মূল লেখায় যান

মধ্য রাতের ট্রেন

কামাল উদ্দিনঅন্যান্য৩১টি মন্তব্য

চট্টগ্রাম মেইলটা নরসিংদী স্টেশনে আসে রাত সাড়ে এগারটা থেকে বারটার মধ্যেই। ভোর রাতের মধ্যে কসবা পৌছার জন্য এই ট্রেনটা একেবারে পারফেক্ট। নরসিংদী স্টেশনে রাত সাড়ে দশটার মধ্যেই পৌছে গেছি। রেল স্টেশন আমার খুবই প্রিয় জায়গা। এই স্টেশন গুলোতে যেন দুনিয়ার সব রকম লোকের দেখা পাওয়া যায়। স্টেশনের হকারদের মন ভোলানো হাঁকডাক। এদের মধ্যে কেউ ঝালমুড়ি, কেউ লেবু পানি আর আচার বিক্রেতা। এছাড়া প্রতারক আংটি ব্যবসায়ী ছাড়াও রয়েছে নানা রকম ধান্ধাবাজ, হেন কোন লোক নাই যে এখানে মিলবে না। স্টেশনে গেলে এসব আমি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখি।

ব্রিটিশদের নির্মিত সিমেন্টের ভাঙ্গা বেঞ্চিগুলো ইতি মধ্যেই ভবঘুরেদের দখলে চলে গেছে। এক ঝাক মশার প্রহরায় কেউবা নাক ঢেকে ঘুমোচ্ছে, অন্য কোথাও আবার কয়েকজন বসে আড্ডা মারছে, এমনকি তাদের মতিগতি ভালো ঠেকছে না বলে দূরে থাকাই শ্রেয় মনে হচ্ছে। ওয়েটিং রুমের যা তা অবস্থার কথাটা নাইবা বললাম। স্টেশন মাষ্টার প্রথম বলেছিল রাত ১২টার মধ্যেই ট্রেন চলে আসবে। ঘুরে ঘুরে বাদাম চানাচুর খাচ্ছিলাম আর মাঝে মাঝে মোবাইল স্ক্রীনে চোখ বুলিয়ে টাইম দেখে নিচ্ছিলাম। পৌনে বারটার দিকে স্টেশন মাষ্টার জানিয়ে দিলো আজ ট্রেন লেট হবে, মানে হলো ১২টায়ও আসছে না। চোখের পাতা এবং পা দুটোই বেশ ভারি হয়ে আসছিল। কোথাও বসে একটু চা খেতে পারলে চোখ আর পায়ের বিশ্রাম হতো। কিন্তু স্টেশনের ভাসমান চা বিক্রেতাদের কাছে লাল চা খেতে পারলেও বসার সুযোগ পাওয়া যাবে না।

যেহেতু ট্রেন আসতে লেট হবে ভাবলাম একটু হেটে স্টেশনের বাহির থেকে গাভির দুধের চা খেয়ে আসি। প্লাটফরম থেকে নেমে রেল লাইন ধরে সোজা একটু হাটতেই পেয়ে গেলাম একটা চা দোকান। এখান থেকে স্টেশন যেহেতু দেখাই যায় সুতরাং চা খাওয়ার উছিলায় একটু আয়েস করে সময় কাটানো যাবে ভালোই। কয়েকজন লেবার শ্রেণীর লোক বসে চা খাচ্ছে বা নিজেদের সাংসারিক আলাপ করছে। একটা বেঞ্চিতে অল্প একটু যায়গা খালিই ছিলো যাতে আমি লোক গুলোর গা ঘেষে গাদাগাদি করে বসতে পারলাম। গরুর দুধের চায়ের অর্ডার দিলাম। দোকানি বেশ বয়স্ক মানুষ, আর পোষাকেও দারিদ্রতার ছাপ স্পষ্ট। অনেক সময় নিয়ে আমাকে চা বানিয়ে দিলেন, আমার ও তো কোন তাড়া নাই। চা খেতে খেতে দোকানীর সাথে কিছুটা আলাপ জমানোর পরই উনি বললো অমাবশ্যার রাতে ট্রেন ভ্রমণ ভালো নয় বাবা।

চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম ঘুটঘুটে অন্ধকার। মনে হচ্ছে পৃথিবীতে এই দোকানটা ছাড়া আর কিছুই নাই। অথচ আমার স্পষ্ট মনে আছে প্লাটফরম থেকে যখন মাটির রাস্তায় নামি চাঁদের আলোয় রাস্তা চকচক করছিলো। মোবাইলের কোন আলো না জ্বালিয়েই আমি এখানে এসেছি। ভাবলাম হয়তো মেঘে চাঁদ ঢেকে গেছে। কিন্তু ধাক্কাটা খেলাম যখন স্টেশনটাকে দেখতে পেলাম না। অথচ এখানে বসে চা খেতে খেতে আমি অনেক বার স্টেশনের আলোগুলো দেখেছি। বিল মিটিয়ে তাড়াতাড়ি স্টেশনের দিকে পা বাড়ালাম। একটু আগানোর পরই স্টেশনের লাইটগুলো আবার দেখতে পেলাম। কিন্তু স্টেশনে পৌছে মনে কেমন যেন খটকা লাগলো। লোকজন এতো কম কেন? স্টেশন মাষ্টারকে জিজ্ঞেস করলাম চট্টগ্রাম মেইল কখন আসবে? ওটা তো চলে গেছে ঘন্টাখানেক আগেই। এটা কি করে সম্ভব! আমি তো ট্রেন লাইনের পাশেই বসে চা খাচ্ছিলাম! কসবা যাওয়া আজ আর হবে না বুঝে গেলাম। স্টেশন থেকে বের হয়ে একটা সিএনজি নিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা হলাম।

পরের দিন ভোরেই খবরের হেড লাইনে দেখলাম চট্টগ্রাম মেইলের সঙ্গে মহানগর গোধূলি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই ট্রেনের চালক সহ ১২ জন নিহত। সকালেই আমি ছুটে গেলাম দূর্ঘটনা স্থল দেখতে। একেবারে ভয়াবহ অবস্থা। একটা ট্রেন অন্যটার ভেতরে ঢুকে গেছে। আল্লাহকে অশেষ ধন্যবাদ দিয়ে ফেরার পথে ভাবলাম চাচার দোকান থেকে একটা দুধ চা খেয়েই যাই। কিন্তু ওখানে গিয়েই খেলাম বড় ধাক্কাটা। ওখানে তো কিছুই নাই একেবারে ফাঁকা যায়গা। ভাবলাম ভুল করছি, তাই স্টেশনে গিয়ে আবার ফিরে এলাম, নাহ আমার কোন ভুল নাই। মহা ফাপড়ে পড়ে গেলাম এবং রাতের সবগুলো ঘটনা আবার রিভার্স দিলাম। স্টেশন মাষ্টারের ভুল বলা, পাশ দিয়ে ট্রেন যাওয়ার পরও না দেখা, এক সময় এই দোকান ছাড়া আর কিছুই না দেখা! সব কিছু যেন স্বপ্নের অংশ মনে হচ্ছে। কাছাকাছি আরশি নগরের এক মধ্য বয়স্ক দোকানীকে জিজ্ঞেস করলাম ভাই ওখানে তো একটা চা দোকান ছিল, সেটা কোথায়? কেউ কি ওটা দেখেছে? লোকটা আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করলো। মানে কি? লোকটা বললো মানে হলো নিশ্চয়ই গত রাতে কেউ ঐ দোকানটা দেখেছে। আর তারই ফলাফল হলো এই ট্রেন দূর্ঘটনা। আমার মাথায় কিছুই ঢুকছিল না।

তখন মানুষ ঢাকা যাতায়াত করতো পায়ে হেটে। বৃটিশরা এসে এই ট্রেন লাইন সৃষ্টি করে। ট্রেন লাইন হওয়াতে এলাকার মানুষের সুবিধা হয়, এবং খুব অল্প সময়েই স্টেশনটা খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠে। তখন এই এলাকায় একটা মাত্র দোকান ছিল যেখানে কিছু খাবার দাবার আর চা বিক্রি হতো। এক দিন সন্ধ্যার ট্রেন আসতে খুব লেট করছিলো। শোনা যায় যান্ত্রিক ত্রুটি সারিয়ে আসতেই ওর দেরি হচ্ছিল। যখন ট্রেনটা আসে তখন প্রায় মধ্য রাত। বিপরিত দিক থেকেও তখন অন্য ট্রেনটি চলে এসেছিল, তখন সিগন্যাল গুলো হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হতো। কোন কারণে সিগন্যাল ম্যান অনুপস্থিত ছিলো বা বিপরিত দিক থেকে লেট করে আসা ট্রেনটির কথা ভুলে গিয়েছিল। ফলাফল মুখোমুখি সংঘর্ষ। সেই সংঘর্ষের সময় পাশেই থাকা দোকানে কয়েকজন রেল শ্রমিক চা খাচ্ছিল বা আড্ডা মারছিল। একটা ইঞ্জিন ছিটকে এসে ঐ দোকানে চলে আসে, আর ওখানে থাকা শ্রমিক এবং দোকানি ইঞ্জিনের গরম কয়লায় পুড়ে ছাই হয়ে যায়। মাঝে মধ্যেই লোকজন মধ্য রাতে ঐ দোকানটা দেখে। আর যেদিন দেখে সেদিন কোথাও ও না কোথাও ট্রেন দূর্ঘটনা নিশ্চিৎ। এটা অনেক পুরোনো কিন্তু সত্য কথা, দোকানি আমাকে বলল।

শির দাড়া বেয়ে একটা শিতল স্রোত নেমে গেল আমার। বলে কি লোকটা! তাহলে গত রাতে আমরা সেই শত বর্ষ পুরোনো দোকানে বসে চা খেয়েছিলাম! লোকগুলো শতবর্ষি পুরোনো, আর দুধ চা টাও নিশ্চয়ই সেই সময়কারই! কতো যায়গায়ই তো আমরা সেলফি তুলি, ওখানে একটা সেলফি তুললাম না কেন??

মোট পড়েছেনঃ ১০৭৯জনআজ পড়েছেনঃ ০জন

৩১টি মন্তব্য

  1. কি ভয়ংকর অবস্থা। এমন ভুতুড়ে অবস্থা ভাবলেই শিউরে উঠছি। ধন্যবাদ ভাইয়া আপনার লেখাটা ভালো লেগেছে। সত্যি মিথ্যে জানিনা তবে এসব শুনে শুনে রেল স্টেশন সম্পর্কে আমার একটা ভীত অবস্থা কাজ করে সবসময়। বিশেষ করে রাতের স্টেশন সম্পর্কে অনেক নাটক সিনেমায় এগুলোই দেখানো হয়। ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন

    1. এমন গল্পগুলো শত ভাগ সত্যি হওয়ার কোনও কারণ নাই। তবে পুরোনো দিনের মানুষরা এমন সব গল্প বেশী বলে এবং বিশ্বাস ও করে। এখানে কিছুটা বাস্তব আর বাকিটা…….ধন্যবাদ আপু, শুভ রাত্রি।

  2. যাক অবশেষে ঘুরান্তিস এর বাইরে গিয়েই ভুত-প্রেতের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হয়ে গেল।
    এতগুলো লাইন বোধ করি জীবনে প্রথম লিখলেন, এখানে অবশ্যই।
    এবার থেকে চা-চো সাবধানে খাবেন!

  3. আমি ভাবছি, সব শোনার পর আপনার কি অবস্থা হয়েছিলো তখন! শুধু ভয়টুকুই পেয়েছিলেন নাকি বাসায় ফেরার আগেই জ্বরে ধরেছিলো? শুনেছি আৎকা ভয় লাগলে মানুষ তৎক্ষনাৎ ভয়টা বুঝতে পারেনা, কিন্তু জ্বর আসে। আর তারপর অনেক দিন সেই অবস্থাটা মনের মধ্যে ঘুরঘুর করতে থাকে। তবে যাইহোক আপনার সাথে যাই ঘটেছে তাতে আপনার মঙ্গল হয়েছে।

    এই প্রথম আপনার কাছ থেকে একটা পূর্নাঙ্গ লেখা পেলাম। বলতে দ্বিধা নেই, খুব ভালো লিখেছেন। এরপর থেকে কিন্তু থামা যাবে না। বেশি বেশি করে লিখতে হবে 🙂

    শুভ রইলো ভূতুরে ভাই,
    ভালো থাকুন সব সময় 🌹🌹

  4. আমার কাছে আপনার এই গল্পটা রহস্য গল্পই মনে হচ্ছে। আবার ভাবছি! যদি সত্যি সত্যি সেদিন সেসময় সেখানে উপস্থিত থাকতেন, তো এই পোস্টে না হলেও অন্তত কয়েকটা ছবি যুক্ত হতো। যেহেতু আপনি একজন ছবি তোলার ওস্তাদ। তো যাহোক, গল্পটা পড়ে নতুন করে ট্রেনে চড়ার ইচ্ছে জাগছে। অনেক বছর হলো ট্রেনে চড়া হয় না আমার!
    শুভকামনা থাকলো শ্রদ্ধেয় দাদা।

  5. ট্রেন স্টেশন আমারও খুব পছন্দের স্থান৷ বিদেশে গেলে আমি কাছাকাছি ট্রেন স্টেশন এ যাবই একবার৷ গিয়ে বসে থাকি মানুষ দেখি।
    অনেক ভালো একটি পোস্ট দিলেন। আপনার এই পোস্ট আপনাকে আলাদা ভাবে পরিচয় করিয়ে দিলো৷
    এমন রহস্যপুর্ন লেখা আরো চাই।

    শুভ কামনা।

  6. কামাল ভাই ব্যপক হইছে গল্পটা । অনেক ‍দিন পর এমন একটা গল্প পরলাম, তবে কামাল ভাই গল্পের একটা অংশ কিন্তু আপনি বাদদিয়েছেন —
    “ আপনি যখন চায়ের কাপে একটা চুমুক দিলেন তখন আপনার পিছন থেকে 10/12 বছরের একটা কন্ঠ ভেসে এল — স্যার আজইকা হারাদিন কিছু খাইনাই, ঠিক তখনই চায়ের দোকানী ধমক দিয়ে বলল যা ভাগ, আমি পিছন ফিরে দেখলাম ছেলেটা ধমক খেয়ে 2/3 তাহ ধূরে গিয়ে দাড়িয়ে রইল, কোলে 5/6 বছরের একটা বাচ্ছা, চায়ের দোকানী আমাকে লক্ষ কর বলল, কমল- বাপ মা নাই, ষ্টেশনেই থাকে, দিনে কিছু জুটলে ভাই বোন মিলে খায় না ঝুটলে উপাস ঘুমায়, আমি ছেলেটাকে কাছে ডেকে বললাম কিখাবে, ছেলেটা চুপ, আমি দোকানীকে বললাম চাচা দুইটা কলা, দুইটা রুটি আর এক গ্লাস দুধ দেন, খাবার গুলো হাতে নিয়ে ছেলেটা একটু দূরে যেয়ে মাটিতে বসে বোনকে নিয়ে ক্ষেতে শুরু করল, খাবার অবস্থা দেখে বুঝাযাচ্ছে সারা দিন কিছুই খায়নি, আমি চাটা শেষ করে আরো 2টা কলা 2টা রুটি ছেলেটার হাতে দিয়ে বললাম পরে খেয়েও, ট্রেন দূর্ঘটনার পর তাদেরকে আর কেউ ষ্টেশনে দেখেনি, হয়ত গরম কয়লার নিচে পরে তারাও না ফেরা দেশে চলেগেছে। ” কামাল ভাই লকডাউন থাকতে থাকতে এমন কয়েকটা হিট গল্প মুক্তি দিয়েদেন। আমরা পইরা ফিট হইয়া যাই।

    1. আসলে এমন করে গল্প লেখার মতো আমার ভেতরে রসদ নাই। লেখকদের মনের ভেতর আলাদা একটা জগৎ সৃষ্টি করতে হয়, তেমনটা করার মতো সময় সুযোগ বা ক্ষমতা আমার খুব একটা হয়না……অনুপ্রেরণা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।