মূল লেখায় যান

কেমন আছিস তুই//

বন্যা লিপিচিঠি৩২টি মন্তব্য

জানিস্! ভীষণ মনে পড়ছে তোকে। এই মাসটা এলেই আমি বিষণ্ণ হয়ে যাই।আমার বুকের ভেতরে চাপ চাপ কষ্টেরা কিলবিল করে।এ মাসটা এলেই তোর চাঁদের জোছনার মতো মুখটা চোখের তারায় জ্বল জ্বল করে জ্বলতে থাকে। তোর চোখ মুখ ললাট, কদম ছাঁটের মতো ঘন কালো চিকচিকে চুল গুলো। আমার চোখ পোড়ায়,আমার বুক ঠেলে কান্না পায়।আমি একা একা কাঁদি। এমন করে কেন চলে গেলি?

তোকে চিঠি লিখি কোন ঠিকানায়? তুই পারবি তো পড়তে আমার চিঠি। এখনো কি আমার ওপর অভিমান আছে তোর? পারবিনা আমায় মাফ করতে? তুই ভীষণ শান্ত ছিলি। একেবারে মাটির পুতুলের মতো। আমার যে অনেক রাগ ছিলো! একটু এদিক সেদিক হলেই তোকে চড় থাপ্পর মারতাম। খুব কি লাগতো তোর?
কেন বুঝিনি তোর মর্ম? তাই কি এত তারাতারি ছেড়ে চলে গেলি?
তোকে নিতে চাইনিতো, কেন জিদ ধরলি তুই? সেদিনটা আজো জ্বল জ্বল করছে স্মৃতীতে, নিপুর জন্ম হলো সকালে, কোরবানী ঈদের দ্বিতীয় দিন।ঈদের দিনের পোড়ানোর পরেও বাকি থাকা আতশ বোমা (বাঁশের কঞ্চির মাথায় রঙিন কাগজে মোড়া বারুদ)ফাটালাম আমরা সবাই মিলে।রঙ মাখলাম,বায়না ধরলাম পুকুরে গোসল করতে যাবো, জানতাম আম্মা আজ আর বেশি আপত্তি করবেন না। শুধু তোকে আর সাগর’কে নিতে চাইনি, তারপরও তুই বিপু সাগর সবাই বায়না ধরলি আমার বন্ধুদের সাথে তুইও যাবি।আম্মা কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। তোদের জন্য আলাদা পানি তুলছিলেন, গোসল করিয়ে দেবেন বলে।
তুই আম্মার সামনে কেমন ভাবে অনুনয় করে করে রাজি করিয়ে নিলি। ১০/১২ জনের দলের সাথে তোরাও চলে এলি।

থানা’র পুকুরের ঘাটে বসিয়ে বিপু, সাগর আর তোকে আমি বলে দিয়েছিলাম, খবরদার,যেখানে বসিয়ে রেখেছি এখানেই থাকবি। আমি ছাড়া এক সিঁড়িতেও নামবিনা তোরা। সাগর,বিপু,তুই লক্ষী হয়ে বসে ছিলি। আমি তোদের মগে পানি তুলে তুলে গোসল করিয়ে দিয়ে বসিয়ে রাখলাম।
তাহলে কি হলো?

আমাকে ধাক্কা দিলো কে পেছন থেকে? হাবুডুবু খেতে লাগলাম সাঁতার না জেনে! ডাক্তার কাকার মেয়ে ঈরানী চুল ধরে টেনে না তুললো। তারপরই শুনলাম সুইট সুইট চিৎকার। তোকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। হাবুডুবু খেতে খেতে আমার শরীর বিবশ।
আমি জোড় গলায় চিৎকার করছি, সুইটি সুইটি সুইটি……..মুক্তি,বনানী, মনি,সেলিনা, শিউলি, পলি ফুপু,হ্যাপী ফুপু, ঈরানী, দুলালী সবাই তোকে ডাকছে। ছুটে যাচ্ছি বাসার দিকে, পা চলছেনা, রাস্তা দিয়ে যাবার সময় মোফাজ্জেল কাকা জানতে চাইলেন এমন করে কাঁদছি কেন? রাস্তার মধ্যেই লুটিয়ে পড়লাম। কাকু সুইটি কে পাচ্ছিনা, কাকু হাতের ঘড়ি খুলতে খুলতে বললেন, তুই বাসায় যাইয়া জানা, আমি যাচ্ছি,বলেই দৌড়ে ছুটে চলে গেলেন পুকুর পাড়ে।
বাসায় এসে লুটিয়ে পড়লাম আম্মার পায়ের কাছে, কেবল গোসল করে বের হয়ে শাড়ি পড়ছিলেন আম্মা।
আম্মা কি ভেছিলো জানিস! আবার বুঝি তোর সাথে আমার মারামারি লেগেছে। যখন বললাম তোকে খুঁজে পাচ্ছিনা,দিগ্বিদিক হয়ে ছুটে বেড়োতে গিয়ে সদর গেটের সাথে শাড়ির আঁচলে ছিঁড়ে আটকে রইলো। চৌমাথা থেকে সোজা থানার পুকুর পর্যন্ত এক দৌঁড়ে রাস্তা পেড়োলেন, সাথে সাথে ছুটলো শত শত মানুষ। পুলিশ সদস্য,সাধারন মানুষ পুকুরে নেমে গেলো তোকে খুঁজতে। ২০/২৫ হাত গভির পুকুরে তোকে কেউ খুঁজে পেলোনা।
পুকুরের ডান দিকে ওই দুরের কোনা ধরে লাবলু কাকাদের বাসা। তাঁদের বাসার পেছন দিকটাতে এই পুকুর। ওখানে ভিড় জমেছিলো দেখার জন্য এ পুকুরে কেউ হাড়িয়ে গেছে বলে। লাবলু কাকা ঘরে ঘুমাচ্ছিলেন, লাবলু কাকার মা তাকে ঠেলে জাগিয় দিয়ে বলেছিলেন… “লাবলু তুই এহনো ঘুমাও ওঠ শিগগীর, দেখ গিয়া চাঁনের ( চাঁদ,আমার আব্বার নাম) মাইয়া পুকুরে পড়ছে মনে হয়।” কাকু সোজা দৌঁড়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন পুকুরে। এক ডাইভে চলে গেলেন পুকুরের গভির অতলে, তোর পিঠেই হাত পড়লো সোজা। দৌড়ে আসার ফলে তাঁর নিঃস্বাশের কষ্ট হচ্ছিলো।ভেসে উঠলেন। জানালেন সবাইকে, তোকে পেয়েছেন খুঁজে। দ্বিতীয় ডাইভে তোকে তুলে আনলেন। সম্ভাব্য সবরকম চেষ্টা চললো। তোর অমন সুন্দর ফর্সা দেহ নিথর রইলো তো নিথরই রইলো। সবাই আমাকে দোষী করলো। আমি কেন পুকুরে যাবার বায়না করেছিলাম। আব্বা আমাকে চড়ও মারলেন। আমি কেন বেঁচে রইলাম বল বুবু? পরে জেনেছি তোকে সাঁতার শেখাবার ছলে কেউ একজন(নাম বলছিনা) পিঠে করে মাঝ পুকুরে নিয়ে গিয়েছিলো। ফিরে আসাতে কষ্ট হচ্ছিলো বলে তোকে ছেড়ে দিলো। কি করে মানবো বল? আমার ওপরে রাগ করে আছিস এখনো বুবু? পারবিনা আমায় মাফ করতে?
আমার বিশ্বাস তুই বেহেস্তি বাগানে ফুল হয়ে আছিস। মহান আল্লাহ তোকে বেহেস্তি বাগানে ফুল করেই রাখুন।
আমি ভাবিনি তোকে কখনো লিখতে পারবো। কষ্ট হয় বুবু, ভীষণ কষ্ট!
যেখানেই আছিস খুউব ভালো থাকিস বুবু।
আজকের দিনটা এলেই আমি বড় বেশি কাঁদি। আমার যে আর কেউ বোন রইলোনা। শুভ’টাও ছেড়ে চলে গেলো।
ওকে তো নিজের বাচ্চার মতো করে পালতাম রে! তাও চলে গেলো।
আর লিখতে পারছিনা।
তুই ভাল থাকিস।
তোর
লিপি আপু

১০: ১০:২০১৯

মোট পড়েছেনঃ ১৩৯৫জনআজ পড়েছেনঃ ০জন
ঘরে বসেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন

৩২টি মন্তব্য

    1. এ কাহিনী সম্পূর্ণ সত্যি।আমার ইমিডিয়েট ছোটো বোনকে উদ্দেশ্য করে লেখা।
      মনে হয়না যেভাবে লিখতে চেয়েছিলাম, সেভাবে লিখতে পেরেছি। কষ্টগুলো ভাষা রুদ্ধ করে রেখেছে। পড়েছেন, মন্তব্যে কৃতজ্ঞতা ধন্যবাদ জানবেন।

  1. পুকুরে পানিতে ডুবে মৃত্যু! এ মৃত্যুটা আমার অনেক চেনা তবে মরিনি আমি ভাগ্যের জোরে এক সকালে ডুবেছিলাম পুকুরে উদ্ধার হই সেই বৈকাল পাচটায়। অলৌকিক ভাবে বেচে যাই আমি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য।আজ আপনার এ লেখাটি পড়ে মনে পড়ে গেল আমার সেই ভয়ংকর স্মৃতি। ওপারে ভাল থাকুক আপনার বোনটি এই দোয়া রাখছি।

  2. লেখা পড়ে ব্যথিত হলাম আপু। বোনের জন্য অনেক দোয়া রইলো।

    আজ আপনার লেখায় সত্যিই চমৎকৃত হলাম। ফাঁকিবাজের মত যিনি বড় লেখা এড়িয়ে যেতেন তিনি নিজেই আজ এত সুন্দর আবেগময় লেখা লিখেছেন দেখে অনেক খুশি হয়েছি।

    ধন্যবাদ আপনার প্রাপ্য। শুভকামনা রইলো।

    1. ভাই বড় হয়ে গেছে অনেক, তাইনা? কি করবো বলুন? এটুকু না লিখলে কি পুরোটা বোঝানো যেত?
      ধৈর্য ধরে পড়েছেন তাতেই ধন্য হলাম অনেক। শুভ কামনা, শুভেচ্ছা জানবেন।

  3. ছোট বোনের আত্মা শান্তিতে থাকুক ওপারে। কলিজার টুকরা বোনের পরপারে চলে যাওয়া কতটা হৃদয় বিদীর্ণ করে তা কাউকে বোঝানোর মত নয়।

    ভালো থেকো বন্যা। শুভ কামনা 🌹🌹

  4. নিজের অর্ধ শততম পোস্ট প্রিয় বোনকে নিয়ে দিয়েছো। সে যেখানেই আছে তোমার এই নিবেদনে খুশি হবে।

    শুভেচ্ছা আর অভিনন্দন অর্ধ শততম পোস্টের জন্যে। আশা করি অতি শিগ্রিই শততম পোস্ট আমাদের উপহার দিবে। 🌹🌹

  5. চোখের কোণে জল নিয়ে চিঠিটি পড়ছিলাম আপু, বুক ফেটে কষ্ট বেরিয়ে আসছে, কি বলে স্বান্তনা দেয় আপনাকে, বোনের অকাল মৃত্যু আসলেই সইবার নয় আপু।
    দোয়া করি আল্লাহ্ যেন আপুকে জান্নাতুল ফেরদৌসের বাগানে রাখেন, আমীন।
    😭

    1. একদম ঠিক বলেছেন আপু,দু’দুটো বোন হারিয়ে অবশেষে আমি একা রয়ে গেছি। সবার মাঝে বোনদের খুঁজি। আমার অনেকগুলো কাজিন বোন আছে। ওদের মধ্যেই খুঁজি আমার হারানো বোনদের। ওরাও আমাকে ভীষণ ভালবাসে।
      আপনাকে ধন্যবাদ অনেক।
      মনে হচ্ছে আপনি আমার ব্লগে এসে পচন্দসই পোস্টগুলোতে মন্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। আমার নজরে পড়তে দেরি হলো বলে ক্ষমাপ্রার্থী।
      ভালবাসা রইলো আপনার প্রতি।

মন্তব্য করতে লগিন করুন অথবা নিবন্ধন করুন।

অনলাইনে ডাক্তার দেখাতে চান?