বদি

যুদ্ধের ভয়াবহতা সর্বোত্র শুরু হয়ে গেল।যুদ্ধে গেরিলা বাহিনী নাপাকিদের ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ এর বিভিন্ন স্থাপনায় অতর্কিত আক্রমন করে নাপাকি সামরিক জান্তাকে ব্যাতি ব্যাস্ত করে তুলেন।বিদ্যুত কেন্দ্র,রেডিও টেলিভিশন অফিস,বড় বড় হোটেল,রেল ষ্ট্যাসন,বিপণী কেন্দ্র ইত্যাদি স্থাপনাতে গেরিলারা একের পর এক হামলা করতে থাকে তারই ধারাবাহিকতায় সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুত কেন্দ্রেও গেরিলা হামলার প্লান করেন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা।
নিউজ নারায়ণগঞ্জ বরাতে জানা যায় কমান্ডার ইসমাইল হোসেন নেতৃত্বে আরো যারা ছিলেন সামছুল হক ও তার ভাই নূর মোহাম্মদ এস এ হামিদ।টারবাইন ফিটারম্যান হিসাবে সামছুল হক সেখানে কর্মরত ছিলেন।তার ভাই নূর মোহাম্মদ ছিলেন সেখানকার গাড়ী ড্রাইভার।সুইচ এটেন্ডেটে কর্মরত ছিলেন এস এ হামিদ।কর্মরত অবস্থায় তারা গেরিলা অপারেসনের প্লান করেন।নাপাকিদের চোখ ফাকি দিয়ে সামছুল হক ও নূর মোহাম্মদ বোমা তৈরীর সকল সরঞ্জাম বিভিন্ন কৌশলে পাওয়ার হাউসের ভিতরে প্রবেশ করান।এ সব কৌশল ও বোমা তৈরীর সরঞ্জামাদী প্রবেশ করানো হয় কমান্ডার ইসমাইল ও আলী হোসেনের পরামর্শে।
ঐ সব সংগ্রীহিত সরঞ্জামাদী দিয়ে তৈরী করা হয় শক্তি শালী তিনটি বোমা।অতপর সেখানকার কর্মরত সকল বাঙ্গালীদের সতর্কে থাকার পরামর্শ দেন।অবশেষে কাঙ্খিত ৩ নভেম্বর পাওয়ার হাউসের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের বয়লারে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।এতে চারটি বয়লার ও জেনারেটর ধ্বংস হয়ে যায় তাতে তখনকার সিদ্ধিরগঞ্জ ৩০ মেঘাওয়াট বিদ্যুত কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়।ফলে ঢাকা ক্যান্টনম্যান্ট,টঙ্গী,এবং নারায়ণগঞ্জ এলাকায় বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।দেশ স্বাধীনের পর বীর মুক্তিযোদ্ধা সামছুল হককে বীরপ্রতীক উপাদি দেয়া হয়।
ক্র্যাক প্লাটুনের গর্বিত সদস্যদেরও ছিলো গেরিলা অপারেসনে কমান্ডার আলতাফের নির্দেশে,কামালের নেতৃত্বে সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে উড়িয়ে দেবার একটি লোমহর্ষকর প্লান করেন।দিনটি ছিলো মেঘাছন্ন আকাশের ১৯আগষ্ট ১৯৭১ সাল।গেরিলারা সন্ধ্যার পর বাড্ডার ঐপারে পিরুলিয়া গ্রামের হাইড আউট থেকে দুটো নৌকা করে রওয়ানা হলেন।প্রথম নৌকায় ছিলেন কাজী,বদি,জুয়েল আরো দু’জন,অন্য নৌকায় ছিলেন রুমি,ইব্রাহিম,জিয়া,এবং আজাদ।প্রথম অপারেশনে আসা নিয়ে আজাদ ছিলেন বেশ উত্তেজিত পাশাপাশি কিছুটা নার্ভাসও ছিলেন কারন এটাই ছিলো তার প্রথম অপারেসনস।কাজীদের নৌকা কিছু একটা চেক করতে রুমীদের নৌকা ছেড়ে দিয়ে হঠাৎ কিছুটা এগিয়ে গেল।তখন অন্ধকার আর মেঘাছন্ন রাত হওয়ায়,রুমীরা দূর থেকে কাজীদের নৌকা দেখতে পাচ্ছিলেন না।হঠাৎ রুমিরা ভয়ানক গুলির শব্দ শুনতে পেলন কিন্তু ওরা কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলো না,কি ঘটল!।কিছুক্ষণ পর গুলির শব্দ থেমে গেলে ওরা রুমিদের দৃষ্টির সীমানায় পড়ল।এরপর জানতে পারলো সেই সময়ের ভয়ংকর ঘটনা।
জুয়েল এবং কাজী তাদের স্টেনগান নৌকার পাটাতনে লুকিয়ে রেখেছিলেন,কিন্তু কাজীর নিষেধ সত্ত্বের বদি কোলের উপরেই স্টেনগানটি রেখেছিলেন তার আঙ্গুল ছিলো টিগারের উপর।কাজীরা যখন হঠাৎ একটি মিলিটারি ভর্তি নৌকার সামনে পড়ল,তখন রাজাকার বাঙ্গালী মাঝি জানতে চায় –“কে যায়”?অন্ধকারে মিলিটারি গুলো এক দম চুপ মেরে ছিলো।তার প্রশ্নের উত্তরে কাজী ঘুরিয়ে জবাব দেয় “সামনে যাচ্ছি”।যখন নৌকাটা একেবারে কাছে এলো তখন রুমিদের চোখে পড়ে নৌকা ভর্তি মিলিটারি। ভাগ্য ভাল যে বদি তার স্টেনগান হাতে প্রস্তুতি নিয়েই রেখেছিল।যখনি বদি মিলিটারি বুঝতে পারল তখনি কেউ কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই সে ফায়ার শুরু করে দিল, বদির হঠাৎ ব্রাসফায়ারের মুখে টিকতে পারেনি নাপাকিরা,নাপাকিরা ফের গুলি চালালে সেই গুলির একটা এসে লাগে জুয়েলের আঙুলে,তার তিনটি আঙুল ভয়ংকর রকম
জখম হয়।সে সময় মিলিটারিদের বেশ কয়েকটা মারা পড়ে,বাকিগুলো পানিতে ঝাপিয়ে পড়ে সাঁতরে প্রাণ নিয়ে পালায় ।জুয়েলের মারাত্মক জখম হওয়ায় ওরা সেখান থেকেই পিরুলিয়ার হাইড হাউসে ফিরে আসে আর ওখানেই তারা রাত কাটায়।এর পর জুয়েলকে দ্রুত চিকিৎসা দেয়া প্রয়োজন থাকলেও সেই রাতে তা আর সম্ভব ছিলো না।পর দিন কাজী আর বদি মিলে জুয়েলকে নিয়ে যায় ডাঃ রশিদ উদ্দিনের চেম্বারে। ডাঃ রশিদ তাঁর রেডক্রস চিহৃ আঁকা গাড়িতে করে জুয়েলকে নিয়ে যান রাজারবাগে ডাঃ মতিনের ক্লিনিকে।সেখানে অপারেশন করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দেন ডাঃ মতিন।
এমন সব ভয়ংকর গেরিলা অপারেসনের মাঝে মাঝে রসিকতারও কমতি ছিল না।জুয়েলকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করে আজাদ,‘জুয়েল,খুব ব্যথা লাগতেছে’?ব্যাথায় কাতর জুয়েল হাসি মুখে জবাব দেয়,না, হেভি আরাম লাগতেছে।দেশের জন্য রক্ত দেওয়া হইল,আবার জানটাও রাখা হইল।দেশ স্বাধীন হলে কইয়া বেড়াইতে পারুম,দেশের জন্য যুদ্ধ কইরা আঙ্গুল শহীদ হইছিল…।বলে নিজেও কিছুক্ষণ হাসলেন।কিন্তু আজাদ জুয়েলের এই হাসির সাথে যোগ দিতে পারলেন না কারন ভয়ংকর যন্ত্রনায় বার বার কুঁকড়ে যাওয়া জুয়েলের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে খুব অসহায় বোধ করেন।
ডাঃ আজিজুর রহমান জুয়েলের ব্যান্ডেজ বাঁধা আঙ্গুল গুলো দেখে নিজেও আঁতকে উঠেন।ব্যান্ডেজ খুলে ড্রেসিং করবার সময় ক্রমেই খারাপের দিকে যেতে থাকা আঙ্গুল গুলোর দিকে চেয়ে রইলেন জুয়েল তার ভাবনাটা বুঝতে পারলেন।মিনতির সুরে জুয়েল বললেন,দেশ স্বাধীন হইলে আমি ন্যাশনাল টিমের হয়ে ওপেনিংয়ে নামুম,ক্যাপ্টেন হমু।আঙ্গুল তিনটা রাইখেন স্যার, প্লিজ!! অসাধারণ পুল খেলতো জুয়েল,সুইপ,স্লগ সুইপে ওর জুড়ি মেলা ভার ছিলো তখন।দাঁড়াতে দিতোই না বোলারকে,নাকের জল-চোখের জল একাকার হয়ে যেত বোলারদের।
স্বাধীন বাংলাদেশের হয়ে এ রকম খেলার স্বপ্নই ছিলো তার ,,,ওপেনিংয়ে নামবে,পিটিয়ে তক্তা বানাবে নাপাইক্কাদের।আহত হবার পর আলমদের বাড়িতেই আসমা ওর ছোট বোন আসমা জুয়েলের ভাঙ্গা তিনটা আঙ্গুল ড্রেসিং করতো প্রতিদিন,অসম্ভব কষ্ট হতো ছেলেটার,তাই গল্পে ভুলিয়া রাখত ওরে-একদিন জিজ্ঞাসা করল,জুয়েল,-রকিবুল হাসান তো অল পাকিস্তান টিমে চান্স পাইল।তুমি পাইবা না?রসিক রাজা জুয়েল বলল, আরে, কী যে বলো মেজপা।আমারে এই বার নিউজিল্যান্ডের এগেইনেস্টে নিল না বইলাই তো আমি অল পাকিস্তানই ভাইঙ্গা দিতাছি।খালি দেশটা স্বাধীন হইতে দাও,আমরা বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম বানামু।তাতে আমি ঠিকই চান্স পামু,দেইখেন হুম।
-তা তো পাইবাই।ওপেনার ছাড়া টিম হইব ক্যামনে? কিন্তু নাপাকিস্তান টিমেও চান্স পাইতা মনে হয়…
-আরে আবার পাকিস্তান!! পাকিস্তানরে তো বোল্ড করে দিতেছি… একে বারে মিডিল স্ট্যাম্প উপড়ায়ে ফেলতেছি।উফ… আস্তে মেজপা,ব্যথা লাগে তো…
-সরি।তোমার আঙ্গুল তিনটা যে কবে ভালো হবে!!
-হ,শালার এই আঙ্গুল তিনটা নিয়া বড় টেনশনে মরতাছি।কচু ভালো হয় না ক্যান?কবে যে আবার ব্যাট ধরতে পারুম…সাধ মিটাইয়া পিটাইতে পারুম…
-একটা বার যদি ওরে ব্যাট হাতে পিটাইতে দেখতে পারতাম… একটা বার!।

দেশটা স্বাধীন ঠিকই হয়েছিলো কিন্তু স্বাধীন দেশের হয়ে আর ওপেনিংয়ে ব্যাট করতে নামার সুযোগ হয়নি অবিভক্ত পাকিস্তানের অন্যতম সেরা ওপেনার আব্দুল হালিম জুয়েল খানের।১৯৭১ সালের ২৯শে আগস্ট আলবদর কমান্ডার মতিউর রহমান নিজামীর চর বদর সদস্য কামরুজ্জামানের তথ্যের ভিত্তিতে নাপাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে আহত জুয়েল,ক্রিকেটার পরিচয় পেয়ে তার ভাঙ্গা আঙ্গুল গুলো মুচড়াতে মুচড়াতে একে বারে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছিলো।ক্র্যাক প্লাটুনের অন্য সবার সাথে জুয়েলকেও মেরে ফেলা হয়েছিলো সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে,সার্বিক তত্ত্বাবধান আর নেতৃত্বে ছিল আলবদরের সর্বে সর্বা জামায়াত নেতা রাজাকার মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ।

নারায়ণগঞ্জের উল্লেখ যোগ্য গেরিলা যুদ্ধ গুলো হলো:
১৭ জুলাই ঢাকা-নরসিংদী মহা সড়কের উপর অবস্থিত বরদা গ্রামের কারভার্ট ধ্বংস,
৩ আগষ্ট ফতুল্লা থানার বিজেসি গোদনাইল প্রেস হাউজে আগুন,
আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ ও ১৪ নভেম্বর বন্দর থানাধীন লাঙ্গলবন্দ ব্রিজ অপারেশন,
২৩ আগস্ট সদর থানার রূপসীবাজার অপারেশন,
২৯ আগস্ট আড়াইহাজার থানা আক্রমণ,
১২ সেপ্টেম্বর ফতুল্লা রেলসেতু আক্রমণ,
সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর জাঙ্গির অপারেশন,
১০ অক্টোবর কাঞ্চনবাজার অপারেশন,
১০ অক্টোবর পাগলা রেলসেতু ধ্বংস,
২৬ অক্টোবর কলা গাছিয়ার গানবোট অপারেশন,
৩ ডিসেম্বর কাশিপুর অপারেশন,
এবং আরো অজানা অনেক গেরিলা অপারেসনস ছিলো যার ফসল আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশ।দেশ স্বাধীনের এই গেরিলা বাহিনীর নাপাকিদের আতংকিত নাম ছিলো ক্র্যাক প্লাটুন।এই ক্র্যাক প্লাটুনে উল্লেখ্যযোগ্য বেশ কয়েক জন বীর সদস্যরা ছিলেন….
আবুল বারক আলভী,শহীদ আব্দুল হালিম চৌধুরী জুয়েল বীর বিক্রম,পপসম্রাট আযম খান,আমিনুল ইসলাম নসু,আলী আহমেদ জিয়াউদ্দিন বীর প্রতীক,ইশতিয়াক আজিজ উলফাত,কাজী কামাল উদ্দিন বীর বিক্রম,কামরুল হক স্বপন বীর বিক্রম,গোলাম দস্তগীর গাজী বীর প্রতীক,চুন্নু,জহির উদ্দিন জালাল,জহিরুল ইসলাম,নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু,নীলু,পুলু,ফতেহ চৌধুরী,শহীদ বদিউজ্জামান,বদিউল আলম বদি বীরবিক্রম,মতিন ১,মতিন ২,শহীদ মাগফার আহমেদ চৌধুরী আজাদ,মাহবুব,মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রম,মাযহার,রাইসুল ইসলাম আসাদ,লিনু বিল্লাহ,শহীদ শাফি ইমাম রুমী,শহীদুল্লাহ খান বাদল,শাহাদত চৌধুরী,সামাদ,হাবিবুল আলম বীর প্রতীক, হিউবার্ট রোজারিও এবং হ্যারিস এবং আরো অনেকে খোদ ঢাকা শহরেই তারা মোট ৮২টির মতন গেরিলা অপারেশন পরিচালনা করেন।পাঁচ-ছয় জনের এক একটি দল তৈরি করে এই  গেরিলা দলগুলো বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নিতেন।

চলবে….

আসছে ১৫ই আগষ্ট জাতীয় শোক দিবস।এই দিনে দেশের স্থপতি বঙ্গ বন্ধু জাতীর পিতা শেখ মজিবর রহমান সহ তার পুরো পরিবারকে হত্যা করে কিছু সেনাবাহিনীর রাজাকার মাইন্ডেড অফিসার যার শোক আজও আমরা বয়ে বেড়াই।সেই শোক সপ্ত পরিবারের জন্য রইল আমার সমবেদনা।

ছবি:শহীদ আলতাফ মাহমুদ ওয়েভসাইট

 

 

 

গত পর্বটি এখানে

১১৯জন ১১৮জন
0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য