিমবঙ্গ জলপাইগুড়িতে।) আমার যে-কী আনন্দ লাগছে! দিদির বিয়ে কী আনন্দ। তখনো আমাদের কাছে তেমন কোনো টাকা-পয়সা নাই। দিদি-কে বিয়ে দিয়েছি মিলের শ্রমিক-দের কাছ থেকে সাহায্য তুলে। বোনের বিয়ের কিছুদিন পর হঠাৎ একদিক দুপুর-বেলায় বাবা এক্সিডেন্ট করে বসে। কাজে থাকা অবস্থায় মিলের ক্যালেন্ডারে বাবার একহাত থেঁতলে যায়। সেই এক্সিডেন্টের পর বাবা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন আমার লেখা-পড়া অনিশ্চয়তা হয়ে পড়ে। কিন্তু লেখা-পড়া করার অনেক ইচ্ছা ছিল আমার। কিন্তু কী-করে লেখা-পড়া করবো? লেখা-পড়া করতে হলে-তো অনেক টাকার প্রয়োজন, তা পাবো কোথায়? টাকা যে-নাই, তাও বুঝতাম। তবু প্রতিদিন মা-কে জালাতন করতাম আমাকে স্কুলে ভর্তি করানো’র জন্য। সেই অভাবের মাঝে মায়ের কান্না দেখে আমার বড়-দাদা আমাকে লক্ষণখোলা দক্ষিণ ফ্রি প্রাইমারী স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি  করে দেয়।

স্কুলে আসাযাওয়া শুরু করে দিলাম, পুরাতন একসেট বই কিনে। কিন্তু খাতা-কলমের খুবই অভাব ছিল। স্কুলে হাতের লেখা দেওয়ার জন্য বাংলা, ইংরেজি আর অংক খাতা রাখতাম। বাসায় লেখার জন্য শ্লেট-পেনসিল ব্যবহার করতাম, স্কুলেও শ্লেট-পেনসিল সাথে করে নিয়ে যেতাম। স্কুলে যেতাম ছেঁড়া জামা-কাপড় পড়ে, ভালো আর সুন্দর জামা পাবো কোথায়? সুন্দর জামা-কাপড়-তো দূরের কথা, স্কুল থেকে এসে কোনো-কোনো সময় না-খেয়ে-ও থাকতে হয়েছে রাত অবধি। এভাবে চলতে খুব কষ্ট হচ্ছে তাই মায়ের কাছে একদিক কিছু টাকা চাইলাম, নারায়ণগঞ্জ থেকে কিছু বাদাম এনে মিলের গেইটের সামনে বসে বিক্রি করার জন্য। আমার কথা শুনে আমার মা’ বহু কষ্ট করে পাশের বাসার এক গৃহিণীর কাছ থেকে ২০ টাকা হাওলাৎ করে আমাকে দিলেন বাদাম আনার জন্য। আমি ২০ টাকা নিয়ে লক্ষণখোলা থেকে হেঁটে নারায়ণগঞ্জ গিয়ে পাইকারি দরে ১৮ টাকা দিয়ে তিন-সের বাদাম কিনে আনলাম। মা সেই বাদাম ভেঁজে দেয়, আমি বাদাম নিয়ে বিকালবেলা আদর্শ মিলের গেইটের সামনে বসে বিক্রি করতাম। দুই-সের বাদাম বিক্রি হতো ৩০ টাকা, লাভ হতো ১০ টাকার মতো। এভাবে স্কুলের আসা-যাওয়ার ফাঁকে-ফাঁকে বাদাম বিক্রি করতে-করতে ২০ টাকার চালান ১০০ টাকা করে ফেললাম, কিছু-দিনের মধ্যে। এখন আর আমার খাতা-কলমের অভাব নাই, স্কুলে যাওয়ার সময়ও ১০/১৫ পয়সা করে নিতাম। এইভাবে চলছে আমার লেখাপড়া বাদাম বিক্রির সাথে-সাথে তালমিলিয়ে, চলল দুবছরের মতো।

এভাবে চলতে-চলতে একসময় আদর্শ কটন মিলস্ একদিন ব্বন্ধ হয়ে যায়। মিলের সব শ্রমিক-দের ছাটাই করে দেওয়ার ঘোষণা দেয় মিল কর্তৃপক্ষ। মিলটি ছিল বাংলাদেশ সরকারের  ‘বিটিএমসি’র অধীনে। মিল বন্ধ ঘোষণার পর-পর মিলের ভেতরে থাকা অনেক শ্রমিক নিজেদের হিসাব বুঝে নিয়ে মিলের বাসা ছেড়ে চলে যায়, থেকে যাই আমরা সহ কিছু ফ্যামিলি। তখনো আমার বাবা অসুস্থ হয়ে ঘরে পাড়ে আছে। বাবা যেই মিলে চাকরি করতেন, সেই মিল থেকে সামান্য পরিমান কিছু টাকা বাবা পায়। সেই টাকা দিয়ে বাবার জীবনের শেষ-সময় পর্যন্ত শুধু চিকিৎসা বাবদ খরচ হয়ে যায় । আমি তখন সংসারের অভাবের কারণে লেখাপড়া বন্ধ করে মিলে থাকা সমবয়সী ছেলে-দের সেথে বিভিন্নরকম কাজ করতে থাকি। দৈনিক মুজুরি মাত্র ৮ টাকা, কাজ করলে টাকা পাই, না-করলে আর পাইনা। তখন আমাদের সংসারে মা’ দুই-বোন, বৌদি-দাদা আমি সহ ৬ জন খানা-ওয়ালার দায়িত্ব বড়-দাদার উপর বর্তায়। আমি সপ্তাহে ৩০ টাকা করে মায়ের কাছে দিতাম কিছু বাজার-সদাই করার জন্য। এর-মধ্যদিয়ে আমার মেঝো দিদির বিবাহের কথাবার্তা শুরু হয়। বাবা অসুস্থ, দাদার কাজ নাই। তখন বোনের বিবাহের কথা শুনে মিলের সবাই আমার মেঝো-দিদির বিবাহের দিন-তারিখ ঠিক করে ফেলে। অতঃপর মিলের সবার সহযোগিতায় মেঝো-দিদির বিবাহ সম্পূর্ণ  হয়। এরপর দেখা দেয় ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ। সেই দুর্ভিক্ষ-পীড়িত সময়ে আটার-যাউ আর আলু-ভাত খেয়ে বছর পার করতে-করতে চলে এলো ১৯৭৫ সাল।

‘বলছি’ ১৫ আগস্টের কথা। ওই-সময় মনে হয়েছিল আবার বোধহয় স্বাধীন দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে যে-কোনো সময়। কিন্তু না, হয়নি। নিজের দুঃখ নিজের মনে চেপে ধরে অল্পকিছু-দিনের মধ্যে বাঙ্গালি-জাতি জাতির-জনক বঙ্গবন্ধু-কে হারানো ব্যথা ভুলে একটু সেরে ওঠতে পেরেছিল। দেখেছি তখন মানুষের মনের অবস্থা, স্বজন-হারা বেদনা যেমন, বঙ্গবন্ধুকে হারানো ব্যথাও ছিল সবার কাছে তেমন। সেসময় আমার মা-বাবাকেও হায়-হায় করতে দেখছি। তখন সর্বত্র ছিল ভয় আর আতঙ্ক, এই ভয় আর আতঙ্কের মধ্যে কেটে যেত দিন-রাত। এর কিছুদিন পর দেখা দিল আমাদের জীবনে আরেক-টা দুর্ভিক্ষ, মিলস্ থেকে বাসা ছাড়ার নির্দেশ এলো প্রতি-টি ঘরে-ঘরে। তবু আমারা মিলের বাসা ছাড়তে নারাজ। কোথায় যাবো? কোথাও যাওয়ার পথ নাই। থেকে যাই মিলের ভেতরেই।

এদিকে মিলের ভেতরে একটা মসজিদ নির্মাণের কাজ আরম্ভ হয়ে যায়। মসজিদ তৈরির ঠিকাদার হলো চট্টগ্রাম শহরের একজন হিন্দু লোক। কনেক্ট্রাকশন  কাজের লোকের প্রয়োজন। রাজ-মিস্ত্রির রোজ ২৫/৩০ টাকা, আর যোগালি’র রোজ ১০ টাকা। আমি এবার সাহস করে ওই মসজিদ নির্মাণের যোগালি কাজে লেগে যাই। ২/৩ দিন কাজ করার পর আমার মা’ জানতে পাড়ে আমি মসজিদে যোগালি কাজ করছি। দুইতিন-মাস কাজ করার পর ওই কনট্রাকটর আমাদের চট্টগ্রাম গিয়ে কাজ কতে বলেন, রোজ পাবো ১২ টাকা, থাকা-খাওয়ার সুন্দর ব্যবস্থা আছে, বললেন সেই কনট্রাকটার। আমরা ৩ জন রাজি হয়ে যাই। কথাবার্তা সব ঠিকঠাক, আগামীকাল সকালে ওই কনট্রাকটারের সাথে যেতে হবে। বাসায় এসে আমার মাকে বিষয়টি জানালাম, মা’ প্রথমে এতে রাজি ছিলনা। পরে আমার অনুরোধে রাজি হয়েছে। মা-কে রাজি করে আমরা ৩ জন মসজিদের কনট্রাকটারের সাথে চলে গেলাম চট্টগ্রাম শহরে।

সেখানে দুইদিন কাজ করার পর আমাদের নিয়ে যায় কক্সবাজার মহেশখালী। আমাদের মহেশখালী নিয়ে কাজে লাগিয়ে থাকা-খাওয়ার জায়গা ব্যবস্থা করে দিয়ে কনট্রাকটার চট্টগ্রাম চলে যায়। আমাদের কাজটা ছিল মহেশখালীর একটা রাস্তা তৈরির কাজ। তখন মহেশখালীতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হতো, বৃষ্টির কারণে কাজ করা যেত-না। পড়লাম মহা-মুশকিলে, যার কাছ থেকে খাওয়ার টাকা নিবো সেই লোকের সাথেও দেখা মেলেনা। তখন বাধ্যতামূলক আমরা একটা লবণের মিলে গিয়ে কাজ নেই, মিলের নাম ছিল মেসার্স জাকিরা সল্ট”, বেতন দৈনিক ২৫ টাকা হাজিরা। সেখানে কাজ করেছিলাম প্রায় দেড়-বছর। মাঝখানে আমাকে একা ফেলে আমার সাথের দুইজন চলে আসে, এতিমের মতো আমি-ই থেকে যাই মহেশখালীতে। হঠাৎ একসময় বাজারে  লবণের দাম কমে যায়। মিল বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিল।

এখন যাবো কোথায়? মিলে কাজ নেই, পকেটে টকা নেই। মায়ের কাছে একটা চিঠি লিখে পাঠালাম। ‘মা’ আমার কাজ নেই, চলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। চিঠি হাতে পাবার পর মায়ের কান্না-কাটিতে বড়-দাদা একদিন রওয়ানা দিলেন মহেশখালীর উদ্দেশে আমাকে ফেরৎ আনতে। বড়-দাদা যেদিন মহেশখালীতে যায়, যেদিন আমার বড়-দাদা মহেশখালীতে পা-রাখলেন, সেদিন সকালবেলা মিলে থাকা আমারা কয়েক-জন মহেশখালী থেকে চট্টগ্রামে চলে আসি। দাদা আমাকে না-পেয়ে সেখানে একদিক থেকে আমাকে কোথায় পাওয়া যাবে সেই ঠিকানা সংগ্রহ করে পরদিন আবার চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওয়ানা হয়।

মহেশখালী থেকে আমরা ৩ জন একসাথে কালুরঘাটে এসে আশ্রয় নিলাম সাথের দুইজনের পরিচিত এক-লোকের বাসায়। সেখানে ওইদিন অতি কষ্টে রাত-যাপন করে পরদিন সকালবেলা তিনজন মিলে কাজের সন্ধানে বাহির হলাম। গেলাম পোর্টে। সেখানে সাথের দুইজনের পূর্বপরিচিত অনেক লোক কাজ করে। ওরাও আগে এখানেই কাজ করতো, এখান থেকে বেশি রোজগারের আশায় পাড়ি জমায় মহেশখালীতে। এখন আবার ফিরে এলো এখানেই, সাথে আছি আমি। ঘোরাফেরা করতে করতে দুপুরবেলা আমার বড়-দাদা কালুরঘাট এসে আমাদের খুঁজতে লাগল। বহু খোঁজাখুঁজি করে বড়-দাদা আমাদের খোঁজ পায়। আমি আমার বড়-দাদাকে দেখে শুধু কাঁদছিলাম। আমার কান্না দেখে দাদাও চোখের জল আর ধরে রাখতে পারলেন-না। সাথে থাকা দুইজনের চোখও টলমল করছে আমি ঢাকা চলে যাবো তাই। তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সেদিন সন্ধ্যাবেলা চট্টগ্রাম থেকে দাদা আমাকে ২২ টাকা দিয়ে ট্রেনের একটা টিকেট কিনে দিয়ে ট্রেনে উঠায়ে দেয়, আমি ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হই, দাদা চলে যায় পার্বত্যচট্টগ্রাম আমার ছোট-কাকার বাড়ি।

সারারাত ট্রেনে থেকে পরদিন সকালবেলা ঢাকা এসে পৌঁছলাম, বাসায় আসতে-আসতে বেজেছে সকাল ১০টা। মা’ আমাকে দেখামাত্র দৌড়ে আসে আমাকে জরিয়ে ধরে কাঁদছিলেন, সাথে আমার দুই-বোনও। বাবা ঘরে অসুস্থ অবস্থায় পড়ে আছে, আমি গিয়ে বাবা-কে নমস্কার করি, বাবা আমাকে কাছে পেয়ে মনে হচ্ছিল একটু শান্তি পেলেন। এবার সংসারে যোগান দেয়ার পালা। লেখাপড়া আর হলো না, এখন কাজ করার সময় তা নিজেই বুঝতে পেরেছি। আমার বয়স তখন আনুমানিক ১৬/১৭ হবে। আমি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসার বছর-খানেক পর-ই  বাবা পরলোকগমন করেন। অভাবের উপর অভাব, অভাব যেন পিছুপিছু। ছাড়ছেনা কিছুতে। বাবার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পূর্ণ হয় বন্দর থানাধীন ১ নং ঢাকেশ্বরী কটন মিলের শ্মশানঘাটে। তখন আমাদের সংসারটা চলছিল না-খেয়ে না-দেয়ে। এদিকে মিলেও আর থাকা যাচ্ছি-লোনা, মিলের বাসা ছাড়তেই হবে।

বাধ্যতামূলক আদর্শ কটন মিলস্ থেকে বাসা ছেড়ে দিয়ে আসলাম নগর খাঁনপুর। দাদা পাগলের মতো হয়ে এক-প্রকার নিরুদ্দেশ, দাদার খবর নাই। সংসারে আমি-ই একমাত্র রোজগার করার মতো। উপায়ন্তর না-দেখে নগর খাঁনপুরের স্থানীয় কয়েক-জনের সহযোগিতায় রিকশা চালনা শিখলাম। সে-সময় রিকশা চালিয়ে মা’ বৌদি,ভাতিজা-ভাতিজি আর এক বোন সহ সংসারের ৪/৫ জনের ভরণপোষণ আমি-ই রিকশা চালিয়ে যোগাড় করতাম। মাঝেমাঝে চানাচুর বিক্রিও করতাম কমলাপুর রেলস্টেশনে। সারারাত কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সকালবেলা আসতাম বাসায়। থাকতাম, নগর খাঁনপুর শ্যামসুন্দর শাহার বাড়ি। (এরমধ্যে দাদাও এসে পড়ল নগর খাঁনপুরে। দাদা কিল্লার পুল সংলগ্ন ফাইন টেক্সটাইল মিলে কাজ নিয়ে কাজ করা শুরু করে। আমি প্রতিদিন রাতা দাদার সাথে তাঁতের কাজ শিখতে যেতাম। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁতের কাজ আমার আয়ত্তে এসে পড়ে। তখন রিকশা চালানো ছেড়ে মিলে তাঁতের কাজ করা আরম্ভ করি।) সেখানে-ই ঘটে গেল আমার জীবনের ভালো-লাগার একটা পর্ব।

শ্যামসুন্দর মহাশয়ের বাসায়-ই থাকতো এক মেয়ে, ও-ই আমার জীবনের প্রথম ভালো-লাগার ভালোবাসা। (তখন সবেমাত্র  টেক্সটাইল মিলে কাজ শিখে আমি কাজ করা শুরু করেছিলাম, কিল্লারপুল ফাইন টেক্সটাইল মিলে। সার্ভিস হয়েছে মাত্র ১৮/১৯ মাস। আমার সাথে একজন হেলপার ছিল, নাম ছিল কানাই লাল শাহা। একসময় ফাইন টেক্সটাইল মিলের কাজটা কানাইকে বুজিয়ে দিয়ে আমি ফতুল্লা কাঠেরপুল ওয়েল টেক্সটাইল মিলে চলে যাই।) সেই ভালো-লাগার দায় দিতে গিয়ে শেষ-পর্যন্ত ওকে নিজ হাতে অন্যজনের হাতে তুলে দিতে হয়েছিল। এর কিছুদিন পরে অবিবাহিত থাকা আমার  এক বোনের বিবাহ দিয়েছি এই নগর খাঁনপুরে-ই। তাও নগর খাঁনপুর গ্রামবাসীর সহযোগীতায় বিবাহ সম্পূর্ণ হয়।

এরপর ১৯৮৪ সালে ফাইন টেক্সটাইল মিলের একজন শ্রমিকের বাড়িতে গিয়ে আরেক মেয়ের প্রেমে পড়ে ১৯৮৬ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হই। সেই শ্রমিকের বাড়ি চিল বিক্রমপুর তাল-তলা সুবচনী-তে। ১৯৮৯ সালে একটি মেয়ে সন্তানের জনক হই। ১৯৯০ সালে আমার মা’ পরলোকগমন করেন।  ১৯৯১ সালে পুত্র-সন্তানের জনক, এক মেয়ে আর এক ছেলে নিয়ে ভালোভাবেই দিন যাচ্ছিল। ২০০৭ সালে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি সে গোপালগঞ্জ।  ২০১১ সালে আমার ছেলে-টা আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সেও পরলোকগমন করে। মৃত্যু-কালে ছেলের বয়স হয়েছিল ১৮/১৯ বছর। আমার ছেলে-টা ছিল একগুঁয়ে, যা বলতো তাই করতো। যা চাইতো তাই তাকে দিতে হতো। মৃত্যুর ৪/৫ মাস আগে ওর মায়ের কাছ থেকে ১০০০ হাজার টাকা নিয়ে ঢাকা বসুন্ধরা সিটিতে গিয়ে তখনকার নোকিয়া c3 একটা মোবাইল ফোন কিনে নিয়ে আসে। ছেলের সেই রেখে যাওয়া নোকিয়া c3 মোবাইল দিয়েই আমার এই তথ্যপ্রযুক্তির অনলাইনে প্রবেশ।

প্রথমে ফেসবুক, পরে গুগল প্লাস, টুইটার ও ইউটিউব। একসময় al bangla newspaper নামে একটা মোবাইল এপ্লিকেশন ডাউনলোড করে বিডিনিউজের খবর পড়তাম। অনলাইনে বহু সাইটে ঘুরতে-ঘুরতে ২০১৫ সালের বিডিনিউজ২৪ ডটমক ব্লগে প্রবেশ করি। ব্লগের লেখাগুলো ছিল আমার কাছে খুবই প্রিয়। লেখা পড়ে আমি কেবল ভাবতাম, আমি যদি লিখতে পারতাম! এসব ভাবতে-ভাবতে একদিন আমি ব্লগ ডট বিডিনিউজ২৪ ডটকমে নিবন্ধন করে ফেলি ৩ মার্চ ২০১৫ ইং তারিখে। কিন্তু হায়! প্রোফাইলে ছবি দিতে পারছিলাম-না, আর নোকিয়া c3 মোবাইল দিয়ে বাংলা লিখতেও পারছি-না। মনের আকাঙ্ক্ষা থেকেই যাচ্ছে, এখন আমার কিচ্ছুই ভালো লাগছে-না। তবু পথ আমি ছাড়ছি-না, আমি ব্লগে লিখবো-ই। ব্লগে আমার প্রথম লেখাটা লিখেছিলাম ইংরেজিতে, শিরোনামটা দিয়েছিলাম ‘আমিও মানুষ’ তা ইংরেজিতে-ই দিয়েছিলাম। অনেকদিন পর দেখি ব্লগ সংকলক পোস্টের শিরোনাম বাংলায় লেখার জন্য বলছে। বাংলায় লিখতে পাড়লেই আমার লেখাটা প্রকাশ পেয়ে যায়। কিন্তু তা কী করে সম্ভব! নোকিয়া মোবাইল দিয়ে-তো বাংলা লিখাই যায়না। একদিন এক বন্ধুর সিম্পনি ৮৫ একটা মোবাইলে বিডিনিউজ ব্লগে লগইন করে শিরোনাম-টা বাংলায় লিখে দেই। পোস্টের লেখা বাংলায় লিখেছিলাম কি-না তা আমার মনে পড়ছে-না। সেই লেখা প্রকাশ হওয়ার বহুদিন আর ব্লগে লগইন করিনি সময় আর মোবাইলের কারণে। প্রায় ৭/৮ মাস পর আমি নতুন একটা সিম্পনি এন্ড্রয়েড মোবাইল কিনে ব্লগে লগইন করে দেখি আমার সেই লেখায় চার-পাঁচটি মন্তব্য জমা হয়ে আছে। লেখার শিরোনাম আর পোস্টের লেখাও বাংলায়। আমার লেখায় মন্তব্য দানকারী লেখক-দের মন্তব্যের প্রত্যুত্তর দিতে গিয়েই আমার বিডিনিউজ২৪ ডটকমে লেখা শুরু হয়।

লিখতাম নারায়ণগঞ্জ শহরের নাগরিক সমস্যা নিয়ে। লিখতাম নগরের যানজট নিয়ে। লিখতাম পূজা-পার্বণ, এলাকার ওয়াজ মাহফিল ও সদ ধর্মের উৎসবের বিবরণ, জানিয়ে দিতাম এলাকার সংবাদ। লিখতাম শীতলক্ষ্ম্যা নদীর বিষাক্ত কেমিক্যালের নির্গত পানি নিয়ে। আবেদন জানাতাম শীতলক্ষ্ম্যাকে বাঁচানোর, শীতলক্ষ্ম্যা বাঁচলে আমরা বাঁচবো এসব নিয়ে। সেসব লেখাগুলো কোনো একসময় ব্লগ ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এরমধ্যে ঘনিয়ে এলো ব্লগ ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ষষ্ঠ প্রতিষ্ঠা-বার্ষিকী। প্রকাশ করবে ব্লগ লেখক-দের লেখা নিয়ে ‘নগর নাব্য-মেয়র সমীপেষু ২০১৭’। লেখার প্রস্তাবনা নেয়া শুরু হলো তিনমাস আগে থেকে। সবাই যার-যার লেখার শিরোনাম আর লেখার লিং প্রস্তাবনায় জমা করতে লাগল, আমি আমার একটা লেখাও প্রস্তাবনায় জমা দেই নাই, আমি দিয়েছি সহ-লেখকদের লেখার প্রস্তাবনা। আমার লেখার প্রস্তাবনা দিয়েছে আমাকে যারা ভালোবাসে তারা। এরপর ১৬ ফেব্রুয়ারি ধানমণ্ডির ড্যাফিডেল টাওয়ারে এক জাঁকজমক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের বিডিনিউজ ব্লগের লেখকদের লেখার ‘নগর নাব্য-মেয়র সমীপেষু ২০১৭ বই-খানার মোড়ক উন্মোচন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি মেয়র জনাব সাঈদ খোকন সাহেব। উপস্থিত ছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য-কমিশনার সাহেব সহ আরো সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ। সেই অনুষ্ঠানে সেরা লেখকের সম্মাননা দেওয়া হয় আমাকে। আমি কৃতজ্ঞ ব্লগ ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে। আমি কৃতজ্ঞ সবার কাছে, সবার অনুপ্রেরণা আর ভালোবাসায়-ই আমি লিখতে পেরেছি আমার নারায়ণগঞ্জ শহরবাসীর সমস্যা, তুলে ধরতে পেরেছি নগরে নানাবিধ সমস্যার চিত্র। আরো যাতে লিখতে পারি নাগরিক সমস্যা নিয়ে সেই আশীর্বাদ কামনা করি সাবার কাছে। লেখার আরো অনেক ছিল, লিখলামনা পোস্টের লেখা অনেক বড় হয়ে গেছে তাই। আমি আমার জীবন নিয়ে এই সোনেলায় লিখলাম এই কারণে যে, আর যদি কখনো সোনেলায় না-লিখতে পারি! সেইজন্য লিখে জানালাম আমার জীবন চলার কাহিনী, যাতে সবাই এই দরিদ্র মানুষটিকে জানে। সবার সুস্বাস্থ্য কমনা করে এখানেই শেষ করি আমার দারিদ্র্যতা নিয়ে জীবন চলার মাঝে অনলাইন জীবন-কাহিনী।

 

৪০৪জন ৪০০জন
0 Shares

১৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য