মূল লেখায় যান

রঙধনু আকাশ (৩য় পর্ব)

ইঞ্জাগল্প২৭টি মন্তব্য

রুদ্র সেলফোনটা তুলে নিয়ে বাসায় কল দিলো, ছোটোবোন ফোন রিসিভ করলে বললো, রুমি মম কই?

এইতো পাশেই আছে, দিচ্ছি।

ও পাশে রুদ্রর মা ফোন ধরে হ্যালো বললে রুদ্র বললো, মম তুমি আর ভাবী একটু অফিসে আসো তো, জরুরী একটা মিটিং করতে হবে।

হটাৎ কি এমন জরুরী বিষয় রুদ্র? 

মম এখন তো ড্যাড নেই, তুমিই কোম্পানির কো-চেয়ারপার্সন আর ভাবী ভাইয়ার স্থলে আসবে।

আচ্ছা আসছি, বলেই রুদ্রর মা ফোন কেটে দিলো। 

রুদ্র সবার দিকে ফিরে বললো, আমার মা আর ভাবী আসুক তারপর এইসব সিদ্ধান্ত নেবো, হুদা সাহেব আপনি ব্যাংকে এখন ফোন দিয়েন না, ওরা যদি কল করে বলবেন আমরাই উনাদের কল দিয়ে আসতে বলবো।

ওকে স্যার। 

জিএম সাহেব আপনি সব রেডি করুন, আমরা মিটিং করেই ডিসিশন নেবো, আপনারা তিনজন এবং আমরা তিনজন মিটিংয়ে থাকবো, আপাতত আমাদের সবার জন্য হাল্কা কিছু খাবারের ব্যবস্থা করুন, বলেই রুদ্র ডানহিল লাইট একটা নিয়ে ধরালো।

ইন্টারকম বেজে উঠলে রুদ্র রিসিভ করতেই রিসেপশনিস্ট বললো, স্যার মিস শেলি এবং উনার বাবা মিস্টার সফি এসেছেন।

রুদ্র কিছুক্ষণ ভেবে বললো, ওকে উনাদেরকে কেবিনে পাঠিয়ে দাও।

ওকে স্যার। 

 

রুমের দরজা খুলে রুদ্রর হবু শ্বশুর ও শেলি প্রবেশ করলো।

কেমন আছো রুদ্র, সরি ওদিন আমাদের একটা প্রোগ্রাম ছিলো, এছাড়া শেলির শরীরটাও ভালো ছিলোনা বলেই তাড়াতাড়ি চলে এসেছিলাম।

নেভার মাইন্ড আংকেল, বসুন।

শেলি আর শেলির বাবা বসলে রুদ্র জিজ্ঞেস করলো, কি খাবেন বলুন, কফি চলবে?

প্রিমিয়াম গোল্ড হলে চলবে।

রুদ্র কিঞ্চিৎ কটমট করে তাকালো, এরপর রিসেপশনিস্টকে কল দিয়ে কফি দিতে বললো।

তা তোমাদের কি অবস্থা, এখন তো তুমিই সব?

কেন এই কথা বলছেন?

মানে তোমার আব্বা নেই, নীল তো পাগল হয়ে গেছে।

কথাটা বুঝে শুনেই বলছেন তো আংকেল, নীল ভাই অসুস্থ, পাগল হয়ে যায়নি।

ঔদ্ধত্য দেখিয়ে সফি সাহেব বললেন, ঐ একি কথা আর কি, বলেই হে হে হে করে হাসলেন।

রুদ্রর ইচ্ছে করছে উঠে কানের নিচে কষে চটকানা দেয়, এ সময় পিয়ন এসে কফি দিয়ে গেলো।

আদুরে গলায় শেলি বললো, রুদ্র তুমি ভালো আছো তো বেবি, লিপস্টিক বের করে ঠোঁটে মাখলো।

রুদ্র জবাব না দিয়ে শেলির তামশা দেখতে লাগলো।

 

রুদ্রর মা আর ভাবীকে কেবিনে ঢুকতে দেখে সফি সাহেব বলে উঠলো, এই যে বেয়াইন আসছেন দেখছি, আসুন আসুন।

ভাই সাহেব কেমন আছেন, মা শেলি তুমিও আসছো দেখছি বলেই রুদ্রর দিকে প্রশ্নবোধক ভাবে তাকালেন। 

রুদ্র দুই কাঁদ তুলে শ্রাগ করলো।

তা বেয়াইন সাহেব আপনারা নিশ্চয় কোনো বিষয়ে এসেছেন?

আমাদের একটা জরুরী মিটিং আছে, তা আসতে হয়েছে।

ওহ তাহলে তো অসময়েই এসে পড়েছি, তাহলে আমরা উঠি?

এসেই যখন পড়েছেন তাহলে আমাদের মিটিং এটেন্ড করুন আংকেল।

সফি সাহেব বসে পড়লেন, মনে মনে বললেন ভালোই হলো, সম্পত্তির ব্যাপারে অনেক কিছু জানা যাবে। 

রুদ্র ইন্টারকমে জিএম সাহেবকে ফোন দিয়ে বললো, আমার রুমে পাঁচটা লাঞ্চ দিন, আপনাদের জন্য এক্সট্রা দুইটা আনিয়ে নিন প্লিজ।

ওকে স্যার।

রুদ্র ইন্টারকম ডিস্কানেক্ট করে ওর ভাবীকে জিজ্ঞেস করলো, ভাইয়া আর রুহি কি করে? 

রুহি নীলের সাথে খেলছে, রিয়া আছে ওদের সাথে।

রিয়া কে, প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন সফি সাহেব।

আনকেল ও আমার ছোটবোন। 

ওহ আচ্ছা আচ্ছা, যেন উনি আশ্বস্ত হলেন এমন ভাব দেখালেন।

 

লাঞ্চের পর সবাই কনফারেন্স রুমে বসেছে মিটিং করতে, রুদ্র ফিন্যান্স ডিরেক্টরকে বললো সমস্যা গুলো বুঝিয়ে বলতে।

ফিন্যান্স ডিরেক্টর সব খুলে বলতে লাগলো একে একে, মাঝে মাঝে রুদ্রর মা এইটা সেটা নিয়ে প্রশ্ন করে যাচ্ছেন, এক সময় ফিন্যান্স ডিরেক্টরকে নীলের বউ রেনু জিজ্ঞেস করলো, তাহলে এখন উপায় কি? 

উপায় দুইটা আছে ম্যাম।

সবাই আগ্রহ নিয়ে তাকালো ফিন্যান্স ডিরেক্টরের দিকে।

জিএম সাহেব বললো, উপায়ের একটি হলো কোম্পানিকে দেউলিয়া ঘোষণা করা।

এতো রাস্তায় নামতে হবে, সফি সাহেব বললেন।

না স্যার, আমাদের কাছে এই মুহূর্তে দেড়শো কোটি টাকা আছে যা আমরা মিসেসে নীলের একাউন্টে ট্রান্সফার করে দেবো, এতে যত ফ্যাক্টরি আছে এবং বাড়ি সহ সবই নিলামে চলে যাবে কিন্তু দেড়শো কোটি টাকায় রুদ্র স্যার ভালো ভাবেই সামনে এগুতে পারবে।

আর দ্বিতীয় অপশন, রুদ্রর মা জিজ্ঞেস করলেন। 

দ্বিতীয়টিও প্রায় সেইম, ভদ্রলোকের মতো সব কিছুই ব্যাংক নিয়ে যাবে,,শুধু থাকবে চেয়ারম্যান স্যারের চারশো কোটি টাকার শেয়ার, যা এখন পঞ্চাশ কোটিরও  কম এবং দিন দিন দাম কমছে।

 

তাহলে তো দেখছি দুটোই এক, যা আছে ব্যাংক নিয়ে যাবে, রেনু বললো।

নাহ রেনু, দেউলিয়া ঘোষণা করা হলে তোমার শ্বশুরের বদনাম হয়ে যাবে।

মা আমি তা হতে দেবোনা, রুদ্র বললো।

আমিও চাইনা রুদ্র।

তাহলে এখন সব সম্পত্তি ব্যাংকে দিয়ে দেবেন, সফি সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,ওদিকে শেলির কোনো ভাবান্তর নেই, যেন সে এখানে নেই। 

জ্বি ভাই সাহেব, জবাব দিলেন রুদ্রর মা।

রুদ্র বললো না, আমরা সব ব্যাংকে দেবোনা, দরকার হলে আমাদের রানিং ব্যবসা গুলো বিক্রি করবো আর ব্যাংকে দেবো।

সেটা ব্যাংক মানবেনা স্যার।

সেটা আমি ব্যাংকের সাথে কথা বলবো, দেখি কি করা যায়।

আসলে এইভাবে ফকির হয়ে গেলে কেমনে চলবে রুদ্র, সফি সাহেব হতাশ হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

তাহলে কি করা যায় বলুন?

সফি সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, না না তাহলে আমি এখানেই তোমাদের এনগেজমেন্ট ভেঙ্গে দিচ্ছি, চলো শেলি।

শেলি আর কারো দিকে তাকালোনা, উঠে দাঁড়িয়ে এনগেজমেন্ট রিংটা খুলে রুদ্রর সামনে রেখে বাপের পিছু নিয়ে বেড়িয়ে গেলো। 

সবাই হতভম্ব হয়ে ওদের চলে যাওয়া দেখলেও রুদ্রর ভাবান্তর হলোনা। 

 

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো, রুদ্র ব্যাংকের সাথে কথা বলে সময় নিবে, যথাসম্ভব চেষ্টা করবে কোম্পানি বাঁচানোর।

রুদ্র ঘড়ি দেখলো, চারটা বাজছে, রুদ্র মাকে বললো, আপনারা বাসায় যান, আমি ব্যাংক গুলোর সাথে কথা বলার চেষ্টা করছি।

স্যার আজকে আর সম্ভব হবেনা, আপনি আগামীকাল সকালে যান।

হাঁ তাও ঠিক, মম ভাবী চলো আজ বাসায় যায়।

চল বাবা, বলে উঠে দাঁড়ালের রুদ্রর মা আর ভাবী।

তিনজনই নিচে নেমে এসে দাঁড়ালে রুদ্র বললো, তোমরা আমার সাথে চলো, তোমাদের গাড়ীটা ড্রাইভার নিয়ে আসবে, সামনেই ড্রাইভার দাঁড়িয়ে ছিলো, ওকে গাড়ি নিয়ে চলে যেতে বলে রুদ্র সবাইকে নিয়ে নিজের গাড়িতে রওনা হলো। 

পথেই রুদ্রর মা কথা পাড়লেন, শেলি আর তা বাবা এমন করবে আমি চিন্তায় করতে পারিনি, কোথায় উনি এই সময়ে আমাদের পাশে দাঁড়াবেন, তা না করে উনি সরে পড়লেন।

মম আমি আগে থেকেই জানতাম।

কি, কি জানতি তুই?

উনি স্বার্থপর তা আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম, কিন্তু বাবার সম্মানের জন্যই বিয়েতে রাজি হয়েছিলাম, এখন আমাদের এই বিপদে স্বাভাবিক ভাবেই ওরা সরে পড়েছে। 

কষ্ট লাগছে তোর বিয়েটা ভেঙ্গে গেলো, বড় করে এক নিশ্বাস ফেললেন রুদ্রর মা। 

 

……. চলবে। 

ছবিঃ গুগল।

মোট পড়েছেনঃ ১২৪২জনআজ পড়েছেনঃ ০জন

২৭টি মন্তব্য

  1. ‘সফি সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, না না তাহলে আমি এখানেই তোমাদের এনগেজমেন্ট ভেঙ্গে দিচ্ছি, চলো শেলি।
    শেলি আর কারো দিকে তাকালোনা, উঠে দাঁড়িয়ে এনগেজমেন্ট রিংটা খুলে রুদ্রর সামনে রেখে বাপের পিছু নিয়ে বেড়িয়ে গেলো। ’
    হায়রে স্বার্থপরতা!! এ পর্বটি ভাল লাগলো।
    শুভেচ্ছা জানবেন। ভাল থাকুন ইঞ্জা ভাই!

    1. জীবনে এমন কিছু স্বার্থপর মানুষ আছে যারা নিজেরটা সহ অন্যেরটাও খেতে চাই, এমন স্বার্থপর মানুষ আমাদের আশেপাশেই আছে ভাই।
      দারুণ মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ ভাই।

  2. এইজন্যই সম্পর্ক করতে হয় বংশ দেখে, অবস্থা দেখুন। যখনই দেখলো অর্থকড়ির সমস্যা হবু বউ আর শ্বশুর উল্টাপথে হাঁটা শুরু করলো। স্বার্থপরের দল সব।

    রুদ্র আশাকরি শক্তহাতে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে। আসলে ওর জন্য এবং তাদের পরিবারের জন্য এখন একটা লক্ষী মেয়ে দরকার। যে পরিবারের সবার দিকে খেয়াল রাখবে, মানসিকভাবে সাহস যোগাবে। টাকাপয়সার লোভ নেই যার মধ্যে।

    অচিরেই এমন একজনকে রুদ্রর পাশে আনার জোর দাবি জানাচ্ছি। না হলে আন্দোলন চলবেই। ভালো লাগছে পড়তে দাদা। শুভকামনা জানবেন।

    1. অনেক সময় ভালো বংশ পরিচয়ের মানুষও প্রচন্ড স্বার্থপর হয় ভাই, আমি নিজেই সাক্ষী, রুদ্রর পাশে থাকার জন্য এখনো কাউকে চিন্তা করিনি ভাই, আশা করি দ্রুতই সিদ্ধান্ত নিবো।
      ধন্যবাদ ভাই, ভালোবাসা জানবেন।

    1. জ্বি দাদা, দুনিয়াতে স্বার্থপর মানুষের অভাব নাই, এদের টার্গেট হলো স্বার্থসিদ্ধি, তাহলেই ওরা চামে চামে সরে পড়ে।
      ধন্যবাদ দাদা।

  3. আমি ও চাইছিলাম সম্পর্ক টা না টিকুক কারন যে মেয়ে বিয়ের খরচের জন্য আগেই নির্দিষ্ট এমাউন্ট চেয়ে বসে তার সাথে সম্পর্ক না রাখাই ভালো এবং তখনই বুঝা গেছে এদের শিক্ষা , অহমিকা, বংশ এর পরিচয়। ভাবীর বোন মনে হচ্ছে নায়িকা! ব্যবসার যে কত টেকনিক, ধারা আছে তা বুঝলাম কিছুটা। আজকের পর্বটা দারুন লাগলো। শুভ কামনা রইলো

    1. ধন্যবাদ আপু, আপনার আশা যখন পূর্ণ হলোই তাহলে মিষ্টি খাওয়ান।
      সত্যি তাই, শিক্ষা থাকলেই হবেনা আপু, মনুষত্বটাই বড় কথা।
      নায়িকা নিয়ে এখনো কোনো চিন্তা করিনি আপু, দেখা যাক কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়।
      ধন্যবাদ আপু।

  4. নতুন জয়েন করেছি তাই আগের পর্ব পড়িনি।
    এ পর্ব। আমার ভালো লেগেছে পারিবারিক ইনস্টিটিউটেে মহিলাদের অংশগ্রহণ।
    স্বার্থপর কংশমামার প্রকাশটিও দারুণভাবে ফুটেছে।
    বেশ ভালো লেগেছে।

    1. আপু এই গল্পের আগের দুই পর্ব পড়তে চাইলে আমার নামের উপর ক্লিক করলেই সব পেয়ে যাবেন।
      ধন্যবাদ যথাপোযুক্ত মন্তব্যের জন্য।

    1. দোয়া রাখবেন আপু যেন ঠিক মতো গল্প এগিয়ে নিতে পারি, মানুষের আচার আচরণেই বংশের পরিচয় পাওয়া যায়, আবার অনেকের বংশ ভালো কিন্তু ওরা প্রচন্ড স্বার্থপর হয়।
      পাশে থেকে অনুপ্রাণিত করার জন্য ধন্যবাদ আপু।

  5. পরিবারের প্রধান ব্যাক্তির মৃত্যুতে একটি পরিবার ধ্বংশ হয়ে যায়। ব্যাংক লোন এর পাওনা পরিবারের উপর বর্তায়, কিন্তু লোনটি চালু আর থাকেনা। এই নিয়মটি খুব খারাপ।

    সমাজে সফি সাহেবের মত এমন অসভ্য লোক আছে প্রচুর। এদের এড়িয়ে চলা উচিত।

    গল্প লিখছেন, মনে হচ্ছে চোখের সামনে দেখছি।
    শুভ কামনা ভাইজান।

    1. এই গল্পের প্রায় বিষয়ই আমার জীবনে ঘটেছে ভাইজান, বাংকের লোন অবশ্য ততকালীন ১১/১২ লক্ষ হবে যা আমি দিনে দিনে দিয়ে দিয়েছিলাম কিন্তু সাকসেশন রিপোর্ট নেওয়ার জন্য প্রায় আট মাস কষ্ট করেছি।
      সফি সাহেবের মতো মানুষ আমার আত্মীয়দের মধ্যেই পেয়েছি,,যারা এক সময় খেতে পারতোনা, সারা বছর আমিই চালাতাম, কিন্তু আমার বিপদে তাদেরবকাউকে তো পাইনি উল্টো বদনাম করতে ছাড়েনি।
      দোয়া রাখবেন ভাইজান।
      ধন্যবাদ।

মন্তব্য করতে লগিন করুন অথবা নিবন্ধন করুন।