মূল লেখায় যান

মামাকে দেখতে যাওয়া (পর্ব-১১)

শামীম চৌধুরীভ্রমণ২৫টি মন্তব্য

মামাকে দেখতে যাওয়া। (পর্ব-১০)  < পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুণ

পর্ব-১১

আমি আগের কোন এক পর্বে উল্লেখ করেছিলাম যে,কেওলাদেও পার্কের শেষ প্রান্তে (বনের শেষ অংশে) ৬ নাম্বার জোন। এখন ভাবছি বনটি সম্পর্কে একটা সম্যক ধারনা আমার পাঠক বন্ধুদের দেওয়া দরকার। যাতে করে তাঁরা বনের পরিবেশটা ভাল করে বুঝতে পারেন। অন্যান্য জোন সম্পর্কে যখন আলোকপাত করবো তখন পাঠকরা চটজলদি ধরতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। পূর্বেও উল্লেখ করেছিলাম এই বনের ভৌগলিক অবস্থান। তারপরও আজ আবারও করছি, কারন আগের পর্বগুলি যারা পড়েননি সেই নতুন পাঠকদের বন সম্পর্কে ধারনা নিতে সুবিধা হবে।
কেওলাদেও জাতীয় উদ্যান ইংরেজি: Keoladeo National Park রাজস্থানের সিন্ধু -গঙ্গা নদীর বৰ্ষাকালীন জৈবভৌগোলিক অরণ্য যা প্ৰদেশের মাঝে অবস্থিত। এই উদ্যানের আয়তন ২,৭৮৩ হেক্টর। ১৯৮২ সনে এটিকে রাষ্ট্ৰীয় উদ্যান হিসাবে ঘোষণা করা হয়। ১৯০০ সনেরও এটি মহারাজাদের আমলে শিকারের ক্ষেত্রে সংরক্ষিত অঞ্চল ছিল। ১৯৫৬ সনে এটি পক্ষী উদ্যানে পরিণত হয়। ১৯৭২ সন পৰ্যন্ত মহারাজাদের এখানে শিকার করার অনুমতি ছিল। ১৯৮১ সনে এটিকে রামসার জলাভূমি হিসাবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৮৫ সনে প্ৰাকৃতিক সম্পত্তি হিসাবে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মৰ্যাদা লাভ করে।এখানে জলাশয়ের তীরবৰ্তী অঞ্চলটিকে দুটা অংশে ভাগ করা হয়েছে। জলস্তর সঠিক রাখার জন্যে পানি যোগানোর নিয়ন্ত্ৰিত ব্যবস্থাও গৃহীত হয়েছে। সমগ্ৰ উদ্যানটি ১৭টি গ্রাম এবং ভরতপুর নগর দ্বারা বেষ্টিত। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, ২০১৩ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই বনে সব জলাশয়ে পানি শুকিয়ে যায়। যার ফলে সেই ৪ বছর কোন পরিযায়ী পাখি এই বনে আসে নাই। পরবর্তীতে ভারত সরকারের ভরতপুর বন বিভাগ কয়েকটি গ্রামে গভীর নলকূপ বসিয়ে জলাশয়ে বারো মাস জলস্তর ঠিক রাখার ব্যাবস্থা নেয়। ২০১৭ সাল থেকে আবার নিয়মিত পরিযায়ী পাখি আসা শুরু করে। প্ৰায় ৩৬৪টি প্ৰজাতির পরিযায়ী পাখি এখানে শীতকালে আসতে দেখা যায়। এরা মূলতঃ আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, চীন, উত্তর আমেরিকা এবং সাইবেরিয়া থেকে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এই বনে আসে। পাখির অভয়ারণ্য এই বন থেকে ভারত সরকারের রাজস্ব আদায়ের একটা বড় অংশ কাজ করে।
বনের একটি পরিবেশ।
ফ্লেমিংঙ্গোর আশায় পূর্বের ৫টি জোন অতিক্রম করে আমরা ৬ নাম্বার জোনে এসে সারস পাখির ছবি তুলি। পরবর্তীতে এই জোনে আরো বেশ কয়েক প্রজাতির পাখির দেখা পাই। আমার বিশেষ লক্ষ্য ছিলো যে সকল জলজ পাখি আমার পূর্বে তোলা নেই সেই গুলিকে টার্গেট করা। আমার সঙ্গীরা যার যার মতন পাখির ছবি তুলছেন। উনারা যে পাখিগুলির ছবি তুলছেন তা সবই আমার তোলা ছিল। তাই তাদের সঙ্গে যোগ না দিয়ে দল থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলাম। কিছুটা পথ একা একা এগিয়ে গেলাম। হঠাৎ নজরে পড়লো ইউরেশিয়ান চামুচ ঠুঁটি বা Eurasian Spoonbill. এর মতন পাখি। এরা ঠোঁট পানিতে ঢুকিয়ে জলজ উদ্ভিদ থেকে খাবার খাচ্ছে। সঙ্গে থাকা বায়নুকুলার দিয়ে দেখে নিলাম। হঠাৎ তারা ঠোঁট উপরে তুলে ধরলো। দেখার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা বেড়ে গেল। কারন আমার বহুদিনের অপেক্ষায় থাকা আকাংখার পাখি পেয়ে যাওয়ায়। স্পুনবিল বা চামুচ ঠুঁটি পাখিটি ২০১৮ ও ২০১৯ সালে রাজশাহী জেলায় পদ্মার চরে দেখা যায়। সংখ্যায় ছিল ২টি। পদ্মার মাঝি অনিকের বার্তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০১৮ সালে রাজশাহী ছুঁটে যাই। ভোরে পদ্মার পাড়ে পৌঁছে অনীকের নৌকায় পুরা চর চষে বেড়ালাম। কোথাও পাখিটির দেখা পেলাম না। অনুরূপ ভাবে ২০১৯ সালেও স্পুনবিলের ছবি তুলতে পারলাম না। কষ্টটা তখন থেকেই বুকের উপর চেপে বসে ছিল। কাংখিত পাখিটিকে এই বনে দেখে আমি উৎফুল্ল হয়ে গেলাম। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, পদ্মার চর থেকে খুবই কাছে পাখিগুলি পেয়ে যাই। আর সংখ্যায় অগণিত। (এখানে পাখি কাছে পাওয়ার কারন আগের পর্বে উল্লেখ করেছিলাম) বিভিন্ন ভঙ্গিমায় চামুচ ঠুঁটি পাখির ছবি তুললাম। মনটা আনন্দে ভরে গেল। আমি জানি আমার সঙ্গীদের কারো এই পাখির ছবি তোলা নাই। পরে সবাইকে ডেকে এক সঙ্গে করে পাখির ছবি তুলতে বললাম। তারা সবাই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো এবং পুরস্কার স্বরূপ আমাকে ধন্যবাদ জানালো। আমি তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশে মুগ্ধ হলাম। কারো কাছ থেকে নতুন কিছু গ্রহন করায় তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ লজ্জ্বার কিছু না। বরঞ্চ আনন্দের ও গর্বের। কেন কথাটা বললাম? সর্বপ্রথম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বিশিষ্ট বণ্যপ্রাণী গবেষক,আলোকচিত্রী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেনারী বিভাগের ডিন ডঃ আমিনুর রহমান। এত বড় মাপের একজন কিংবদন্তী মানুষ যখন সবার সম্মুখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তখন আমি অবাক ও লজ্জিত হয়ে যাই। পরে তিনি আমাকে বলেন, আপনি আমাদের থেকে অনেক দূরে ছিলেন। আপনি ডেকে পাখিটির ছবি তুলিয়ে না দিলে আমরা কোনদিন স্পুনবিল পাখির ছবি তুলতে পারতাম না। আর এই কাজগুলি বরবার আমি আমার সতীর্থদের জন্য করে আসছি। আগে তাদের ছবি তোলার সহযোগিতা করি পরে নিজে তুলি। তাতে আমি খুব আনন্দবোধ করি।
আমি এই বন থেকে অনেক প্রজাতি পাখির ছবি তুলেছি। তার অধিকাংশই দেশ থেকে তোলা। আর আপনাদেরও অনেকের কাছে পরিচিত। তাই আমার ভ্রমন কাহিনীতে যে পাখিগুলি আমার তোলা ছিল না সেগুলিই আপনাদের কাছে উপস্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিলাম। না হলে সকল পাখি উপস্থাপন করতে হলে ৩০০ পর্বেও লেখা শেষ করা যাবে না। ব্যাপারটি পাঠক বন্ধুরা ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
ইউরেশিয়ান চামুচ ঠুঁটি বা Eurasian Spoonbill
ইউরেশিয়ান চামুচ ঠুঁটি বা Eurasian Spoonbill মূলতঃ প্রাশ্চেত্যের পাখি। এরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পরিয়ায়ী হয়ে আসে খাবারের জন্য। এরা প্লাটালিয়া লিউকোরিডিয়া পরিবারের বা গোত্রের অন্তর্ভুক্ত একটি জলজ পাখি। এদের ইংরেজী নাম Eurasian Spoonbill ও বাংলায় নাম হলো ইউরেশিয়ান চামুচ ঠুঁটি।
 
এদের মূলত ভারত,পাকিস্তান,ভূটান, নেপাল ও শ্রীলংকায় দেখা পাওয়া যায় শীত মৌসুমে। এরা নিজ দেশ ছাড়া অন্য কোথাও প্রজনন করে না। কোন পরিযায়ী পাখিই নিজ দেশ ছাড়া প্রজনন করে না। শীত মৌসুমে অতিরিক্ত ঠান্ডা ও বরফে জলাশয় আচ্ছন্ন থাকায় এরা পরিযায়ী হয়ে আসে খাদ্যের অন্বেষনে।
 
এদের প্রধান খাদ্য জলজ পোকামাকড়, শাঁস, নিউটস, ক্রাস্টেসিয়ানস, কৃমি, জোঁক, ব্যাঙ,ছোট মাছ ও জলজ উদ্ভিদের শেওলা বা ছোট ছোট টুকরো জলজ ফল।
 
এরা দলগত ভাবে চলাফেরা করে। কখনও দলছুট হয় না। এরা কমপক্ষে ২০০ এর অধিক ঝাঁকে দলবেঁধে কোন সুবিধাজনক ও নিরাপদ স্থানে অস্থায়ী আবাস গড়ে তুলে। খাদ্যের অভাব দেখা দিলে মাঝে মাঝে ৩/৪টি পাখি দলছুট হয়ে আশেপাশে কোন অঞ্চলে চলে আসে খাবার খোঁজার জন্যে। খাবার শেষে পুনরায় দলে যোগ দেয়। এক সঙ্গে রাত্রিযাপন করে। প্রজনন কালে এরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়।
 
এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এদের প্রজননকাল। জলাশয়ের ধারে উঁচু গাছে মাচার মতন করে খড়,লতা গুল্ম ও ছোট ছোট গাছের ডালা দিয়ে বাসা বানায়। নিজেদের বানানো বাসায় মেয়ে পাখিটি ৫-৬টি ডিম দেয়। উভয়ে ডিমে তা দেয়। ২৮ দিনে ডিম থেকে বাচ্চা ফুঁটে বের হয়। বাবা ও মা মিলিত ভাবে ছানাদের পরিচর্যা করে। ছানারা বড় হলে বাসা ছেড়ে উড়ে চলে যায়।
 
এই জলজ পাখি সারা বিশ্বে বর্তমানে নিরাপদে আছে। এখনো হুমকির মুখের পড়েনি। ইউরোপের অধিকাংশ দেশে এদের দেখা পাওয়া যায়।
আশা করি আমার পাঠক বন্ধুদের ইউরেশিয়ান চামুচ ঠুঁটি বা Eurasian Spoonbill জলজ পাখিটি সম্পর্কে মোটামুটি ধারনা দিতে
পারলাম।
 
(চলবে)
মোট পড়েছেনঃ ৯৭৯জনআজ পড়েছেনঃ ০জন

২৫টি মন্তব্য

    1. ভাইজান, আমি ব্লগের জন্য ছবি সাইজ করতে পারিনা সব ছবি আগে তৌহিদ করে দিত আর এখন ইঞ্জা ভাই করে দিচ্ছেন। বার বার উনাদের বিরক্ত করতে ইচ্ছে হয় না। তাই আজ নিজেই পিসিতে ব্লগের জন্য সাইজ করতে যাই। কিন্তু শেষের ছবিটা যতই সাইজ করে ততই পোষ্ট করার সময় হলে ১০০কেবির উপরে। ছোট করতে করতে এই অবস্থা।

      1. শামীম ভাই, আমি যে রিসাইজার ইউজ করি, তা আপনাকে পাঠানো যায় কিনা দেখি। পিসির জন্য বেস্ট রিসাইজার। হেলাল সাহেবও একই রিসাইজার ইউজ করেন।
        পিসি ব্যবহার করে কোনো লিংক পোস্টের মধ্যে দিলে ( যেমন উপরে পর্ব দশ দিয়েছেন) সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হচ্ছে, পূর্বতন পোষ্টে গিয়ে তার শিরোনাম কপি করে বর্তমান পোষ্টে দিবেন। আর কিছু করতে হবে না।
        না বুঝলে বলবেন ভাই।

      2. জ্বি জিসান ভাই। মমি ভাই বুঝিয়ে দিয়েছেন। লিংক কিভাবে দিবো। এই পর্বে সেভাবেই করেছি। পিসিতে পর্বটা ওপেন করে লিংক কপি করে পরে লেখা শুরুর আগে পেষ্ট করেছি। ধন্যবাদ শিখানোর জন্য।

  1. বাহ অসাধারণ এক সাবজেক্ট দিলেন ভাই, স্পুনবিল পাখি আমি টিভিতে দেখেছি, আজ দেখলাম আপনার ছবি ও লেখাতে জানলাম পাখিটির জীবনাচরণ, খুব ভালো লাগলো ভাই।

  2. অসাধারণ ভাইয়া আপনার এতো ধৈর্য্যের কারনে এমন অজানা পাখি গুলো দেখার সুযোগ পাচ্ছি, বিস্তারিত জানার সুযোগ পাচ্ছি। অসংখ্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা রইলো। নিরাপদে থাকুন সুস্থ থাকুন শুভকামনা রইলো

  3. ধন্যবাদ ভাইজান পাখি সম্পর্কে ধারনা আমার একদম নেই আপনার লেখায় অনেক কিছু জানতে পারি। আপনার লেখায় চামুচ ঠুঁটি পাখিটা দেখতে পারলাম,চিনতে পারলাম।
    আরো অনেক কিছু জানার,দেখার ইচ্ছা রাখি ভবিষ্যৎতে, ভালো থাকবেন।

    শুভ কামনা রইল।

    1. ধন্যবাদ আলিফ। দীর্ঘদিন পাখির ছবি তোলার সুবাদে পাখি নিয়ে কাজ করতে যেয়ে নানানমুখী অভিজ্ঞতা অর্জন হয়। তাই সবার সঙ্গে আমার ছবি ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারলে অনেক অজানা তথ্য জানাতে পারবো। তুমি লেখাটি পড়ায় ও জানতে পারায় আমার পরিশ্রম স্বার্থক। ভাল থেকো বোন।

  4. চামুচ ঠুঁটি! নামটার মতোই পাখিটাও দেখতে অদ্ভুত।
    মনে হচ্ছে সত্যি সত্যিই ঠোঁটের আগায় একটা চামচ লাগিয়ে রেখেছে। আপনার প্রতিটি ছবির পেছনের গল্পগুলো খুবই আকর্ষণীয়। মনেহয় ছবি দেখতে নয়, যেন কোনো অ্যাডভেঞ্চারে অংশ নিতে যাচ্ছি।

    সিরিজ চলুক, পড়তে থাকবো।
    ভালো থাকুন শামীম ভাই। শুভ কামনা 🌹🌹

  5. ভ্রমণ এবং ছবি পোষ্ট দুটোই আমাকে সমান আকর্ষণ করে। তাই কোন ভ্রমণে যদি এমন চমৎকার তথ্য এবং পাখির ছবি থাকে সেটা আমার কাছে মনে হয় যেন এক টুকরো হিরে……..হিরে পোষ্টে ভালোলাগা জানিয়ে গেলাম বড় ভাই।

মন্তব্য করতে লগিন করুন অথবা নিবন্ধন করুন।