Happy friendship day

সুরাইয়া নার্গিস ২ আগস্ট ২০২০, রবিবার, ০৫:৩৪:৩৫অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৯ মন্তব্য

“Happy friendship day”

আমার বান্ধবী ইসরাত”

*ছোটবেলা থেকেই আমি অন্য রকম পাশের বাসার ধনীর লোকের ছেলে মেয়ের সাথে খেলা করি নাই। বরং যারা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে খেলা দেখতো কিন্ত খেলার সুযোগ পেল না আমি তাদের সাথে খেলা করতাম। কারন বস্তির বাচ্চাটার আনন্দের কারন হতে চাইতাম।

*আমি কখনো ক্লাসের সবচেয়ে মেধাবী ফাস্ট বেঞ্চে বসা ছাত্র/ছাত্রীর সাথে মিশি করি নাই। বরং ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চের মেয়েটার সাথে মিশতাম ওর পড়াশোনার আগ্রহ বাড়াতে।কলেজের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটার বন্ধুত্ব আমি চাইনি বরং কলেজের সবচেয়ে কুৎসিত মেয়েটার বন্ধু আমি হয়েছি।

কারন সুন্দরী মেয়ে বান্ধবীকে নিয়ে আমি গর্ব করবো,আর কালো বান্ধবীটা আমাকে নিয়ে গর্ব করবে এতেই আমি খুশি।

আমার বন্ধু ইসরাত..

আমি তখন কলেজে ভর্তি হয়েছি প্রথম দিনের ক্লাস কোন ড্রেস পড়বো তার সাথে হালকা কিছু কসমেটিকসও কিনলাম।আমরা ৩ জন বান্ধবী একসাথে বসবো প্রথম থেকে ৩য় বেঞ্চ এর মধ্যে,,কিন্তু আব্বুর অফিসের গাড়ি আসলো দেরি করে।আমার যেতে দেরি হলো আর কলেজের বেঞ্চ তো কারো বাপ দাদার সম্পত্তি না 😂 যে দখল করে রাখবে।

তাই বন্ধুরা বসলেও দেরিতে যাওয়ার কারনে ওদের পাশে আমার জায়গা হয়নি। পরিচিত অনেকেই ডাকলেও বসতে বসলাম না কারন পরে আসলে পিচনেই বসা উচিত নাই। তাই মন খারাপ করে পিচনে চলে যাচ্ছি লক্ষ করলাম চতুর্থ বেঞ্চটা একদম খালি। যেখানে শুভেচ্ছা ক্লাস বলে প্রতি বেঞ্চে ৬-৮ জন বসেছে সেখানে একটা বেঞ্চের দু পাশে মেয়ে ২ জন মেয়ে বসে আছে। মাঝখানে খালি আমি গিয়ে মাঝখানে বসে পড়লাম ওমনি সামনে পিচনে সবাই হাসতে শুরু করলো আমি লজ্জা পেয়ে বোকার মতো বসে আসি।পাশের মেয়েটা বললো আমি দেখতে কালো, কুৎসিত তাই বেঞ্চে কেউ বসে নাই তুমি বসেছো তাই ওরা হাসছে।

আমি ওর কথায় হেসে বললাম ও আচ্ছা।তারপর স্যার ক্লাসে আসলেন লেকচার দিলেন পর পর কয়েকজন স্যার, প্রধান অতিথি বক্তব্য শেষ করলেন।আমাদের রজনীগন্ধা ফুলের স্টিক দিয়ে বরন করে নিলেন।আমি তাকে প্রশ্ন করলাম তোমার নাম কি? ইসরাত জাহান।আমি আলিফ।তুমি আমার বন্ধু হবে?

সে নির্বাক দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে আছে আর চোখ থেকে অনবরত পানি ঝরছিলো।আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম ইসরাত তুমি কাঁদছো কেন?কোন সমস্যা?ইসরাত বললো হ্যাঁ সমস্যা।আমি হাত বাড়িয়ে বললাম বন্ধুর কাছে শেয়ার করো সমস্যার সমাধান করতে না পারলেও শান্তনা দিতে পারবো।জানো আলিফ ছোটবেলা থেকেই আমি দেখতে কালো, কুৎসিততাই কেউ কখনো বন্ধু হতে চাওয়া তো পরের কথা আমি চাইলেও কেউ বন্ধু হয় না।আমার কোন বন্ধু নেই আমার মা, বোন ওরাই আমার বন্ধু। ইসরাতের কথা শুনে আমার খুব কষ্ট লাগলো।

ওহ্ বুঝছি আমি সুন্দর বলে তুমি আমার বন্ধু হবে না! সে হেসে বললো আলিফ তোমার মতো বন্ধু পাওয়া তো আমার পরম সৌভাগ্য।তাহলে তুমি রাজি ওকে আজ থেকে আমরা দুজন বন্ধু বলেই আমি ওর চোখের পানি মুছে দিলাম।পরবর্তী ৫ বছরে আমি কোনদিন ইসরাতকে কাঁদা তো দূরের কথা মন খারাপ করতেও দেই,সেইম সে ও আমার ভালো বন্ধু হয়ে ওঠল।

আমাদের বন্ধুত্বের ৬মাস পর একদিন আমি ইসরাতদের বাসায় বেড়াতে গেলাম। আশেপাশে কমপক্ষে ২০ জন মহিলা,ছেলে,মেয়ে ছোট বাচ্চা সবাই আমাকে দেখার জন্য পর্দার আড়াল থেকে উঁকি মারছে।আমি নাস্তা খাওয়ার সময় লক্ষ করলাম কেউ কেউ জানালা দিয়েও আমাকে দেখছে। আর আমি লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছি এটা ভেবে যে আমাকে তারা বিয়ের জন্য পাত্রী দেখতাছে 🙈

কিছুক্ষন পর খেতে বসলাম তখন দেখি কিছু মহিলা আমার সামনে এসে বসা এবার এত লজ্জা আমি রাখি কোথায়। সামনে ভাত আমি চোখে দেখি না কারন লজ্জা লাগছে এটা ইসরাতের মা বুঝতে পেরে হেসে বললেন।শোভা ভাবি খেয়ে নেওক পরে আইসেন দেখতাছেন না মেয়েটা লজ্জা পাচ্ছে।মনে মনে গালি দিলাম এতক্ষন পর বুঝছেন, পাত্রী দেখলেও লাভ নাই আমি বিয়ে করবো না।ওনাদের শোভা ভাবী আমার দিকে তাকিয়ে বললেন মা লজ্জা পাচ্ছো?আমি ভদ্রতা করে মুচকি হেসে বললাম, না আন্টি আপনারা বসুন সমস্যা নেই। শোভার মা এবার একা না আরো দুজন ডেকে এনে বসিয়ে লম্বা গল্প শুরু করলেন।

কোন রকম প্লেটের ভাত শেষ করলাম ওনাদের গালগপ্প শেষ করলেন।এবার আবার এক্সজাম দিবার পালা, পুরো বায়োডাটা শেষ করলাম বিয়ের পাত্রী ভাবতে ভাবতে।শোভার মা এবার বললেন ইসরাত তুমি দেখি ভালো পরিবারের মেয়ের সাথেই বন্ধুত্ব করছো।ইসরাত হেসে বললো আন্টি আলিফ খুব ভালো মেয়ে ওর কাছে শোনছি ওর বাবা মা অনেক ভালো মানুষ।

আমাদের গল্পের মাঝে শোভা আন্টির মেয়ে এসে উপস্থিত আম্মু ইসরাত আপুর বান্ধবীকে দেখতে আসলাম।শোভা আন্টি পরিচয় করিয়ে দিলেন আলিফ এই আমার মেয়ে সোনিয়া ক্লাস সেভেনে পড়ে।তুমি কেমন আছো?কোন স্কুলে পড়?ইত্যাদি কথা বললাম হয়ত বর পক্ষের কেউ হবে তাই ভদ্রতা বজায় রাখলাম,ব্যবহারে মাধুর্য চেহাড়ায় মোনতা ভাব রাখলাম।

সোনিয়া হেসে বললো আলিফ আপু আপনি খুব সুন্দর জানেন ইসরাত আপু কালো বলে কেউ তাঁর বন্ধু হয়না।আমি স্কুল থেকে বাসায় ফিরেই শোনলাম ইসরাত আপুর বান্ধবী আসছে খুব সুন্দর তাই আপনাকে দেখতে আসলাম।শোভা আন্টি বললেন ইসরাতের সাথে কেমন মেয়ে বান্ধবী হলো সেটা জানার, দেখার কৌতুহল আমাদের সবার।মৌমিতার মা বলছিলো দেখেন গিয়ে ভালো জাতের মেয়ে না হয়ত বস্তির মেয়ে বলেই বান্ধবী হইছে।কথাটা শোনে আমার খারাপ লাগছিলো তাই তোমার সাথে এতক্ষন ধরে কথা বললাম।

ইসরাত বললো আন্টি আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে ভালো মানুষটাই আমার বান্ধবী আলিফ।আমি হেসে বললাম ইসরাত তুমি কালো না ফর্সা এটা আমি কখনো দেখি না।তুমি ভালো একজন মানুষ সেটা দেখেই আমি বন্ধু হয়েছি।ইসরাত হেসে বললো আলিফ তুমি হয়ত জানো না আমি তোমাকে নিয়ে গর্ব করি তুমি আমার জীবনের সেরা পাওয়া।সেইদিনটা আমার জন্য অনেক খুশির ছিলো, আনন্দের ছিলো।কারন আমার সুন্দরী বান্ধবী গুলো কখনো আমাকে নিয়ে গর্ব করে নাই বরং অসুন্দর বান্ধবীর অহৎকার ছিলাম আমি।

কয়েকদিন পর ইসরাত আমাদের বাসায় আসলো রিক্সে থেকে নামার পর আশে পাশে সবাই হা করে দেখে প্রশ্ন করলো। আলিফ মেয়েটা কে?আমার বান্ধবী ইসরাত কথাটা শোনে কেউ খুশি হয়নি কেউ কেউ বলেই ফেলল বন্ধুত্ব করলে একটু চেহাড়াটা দেখা উচিত, আলিফের রুচি নেই।আমার আত্মীয় স্বজন সবাই ইসরাতকে চিনতো তবে চেহাড়া খারাপ হলেও ওর ব্যবহারে সবাই ভালোবাসতো।

আমি যখন ইসরাতকে নিয়ে দুজন ছবি তুললাম ছবি দেখে এক বান্ধবী বললো একপাশে দিন অন্যপাশে রাত বলে হি হি হি হি হাসলো।আমিও হাসলাম দেখি ইসরাতের চোখে পানি ঢলমল করছে, পরে বান্ধবীকে লক্ষ করে বললাম “দিন -রাত মানে আলিফ-ইসরাত, একজন ছাড়া অন্যজন অচল রাত আছে বলেই দিনের এত মায়া,ইসরাত আছে বলেই আলিফ এত সুন্দর।এবার ইসরাতও হি হি হি হি হেসে করে দিল আমার হাত ধরে বললো আমরা বন্ধু সারাজীবনের জন্য।

ইসরাত, আমি এইচ.এস.সি পাশ করলাম দুজনেই চাকরিতে জয়েন করলাম।একদিন ইসরাতকে বর পক্ষ দেখতে আসলো আমিও গেলাম।ছেলে সুন্দরী মেয়ে বিয়ে করবে ইসরাতকে না করে দিল, আমি ভিতর থেকে বললাম “ওই ছেলে কি বউয়ের রুপ ধুয়ে শরবত খাবে? যে ফর্সা বউ লাগবে।আর দেহের সৌন্দর্য ক্ষনস্থায়ী মনের সৌন্দর্য সারাজীবন যে বুঝে সে শরীর না মনে সৌন্দর্য দেখে” আঙ্কেল বাদ দেন ইসরাতের জন্য অন্য ছেলে দেখতে বলুন।

ছেলে পক্ষ চলে যায় কয়েকদিন পর ওই বিয়ে আবার ঠিক হলো রাতেই বিয়ে, ইসরাত হবু বর এর অনুমতি নিয়ে ওর বাবাকে নিয়ে আমাদের বাসায় আসলো। রাত তখন ১০ টা আমাকে নিয়ে গেল ওদের বাসায় রাত ১২টা তারপর কাজী আসলো বিয়ে পড়ানো হলো। রাত ২টায় বর যাত্রী ইসরাতকে নিয়ে চলে যাবে  ইসরাত কাঁদে আমিও এত কাঁদছিলাম যে অসুস্থ হয়ে পড়ি।বিয়ের পর ওর বৌভাতে শ্বশুড় বাড়ী যাই, তারপর সে বাবার বাড়ি আসলেই আমাদের দেখা হতো। ইসরাতের বর একদিন হেসে বললো আলিফ আপু তোমার কথাটা সেদিন খুব ভালো লেগে ছিলো। অনেক ভেবে তারপর ইসরাতকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আর আমি ইসরাতকে পেয়ে সুখি সত্যি সে খুব ভালো মেয়ে (ইসরাতের বর দেখতে ফর্সা দুধে আলতা গায়ের রং সবটা আল্লাহর রহমত)।ইসরাতের বিয়ে হয়েছে ৬বছর, ওর ১ ছেলে ১ মেয়ে হয়েছে ৩ বছর ধরে দেখা হয় না ইসরাত সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকে।তাই আমাদের মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয়।তাই বলে কি দূরত্ব কখনো বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যায়, কখনো না। যদি মনের অনুভূতি ঠিক থাকে তাহলে সারাজীবন বন্ধুত্ব থাকে।ইসরাত মিস ইউ দোস্ত, তুই আমার জীবনের সেরা বন্ধু ভালো থাকিস স্বামী সন্তান নিয়ে এই দোয়া করি।

ভার্চুয়াল ফেসবুক,ব্লগে মায়ার অনেক ভাই বন্ধু হয়েছে ,বাস্তব জীবনে অনেকও এর সংখ্যা বেড়েছে ভালো ভাইয়া, বন্ধু হয়েছে। তবু আজ বন্ধু দিবসে তোর নামটাই মনে আসলো কারন তুই আমার জীবনে বেস্ট ফ্রেন্ড।

Happy friendship day.

২০১জন ৭১জন
0 Shares

৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য